ঢাকা, রোববার 23 April 2017, ১০ বৈশাখ ১৪২৩, ২৫ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিচার আর ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশা এখনও হতাহত স্বজনদের বুকে

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : মানবসৃষ্ট দুর্যোগ হিসেবে পৃথিবীশ্রেষ্ঠ ঘটনায় ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নেয়া “রানা প্লাজা” ট্রাজেডির দিনক্ষণ আসার আগে ও পরে কয়েকটা দিন আলাপ আলোচনার মধ্যে সেদিনের বিভৎসতাকে মনে করা যেন সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। বছরের গোটা সময়টাতে ওই ঘটনা স্মরণ করার ফুসরতও যেন কারও নেই। কিন্তু,  যাদের স্বজন হতাহতের শিকার হয়েছেন,  বছরজুড়েই তাদের বুকটা ফাটে যন্ত্রণা- কষ্ট আর বেদনায়,  তার সাথে আশাহতের জ্বালাও কম জ্বালায় না তাদের। ওই ট্রাজেডির কলাকুশলির বিচার দেখার যে অপেক্ষা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার যে আশা-এই দুটোর কোনটারই অস্তিত্ব মেলেনি বিগত বছরগুলোতে। সবকিছুকে ছাপিয়েই আবার এসেছে সেই দু:খজাগানিয়া দিনটি। রাজধানীর পাশ ঘেষেঁ গড়ে ওঠা শিল্পাঞ্চলখ্যাত  সাভারের রানা প্লাজা ট্রাজেডির চতুর্থ বার্ষিকী কাল সোমবার। 

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসে ১ হাজার ১৩৬ জন শ্রমিক নিহত এবং আহত হয় প্রায় ২ হাজার। ঢাকা জেলা প্রশাসক অফিসে রক্ষিত হিসাব অনুযায়ী,  রানা প্লাজার ধ্বংস্তূপ থেকে ২ হাজার ৪৩৮ জনকে জীবিত এবং ১ হাজার ১১৭ জনকে মৃত উদ্ধার করা হয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ১৯ জন মারা যায়। মৃত উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ৮৪৪ জনের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ডিএনএ পরীক্ষার নমুনা রেখে ২৯১ জনের অশনাক্তকৃত লাশ জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়। জীবিত উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ১ হাজার পাঁচশ ২৪ জন আহত হন। তদের মধ্যে গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করে ৭৮ জন। ওই ঘটনায় মোট ৩টি মামলা হয়। ৩টি মামলার মধ্যে একটি করে পুলিশ। ওই মামলা হয় ভবন ত্রুটিপূর্ণ জেনেও শ্রমিকদের মৃত্যুর মুখে ফেলে দেয়ার অভিযোগে সরাসরি হত্যার অভিযোগ এনে আরেকটি মামলা করেন নিহত শ্রমিক জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী শিউলী আক্তার। অপর মামলাটি বিল্ডিং কোড অনুসরণ না করার অভিযোগে করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। ৩টি মামলাই তদন্ত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার বিজয় কৃষ্ণ কর। মামলা ৩টিতে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে।

বিচারের পথ দূরঅস্ত

রানা প্লাজা ধস‘র ঘটনায় দায়ের করা গুরুত্বপূর্ণ দু‘মামলারই ভবিষ্যৎ আলো আঁধারিতে। কোনটারই গতি নেই। ইমারত নির্মাণ আইনে দায়ের করা মামলায় ভবন মালিক সোহেল রানাসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য সর্বশেষ গত ১২ এপ্রিল বুধবার দিন ধার্য ছিল। তবে মামলার মূল নথি জেলা জজ আদালতে থাকায় সাক্ষ্যগ্রহণে দিন পেছানো হয়েছে। আদালত সূত্রে জানা গেছে,  মামলার মূল নথি জেলা জজ আদালতে থাকায় সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য রাষ্ট্রপক্ষ সময়ের আবেদন করেন। পরে ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোস্তাফিজুর রহমান আবেদন মঞ্জুর করে আগামী ১৭ মে (বুধবার) দিন ধার্য করেন।

ইমারত নির্মাণ আইন না মেনে ভবন নির্মাণ করায় রাজউকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হেলাল উদ্দিন ঘটনার দিন সাভার থানায় মামলাটি করেন। মামলায় সাক্ষী করা হয়েছে ১৩০ জনকে। মামলার আসামীরা হলেন- ভবন মালিক সোহেল রানা (কারাগারে),  রানার মা মর্জিনা বেগম,  রানার বাবা আবদুল খালেক,  সাভার পৌরসভার তৎকালীন মেয়র রেফাত উল্লাহ,  কাউন্সিলর মোহাম্মদ আলী খান,  সাভার পৌরসভার সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান (পলাতক),  সাভার পৌরসভার সাবেক নিবার্হী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম (কারাগারে),  সাভার পৌরসভার সাবেক প্রধান নিবার্হী প্রকৌশলী উত্তম কুমার রায়,  সাভার পৌরসভার নগর পরিকল্পনাবিদ ফারজানা ইসলাম (পলাতক),  মাহবুবু আলম (পলাতক),  ঠিকাদার নান্টু (পলাতক),  রেজাউল ইসলাম (পলাতক),  সাভার পৌরসভার সাবেক উপ-সহকারী প্রকৌশলী রকিবুল হাসান,  সারোয়ার কামাল,  বজলুস সামাদ আদনান,  মাহমুদুর রহমান,  আমিনুল ইসলাম ও আনিসুর রহমান। ২০১৫ সালের ২৬ এপ্রিল সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার বিজয়কৃষ্ণ কর ভবন মালিক সোহেল রানাসহ ১৮ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।২০১৬ সালের ১৪ জুন ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোস্তাফিজুর রহমান আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।

এদিকে,   নকশা বহির্ভূত রানা প্লাজা ভবন নির্মাণে দুর্নীতির অপর মামলায় রানাসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশের জন্য আগামী ৮ মে দিন ধার্য করেছেন আদালত।গত ১৯ এপ্রিল বুধবার ঢাকা বিভাগীয় স্পেশাল জজ এম আতোয়ার রহমান উভয় পক্ষের অভিযোগ গঠন শুনানি শেষে এ দিন ধার্য করেন। রানা প্লাজা ভেঙে পড়ার ঘটনার পরপরই ভবন নির্মাণে দুর্নীতির অনুসন্ধানে নামে দুদক। নকশা বহির্ভূত ভবন নির্মাণের অভিযোগে ২০১৪ সালের ১৫ জুন সাভার থানায় ১৭ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করে কমিশন। ভবনটি সোহেল রানার বাবার নামে হওয়ায় ওই সময় মূল অভিযুক্ত সোহেল রানাকে বাদ দিয়েই তার বাবা-মাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়। তদন্তে সোহেল রানাই ভবনের মূল দেখভালকারী ছিল- প্রমাণ হলে চার্জশিটে তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মামলার বাদী ও তদন্তকারী কর্মকর্তা দুদকের উপ-পরিচালক এসএম মফিদুল ইসলাম ওই বছরের ১৬ জুলাই সোহেল রানাসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারা ও দন্ডবিধি ১০৯ ধারায় চার্জশিট দাখিল করেন। এ মামলার অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষে ঢাকা বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক এম আতোয়ার রহমান গত বছরের ৬ মার্চ দুদকের দেয়া এ অভিযোগপত্রে ত্রুটি থাকায় পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেন। পুনতদন্ত শেষে চলতি বছরের শুরুতে ফের একই আসামীদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে দুদক। 

নিহতদের সন্তানেরা মাতৃস্নেহে বেড়ে উঠছে গাইবান্ধার আরকা-হোমসে

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডিতে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের শিশু সন্তানরা মাতৃস্নেহে বেড়ে উঠছে গাইবান্ধায়। বাবা-মা হারানো বিভিন্ন জেলার এসব শিশুদের লেখাপড়াসহ পুনর্বাসনের দায়িত্ব নিয়েছে জেলার অরকা-হোমস নামের একটি প্রতিষ্ঠান। সেখানেই পরিবার হারিয়েও পরিবারের আদর-যতেœই লেখাপড়া,  বিনোদন ও খেলাধুলার সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে শিশুরা। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির শিকার শিশুদের জন্য এই হোমসটি তৈরি করেছে রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সংগঠন অরকা (ওল্ড রাজশাহী ক্যাডেট অ্যাসোসিয়েশন)। আর এখানে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ।

গাইবান্ধার অরকা-হোমস কার্যালয় সূত্রে জানা যায়,  ২০১৪ সালের ২২ ডিসেম্বর ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামে অরকা-হোমস প্রতিষ্ঠিত হয়। গাইবান্ধা-বালাসিঘাট সড়কের তেঁতুলতলা থেকে আধা কিলোমিটার উত্তরে এই প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে একটি তিনতলা ভবন,  খেলার মাঠ,  লাইব্রেরি ও বিনোদনের ব্যবস্থা। পাশেই রয়েছে হোসেনপুর মুসলিম একাডেমি। স্বাস্থ্যসম্মত ও ঘরোয়া পরিবেশেই এখানে বেড়েছে উঠছে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডিতে প্রাণ হারানো পোশাক শ্রমিকদের ৪৪টি শিশুসন্তান। এর মধ্যে কেউ কেউ আড়াই বছর ধরেই রয়েছে অরকা-হোমসে। আর স্কুলে যাওয়ার উপযোগী শিশুগুলোর পড়ালেখার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে পাশের হোসেনপুর মুসলিম একাডেমিতে।

অরকা-হোমসের তদারকির দায়িত্বে থাকা হোসেনপুর মুসলিম একাডেমির উপাধ্যক্ষ শফিকুল ইসলাম বলেন,  ‘সাত জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এখানে শিশুদের তদারকির দায়িত্বে আছে। হোমসে অবস্থানরত শিশুদের লেখাপড়া শেষ হলে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করা হবে। পাশাপাশি মেয়েদের জন্যও কর্মসংস্থান এবং প্রয়োজনমতো বিয়ের ব্যবস্থা করা হবে।’

শফিকুল ইসলাম আরও বলেন,  ‘শিশুরা যেন বাবা-মায়ের স্নেহের অভাব বুঝতে না পারে,  আমরা সেই চেষ্টাই করছি। ওদের জন্য খেলাধুলা ও বিনোদনের সব ব্যবস্থাই রাখা হয়েছে। এক কথায় বলতে গেলে,  একটি শিশু নিজের পরিবারে যেভাবে লালিত-পালিত হয়ে থাকে,  আমাদের এখানেও তেমনটিই হচ্ছে।’

 সেই রানা প্লাজার জায়গা এখন যেমন

চার বছর যেতে না যেতেই সাভারের রানা প্লাজা ভবনের জায়গায় অবৈধ দখলদারদের সরব উপস্থিতি দেখা গেছে। কাস্তে হাতে শ্রমিকের দুই হাতের একটি ভাস্কর্য-ই কেবল সাম্প্রতিককালের নিষ্ঠুরতম ট্র্যাজেডির সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু দখলই নয়,  হাজারো পোশাক শ্রমিকের রক্ত,  মাংস,  হাড় মিশে থাকা রানা প্লাজা ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।

সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়,  পুরো জায়গা জুড়ে অযতœ,  অবহেলা ও ময়লা-আবর্জনার চিহ্ন। শুধু তাই নয় ওই ভবনের সামনের ভাস্কর্যের পাশ দিয়ে কেউ ময়লা আবর্জনা ফেলছেন,  কেউ দোকান ভেঙে স্তুপ করে রেখেছেন। কেউ কেউ আবার অঘোষিত টয়লেট বানিয়ে ফেলেছেন। কিছু দখলদার নিজেদের আহত শ্রমিকদের স্বজন দাবি করে সেখানে বিভিন্ন ধরনের দোকান তুলে ব্যবসা করছেন। পড়া ভবনের জায়গা দখলের জন্যই একটি চক্র এই জায়গা ঘিরে বিভিন্ন দোকানঘর ও স্থাপনা তুলে ভাড়া গুনছে।স্থানীয়রা বলছে,  ‘সরকারেরএই জায়গার মালিকানা বাজেয়াপ্ত করার ঘোষণা ভবিষ্যতে যাতে কার্যকর হতে না পারে,  সেজন্যই স্থানীয় প্রভাবশালীদের একটি চক্র কৌশলে এই জমির আশপাশে স্থাপনা তৈরি করে দখল করার পাঁয়তারা করছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ