ঢাকা, শুক্রবার 21 April 2017, ৮ বৈশাখ ১৪২৩, ২৩ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

গরু জবাই রুখতে মানবহত্যার আইন কি সভ্যতার পরিচায়ক?

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : গরুর গোশত সবচেয়ে সুস্বাদু ও পুষ্টিকর খাদ্য। যাদের এলার্জি আছে তাদের কথা বাদ দিলাম। হাইপার টেনশনওলাদেরও গরুর গোশত খাওয়া থেকে দূরে থাকা উচিত স্বাস্থ্যগত কারণে। এছাড়া কোনও অন্ধবিশ্বাস যা তথাকথিত ধর্মীয় বোধ থেকে গরুর গোশত খাওয়া থেকে দূরে থাকা মানে শুধু বোকামো নয়; আল্লাহর একটি নিয়ামতকে অমর্যাদা করবারও শামিল বৈকি।

মানুষ অনেক প্রাণিই খায়। আসলে মানুষকে এসব খেয়ে হৃষ্টপুষ্ট হয়ে আল্লাহর ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। আফ্রিকা মহাদেশের মানুষ সাপ, বিচ্ছু, উঁইপোকা, পিঁপড়ে, কেঁচো, কাঠের পোকা প্রায় সবই উদরস্থ করে। কোনওটা পুড়িয়ে এবং কোনওটি কাঁচাই ওরা খেয়ে ফেলে। মুসলমানরা অবশ্য সব প্রাণি বা জীব খেতে পারে না। তাদের হালাল-হালাম বাছ-বিচার করে খেতে হয়। গরু, মহিষ, উট, দুম্বা, ভেড়া, ছাগল, হরিণ প্রভৃতি মুসলমানদের জন্য হালাল। এছাড়া পানির মাছসহ স্থলচর আরও কিছু প্রাণি মুসলমানদের খাদ্যের মধ্যে পড়ে। যেমন: খরগোস, চমড়িগরু, নীলগাই, ওয়াইল্ড দ্য বিস্ট এসবের গোশত খেতে তাদের কোনও নিষেধ নেই। যেসব পশুর গোশত খাওয়া হালাল বা বৈধ, সেসবের দুধ খাওয়াও জায়েজ মুসলমানদের জন্য। আসলে গৃহপালিত ও বনেজঙ্গলে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি হওয়া প্রাণির গোশত, দুধ যেমন মানুষের পরম উপকারী, তেমনই এগুলোকে মানুষ নানাভাবে ব্যবহার করেছে অতীতে। তবে সভ্যতার উন্নতিক্রমে পশুর নানাভাবে ব্যবহারেও উন্নতির ছোঁয়া লেগেছে। এক সময় এমনও ছিল যে, মানুষ আর পশু একইভাবে জঙ্গলে চরে বেড়াত। সুযোগ বুঝে মানুষ যেমন পশু ধরে খেতো; তেমনই পশুও মানুষ পাকড়ে ক্ষুধা নিবারণ করতো।

পশু তথা গরু, মহিষ, ঘোড়া, গাধা এসব মানুষের জন্য খুবই উপকারী প্রাণি। গরু-মহিষ কেবল দুধই দেয় না। এখনও এসব দিয়ে মানুষ চাষাবাদ করে। গ্রামে গাড়ি টানে। তবে আজকাল চাষাবাদ ও পরিবহনের কাজে গরু-মহিষের ব্যবহার কমে যাচ্ছে যান্ত্রিকতার প্রভাবে। তাই বলে গরু-মহিষের চাহিদা কিন্তু কমেনি মোটেও। প্রোটিনের অভাব পূরণে গরু-মহিষের গোশতের চাহিদা বেড়েছে অনেকগুণ। শুধু মুসলমান ও খৃস্টানরাই গরুর গোশত খায় না। অন্য সম্প্রদায়ের লোকেরাও গরুর গোশত বেশ তৃপ্তিসহকারে খায়।

বলতে দ্বিধা নেই, ব্রাহ্মণ ঠাকুরদের একটি বৃহৎ অংশ গরুর গোশত এখনও খায়। বিশেষত কাশ্মির ও দক্ষিণ ভারতের ব্রাহ্মণরা গরুর গোশত আগেও খেতো। এখনও খায়। আগেকার দিনে ব্রাহ্মণবাড়িতে কোনও অতিথি এলে কচিগরুর গোশত দিয়ে আপ্যায়নের ইতিহাস কে না জানে? অতিথি এলে গো-হত্যা করতে হতো। এ জন্যই অতিথিকে বলা হয় ‘গোঘ্ন’ বা গো-হত্যাকারী। অথচ আমাদের প্রতিবেশী গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে গরু নিয়ে চলছে তুমুল কাণ্ড। গরু জবাই করা সেখানে অবৈধ বা বেআইনি। গরুর গোশত খাওয়ার এবং পরিবহনের জন্য ইতোমধ্যে ১৫ জনের বেশি মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করেছে সেখানকার উগ্রবাদীরা। সম্প্রতি ভারতের কোনও কোনও রাজ্যসভায় গরু জবাই ও এর গোশত খাওয়ার শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আইন পর্যন্ত পাস হয়ে গেছে। অথচ হাজার হাজার কোটি রুপির গো-মাংস রফতানিকারক হচ্ছেন সেখানকার ব্রাহ্মণঠাকুরেরাই। এই গো-মাংস বণিকদের কী শাস্তি দেয়া হবে আমরা জানি না।

প্রাচীন যুগে যজ্ঞ দিতে বহু গরু বলি দেয়া হতো। সেই বলিকৃত গরুর মাংস ব্রাহ্মণ পুরোহিত সবাই ভক্ষণ করতেন। কখনও কখনও গো-মাংসে টান পড়লে তা নিয়ে ঝগড়া-বিবাদও ঘটে যেতো ঠুকুরদের মধ্যে। কাজেই গো-মাংস ভারতীয় শাস্ত্রে নিষিদ্ধ ছিল না। কিন্তু সেই গোমাংসে এখন তাদের অরুচি কেন, তা আমার মতো দুর্মুখের অবোধ্য বটে।

রামদের নামে একজন যোগগুরু অবশ্য গোমুত্র ও গোবর দিয়ে পানীয় প্রস্তুত করে ভারতের বাজারে ছেড়েছেন। ঠাকুর-পুরোহিত সবাই তা তৃপ্তি সহকারে পানও করছেন। এতে তাদের কোনও সমস্যা হয় না। গোদুগ্ধের বিচিত্র ধরনের মিষ্টান্ন খেতে কোনও বাধা নেই। সমস্যা শুধু গোশত বা মাংসে। গোমুত্র ও গোবর খেয়ে যদি কারোর মগজ খুলে যায়, আমাদের আপত্তি কী? ভারতীয় কোনও কোনও প্রধানমন্ত্রীও তো গো-মূত্র পান করেছেন নিয়মিত। এর মতো তৃপ্তিদায়ক ও উপাদেয় পানীয় নাকি আর হয় না। ঠিক আছে। গোমূত্র কিংবা গোবর খেয়ে যদি তাদের স্বাস্থ্য ভালো থাকে, মনের প্রশান্তি জন্মে, তবে আমরা কেন আপত্তি করবো? সম্ভব হলে আমাদের কাছ থেকে গো-মূত্র নিতে পারেন তারা। তবে গোবর দেবার উপায় নেই। কারণ এটা দিলে আমাদের জমির উর্বরতা ধরে রাখতে অসুবিধে হতে পারে।

ভারত তেত্রিশ কোটি দেবতার দেশ। গাছ, পাথর, নদী-নালা, ইঁদুর, প্যাঁচা, সাপ, বিচ্ছু কিছুই বাদ থাকে না পূজ্য দেব-দেবীর তালিকা থেকে। গরু বা গাভীও তাদের পূজ্য দেবীর অন্তর্ভুক্ত। তারা গরুর দুধ খাবেন। গোবর-গোচনা দিয়ে পূজার প্রসাদ বানাবেন। পঞ্চগব্য না হলে পূজো হবে না। পবিত্রতা হাসিল হবে না। অথচ গরুর গোশত তথা আসল খাদ্যবস্তুর প্রতিই তাদের দারুণ অনাগ্রহ অথবা ঘৃণার মানসিকতা। এর কোনও যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাওয়া ভার। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও নেই গো-মাংসের প্রতি তাদের এ সীমাহীন বিদ্বেষ মানসিকতারই। 

আমাদের প্রিয় প্রতিবেশী-ভারতীয়রা গরুর গোশত আরব দেশসমূহে, আমেরিকায়, ইউরোপে চালান করে বিলিয়ন বিলিয়ন দিনার, রিয়াল, ডলার আর ইউরো কামাই করবেন অথচ মুসলমানদের তা খেতে দেবেন না, গরু জবাই করতে বাধা দেবেন। এ কোন দ্বিমুখী নীতি? এমন বৈষম্য কেন? 

গরু মানুষের মূল্যবান সম্পদ। এ সম্পদ লালনপালনে অনেক খরচ। আগের দিনে খালিমাঠ পড়ে থাকতো। সে মাঠে গজাতো সবুজ ঘাস। সে ঘাস খেয়ে গরুমোটা তাজা হতো। এখন সে সুযোগ নেই। আজকাল গো-খাদ্যের তীব্র অভাব। অনেক অর্থ খরচ করে গরু পালন করতে হয় আজকাল। গাই গরুর দুধ দিয়ে না হয় পুষিয়ে নেয়া যেতে পারে। দুধ শুধু পুষ্টিকর খাদ্যই নয়। এ দিয়ে নানা রকম উপাদেয় খাদ্য প্রস্তুত হয়। এছাড়া এর দই, ঘি, মাখন, পনির ইত্যাদিও খুব জনপ্রিয় খাবার। এসবের মূল্যও আকাশ ছোঁয়া। কিন্তু বলদ বা ষাঁড় দিয়ে কী হবে? ষাঁড় না হয় গরু উৎপাদনে ব্যবহৃত করা গেল। আজকাল অবশ্য ষাঁড়ের তেমন দরকারও হয় না। বৈজ্ঞানিক উপায়ে ইনজোকশন পুশ করে গাই গাভিন করানো সম্ভব হয়। তাই পুরুষ গরু মানে ষাঁড় প্রায় বেকার। এছাড়া এক ষাঁড়ের কয়েক ফোঁটা বীজ নিলেই বহু গাই ভরানো সম্ভব আধুনিক পদ্ধতিতে। এরপর বাকি থাকে কৃষিকাজে গরুর ব্যবহার। আজকাল সেসুযোগও কমে গেছে। যন্ত্রায়নের ফলে চাষ কাজে বলদ গরুর ব্যবহার এখন প্রায় নেই বললেই চলে। তাহলে দুধের জন্য গাভি পালন লাভজনক হলেও ষাঁড় বা বলদ পালন করে লাভ কী? গাভিকে মায়ের সমান সম্মান করলেও বলদ বা ষাঁড়কে বাবার সমতুল্য ভাবা হয় না। অবশ্য কোথাও কোথাও ষাঁড়ের পূজো হতে দেখা যায়। ষাঁড়ের কদাচিৎ পূঁজো হলেও অনেক উপজাতি একে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে এর গোশত খেয়েও ফেলে। বাকি পুরুষ গরুগুলোর কী হবে? এগুলো নির্বিবাদে থেকে গেলে নিশ্চয়ই পৃথিবী জুড়ে দাপিয়ে বেড়াবে আর মানুষের ফসল ধ্বংস করে মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করবে?

গরু একটি উপকারী প্রাণি। যতœ-আত্তি করে এটি পালন করে মানুষ। এর দুগ্ধ পান করার জন্য। গোশত ভক্ষণের জন্য। প্রয়োজনে চাষাবাদের কাজে লাগানোর জন্য। তবে এখন চাষাবাদে কিংবা গাড়ি টানতে গরুর ব্যবহার প্রায় হয় না। দুগ্ধ ও গোশতের চাহিদা অন্য কিছু দিয়ে পূরণ হয় না। তাই পৃথিবী জুড়ে গরু সমাদৃত।

আগেই বলেছি, খোদ ব্রাহ্মণ ঠাকুররাই গরুর গোশত বেশি খেতেন। এখনও ভারতে ব্রাহ্মণদের গো-মংসে চমৎকার অভ্যাস রয়েছে। প্রাচীন যুগে কোনও কোনও যজ্ঞানুষ্ঠানে গো-মাংস কম পড়ে গেলে ঠাকুরদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ সৃষ্টি হয়ে যেতো তা আমরা অনেকেই জানি। এ বিষয়ে ইতিহাসগ্রন্থে বিস্তারিত পাওয়া যায়। এদেশের প্রখ্যাত নও মুসলিম আবুল হোসেন ভট্টাচার্য (সাবেক নাম সুদর্শন ভট্টাচার্য) তাঁর বিভিন্ন গ্রন্থে এ বিষয়ে অনেক কথা লিখেছেন। আমি নিজে কলকাতা, দিল্লি, ভুপাল, জৌনপুরে মুসলমানদের দোকানে জবাই করা আস্ত গরু ঝুলিয়ে রাখতে দেখেছি। কিন্তু এখন এমন কী হলো যে, গরু জবাই করলে বা এর গোশত কেউ খেলে বা পরিবহন করলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে? গরু কি মানুষের চেয়ে কোনও মূল্যবান প্রাণি? নিশ্চয়ই না। ব্রাহ্মণ-পুরোহিত ঠাকুররা ছাগল, ভেড়া, মহিশ হত্যা করে মাংস খাবেন। কিন্তু গরুজবাই করা যাবে না তা কেমন যেন স্ববিরোধী আইন মনে হয় না?

আচ্ছা ঠিক আছে, গরু তাদের পূজ্য দেবতা হতে পারে। গাছ, পাথর, ইঁদুর, প্যাঁচা তাদের আরাধ্য দেবতা হলে গরুর কী দোষ? কিন্তু মুসলমানদের কাছে গরু তো অন্যান্য প্রাণির মতোই একটি প্রাণি বৈ কিছু নয়। তারা গরু পালবে, পুষবে, অথচ এর গোশত খেতে পারবে না কেন? এমন আইন কি সত্যি মানবিক? আসলে এ আইন মানবিক নয়, পাশবিক। গরু বা পশুরক্ষার আইনকে পাশবিক আইন ছাড়া আর কী আখ্যা দেয়া যায়? পশু রক্ষার্থে মানুষ হত্যার আইনকে আধুনিক সভ্যতার যুগে ‘কালো আইন’ বলে চিহ্নিত করা উচিত।

প্রাচীন যুগে যজ্ঞানুষ্ঠানে হাজার হাজার গরু হত্যা করা হতো। গো-মাংস নিয়ে ব্রাহ্মণরা কাড়াকাড়ি করতেন। গো-মাংস ব্যতীত অতিথি আপ্যায়ন হতো না এক সময়। সেজন্য অতিথির আরেক নাম ‘গোঘœ’ বা গো-হন্তারক। কিন্তু আধুনিক ভারতে গো-হত্যা রুখতে  মানুষ হত্যা শুরু হয়েছে। গো-হত্যার দায়ে প্রবর্তন করা হচ্ছে মৃত্যুদণ্ডের আইন। এ হচ্ছে ভারতীয় সভ্যতা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ