ঢাকা, বুধবার 21 November 2018, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

অপরিণত শিশুর জীবন বাঁচাতে অনন্য ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার

অনলাইন ডেস্ক: প্রাণীদের কিছু কিছু আচরণ অনুকরণ ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষের দক্ষতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সম্প্রতি ক্যাঙ্গারুদের সন্তান পালনের পদ্ধতিটি অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেয়া মানব শিশুর প্রাণ বাঁচাতে অনন্য একটি পন্থা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

অপরিণত নবজাতকের জীবণ রক্ষার উপায় নিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা দশকের পর দশক ধরে চিন্তা-গবেষণা চালিয়ে আসছেন। 

চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেওয়া শিশুর যত্নের জন্য কোনো কৃত্রিম ব্যবস্থা নয়, প্রকৃতির দেখানো পথই যথেষ্ট হতে পারে। খুবই সহজ-সরল একটি পদ্ধতিতে সেবা এবং চিকিৎসা করালে এসব শিশু বেঁচে যায়। এই পদ্ধতিটি ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার (কেএমসি) নামে পরিচিত। 

সেভ দ্য চিলড্রেনের ‘সেইভিং নিউবর্ন লাইভ (এসএনএল) কর্মসূচির পরিচালক ডা. সৈয়দ রুবাইয়াত বাসসকে বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তিন শ’র বেশি সমীক্ষা চালানো হয়েছে, যাতে প্রমাণিত হয়েছে যে, ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার (কেএমসি) অপরিণত শিশুদের জীবন রক্ষায় সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।’

তিনি বলেন, ১৯৮৩ সালে কলম্বিয়ায় এই সহজ পদ্ধতিটি চালু হওয়ার পর থেকে এটি ধীরে ধীরে সারা বিশ্বে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০০৩ সালে নির্ধারিত সময়ের আগে অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেয়া ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের জীবন বাঁচাতে কেএমসি পদ্ধতি গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু প্রচার-প্রচারণার অভাবে বাংলাদেশের অনেক মায়েরই বিষয়টি সম্পর্কে কোন ধারণা নেই। এদেশে এটি এখনো একটি নতুন ধারণা। যদিও অপরিণত শিশুর মৃত্যুর হার বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে সপ্তম।

ইউনিসেফ আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, কেবল চলতি বছরই দেশে অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেয়া ২৩ হাজার ৬শ’ শিশু মৃত্যুবরণ করতে পারে। ফলে এসব শিশুর মৃত্যু রোধে কেএমসি পদ্ধতি জনপ্রিয় করার জন্য ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানোর প্রয়োজন রয়েছে।

ডাক্তার রুবাইয়াত বলেন, ‘২০১৬ সালে আমরা কুষ্টিয়ায় প্রথম চিকিৎসা সেবা হিসেবে কেমসি পদ্ধতি চালু করি এবং বেশ ইতিবাচক সাড়া পাই... এখন পদ্ধতিটি স্বল্প ব্যয় ও কার্যকারিতার কারণে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।’

তিনি জানান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউনেটালজি বিভাগ ও ঢাকা শিশু হাসপাতালসহ রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে বর্তমানে ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার (কেএমসি) পদ্ধতির চিকিৎসা সেবা পাওয়া যাচ্ছে। 

এই পদ্ধতিতে ভাল ফল পাওয়া একজন হলেনÑ কুষ্টিয়ার নিপা। ১৮ বছর বয়সী নিপা দুই বছর আগে খোকশা হাসপাতালে ওমর নামের মাত্র এক কেজি ৭৪০ গ্রাম ওজনের একটি আপরিণত শিশুর জন্ম দেন।

ওমরকে প্রথম দিকের বিপজ্জনক দিনগুলো অতিক্রমে সহায়তা করতে চিকিৎসক ও নার্সরা তার ওপর কেএমসি পদ্ধতি প্রয়োগ করেন। তারা নিপাকে তার বাচ্চাটিকে তার বুকের সাথে লাগিয়ে রাখার এবং কেবল বুকের দুধ খাওয়ানোর গুরুত্ব বুঝিয়ে দেন।

কেএমসি পদ্ধতি প্রয়োগের জন্য নিপা ও ওমরকে হাসপাতালের কেএমসি কর্নারে স্থানান্তর করা হয়।

হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স কণিকা রানীর সহায়তায় নিপা তার সন্তানকে কেএমসি অবস্থানে বুকে আগলে রাখেন। এতে ছোট্ট শিশুটির শরীরে যথেষ্ট উষ্ণতা পেতে এবং স্বাচ্ছন্দে মায়ের দুধ খেতে সুবিধা হয়।

নিপাকে তার বাচ্চাটিকে কেএমসি পজিশনে রাখতে এবং প্রয়োজনে বিশ্রাম নিতে সহয়াতা করার জন্য নিপার মা ও শাশড়িকেও হাসপাতালে তার সাথে থাকার অনুমতি দেয়া হয়। 

দশদিন পর নিপাকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেয়া হয়। তবে চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী ওমরের অবস্থা স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত নিপা আরো চার মাস বাড়িতে থেকে ওমরকে কেএমসি পদ্ধতিতে চিকিৎসা সেবা দেন।

নিপা বলেন, ‘আমার খুবই ভালো লাগছে। কারণ ওমর এখন সুস্থ।’

ডাক্তার রুবাইয়াত জানান, ‘ক্যাঙ্গারু যেমন অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেয়া বাচ্চাকে তার বুকের থলের ভেতরে আগলে রেখে মাতৃ¯েœহের উমে বড় করে তুলে তার অনুকরণে ‘ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার’ পদ্ধতিতে নির্ধারিত সময়ের আগে জম্ম নেয়া ও কম ওজনের নবজাতক শিশুকে মায়ের বা পরিবারের অন্য সদস্যদের বুকের মধ্যে রেখে, মায়ের সাথে নবজাতকের ত্বকে-ত্বকে নিবিড় আলিঙ্গনের মাধ্যমে উষ্ণতার আবহ তৈরি হয় এবং শিশুর প্রয়োজনে মা সময়মতো খেতে দেন। এভাবে মায়ের বুকের উত্তাপ ও প্রয়োজন মতো শিশুকে খাওয়ানোর কারণে শিশু দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে এবং সন্তান ও মায়ের মধ্যে বন্ধন দৃঢ় হয়।’ 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমইউ)’র নবজাতক বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. আবদুল হান্নান বলেন, ‘কেএমসি অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেয়া শিশুদের জন্য একটি জীবন রক্ষাকারী এবং প্রায় বিনা মূল্যের চিকিৎসা সেবা।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা অপরিণত শিশুদের মৃত্যুহার রোধে উদ্বুদ্ধকরণ এবং মানুষের আচরণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে কেএমসি পদ্ধতির প্রসার ঘটাতে পারি।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার পদ্ধতিতে দেশে জনবল ও সম্পদের সীমাবদ্ধতার ঘাটতি কাটিয়ে নবজাতকের মৃত্যুর হার কমানো সম্ভব। 

বিশষজ্ঞদের মতে ৩৭ সপ্তাহের আগে কোনো নবজাতক শিশু ভূমিষ্ঠ হলে তাকে প্রি-ম্যাচিউর বা অপরিণত নবজাতক শিশু বলা হয়। বাংলাদেশে কেবল ২০১৪ সালেই বাংলাদেশে চার লাখ ৩৮ হাজার ৮শ’ অপরিরণত বয়সের নবজাতক জম্মগ্রহণ করে। 

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, দেশে বছরে ৩১ লাখ শিশু জন্ম নেয়। এর মধ্যে ৪ লাখ ৫০ হাজার শিশু কম ওজনের অপরিণত বয়সের। এদের মধ্যে বছরে ৩১ হাজার ৫শ’ শিশু মারা যায়। এ মৃত্যুহার রোধ করার জন্যে ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার পদ্ধতি খুবই কার্যকর হতে পারে। 

স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, দেশে প্রতি বছর ২৮ সপ্তাহের আগে জন্ম নেয়া খুবই আপরিণত শিশুর সংখ্যা ২২ হাজার মতো, যাদের জন্য বাড়তি স্বাস্থ্য সেবা প্রয়োজন।

ডাক্তার রুবাইয়াত বলেন, ‘ আমরা দেখতে পাই ২০১৪ সালে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুর প্রধান কারণ হলো অপরিণত জন্ম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব মতে দেশে জন্ম নেয়া শিশুদের ১৪ শতাংশই অপরিণত, যার অর্থ প্রতি সাতটি শিশুর একটি অপরিণত।’-বাসস

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ