ঢাকা, শনিবার 22 April 2017, ৯ বৈশাখ ১৪২৩, ২৪ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মাসের ১৪ কার্যদিবসে পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক পতন

এইচ এম আকতার : ব্যাংকে আমানতের সুদ হার কম হওয়াতে চলতি বছরের শুরু দিকে পুঁজিবাজারের দিকে ঝুঁকে বিনিয়োগকারীরা। পুঁজিবাজারে কারসাজিচক্র আবারও স্বক্রিয় হয়ে উঠেছে। তাদের কারসাজির ফলে চলতি মাসের ১৪ কার্যদিবস ধারাবাহিক পতনে লোকসান হিসাব কষতে হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের। আর ধারাবাহিক পতনে প্রতিদিনই তাদের পুঁজি উধাও হচ্ছে। পোর্টফোলিওতে নিজের কষ্টার্জিত বিনিয়োগ হারানোর চিত্রে তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। এভাবে চললে চলতি মাসেই মার্কেট থেকে বিদায় নিতে হবে নতুন বিনিয়োগকারীদের। অথচ একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার ছাড়া কোনো দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হওয়া কঠিন।

জানা গেছে, ব্যাংকে আমানতের সুদের হার খুবই কম, যার পরিমাণ পাঁচ থেকে ছয় শতাংশের মধ্যে। বছর শেষে বিভিন্ন চার্জ কেটে নেয়ার পর গ্রাহকের সুদের হার আরও কমে যায়। ফলে বছর শেষে কাংখিত হিসাব মেলে না। এজন্য অনেক গ্রাহক ব্যাংক ছেড়ে পুঁজিবাজারে এসেছিলেন অধিক মুনাফা অর্জন করতে। কিন্তু ধারাবাহিক পতনে প্রতিদিনই তাদের পুঁজি উধাও হচ্ছে। লাভের বদলে প্রতিদিনই তাদের লোকসানের হিসাব কষতে হচ্ছে।

বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, টানা দর পতনে ইতোমধ্যে লোকসানের মুখে পড়েছেন ভুক্তভোগীরা। এ পরিস্থিতি দীর্ঘতর হলে তাদের বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। সেজন্য বাজারে কোনো ধরনের কারসাজি হচ্ছে কি না সেদিকে নজরদারি বাড়ানোর কথা বলছেন তারা। এ প্রসঙ্গে জাহিদুল ইসলাম নামে এক বিনিয়োগকারী বলেন, কয়েক বছর ধরে পুঁজিবাজারের সার্বিক অবস্থা ভালো না থাকায় তিনি ব্যাংকে টাকা রেখেছিলেন। কিন্তু গত বছরের মাঝামাঝি পুঁজিবাজার ভালো হলে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেন। প্রথম কিছুদিন ভালো লাভ করলেও সম্প্রতি তার পোর্টফোলিওর অবস্থা বদলে গেছে। ইতোমধ্যে ২১ লাখ টাকার পুঁজি নেমে এসেছে ১৭ লাখ টাকায়। জাহিদুলের মতো অবস্থা অসংখ্য বিনিয়োগকারীর।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত বছরের শেষ দিকেও পুঁজিবাজার বেশ ঊর্ধ্বমুখী ছিল। এ অবস্থা অব্যাহত থাকায় ব্যাংক বীমা আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ বাড়ছিলো সব ধরনের শেয়ারের দর। ফলে সূচকও ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকে। নতুন বিনিয়োগকারীরা বাজারমুখী হন। বাড়তে থাকে বিও একাউন্ট। বিনিয়োগকারীরা প্রাইমারি মার্কেটের চেয়ে সেকেন্ডারি মার্কেটে অধিক ঝুঁকে পড়েন। কিন্তু হঠাৎ করেই কয়েকদিনের মধ্যে বাজারের চেহারা পাল্টে যায়। নতুন পুরোনো সব বিনিয়োগকারী আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। সুমন আহমেদ নামে এক বিনিয়োগকারী বলেন, এখনও ২০১০-১১ সালের ধসের ধাক্কা সামাল দিতে পারিনি। আগের যে লোকসান রয়েছে তা কাটিয়ে ওঠার কোনো উপায় নেই। কারণ এসব শেয়ার এখনও ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ লোকসানে রয়েছে। সে কারণে কিছু নতুন ফান্ড এনে বিনিয়োগ করছিলাম। কিন্তু গত কয়েক দিনের বাজারচিত্রে মূল পুঁজি হারানোর ভয়ে আছি। কারণ নতুন পোর্টফোলিওতে ইতোমধ্যে লোকসান শুরু হয়ে গেছে। তার মতো একই অভিযোগ আরও অনেক বিনিয়োগকারীর।

 প্রতিদিন নতুন আশায় বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারে আসেন আর হতাশা নিয়ে ঘরে ফেরেন। পোর্টফোলিওতে নিজের কষ্টার্জিত বিনিয়োগ হারানোর চিত্রে তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। এভাবে চলছে গত ১৪ কার্যদিবস। পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন এটা স্বাভাবিক দরপতন। এপ্রিল মাসে না কি বাজার সবসময় মন্দা থাকে। তবে এটা অনেক বিনিয়োগকারী মেনে নিতে পারছেন না। তারা বলছেন, এভাবে চললে চলতি মাসেই মার্কেট থেকে বিদায় নিতে হবে তাদের।

পুঁজিবাজারে গত ছয় মাসে সূচক বেড়েছে প্রায় ১১০০ পয়েন্ট। মাত্র ১৪ কার্যদিবসে সূচক পড়েছে ২২০ পয়েন্ট। আগামী ১০ দিন এভাবে চললে সূচক পড়বে আরও ১৫০ পয়েন্ট। সূচকের উত্থান-পতন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যে হারে সূচকের উত্থান হয়েছে, তার চেয়ে অনেক দ্রুত গতিতে পড়ছে। বৃহস্পতিবার সূচক পড়েছে ৩৩ পয়েন্ট। আর লেনদেন হয়েছে ৫৫৭ কোটি টাকা। সব খাতেই ছিল পতনের সুর। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বস্ত্র খাতসহ ওষুধ ও রসায়ন খাতে বেশিরভাগ শেয়ারের দর পড়েছে।

ব্যাংকিং খাতে ৩০টি কোম্পানির মধ্যে ২১টি কোম্পানির দর কমেছে। তিনটির দর বেড়েছে। তিন কোম্পানির দর অপরিবর্তিত ছিল। বাকি তিন কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হয়নি। তবে দর কমার শীর্ষে ছিল আল আরাফাহ্ ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক এবং এবি ব্যাংক। আল আরাফাহ্ ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকের শেয়ারের দর কমেছে এক টাকা ২০ পয়সা। আর এবি ব্যাংকের ৮০ পয়সা। আর্থিক খাতে আইসিবি, ফার্স্ট ফাইন্যান্স, এফএএস ফাইন্যান্স, ইসলামী ফাইন্যান্সসহ পাঁচ কোম্পানির শেয়ারের দর বেড়েছে। অপরিবর্তিত ছিল এক কোম্পানির দর। বাকি ১৭ কোম্পানির দর কমেছে।

এভাবে সূচকের পতন হলে বিনিয়োগকারীদের লোকসান বাড়তেই থাকবে তারপরও ধৈর্য ধরে থাকা ছাড়া কিছু করার নেই। কারণ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের আগেই ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তাহলে ঝুঁকি কমে যায়। 

বিষয়টি নিয়ে আলাপকালে ডিএসই’র পরিচালক রকিবুর রহমান বলেন, পুঁজিবাজার ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে আমি সেটা মনে করছি না। তবে বর্তমানে কিছু দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের দর বাড়ছে এটা মোটেও স্বাভাবিক নয়। এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এ কোম্পানিগুলো সবসময় সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করে। তাই বিনিয়োগকারীদের এখনই সতর্ক হওয়া দরকার। তিনি বলেন, বাজারে এখন অনেক ভালো কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করার সুযোগ এসেছে। বিনিয়োগকারীদের উচিত সেসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা।

একই বিষয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ বলেন, পুঁজিবাজারে টানা উত্থান বা পতন কোনোটাই ভালো নয়। তবে আমাদের পুঁজিবাজারের সার্বিক অবস্থা দীর্ঘদিন থেকে নাজুক। সে বিবেচনায় বলতে গেলে বাজারে এখনও অস্বাভাবিক পরিস্থিতি আসেনি।

এ বিষয়ে ডিএসই’র সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান পরিচালক শাকিল রিজভী বলেন, বাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের ভয়ের কিছু আছে বলে মনে হয় না। পুঁজিবাজারে শেয়ারের দর বাড়বে কমবে এটা স্বাভাবিক। বিনিয়োগকারীদের উচিত সব পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে চলা। অল্পতেই ভয় পেলে চলবে না। 

তিনি আরও বলেন, একটি দেশের অর্থনীতির বড় অংশীদার হচ্ছে পুঁজিবাজার। একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার ছাড়া কোনো দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হওয়া কঠিন। দেশের শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য বিকশিত হতে হলে বাজারকে গতিশীল হতে হয়। বাংলাদেশেও একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার বিকাশের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু নানা কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। বুঝে, না বুঝে একটি মহল তার বিরোধিতা করছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ