ঢাকা, রোববার 23 April 2017, ১০ বৈশাখ ১৪২৩, ২৫ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ঝিনাইদহের জঙ্গি আস্তানা থেকে বিস্ফোরক অস্ত্র ও রাসায়নিক কন্টেইনার উদ্ধার

আব্দুর রাজ্জাক রানা, ঝিনাইদহ থেকে ফিরে : খুলনা বিভাগের ঝিনাইদহ সদরের পোড়াহাটি গ্রামের ঠনঠনিয়া পাড়ায় জঙ্গি আস্তানায় পরিচালিত অপারেশন ‘সাউথ প’ (দক্ষিণে থাবা) আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল শনিবার সকাল সোয়া ৯টা থেকে শুরু হওয়া এ অভিযান চলে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত। সাড়ে পাঁচ ঘন্টাব্যাপী শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান শেষে খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি দিদার আহমেদ প্রেস ব্রিফিং করেছেন। প্রেস বিফ্রিংকালে তিনি বলেন, জঙ্গি আব্দুল্লাহ’র বাড়িটি নিউ জেএমবি’র সদস্যরা বোমা তৈরির কারখানা হিসেবে ব্যবহার করতো। এ আস্তানায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে উচ্চ পর্যায়ের জঙ্গিরা আসা যাওয়া করতো। কারা এ বাড়িতে আসতো তাদের নাম ঠিকানা জানা গেলেও তদন্তের স্বার্থে বলা যাবে না বলে তিনি জানান। এ সময় তিনি অপারেশন ‘সাউথ প’ সমাপ্ত ঘোষণা করেন। 

উদ্ধারকৃত মালামালের মধ্যে রয়েছে সুইসাইডাল বেল্ট ৯টি, সুইসাইডাল ভেস্ট ৩টি, ৮/১০ কেজি ওজনের ৪টি বোমা নিস্ক্রিয় করা হয়েছে। প্রচুর পরিমাণে ইলেক্ট্রিক সার্কিট ও বিস্ফোরক দ্রব্য, ১০০টি বল বিয়ারিং, ১টি রাইসকুকার বোমা, ২০ কনটেইনার হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, ১টি হোন্ডা, ১টি চাপাতি, ১টি বিদেশী পিস্তল, ৭ রাউন্ড গুলি সহ প্রচুর পরিমাণ বোমা তৈরির সরঞ্জামাদি। বোমা নিস্ক্রিয় করার সময় বোমার আঘাতে জঙ্গি আস্তানাটির ঘরের চালা উড়ে যায় ও দেয়াল ভেঙ্গে পড়ে। উদ্ধারকৃত মালামাল পরীক্ষা-নিরিক্ষা করে দেখা হবে বলে তিনি আরও জানান। 

এ দিকে গতকাল সন্ধ্যা থেকে চলা এ অভিযানের কিছুসময় আগেই জেএমবি সদস্য আব্দুল্লাহ তার স্ত্রী ও ছেলে মেয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। 

অভিযানে ঢাকা থেকে আসা কাউন্টার টেরিরিজম ইউনিটের ৭জন বোমা নিস্ক্রিয়কারীসহ ৩০জন সদস্য, খুলনা রেঞ্জ পুলিশ, ঝিনাইদহ পুলিশ, এলআইসি টিম ও পিবিআই টিমসহ ৪শ’ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এ অভিযানে অংশ নেয়। শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে এ অভিযান শুরুহয়। পরে রাত ১১টার দিকে স্থগিত ঘোষণা করা হয়।

অভিযানকালে খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি দিদার আহমেদের নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে টেরিরিজম ইউনিটের এডিসি নাজমুল, বোমা ডিসপোজালের এডিসি রহমত হোসেন, ঝিনাইদহ পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান ও ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক মাহবুব আলম তালুকদার। 

গতকাল শনিবার সকাল সোয়া ৯টা থেকে আবার অভিযান চালানো হয়। অভিযানকালে জঙ্গি আস্তানাটির ৫শ’ গজের মধ্যে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। মাইকিং করে গ্রামবাসীকে নিরাপদ দুরুত্বে চলে যেতে বলা হয়। 

নিরাপদ দূরত্বে থাকতে বলা হয় সংবাদকর্মীদেরও। বর্তমানে ওই জঙ্গি আস্তানাটিতে পুলিশ অবস্থান করছে।

এদিকে শুক্রবার বিকেল থেকে ঘিরে রাখা হয়েছিল সদর উপজেলার পোড়াহাটি গ্রামের ওই বাড়িটি। সন্ধ্যায় সেখানে অভিযান চালিয়ে পিস্তল, গ্রেনেড, সুইসাইড ভেস্ট উদ্ধার করা হয় বলে জানান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ওই দিনের প্রাথমিক অভিযান শেষে শনিবার সকালে সন্দেহভাজন জঙ্গি আস্তানাটিতে ফের অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বিকেল ৩টার আগেই শেষ হয় অভিযান। পরে সাংবাদিক সম্মেলনে আসেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা।

দুই দিনের অভিযানে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের ৩০ জন এবং খুলনা রেঞ্জের পুলিশ, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), র‌্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ৪০০ সদস্য এই অভিযানে অংশ নেন। অভিযানকালে ওই বাড়ির আশপাশের ৫০০ গজের মধ্যে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছিল। পরবর্তী ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত এই নির্দেশ জারি থাকবে বলে জানিয়েছেন ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক মাহবুব আহমেদ তালকুদার। 

প্রেস ব্রিফিংয়ে ডিআইজি দিদার আহমেদ বলেন, ‘ঠনঠনিয়া পাড়ার ওই আস্তানায় কোনও জঙ্গি পাওয়া যায়নি। তবে আমাদের কাছে খবর আছে এখানে তিন-চার জন জঙ্গি ছিল। তারা আগেই পালিয়ে গেছে। তবে এই জঙ্গিদের সবাই জেএমবি ও নব্য জেএমবির সদস্য। আর এই বাড়িতে যে পরিমাণ বোমা তৈরির সরঞ্জাম পাওয়া গেছে তাতে বাড়িটিকে বোমা তৈরির কারখানা বলা যেতে পারে। এই বাড়িতে জঙ্গি সংগঠনগুলোর বিভাগীয় পর্যায়ের লোকজন আসা যাওয়া করতো। এই বাড়িতে অভিযান সম্পন্ন হলেও আমাদের জঙ্গিবিরোধী তৎপরতা চলবে।’ এ সময় উপস্থিত ছিলেন-খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি হাবিবুর রহমান, ঝিনাইদহ পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান, জেলা প্রশাসক মাহাবুব আলম তালুকদার প্রমুখ।

এ দিকে গত শুক্রবার রাতে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ডিআইজি দিদার আহমেদ বলেন, ‘শুক্রবার বিকেল ৬টার দিকে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার পোড়াহাটি গ্রামের আব্দুল্লাহর বাড়িকে ‘জঙ্গি আস্তানা’ সন্দেহে ঘিরে রাখে পুলিশ। ওই বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক, বোমা তৈরির সরঞ্জাম ও অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। বাড়ির মালিক আব্দুল্লাহ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত। সে জেএমবির সদস্য। আব্দুল্লাহ পাঁচ বছর আগে সনাতন ধর্ম থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে।’

দিদার আহমেদ বলেন, জঙ্গি আব্দুল্লাহর বাড়িটি নব্য জেএমবির সদস্যরা বোমা তৈরির কারখানা হিসেবে ব্যবহার করত। এ আস্তানায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে জঙ্গিরা আসা-যাওয়া করত। কারা এ বাড়িতে আসত তাদের নাম-ঠিকানা জানা গেলেও তদন্তের স্বার্থে বলা যাবে না। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ