ঢাকা, রোববার 23 April 2017, ১০ বৈশাখ ১৪২৩, ২৫ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মানবসেবায় আবু বকর (রা.)

ইকবাল কবীর মোহন : মক্কায় বাস করতেন এক বৃদ্ধা মহিলা। এক জীর্ণ কুটিরে ছিল তার বাস। বৃদ্ধা ছিল অতিশয় নিঃস্ব। তাকে সাহায্য করার মতো তার কোনো আত্মীয়-স্বজন ছিল না। কাজ করে উপার্জন করার শক্তিও তার ছিল না। তাছাড়া মহিলা ছিল অন্ধ। বৃদ্ধার কাহিনী শুনে হজরত উমর (রা.)-এর কোমল মন কেঁদে উঠল। তাই তিনি প্রতিদিন বৃদ্ধার কুটিরে যাতায়াত করতেন। তার খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করতেন। প্রতিদিন বুড়ির সেবাযত্ন করে তারপর তিনি ঘরে ফিরে আসতেন। এভাবে কাটছিল কয়েকদিন।
একদিন ঘটল অন্যরকম এক ঘটনা। উমর (রা.) রীতিমত বৃদ্ধার কুটিরে গেলেন। তবে কুটিরে ঢুকেই তিনি অবাক হলেন। বৃদ্ধা বেশ আরামে তার বিছানায় শুয়ে আছে। আজ অন্য কেউ মহিলার যাবতীয় কাজকর্ম সেরে দিয়েছে। উমর (রা.) এর কোনে মর্মই বুঝতে পারলেন না। অগত্যা উমর (রা.) বাড়ি ফিরে গেলেন। পরে দিনের ঘটনা। হজরত উমর(রা.) সময়মতো বৃদ্ধার কুটিরে গিয়ে হাজির হলেন। সেদিনও দেখলেন একই ঘটনা।
কেউ এসে বুড়ির সেবাযত্ন করে দিয়েছে। উমর (রা.) এর বিস্ময় আরো বেড়ে গেল। তিনি চিন্তায় পড়ে গেলেন। তাই তিনি বুড়িকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কুটিরে কে এসেছিল মা? তুমি কি তাকে চেন? কে তোমার কাজ করে দিয়ে যাচ্ছে তা কি তুমি বলতে পার?’
বুড়ি যে অন্ধ। সে কাউকে দেখতে পায় না। তাই বুড়ি বলল, ‘না বাবা, তাকে তো আমি চিনি না। কিন্তু আমার মনে হলো সে খুব ভালো লোক। কী মিষ্টি কথা তার!’  বুড়ির কথা শুনে উমর (রা.)-এর বিস্ময়ের ঘোর আরো বেড়ে গেল। অস্থির মন নিয়ে উমর (রা.) সেদিনও বাড়ি ফিরে গেলেন। পরের দিনও একই ঘটনা ঘটল। উমর (রা.)-এর ভাবনার শেষ নেই। তিনি ভাবছেন সেই পুণ্যবান ব্যক্তির কথা- যিনি বুড়ির সেবা করে অনেক সওয়াবের মালিক হচ্ছেন। এই পুণ্যবান লোকটিকে দেখার জন্য হজরত উমরের খুব ইচ্ছা হলো। এ জন্যে উমর (রা.) সেই রাতে বুড়ির কুটিরের পাশে এসে বসে রইলেন। বুড়ির কুটিরে কে আসছে সেদিকে তিনি নজর রাখছেন। রাত গড়িয়ে গেল। ভোর হতে খুব বেশি দেরি নেই। পাখ-পাখালির কিচির মিচির ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এমন সময় এক ব্যক্তি খাবার ও কাপড়-চোপড় হাতে বুড়ির  কুটিরের সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর মৃদু কণ্ঠে বলল, ‘বুড়ি মা, জেগে আছো তো? আমি এসেছি,- উঠ।’
বুড়ি জেগে উঠে বসল। আগন্তুক বুড়ির কুটিরে প্রবেশ করলেন। তার মলমূত্র পরিষ্কার করলেন। গা-হাত মুছে দিলেন। সব কাজ সেরে আগন্তুক ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। যাবার সময় আগন্তুক বুড়িকে বললেন, ‘মা. এখন আমি আসি।’ বুড়ির মুখে কোনো আওয়াজ সরল না।
তার দু’চোখ দিয়ে অশ্রু বেরিয়ে এলো। বুড়ি ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লাগল। কুটিরের বাইরে থেকে এসব দেখছিলেন উমর (রা.)। সেই এক অভাবনীয় দৃশ্য। দুনিয়ার কেউ এই দৃশ্য কল্পনাও করতে পারে না। উমর (রা.) বলে কথা। বুড়ির অবস্থা দেখে তিনিও অশ্রুসংবরণ করতে পারলেন না। উমর (রা.) ততক্ষণে আগুন্তুককে চিনে ফেললেন।
কিছুটা সময় এভাবেই কাটল। এবার আগন্তুক বুড়ির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কুটির থেকে বেরিয়ে এলেন। উমর (রা.) দৌড়ে এসে আগন্তুকের সামনে দাঁড়ালেন।
তিনি সালাম দিয়ে আগন্তুকের হাত ধরে বললেন, ‘ইয়া আমিরুল মুমেনিন! আপনি আমাকে পরাজিত করেছেন। আপনার কাছে পরাজিত হওয়াও যে গৌরবের বিষয়। এই মহান আগন্তুকের নাম হলো হজরত আবু বকর (রা.)। মুসলিম দুনিয়ার প্রথম খলিফা তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ