ঢাকা, শনিবার 22 April 2017, ৯ বৈশাখ ১৪২৩, ২৪ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রাজশাহী অঞ্চলে আবাদী জমি কেটে পুকুর তৈরির হিড়িক

রাজশাহী : এসকেভেটর মেশিন দিয়ে রাজশাহীর মোহনপুরে পুুকুর খনন করা হচ্ছে -সংগ্রাম

রাজশাহী অফিস : রাজশাহী অঞ্চলে আবাদী জমিতে পুকুর খননের হিড়িক চলছে। এর ফলে একদিকে জমির পরিমাণ কমছে অন্যদিকে জলাবদ্ধতায় জমির ফসল নষ্ট হচ্ছে। এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন যেন অসহায় হয়ে পড়েছে। সিন্ডিকেট করেও অবৈধভাবে এই পুকুর খনন চলছে। এ নিয়ে এসব এলাকায় মামলা-মোকদ্দমাও বাড়ছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ারও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে। 

রাজশাহী, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সরকারি অনুমতি ছাড়াই মাছ চাষের জন্য ফসলি জমিতে ইচ্ছেমতো পুকুর ও ঘের তৈরি করা হচ্ছে। গত কয়েক বছরে এই পুকুর খননের মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এক্ষত্রে বেশিরভাগ স্থানে ভাড়ায় নেয়া হচ্ছে এসকেভেটর মেশিন। একশ্রেণির অতি মুনাফালোভী ব্যক্তি ফসলী জমির আকৃতি-প্রকৃতি নষ্ট করে মাছ চাষের জন্য এই পুকুর খননে নেমে পড়েছে। এটি বেআইনী হলেও তার প্রতি যেন ভ্রƒক্ষেপ নেই। স্থানীয় প্রশাসন দিনের বেলায় বাঁধা দেয়ার এবং কোন কোন ক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা এবং পুকুর খননেন যন্ত্রপাতি জব্দ করে থাকে। কিন্তু রাতের বেলায় রাতরাতি খনন কাজ অব্যাহত রাখা হয়। আবার কেউ কেউ উচ্চ আদালতে রিট করে এই পুকুর খোড়ার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। অনেকেই অভিযোগ করেন, বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানিয়েও কাজ হচ্ছে না। রাজশাহীর পবা উপজেলার খবরে জানা যায়, সেখানকার প্রশাসন চারটি স্থানে অভিযান চালিয়েছিল। তিন জায়গাতেই পুকুরের মালিক আদালতের কাগজ দেখিয়েছেন। বাকি একজনকে শাস্তি দেয়া হয়েছে। ইউএনও অফিস জানায়, পতিত জমিতে পুকুর খননের কথা বলে পুকুর মালিকেরা আদালত থেকে নিজেদের পক্ষে নির্দেশনা পেয়েছেন। আদালত তাঁদের কাজে বাধা না দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এ জন্য প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। এসব জেলার প্রায় প্রতিটি উপজেলায় পুকুর খনন করা হচ্ছে। আর অবৈধ পুকুর খননকারীর তালিকায় রয়েছেন, স্থানীয় ক্ষমতাসীনসহ রাজনৈতিক দলের নেতা, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও ব্যবসায়ীরা। অভিযোগ আছে, প্রশাসন ও ভূমি অফিসকে ম্যানেজ করেই এই কর্মকা- চলছে। অন্যদিকে পুকুর খননের কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে অন্যরা। এবিষয়ে ভুক্তভোগী কৃষকেরা বলছেন, গত বর্ষায় পানি জমে বেশ কিছু স্থানে ফসল নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। প্রশাসনের কাছে দেনদরবার করেও বিলের পানি নিষ্কাশন করা সম্ভব হয়নি। পুকুর খনন যেভাবে বাড়ছে, সামনে আরো বেশি পরিমাণ জমির ফসল নষ্ট হবে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এসব জেলার বিভিন্ন স্থানে অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খনন করা হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে এই প্রবণতা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজশাহী জেলার খবর নিয়ে জানা যায়, দুর্গাপুর, পুঠিয়া ও পবা উপজেলায় পুকুরের সংখ্যা বেশি। উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্যমতে, মাছ চাষের জন্য দুর্গাপুরে এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৯০২টি পুকুর খনন করা হয়েছে। এর আয়তন ২ হাজার ৯৫৪ দশমিক ৩৬ হেক্টর। পুঠিয়া উপজেলায় পুকুরের সংখ্যা ৭ হাজার ২৬৬টি, যার আয়তন ১ হাজার ৫৪৮ হেক্টর। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ উপজেলায় গত পাঁচ বছরে ৫২৯ হেক্টর ফসলি জমিতে পুকুর খনন করা হয়েছে। শুধু গত বছরেই খনন করা হয়েছে ১২৩ হেক্টর জমি। সম্প্রতি পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের নলখোলা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ৩০ বিঘা আয়তনের একটি পুকুর খননের কাজ চলছে। এই পুকুরের মালিকের দাবী, নিম্নাঞ্চলে অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খননের কারণে তাঁদের এলাকায় জমির পানি বের হতে পারছে না। বাধ্য হয়ে তাঁরাও পুকুর খনন করছেন। আশপাশের লোকজন তাঁদের জমি ইজারা দিয়েছেন। আদালতে রিট আবেদন করে পুকুর খননের অনুমতি পেয়েছেন। পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের রণহাটে আম বাগান কেটে প্রায় ১০ বিঘার পুকুর খনন করা হচ্ছে। দুর্গাপুর উপজেলার নওপাড়া ইউনিয়নের অনুলিয়ারবিল ও পোড়াবিলে খালের মুখে পুকুর খনন করায় গত বর্ষা মৌসুমে প্রায় ৩০০ একর জমির ফসল নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে চাষিরা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি। কয়েকজন কৃষক অভিযোগ করেন, পাঁচ-ছয় বছর ধরে বিলে পুকুর খননের হিড়িক পড়ে গেছে। পুকুর মালিকেরা সাধারণ চাষিদের বাধ্য করছেন জমি বিক্রি করতে। এমনকি জোর করে জমি দখল করা হচ্ছে। অন্য এক পুকুর মালিক তার প্রতিবেশীর জমি জোর করে দখলে নিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, জমি বিক্রি করতে যাতে তিনি বাধ্য হন, সে জন্য তার বিরুদ্ধে একটি হয়রানিমূলক মামলা করেছেন। আদালত তাঁর পক্ষে রায় দিয়েছেন। এখন পুকুর মালিক উচ্চ আদালতে আপিল করেছেন। কয়েক দিন আগে প্রশাসনের লোকজন পরিস্থিতি দেখে গেছেন। কিন্তু এলাকার পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থাই করা হয়নি। এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জমি হারিয়ে পথে বসছে হাজারো ক্ষুদ্র কৃষক। বেকার হয়ে পড়ছে কৃষি শ্রমিক। অপরিকল্পিতভাবে খননের জন্য বন্ধ হচ্ছে বিলের পানি নিষ্কাশন নালা। ফলে বর্ষায় জলাবদ্ধতায় ব্যাহত হচ্ছে চাষাবাদ। আবার মাটি বহনে ভাঙছে রাস্তা-ঘাট, কৃষিজমি হারাচ্ছে তার স্বরূপ এবং প্রকৃতি হারাচ্ছে তার বৈচিত্র্য। কিন্তু প্রশাসনের যেন কিছুই করার নেই। জানা গেছে, বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার কারণে বাড়ি ঘরে পানি উঠে যাচ্ছে। এতে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে পড়ছে। সমস্যা সমাধানে স্থানীয় সরকার প্রশাসনের জনপ্রতিনিধিরা হিমসিম খাচ্ছে। ভূক্তভোগীরা আবেদন করেও পরিত্রাণ পাচ্ছে না। উল্টো হয়রানির ঘানি টানছেন তারা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ