ঢাকা, মঙ্গলবার 25 April 2017, ১২ বৈশাখ ১৪২৩, ২৭ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সব শেষে পাগনার হাওরও ডুবল

মহসিন রেজা মানিক, সুনামগঞ্জ থেকে : সুনামগঞ্জের সকল হাওর ডুবে গিয়েও তৃষ্ণা মিটেনি পাহাড়ি ঢলের। সবশেষে বাঁধ ভেঙ্গে জামালগঞ্জ উপজেলার পাগনার হাওরকেও একই পরিণতি স্বীকার করতে হল। গতকাল সোমবার সূর্য উঠার আগেই সো সো করে উড়ারকান্দা বাঁধ ভেঙ্গে ডুবে যায় হাওরটি। এতে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার হেক্টর ফসলি জমির কাঁচা আধা পাকা ধান তলিয়ে যায়। কৃষকের সকল আশা এখন গুড়েবালি। অথৈ জলরাশিতে ডুবে যায় স্বপ্ন। চোখের সামনেই ডুবে গেল কষ্টের ফলানো ফসল। হাওর পাড়ের কৃষকদের চোখে এখন বাঁধ ভাঙ্গার পানি আর চোখের পানি একাকার। ফসল ডুবির দুঃসংবাদ তাড়া করে বেড়াচ্ছে তাদের। হাওর ডুবার দৃশ্য দেখতে দেখতে শোকে পাথর হয়ে গেছে কৃষকেরা। একের পর এক ডুবছে হাওর। জেলা শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে পাগনার হাওরে অবস্থান। জামালগঞ্জ পেরিয়ে সেলিমগঞ্জের বাম দিকে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে পাগনা হাওর। হাওরটি সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ, দিরাই, জগন্নাথপুর ও নেত্রকোনা জেলার খালিয়াজুড়ি এলাকা বেষ্টন করে আছে। বেশির ভাগ বোরো ফসলি জমি জামাগলঞ্জ উপজেলার হাওরপাড়ের কৃষকদের। এক মাস স্বেচ্ছাশ্রম দিয়েও বাঁধ টিকাতে পারেননি শতশত কৃষক। ফসলের সাথে পরিশ্রমও বিফলে গেল। প্রকৃতির কাছে পরাজয় বরণ করতে হলো তাদের। উপজেলার প্রায় ৬০ টি গ্রামের মানুষের এ হাওরের বোরো ফসলের উপর নির্ভরশীল। দিরাই উপজেলার রফিনগর গ্রামে পাশের উরাখালী বাঁধ গতকাল ভোররাতে ভেঙ্গে এ হাওরে ডুকে পানি। পানি প্রবল বেগে বাঁধ ভেঙ্গে ফসল তলিয়ে যায়। এরপরেই শুরু হয় বাঁধ ভাঙ্গার প্রতিযোগিতা। একে একে ভেঙ্গে যায় উজ্জলপুর, গজাড়িয়া, আলীপুর, মতিরখাল, কালনিসহ বিভিন্ন বাঁধ। এলাকার স্থানীয়দের জনপ্রতিনিধিসহ লোকজনের অভিযোগের তীর পানি উন্নয়ন বোর্ড, পিআইসি ঠিকাদারের উপর। বাঁধ এলাকায় মাস খানিকের মধ্যে এদের কারো দেখা পায়নি হাওর পাড়ের কৃষক। তাদের গাফিলাতির কারণেই হাল ধরেন জামালগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান শামসুল আলম ঝুনু। শত শত শ্রমিক নিয়োগ তিনি শুরু করেন বাঁধ রক্ষার কাজ। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো না। চেয়ারম্যানের এই উদ্যোগে উৎসাহী হয়ে হাজার হাজার মানুষ স্বেচ্ছা শ্রমে বাঁধ রক্ষা সংগ্রামে নামে। শেষ পর্যন্ত হেরে যায় তারাও। কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, হাওরে ৯ হাজার ৪শ হেক্টর বোরো ফসল আবাদ হয়েছে। এবার বাম্পার ফলন হয়েছে হাওরে। হাওরের কিছু কিছু এলাকা এখনও তলিয়ে যায়নি। তবে দুদিনের মধ্যে তলিয়ে যাওয়ার শংকা রয়েছে। ইউপি চেয়ারম্যান কুরুনা সিন্দু তালুকদার জানান, ঠিকাদার পিআইসি ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ না করায় এই স্বপ্নের হাওরটি তলিয়ে যায়। অনেক পরিশ্রম করে বাঁধটি ঠিকাতে পারলামনা। জীবন যুদ্ধে হেরে গেলাম। কি করে বাঁচবে হাওর পাড়ের মানুষ। অংক মিলাতে পারছিনা। আব্দুল আহাদ জানান, আর এক সপ্তাহ সময় পেলেই ফসল ঘরে উঠত। এখন কি করি বুঝে উঠতে পারছিনা। কার কাছে সাহায্য চাইব। ওএমএসের চাউলের জন্য লাইনেও দাঁড়াতে পারবনা। এলাকা ছেড়ে পালানো ছাড়া পথ দেখছিনা। হারুন নামের এক কৃষক জানান, হাওরে ২০ কেদার জমি ছিল আমার। এ জমির ফসল দিয়েই সংসার চলত। চোখের সামনেই ফসল তলিয়ে গেল। কিছুই করার থাকলনা। বাঁচ্চা কাচ্চা নিয়ে কি করে চলব। লাইনে দাঁড়িয়ে চাল পেলেও টাকা পাব কোথায়? উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রসূন কুমার চক্রবর্তী জানান, ফসল তলিয়ে যাওয়ার খবর শুনে হাওরে গিয়েছি।

প্রসঙ্গত, গত ২৯ মার্চ থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ী ঢলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্মিত দুর্বল বাঁধ ভেঙ্গে একে একে তলিয়ে যায় সুনামগঞ্জের সবকটি হাওর। সর্বশেষ পাগনার হাওর ডুবিতে সুনামগঞ্জ এখন শতভাগ ফসলহানীর জেলা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ