ঢাকা, রোববার 23 April 2017, ১০ বৈশাখ ১৪২৩, ২৫ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

অতি বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢলে নেত্রকোনা লক্ষ্মীপুর ও ঝিনাইগাতীতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত ॥ শস্যের ব্যাপক ক্ষতি

নেত্রকোনায় পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান ক্ষেতে কৃষকরা ধান কাটতে ব্যস্ত। লক্ষ্মীপুরে পানিতে তলিয়ে যাওয়া রবিশস্যের ক্ষেত।

নেত্রকোনা সংবাদদাতা : অতি বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢলে হাওরাঞ্চলের ফসল তলিয়ে যাওয়ার পর আবারো অব্যাহত বর্ষণে এবার নেত্রকোনায় টানের (উচু এলাকা) জমি নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বুধবার থেকে অব্যাহত ভারী বর্ষণে নেত্রকোনার প্রধান প্রধান নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। টানা বর্ষণে দূর্গাপুর, কলমাকান্দা, বারহাট্টা, আটপাড়া, কেন্দুয়া, পূর্বধলা ও নেত্রকোনা সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের নিন্মাঞ্চলের বোরো ফসল বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। দূওজ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা জুবেদ আলী জানান, আটপাড়া উপজেলার সবচেয়ে বড় হাওর গনেশের হাওরের বিস্তীর্ণ ফসল গত শুক্রবার অতি বৃষ্টি ও ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে। কৃষকদের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের ফসল চোখের সামনে পানিতে তলিয়ে যেতে দেখে আহাজারী করছে।
এদিকে আগাম বন্যা কবলিত নেত্রকোনা জেলার হাওর উপজেলা খালিয়াজুরী, মদন ও মোহনগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ত্রাণের জন্য চলছে হাহাকার। প্রয়োজনীয় ত্রাণ না পেয়ে অনেকেই পরিবার পরিজন নিয়ে অনাহারে-অর্ধহারে দিনাতিপাত করছে।
হাওর এলাকা বরান্তর, গাগলাজুর, লেপ্সিয়া, চাকুয়া, ফরিদপুর, আড়াকান্দি, পাতরা, দাওয়াপুর, লঞ্চঘাট শিবির, শালদিঘা, ফতুয়া, নাগিচাপুর, বল্লীসহ বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, ঢলের পানিতে সব ফসল তলিয়ে গেছে। এলাকার মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, হাওরাঞ্চলে বর্তমানে কোন কাজ নেই, কর্মহীন মানুষ ঘরে বসে অলস সময় কাটাচ্ছে। ঘরে তাদের প্রয়োজনীয় খাবার নেই। অনেক বাড়িতেই সময়মত রান্না হচ্ছে না। সারা দিন এক মুটো ভাতও অনেকের পেটে পড়ছে না। এরই মধ্যে পানি বিষাক্ত হয়ে মাছে মড়ক দেখা দেয়ায় হত দরিদ্র সাধারণ মানুষ মাছও মারতে পারছে না। সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ আসার খবর পেলেও তারা ত্রাণ পাচ্ছে না। ইউপি চেয়ারম্যান ও ক্ষমতাসীন দলের পছন্দসই অনুগত লোকজনকে কিছু কিছু ত্রান দেয়া হচ্ছে। হাওরাঞ্চলের কৃষকদের একমাত্র ফসল হারিয়ে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। ফসল হারানোর কষ্ট সইতে না পেরে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় হৃদযন্ত্রের ক্রীয়া বন্ধ হয়ে এরই মধ্যে কয়েকজন কৃষক মারাও গেছেন।
লক্ষ্মীপুর সংবাদদাতা : লক্ষ্মীপুরে প্রবল বৃষ্টিতে ডুবে নষ্ট হয়ে গেছে নিম্নাঞ্চলের সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমির রবি শস্য। নষ্ট হয়েছে সয়াবিন, বাদাম, মরিচ, বোরো ধান, ডালজাতীয় ফসলসহ রবিশস্য। বুধবার, বৃহস্পতিবার, শুক্রবার ও শনিবারের প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে জমিতে পানি জমে নষ্ট হয়েছে এসব ফসল। কৃষকরা বলছেন, এবার লোকসানই গুণতে হবে তাদের। তবে ফসলী জমিতে জমে থাকা পানি দ্রুত বের করে দেয়ার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে বলে জানায় কৃষি বিভাগ।
লক্ষ্মীপুর কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য মতে, জেলার কয়েক হাজার হেক্টর জমির রবিশস্য বৃষ্টির পানিতে ডুবে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে বোরো ধান, সয়াবিন, বাদাম, মরিচ, ডালসহ রবিশষ্য।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, টানা বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সদর উপজেলা ভবানীগঞ্জ, তোরাবগঞ্জ, পেয়ারাপুর এলাকার নিম্নাচলের ফসলি মাঠ। এতে সব হারিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা। আর তাদের লোকসান গুণতে হবে লাখ লাখ টাকা।
সরেজমিনে সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ মিয়ার বেড়ি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিস্তৃর্ণ সয়াবিনের ক্ষেত বৃষ্টির পানির ডুবে গেছে। নষ্ট হয়েছে সয়াবিন। কৃষকরা ফসল রক্ষায় পাম্প মেশিন বসিয়ে পানি নিষ্কাশন করছে। আবার কোথাও কোথাও কৃষক হাত দিয়ে জমি থেকে পানি সরানোর চেষ্টা করছে। 
চর মনসা গ্রামের সয়াবিন চাষি হানিফ মিয়া জানান, স্থানীয় সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে দুই একর জমিতে সয়াবিনের আবাদ করেছেন, সয়াবিনের বাম্পার ফলনের আশায়। কিন্তু প্রবল বৃষ্টির কারণে তার ক্ষেত পানির নিচে তলি সয়াবিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে দিশেহারা তিনি।
কবির হোসেন, আবু বেপারী, খোকন মিয়াসহ কয়েকজন কৃষক জানায়, প্রবল বৃষ্টির কারণে তাদের কৃষি আবাদের জমি নষ্ট হয়ে গেছে। এতে তাদের লাভের তুলনায় লোকসানই বেশি হবে।
লক্ষ্মীপুর জেলা কৃষি অফিসের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আবুল হোসেন বলেন, যেসব জমিতে বৃষ্টির পানি জমে আছে। ওই সকল জমির জমানো পানি দ্রুত বের করে দেয়ার জন্য মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা পরামর্শ দিচ্ছেন। তাছাড়া যে সকল জমিতে বরোধান ৮০ ভাগ ফাঁকা শুরু হয়েছে, সে সব ধান দ্রুত কেটে পেলার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এতে অনেকটা লোকসানের হাত থেকে রক্ষা পাবে কৃষক। 
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, প্রবল বৃষ্টিতে ক্ষেতে ফসল নষ্ট হচ্ছে। ক্ষেত থেকে পানি সরিয়ে দিতে কৃষকদের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা পরামর্শ দিচ্ছেন।
শেরপুর সংবাদদাতা: প্রবল বর্ষণ ও সীমান্তের ওপার থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে শেরপুরের সীমান্তবর্তী ঝিনাইগাতী উপজেলার নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। গতকাল শনিবার ঢলের পানিতে ঝিনাইগাতী বাজারসহ পাঁচ ইউনিয়নের ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ইউনিয়নগুলো হচ্ছে ঝিনাইগাতী সদর, নলকুড়া, ধানশাইল, হাতিবান্ধা ও মালিঝিকান্দা। এসব এলাকার উঠতি পাকা বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। ঢলের পানিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।
উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার দিবাগত গভীর রাত থেকে মুষলধারে বৃষ্টি ও ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি ঝিনাইগাতী বাজারে প্রবেশ করে। এতে ঝিনাইগাতী বাজারে অবস্থিত ডাকঘর, সাবরেজিস্ট্রার, নলকুড়া ভূমি কার্যালয় ও মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ের চারপাশের এলাকা প্লাবিত হয়। সেই সঙ্গে উপজেলার সুরিহারা, বনগাঁও, চতল, বাগেরভিটা, আয়নাপুর, ফাকরাবাদ, দড়িকালিনগর, সারিকালিনগর, পাগলারমুখ, বগাডুবি, বালিয়াচ্ড, বালিয়াগাঁওসহ ৩০টি গ্রামের নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার উঠতি পাকা বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। সেই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা বলেন, বোরো ধান তাদের প্রধান ফসল। এ ফসল দিয়েই তাদের সংসার চলে। ঢলের পানিতে ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন কিভাবে সংসার চলবে এ নিয়ে তারা চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ জেড এম শরীফ হোসেন বলেন, সকাল দশটার পর থেকে বৃষ্টি না হওয়ায় পাহাড়ি ঢলের পরিস্থিতি বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে। পানি নিম্নাঞ্চলে নামছে। প্রাথমিক হিসেবে এক হাজার ২০০ হেক্টর জমির বোরো ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এ ছাড়া ঢলের পানিতে বিভিন্ন এলাকার পুকুরের মাছও ভেসে গেছে বলে তিনি জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ