ঢাকা, রোববার 23 April 2017, ১০ বৈশাখ ১৪২৩, ২৫ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে চিরশয্যায় সঙ্গীতশিল্পী লাকী আখান্দ

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীর মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে চিরশয্যায় শায়িত হলেন কিংবদন্তীর সঙ্গীতশিল্পী-মুক্তিযোদ্ধা লাকী আখান্দ। রাষ্ট্রীয় সম্মাননা, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদন ও তিন দফা নামাযে জানাযা শেষে গতকাল শনিবার বেলা সোয়া তিনটার দিকে তাকে সমাহিত করা হয়। এদিকে আগামীকাল সোমবার বাদ জোহর আরমানিটোলার বাসায় মরহুমের কুলখানি অনুষ্ঠিত হবে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
এর আগে সকাল ৯টায় বারডেম হাসপাতালের হিমঘর থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের এই কন্ঠযোদ্ধার লাশ নেয়া হয় পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় তার বাসভবনে। এ সময় এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সকাল ১০টায় মরহুমের বাসা সংলগ্ন আরমানিটোলা মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রথম জানাযা শেষে বেলা ১১টার দিকে লাশ নেয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও সর্বস্তরের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে দ্বিতীয় নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। বৃষ্টি উপেক্ষা করে শহীদ মিনারে অসংখ্য কালজয়ী গানের স্ষ্টার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানানোর অনুষ্ঠানে প্রায় কাকভেজা হয়েও ফুল হাতে ছিলেন অনেকেই।
শহীদ মিনারে মরহুমের কফিন পৌঁছলে লাল-সবুজের পতাকায় ঢেকে ম্যাজিস্ট্রেট রবীন্দ্র চাকমার নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল গার্ড অব অনার দেয় এই স্বাধীনতা সংগ্রামীকে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ও ভারপ্রাপ্ত সংস্কৃতি সচিব ইব্রাহীম হোসেন খান।
মরহুম শিল্পীর কন্যা মাম্মিন্তি নূর আখান্দের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, তার কাজকে স্মরণীয় করে রাখতে পরিবারের কোনো প্রত্যাশা থাকলে, তা জানালে আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করব। আর এটা হবে বন্ধুর প্রতি আমার শ্রদ্ধা নিবেদন।
শ্রদ্ধা জানাতে এসে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু মরহুম লাকী আখান্দকে ‘গণমানুষের শিল্পী’ আখ্যা দিয়ে বলেন, তিনি গোটা বাংলাদেশকে হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন।
বাংলাদেশ বেতারের পক্ষে শ্রদ্ধা জানাতে এসে উপ-পরিচালক (অনুষ্ঠান) সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, লাকী আখান্দের মৌলিক গানগুলো বাংলাদেশ বেতারে রেকর্ড করা হয়েছে। সেগুলো সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য মারুফা আক্তার পপির নেতৃত্বে একটি দল শ্রদ্ধা জানায়। বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও বরেণ্য গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার দলের পক্ষ থকে আসেন শ্রদ্ধা জানাতে। তিনি বলেন, গানের ভুবনে তার (আখান্দ) যাত্রা শুরু হয়েছিল মাত্র ১৪ বছর বয়সে। এত কম বয়সে সুরকার হিসেবে এইচএমভির মতো রেকর্ড লেভেল কোম্পানিতে তালিকাভুক্ত হওয়া তো চাট্টিখানি কথা নয়। তারপর কী যে হল গান শুধু গান। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বাংলা আধুনিক গানকে এনে দিলেন নতুন মাত্রা। গানকে সঙ্গী করে কেটে গেল তার সারাটা জীবন।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিসুল হক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকও শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে আসেন। এছাড়া বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, বাংলাদেশ যুব মৈত্রী, জাসাস, বাংলাদেশ বেতার, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়। সাংস্কৃতিক সংগঠন বাংলাদেশ সঙ্গীত সংগঠন সমন্বয় পরিষদ, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, নাট্য সংগঠন প্রাচ্যনাট, শিল্পীত, ঋষিজ ও আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সদস্যরাও শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
শহীদ মিনারে সঙ্গীত-সংস্কৃতি অঙ্গনের ফকির আলমগীর, তিমির নন্দী, খুরশিদ আলম, আকরামুল ইসলাম, নকীব খান, আসিফ ইকবাল, কাজী হাবলু, ফুয়াদ নাসের বাবু, শহীদুল্লাহ ফরায়েজী, কবির বকুল, নাট্যব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম, লেখক শাকুর মজিদ শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসেন। শহীদ মিনারে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে শ্রদ্ধা নিবেদন পর্বের শেষে লাকী আখান্দের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এক মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করা হয়।
এরপর লাশ নিয়ে যাওয়া হয় মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে। বেলা ২টা ৪৫ মিনিটে বুদ্ধিজীবী কবরস্থান চত্বরে তৃতীয় নামাযে জানাযা শেষে তার লাশ সমাহিত করা হয়। এসময় উপস্থিত ছিলেন সঙ্গীতশিল্পী ফুয়াদ নাসের বাবু, লাবু রহমান, শায়েদ ছাড়াও লাকীর সঙ্গীতাঙ্গনের দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও আত্মীয়স্বজন। ঘটনাস্থলে লাকী আখন্দের মেয়ে মামিন্তি তার বাবা হারানোর শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন।
এদিকে, পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয় আগামীকাল বাদ আসর আরমানিটোলার বাসায় কুলখানি হবে। এতে আত্মীয়-স্বজন, শিল্পীর বন্ধু-শুভাকাংক্ষীদের উপস্থিত হতে অনুরোধ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে গত শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন লাকী আখান্দ। তার বয়স হয়েছিল ৬১ বছর। আমৃত্যু এই গানের ইন্তিকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরসহ বিভিন্ন পর্যায়ের বিশিষ্টব্যক্তিবর্গ আলাদা আলাদা শোক বাণী দিয়েছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ