ঢাকা, সোমবার 21 August 2017, ০৬ ভাদ্র ১৪২8, ২৭ জিলক্বদ ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

হার্টের রিং বাণিজ্যে নৈরাজ্য ঠেকাতে মূল্য নির্ধারণ হচ্ছে

অনলাইন ডেস্ক: বছরের পর বছর ধরে চলছে হার্টের রিং পরানোর নামে নিয়ন্ত্রণহীন বাণিজ্য। আর এই রিং বাণিজ্যের নৈরাজ্য ঠেকাতে উদ্যোগ নিয়েছেন কর্তৃপক্ষ।নির্ধারণ করা হচ্ছে হার্টের রিংয়ের মূল্য।

এক শ্রেণির চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে হার্টের রোগীদেরকে অহেতুক এবং উচ্চ মূল্যে নিম্নমানের রিং পড়ানোর অভিযোগ বেশ পুরুনো।যেসব রোগীকে রিং পরানো প্রয়োজন নেই, ঐ সব রোগীদের কমিশনের লোভে হার্টের রিং পরাচ্ছেন তারা।সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের এক শ্রেণির চিকিৎসক হৃদরোগীদের রিং পরানোর এই বাণিজ্যে সরাসরি জড়িত। নিম্নমানের রিং উচ্চ মূল্যে ঐ সব চিকিত্সকদের পছন্দের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে রোগীদের ক্রয় করতে বাধ্য করা হয়। নন মেডিকেটেড রিংয়ের মূল্য কম। মেডিকেটেড রিংয়ের মূল্য অনেক বেশি এবং নিরাপদ। কোন কোন কার্ডিওলজিস্ট মেডিকেটেড রিং পরানোর কথা বলে উচ্চ মূল্য রোগীদের কাছ গ্রহণ করেন। কিন্তু ঐ চিকিত্সকই নিম্নমানের মেডিকেটেড হার্টের রিং রোগীকে পরিয়ে দেন। সরবরাহকারী কোন কোন প্রতিষ্ঠান ঐ চিকিত্সকদের কমিশনের পাশাপাশি চেম্বার ও বাড়ি ভাড়া, গাড়ি ও বিদেশ যাতায়াতের খরচ বহন করে থাকে। এমন অভিযোগ চিকিত্সকদের পক্ষ থেকে পাওয়া যায়। এক শ্রেণির চিকিত্সক রোগী ও তার পরিবারের সদস্যদের এনজিওগ্রাম পরীক্ষা করার সময় কিংবা আগে বলে দেন যে, রিং পরানোর জন্য টাকা নিয়ে প্রস্তুত থাকুন।

রিং বাণিজ্যের এই নৈরাজ্য ঠেকাতে উদ্যোগ নিচ্ছে প্রশাসন। আগামী রোববার থেকে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) লেখা ছাড়া করোনারি স্টেন্ট বা কার্ডিয়াক রিং বিক্রি নিষিদ্ধ হচ্ছে। মোড়কে এমআরপি লেখাবিহীন করোনারি স্টেন্ট বিক্রি বন্ধ করতে এরই মধ্যে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দিয়েছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর।

জানা গেছে, করোনারি স্টেন্টের এমআরপি নির্ধারণ নিয়ে কাজ করছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৩০টি করোনারি স্টেন্টের এমআরপি নিশ্চিত করে সংস্থাটি।

এ প্রসঙ্গে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক গোলাম কিবরিয়া জানান, ৪৭টি করোনারি স্টেন্টের মধ্যে মার্কআপ অনুযায়ী ২৬টির এমআরপি বেঁধে দেয়া হয়েছে। আরো চারটি দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। সবমিলে ৩০টি স্টেন্টের এমআরপি নির্ধারণ হয়েছে।

গত মঙ্গলবার ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে সংবাদ সম্মেলন করে করোনারি স্টেন্টের সর্বোচ্চ মূল্য ৫০ হাজার টাকা ঘোষণা করা হয়। এমন খবরের পর গত বুধবার স্টেন্ট বিক্রি বন্ধ রেখেছিল আমদানিকাররা। এতে হঠাত্ করে হাসপাতালগুলোয় কার্ডিয়াক রিংয়ের কৃত্রিম সংকট দেখা দেয়। তবে গতকাল ব্যবসায়ীরা রিং বিক্রি শুরু করায় এ সংকট কেটে গেছে।

এ বিষয়ে মেডিকেল ডিভাইস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, করোনারি স্টেন্টের সর্বোচ্চ মূল্য ৫০ হাজার টাকা ঘোষণা করা হয়েছে, এমন সংবাদের জেরে স্টেন্ট বিক্রি সাময়িক বন্ধ রেখেছিলেন তারা। কারণ স্টেন্ট বিক্রির জন্য সরকার নির্ধারিত মার্কআপ রয়েছে। ওই মার্কআপ অনুযায়ী এমআরপি নির্ধারণ করে দিলে তাদের পক্ষ থেকে বিক্রিতে কোনো সমস্যা নেই।

এদিকে সব হাসপাতালে একই দামে করোনারি স্টেন্ট বিক্রির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আফজালুর রহমান। তিনি বলেন, আগামী রোববার থেকে এমআরপিবিহীন কোনো করোনারি স্টেন্ট বিক্রি হবে না। সব হাসপাতালেই করোনারি স্টেন্টের মূল্য কমানোর জন্য আগেই হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে একটি কমিটি গঠন করে দেয়া হয়েছিল। ওই কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গতকাল কম দামে স্টেন্ট লাগানো হয়েছে।

জানা গেছে, গতকাল থেকেই দাম কমিয়ে করোনারি স্টেন্ট সরবরাহ করেছে অনেক প্রতিষ্ঠান। জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. মীর জামাল উদ্দীন জানান, গতকাল তিনি তিনজন রোগীর শরীরে করোনারি স্টেন্ট স্থাপন করেছেন। যে স্টেন্টের মূল্য আগে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা ছিল গতকাল তা ৬২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর অন্য একটি রিংয়ের দাম ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা ছিল আগে, সেটি গতকাল ১ লাখ ৪ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন সায়েন্টিফিক করপোরেশনের পণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স মেডি গ্রাফিক ট্রেডিং লিমিটেডের চারটি করোনারি স্টেন্টের এমআরপি নির্ধারণ করা হয়েছে গতকাল। এর মধ্যে রিবেল ব্র্যান্ডের স্টেন্টের দাম ২৫ হাজার টাকা, প্রোমাস এলিমেন্ট প্লাস ৬৯ হাজার ৫৯৮, সাইনারজি ১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৮৯ ও প্রোমাস প্রিমিয়ার ব্র্যান্ডের দাম ৯৪ হাজার ১৭৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

এদিকে করোনারি স্টেন্ট বিক্রির ক্ষেত্রে চারটি শর্ত বেঁধে দিয়েছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। সেগুলো হলো— প্রত্যেক মোড়কের গায়ে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য, কোন দেশের তৈরি, উত্পাদন তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ ও ঔষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের রেজিস্ট্রেশন নম্বর বা সংক্ষেপে ডিআরএ নং সিলমোহর রুটে মুদ্রিত করতে হবে। বাজারজাতের আগে ছাড়পত্র গ্রহণ করতে হবে এবং পরবর্তীতে নতুন মার্কআপ নির্ধারিত হলে সে অনুযায়ী সনদ গ্রহণ করতে হবে।  

সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনারি স্টেন্ট আমদানির পর নির্ধারিত মার্কআপ অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি মন্ত্রণালয় থেকে বহু আগেই নির্ধারিত ছিল। কিন্তু ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর আমদানিকারকদের মার্কআপ অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণে বাধ্য করেনি। ২০১৫ সালে মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন করার পরও এ ব্যাপারে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেয়নি ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের কর্তাব্যক্তিদের ‘ম্যানেজ’ করেই বাজারে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছিল করোনারি স্টেন্ট। সম্প্রতি বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে নড়েচড়ে বসে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। এরই অংশ হিসেবে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ ও সনদ নেয়ার শর্ত পূরণের উদ্যোগ নেয় সংস্থাটি।

দেশে সারা বছর ১৮ হাজার করোনারি স্টেন্ট বা কার্ডিয়াক রিংয়ের প্রয়োজন হয়। এ চাহিদা পূরণ করে ২১টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান। 

প্রসঙ্গত, গত ২২ মার্চ দৈনিক বণিক বার্তায় ‘নিয়ন্ত্রণহীন কার্ডিয়াক রিংয়ের বাজার’ শীর্ষক শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ হয়। ওই সংবাদ প্রকাশ হলে সংশ্লিষ্ট মহলে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। পরে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর স্বার্থসংশ্লিষ্টদের নিয়ে ১১ এপ্রিল বৈঠক ডাকে। এর পর চারটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছায় মূল্য নির্ধারণের প্রস্তাব দেয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ