ঢাকা, শনিবার 22 April 2017, ৯ বৈশাখ ১৪২৩, ২৪ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী বাঙালী জাতি কখনো স্বকীয়তা জলাঞ্জলি দেয়নি

আবু সাঈদ : বাংলা নববর্ষ! শুনতেই মনে বয়ে যায় নতুনত্বের শিহরণ। চৈত্রের আগমনের সাথে সাথেই বাঙ্গালী মনে চলতে থাকে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়ার প্রস্তুতি।
পহেলা বৈশাখে নতুন আমেজ আর উদ্যমে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়া হয়। দিনপঞ্জিকার পাতার সাথে সাথে পাল্টে আমাদের জীবনচর্চার কিছু রীতি-নীতিও। হারিয়ে যায় কত ঘটনা। নতুন বছরের আগমনে সবখানে থাকে নতুনত্বের আমেজ। আমাদের ব্যক্তিজীবন থেকে জাতীয় জীবনে এর প্রভাব বিস্তারিত। অনেক স্মৃতিকে পিছনে ফেলে নতুনের আহ্বানে নিজেদের সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সবাই। কিন্তু তারচেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে! অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত সংস্কৃতি পর্যালোচনা আমাদের অনেকটাই ভাবিয়ে তুলে।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন সবসময়ই নৈতকিতা সমৃদ্ধ ও সুস্থধারার নিজস্ব স্বকীয়তায় ভরপুর। কিন্তু বর্তমানে পহেলা বৈশাখ তথা বাংলা নববর্ষ কেন্দ্র করে আমাদের দেশে যে সংস্কৃতি চর্চা চলছে তা অসংখ্য প্রশ্ন ও বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে। নব্বই ভাগ মুসলমানের আবাস প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের নৈতিকতা সমৃদ্ধ ও শিক্ষণীয় যে আচার-অনুষ্ঠান পালন হতো তা যেন ধীরে ধীরে অত্যন্ত কৌশলে কুরুচিপূর্ণ বিজাতীয় অপসংস্কৃতি দ্বারা বিলীন করে দেয়া হচ্ছে । এটা নিয়ে কথা বলতে হলে বাংলা নববর্ষ তথা বাংলা সালের উৎপত্তি ও সময়কাল সম্পর্কে দুয়েকটা কথা না বললেই নয়।
বাংলা সালের সূচনা সম্পর্কে ইতিহাস পর্যালোচনা করে দুইটি মত পাওয়া যায়। প্রথম মতানুযায়ী, প্রাচীন বঙ্গের (গৌড়) রাজা শশাঙ্কের শাসনামলে (আনুমানিক ৫৯০-৬২৫ খ্রিস্টাব্দ) বঙ্গাব্দ বা বাংলা সাল গণনা শুরু হয়। আর দ্বিতীয় মতানুসারে, মোঘল সম্রাট আকবর তার অর্থপ্রশাসনের কার্যক্রম বিশেষত কৃষি নির্ভর খাজনা সুষ্ঠু আদায়ের লক্ষে আরবী তথা হিজরী সালের উপর ভিত্তি করে ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ বা ১১ই মার্চ হতে বাংলা সাল গণনা চালু করেন। ঐতিহাসিকরাও এর সাথে একমত হয়ে বাংলা একাডেমির মাধ্যমে আংশিক সংশোধন করে বর্তমান বাংলাদেশে প্রচলিত করেন। যেহেতু বাংলা সালের উৎপত্তি হয়েছিল একজন মুসলিম শাসকের (যদিও কিছুটা বিতর্কিত ও স্বৈরপ্রকৃতির ছিলেন) মাধ্যমে এবং মূলত কৃষিনির্ভর হয়ে তাই এই আনন্দিত হয়ে এই দিনকে ঘিরে কৃষক ও মুসলিম সমাজে যে সাংস্কৃতিক আচার-অনুষ্টান প্রচলিত হয়েছিল তাও মূলত নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রাধান্য ছিল। কিন্তু আজকে যেন সেই আবেগ ও মূল্যবোধের উপর হিংসাত্মক হামলা চালানো হচ্ছে । এনিয়ে কিছু কথা বলতেই হয়।
আমি মাত্র তারুন্য নিয়ে এগুচ্ছি! আমাদের অল্প বয়সে, বিগত এক দশক বা এক যুগ ধরে অনেক কিছুই দেখছি এবং বুঝি। কিন্তু আমাদের পূর্বপুরুষরা যারা এখনো আমাদের মাঝে আছেন তারা আমাদের জন্য জীবন্ত ইতিহাস! তাদের মুখে নববর্ষ বরণের যে আচার-অনুষ্ঠান এর পদ্ধতি ও রীতি-নীতি শুনতে পাই তা যেন ছিটেফোঁটাও খুঁজে পাইনা। এক সময় বর্ষবরণ করতে ব্যবসায়ী মহাজনরা তাদের প্রতিষ্ঠানে আয়োজন করতেন ‘হালখাতা’ অনুষ্ঠানের। বিগত বছরের যাবতীয় দেনা-পাওনা মিটিয়ে নতুন খাতায় নতুন হিসাবে বছর শুরু করা হতো। অনুষ্ঠানে ক্রেতা সাধারণের জন্য আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হতো। গ্রামে বিভিন্ন রকম গ্রাম্য খেলা ও কুঠির শিল্প মেলার আয়োজন করা হতো।
কৃষকরা নতুন ধান গোলায় ভরার আনন্দে নবান্ন উৎসব ও বাহারী পিঠা মেলার আয়োজন হতো। যেগুলো ইসলামী তথা দেশের প্রধান ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি থাকতো নমনীয়। আমরা নব্বই ভাগ মুসলমানের আবাস প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের কোনো এক বুনেদি মুসলিম পরিবারের ইসলামী আদর্শ ও ভাবধারায় বিশ্বাসী হয়ে বেড়ে ওঠা সন্তান, বিশ্বাস করি উক্ত আচার-অনুষ্ঠানগুলোই বাঙালিত্বের পরিচায়ক। যাতে সত্যিকারার্থে বাঙ্গালিত্ব ছিল, ছিল নিজস্ব স্বকীয়তা ও নৈতিকতা সমৃদ্ধ। তাদের এই অনুষ্ঠানগুলো সারাবছরই তাদের বাঙ্গালিত্বের পরিচয় দিত। তাদের বাঙ্গালীত্বে ছিল ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা, ভালবাসা। ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী বাঙ্গালী জাতি কখনো তাদের স্বকীয়তা জলাঞ্জলি দেয়নি! তাইতো, দিয়েছে মাতৃভাষার জন্য প্রাণ। যা পৃথিবীর ইতিহাসে নজীরবিহীন। ত্রিশ লক্ষ জীবন বিলিয়ে এনেছে নিজের স্বাধীনতা।
কিন্তু আফসোস! আজকে আমাদের তথাকথিত আধুনিক বাঙালিত্ব প্রদর্শনকারী কিছু তরুন-তরুনীদের জন্য। যারা নিজেদের ঐতিহ্য ও নৈতিকতা সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ভুলে বিজাতীয় অপসংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারে মনোনিবেশিত। তারা আসলে নিজেরাও জানেনা কি করছে?
আমার প্রিয় মাতৃভূমি নব্বই ভাগ মুসলমানের দেশে নববর্ষ বরণ করতে ‘মঙ্গলশোভাযাত্রা’র নামে মুসলমানের সন্তানরা অশালীনতার চূড়ান্ত পর্যায় মূর্তিপূজা করে যাচ্ছে। তারা ধর্ম থেকে সংস্কৃতি আলাদা করতে চায়। কিন্তু বোকার দল জানেনা ইসলাম আমাদের যে সমৃদ্ধ সংস্কৃতি উপহার দিয়েছে তা মানব রচিত সকল অপসংস্কৃতির চেয়ে অসংখ্যগুন উত্তম। তাই তারা আধুনিক বাঙালিত্ব প্রদর্শনের জন্য মাত্র একদিনের বাঙালি সেজে জাতিকে ধোঁকা দেয়। সারাবছর বিদেশী রেস্তোরায় আড্ডা আর একদিনের জন্য কলাপাতায় পান্তাভাত! এযেন নিজেদের সংস্কৃতির সাথে উপহাস করা। সারাবছর বারে হিন্দি গান আর একদিন বটমূলে ‘এসো হে বৈশাখ’! এমনকি এসব অনুষ্ঠানগুলোতেও মাঝে মধ্যে হিন্দি গান শুনতে পেয়ে আমরা লজ্জিত হই! তারা বলে এগুলো নাকি আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য! কিন্তু ওরা আসলে জানেইনা এসবের উৎপত্তিকাল! আর জানলেও অত্যন্ত কৌশলে তা এড়িয়ে যায়।
এই পহেলা বৈশাখ মুসলমানের তৈরী বাঙালি স্বকীয়তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের পূর্ব-পুরুষরা এই দিনকে পালন করতেন ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রাধান্য দিয়ে। নিজেদের বিগত দিনের যাবতীয় ভুল-ত্রুটির ক্ষমা মার্জনা করে আগামীর সফলতা কামনা করে। অথচ বিগত দুই থেকে তিন দশক ধরে এসব ঐতিহ্য ভুলে আমরা বিজাতীয় কুরুচিপূর্ণ অপসংস্কৃতি ধরছি।
এটা এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, গ্রামের কোমলমতি শিশুরাও এখন রং নিয়ে হোলি খেলায় মেতে ওঠে। এখনকার সময়ে নাই সেই আমেজ। সবখানে তোষামোদ আর মর্দন। তরুণ-তরুণীদের জন্য এটা যেন এক অশালীনতার আসর বসে। যা থেকে ঘটছে অনেক অবাঞ্চিত অনৈতিক ঘটনা। এইতো মাত্র এক বছর আগেই আমরা দেখলাম দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাঙ্গন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে নারীর সম্ভ্রমের উপর হলো ভয়ঙ্কর নগ্ন হামলা।
তাদেরকে বিবস্ত্র করে ফেলে নির্যাতন করা হলো। অথচ আমরা নির্বাক! হয়না কোনো বিচার। জাতীয় জীবনে নেমে আসছে বিপর্য! বাড়ছে অপরাধ প্রবণতা! নব্বই ভাগ মুসলমানের দেশে এমন অনৈতিক অপসংস্কৃতি মেনে নেয়া কষ্টকর!
মূলকথা হলো, যেকোনো উৎসব পালনের অধিকার সকলেরই আছে। আমরাও উৎসব পালনের পক্ষে । তবে সেটা যেন হয় সুস্থধারার নৈতিকতা সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং তা হবে ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রাধান্য দিয়ে সম্মানজনক ও নিজস্ব স্বকীয়তা সমৃদ্ধ । নব্বই ভাগ মুসলমানের দেশের আচার-অনুষ্টান গুলোও যেন কোনো ব্যক্তির ধার করা কয়েকদিন আগের তৈরী কোনো বিজাতীয় কুরুচিপূর্ণ অপসংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত! এরকম আধুনিক বাঙ্গালীত্ব প্রদর্শন করে আমাদের নিজস্বতা হারাতে চাইনা। আমাদের নৈতিকতা সমৃদ্ধ সংস্কৃতি যেন কোনো অনৈতিক অপসংস্কৃতির ছোবলে হারিয়ে না যায়। গুণীজনের কাছে আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী তরুন প্রজন্মের এই প্রত্যাশা!
-অনার্স ২য় বর্ষ, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ, সুনামগঞ্জ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ