ঢাকা, মঙ্গলবার 25 April 2017, ১২ বৈশাখ ১৪২৩, ২৭ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

হাওরের ক্ষয়ক্ষতি ও পানির বিষক্রিয়া নিরূপণে লুকোচুরি! 

স্টাফ রিপোর্টার : উজানের ঢলে সৃষ্ট অকাল বন্যা ও পানিতে বিষক্রিয়ায় ব্যাপক ফসলহানিসহ লাখ লাখ হাওরবাসী নিঃস্ব হলেও প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে লুকোচুরি চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করছেন। একই সাথে অভিযোগ, বিস্তীর্ণ হাওর এলাকার পানি বিষিয়ে মাছ, হাঁসসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণি মরে সাফ হলেও প্রতিবেশী ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্তবর্তী ওপেনপিট ইউরেনিয়াম খনিজনিত দূষণকে এড়িয়ে যাচ্ছেন সরকারি বিভিন্ন সংস্থা-প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানী, কর্মকর্তারা। 

গত কয়েকদিনের এ অভিযোগকে আরো শক্ত ভিত দিয়েছে হাওর অঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতিবাচক অবস্থানকে। প্রধানমন্ত্রী গতকাল সোমবার সচিবালয়ে নিয়মিত মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকের এক অনির্ধারিত আলোচনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, হাওর অঞ্চলে ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান নিয়ে ‘প্রচার’ চলছে। 

ধান পাকার আগেই তলিয়ে গেছে ফসল এবং এতে বিপুল জনগোষ্ঠী অর্থৈনৈতিক অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছে। এই বন্যায় বিশেষ করে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণার হাওর অধ্যুষিত হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, মৌলবীবাজার, ও সিলেট জেলাতেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পানিতে বিষক্রিয়ায় মরে গেছে শত শত টন মাছ। অভ্যাহতভাবে মরছে হাঁস-মুরগীসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণি। 

এর আগে গত রোববার সচিবালয়ে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা শেষে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মাকসুদুল হাসান খান বলেন, হাওরে বন্যায় ৪১ কোটি টাকার মোট এক হাজার ২৭৬ মেট্রিক টন মাছ নষ্ট হয়েছে এবং তিন হাজার ৮৪৪টি হাঁস মারা গেছে। একই সাংবাদিক সম্মেলনে কৃষি সচিব মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ্ বলেন, বন্যায় দুই লাখ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। 

প্রধানমন্ত্রী ক্ষোভের সাথে জানতে চান, ক্ষতির এই তথ্য কীভাবে নির্ধারণ হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে অংশ নেয়া একজন মন্ত্রী বলেন, “প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আপনারা বলছেন হাওরে বন্যায় এত মাছ মরেছে, এত ধান নষ্ট হয়েছে। কিন্তু এই পরিমাণ কে মেপেছে? কীসের ভিত্তিতে এ ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হল?’। ”

 হাওর অঞ্চলে মে মাসের দিকে উজানের ঢলে বন্যা হলেও এবার পানি এসেছে অনেক আগে। আর চলতি বছর যে পরিমাণ পানি এসেছে, এর আগে তা কখনও দেখা যায়নি বলে মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে জানিয়েছেন পানিসম্পদ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। আগাম বন্যা হওয়ায় হাওরের ধানের প্রায় সব ধ্বংস হয়ে গেছে। 

অবশ্য প্রধানমন্ত্রী অকাল বন্যায় ফসল হারানো হাওর অঞ্চলে পর্যাপ্ত ত্রাণ পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। ত্রাণ পাঠানোর পাশাপাশি বিতরণেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করারও তাগিদ দিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর কড়া নির্দেশ রয়েছে একজন মানুষও যেন না খেয়ে কষ্ট না পায়। বন্যা উপদ্রুত এলাকায় ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি আদায় বন্ধ করতে এর আগে নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। 

এদিকে রোববার ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, হাওর অঞ্চলের তিন লাখ ৩০ হাজার পরিবারকে মাসে ৩০ কেজি চাল ও ৫০০ করে টাকা দেবে সরকার। আগামী ১০০ দিন বিনামূল্যে ৩৩ থেকে ৩৫ হাজার টন চাল ও নগদ ৫০০ কোটি টাকা হাওরবাসীদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। সভার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া সাংবাদিকদের বলেন, ছয় জেলার ক্ষতিগ্রস্ত তিন লাখ ৩০ হাজার পরিবারকে আগামী ৩১শে জুলাই পর্যন্ত সরকারের ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় মাসে ৩০ কেজি করে চাল এবং ডাল, তেল, নুন কিনতে ৫০০ টাকা করে দেয়া হবে। এছাড়া এসব জেলার ক্ষতিগ্রস্ত আরো (যারা রিলিফ নেবেন না) ১ লাখ ৭১ হাজার ৭১৫ পরিবারকে ওএমএসের মাধ্যমে ১৫ টাকা কেজি দরে চাল এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ১০ টাকা কেজিতে চাল দেয়া হবে। ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী বলেন, ছয় জেলার মধ্যে চার জেলার (সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, সিলেট ও নেত্রকোনা) কৃষকদের সর্বহারা বলা যেতে পারে। তারা বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু আগাম বন্যায় ধান ধ্বংস হয়ে গেছে। মায়া আরো জানান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিবকে সদস্য করে গঠিত কমিটিকে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি দেখে কী করণীয় সে বিষয়ে কমিটিকে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, সুনাগঞ্জে প্রায় ৮০ থেকে ৮৬ ভাগ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে যেসব ক্রটি ছিল বিভিন্ন মন্ত্রণালয় তা চিহ্নিত করে সেসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করছে। এটা কীভাবে উৎরে ওঠা যায় সেই ব্যবস্থা তারা নিচ্ছে। 

আমি তাদের অনুরোধ করব- সকল ভুলভ্রান্তি ভুলে গিয়ে মানুষের সেবার এগিয়ে আসেন। হাওর এলাকাকে ‘দুর্গত অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণার মতো পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। হাওরের পানিতে পিএইচের স্বাভাবিক মাত্রা ৬ দশমিক ৫ থেকে ৯ জানিয়ে মৎস ও প্রাণিসম্পদ সচিব মাকসুদুল হাসান খান সাংবাদিকদের বলেন, গত ১৬ থেকে ১৮ই এপ্রিল পিএইচ-এর মাত্রা ছিল ৫ বা তার নিচে। অক্সিজেনের মাত্রা ছিল দশমিক ০২, অ্যামোনিয়ার মাত্রা ছিল দশমিক ০২ এর নিচে। এর ফলে প্রাথমিক গবেষণার যে ফল দেখা যায়- মূলত ফসল পচে গেছে, তাছাড়া কিছু কীটনাশক থাকতে পারে যার ফলে মাছ মারা যায়, এছাড়া আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি। 

সুনামগঞ্জের হাওরে মাছ এবং জলজ প্রাণীর মড়ক লাগার ঘটনায় তেজস্ক্রিয়তার কোনো প্রভাব আছে কিনা তা পরীক্ষা করে বাংলাদেশ আনবিক শক্তি কমিশনের তিন সদস্যের প্রতিনিধিদল। প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ড. দীলিপ কুমার সাহা। অন্য দুই সদস্য হলেন ড. বিলকিস আরা বেগম এবং কমিশনের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. দেবাশীস পাল। পর্যবেক্ষণের প্রাথমিক ফলাফলের কথা জানিয়ে ড. দিলীপ কুমার সাহা বলেন, “আপনারা যেটা আশঙ্কা করছিলেন, যে এখানে ইউরেনিয়াম বা তেজস্ক্রিয় কোনো পদার্থের ইফেক্টের জন্য এই মাছগুলো মারা গেছে। আমরা রেডিও অ্যাকটিভি পরিমাপের যে মিটার, সেটা নিয়া আসছি। আমরা খুব ক্লোজলি, পানি ও কচুরিপানার খুব কাছ থেকে সেই সার্ভে মিটার দিয়ে রেডিও অ্যাকটিভিটি পরিমাপের চেষ্টা করেছি। তাতে আমরা যেটা দেখেছি, বাংলাদেশের নরমাল যে ব্যাকগ্রাউন্ড লেবেল, রেডিও অ্যাকটিভিটির মিনিমাম যে ব্যাকগ্রাউন্ড থাকার কথা, তার থেকেও অনেক পরিমাণের লেবেল এখানে পাওয়া গেছে। এর অর্থ হলো, এখানে কোনোভাবেই ইউরেনিয়াম বা অন্য কোনো রেডিও অ্যাকটিভির জন্য এখানে মাছগুলো মরে নাই। যেটা পেপারে আসছে বা আরো অন্য সংগঠন পরীক্ষা করে বলছে এখানে সার ব্যবহার করা হয় ধানচাষের জন্য বা কীটনাশক দেয়া হয়। এগুলো পানির সঙ্গে বিক্রিয়া করে হয়তো অ্যামোনিয়া গ্যাস তৈরি করছে, যার ফলে পানিতে অ্যামোনিয়া গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে গিয়ে হয়ত অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেছে। এ জন্য মাছগুলো মারা গেছে। ” তিনি বলেন, “পরিবেশে স্বাভাবিকভাবে ০.২০ মাত্রার তেজস্ক্রিয়তা থাকে। সেক্ষেত্রে হাওরে রয়েছে ০.১০, যা প্রায় অর্ধেক। "

হাওরের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে যথেষ্ট পরিমাণের নমুনা, যেমন- পানি, মরা মাছ, মরা হাঁস, কচুরিপানা, সেডিমেন্টের নমুনা অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংগ্রহ করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব নমুনা আরো কয়েক জায়গায় পাঠানো হবে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদলের প্রধান অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানও বলেছেন, 'এখনো পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কম আছে। তবে বৃষ্টি হওয়ায় অ্যামোনিয়া গ্যাসের পরিমাণ কমেছে। পানি শোধন করতে শুধু কিছু হাওরে চুন বা জিওলাইট ছিটালেই হবে না। এভাবে সম্ভবও নয়। এটা প্রাকৃতিকভাবে হতে হবে। সে জন্য সময় লাগবে। ’ পানিতে দূষণের মাত্রা পরীক্ষা সম্পর্কে মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আমরা পানি পরীক্ষা করে দেখেছি, হাওরে তলিয়ে যাওয়া ধানগাছ পচে এবং জমিতে ব্যবহার করা কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের মিশ্রণে পানি দূষণ হয়েছে। ইউরেনিয়ামের কারণে পানি দূষণ হয়েছে, এমনটা আমরা পাইনি। 

বৈজ্ঞানিক সূত্রগুলো বলছে, ১৭৮৯ সালে বিজ্ঞানী মার্টিন হাইনরিখ ক্ল্যাপরথ ইউরেনিয়াম আবিষ্কার করেন, আর ১৮৯৬ বিজ্ঞানী হেনরি বেকেরেল এর তেজষ্ক্রিয়তা আবিষ্কার করেন। ইউরেনিয়াম খুবই দামি একটু ধাতু। নেপচুনিয়াম আবিষ্কারের আগে ইউরেনিয়ামই ছিল সবচেয়ে ভারি মৌল। সোনালী সাদা বর্নের এই ধাতুটি পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর ক্ষেত্রে একটি অপরিহার্য উপাদান। সে কারণেই এর বহন ও ব্যবসা বাণিজ্য সর্বসাধারণের জন্য নিষিদ্ধ। ইউরেনিয়াম সম্বন্ধে সাধারণ মানুষের তেমন আগ্রহ বা ধারণা না থাকলেও পারমাণবিক বিষ্ফোরণ ও এর ভয়াবহতা সম্পর্কে অনেকটাই জানা আছে সবার। একসময়ের চেরনোবিল আর সম্প্রতিকালে ফুকুসিমার বিষ্ফোরণে তেজষ্ক্রীয় পদার্থ এবং এর ভয়াবহতা নিয়ে কিছুটা হলেও জেনেছে মানুষ। 

ওপেন পীট পদ্ধতিতে ভারতের রানিকোর এলাকাতে ইউরেনিয়াম উত্তোলন করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে ওই এলাকা থেকে তেজষ্ক্রিয় জল বা ভারি পানি যে কোন পাহাড়ী অঞ্চলের ফাটলে জমা থাকতে পারে যা বৃষ্টি ও নদীর জল বাহিত হয়ে হাওর এলাকার মাছ, হাঁস সহ অন্যান্য জীবের মৃত্যুর কারণ। 

মেঘালয়ের রানীকোর এলাকার ইউরেনিয়াম খনির নিকটবর্তী নদী থেকে বরছড়া এলাকা দিয়ে রক্তি এবং আরেকটু পশ্চিমে জাদুকাটা নদী বাংলাদেশে ঢুকেছে। তাছাড়া বৃষ্টির সময় অজ¯্র পাহাড়ী ঝর্ণা ও ছড়া বেয়ে জল নেমে আসে টাঙ্গুয়াসহ আশেপাশের অন্যান্য হাওরগুলোতে। এখন দেখা যাচ্ছে একযোগে সব হাওরে ধান পঁচে গেছে, মাছ মরছে। 

অন্যদিকে, গত বুধবার রাতে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় সভায় অবজ্ঞার সুরে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহ কামাল বলেন, কিসের ‘দুর্গত এলাকা’? সুনামগঞ্জে একটি ছাগলও তো মারা যায়নি। তিনি সুনামগঞ্জকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবিতে আন্দোলনকারীদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনের কথা বলেছেন। এই আইনের ২২ ধারায় নাকি বলা হয়েছে, কোন এলাকার অর্ধেকের উপরে জনসংখ্যা মরে যাওয়ার পর ওই এলাকাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করতে হয়। 

পর্যবেক্ষকমহল ত্রাণ সচিবের এ বক্তব্যের কড়া সমালোচনা বলেন, সচিব মহোদয় এটা কোথায় পেয়েছেন? দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনের ২২ ধারায় যা বলা আছে, “(১) রাষ্ট্রপতি, স্বীয় বিবেচনায় বা ক্ষেত্রমত, উপ-ধারা (৩) এর অধীন সুপারিশ প্রাপ্তির পর, যদি এই মর্মে সন্তুষ্ট হন যে, দেশের কোন অঞ্চলে দুর্যোগের কোন ঘটনা ঘটিয়াছে যাহা মোকাবেলায় অতিরিক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং অধিকতর ক্ষয়ক্ষতি ও বিপর্যয় রোধে বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করা জরুরি ও আবশ্যক, তাহা হইলে সরকারি গেজেটে বিজ্ঞপ্তি জারির মাধ্যমে, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলকে দুর্গত এলাকা হিসাবে ঘোষণা করিতে পারিবেন। 

(২) কোন অঞ্চলে সংঘটিত মারাত্মক ধরণের কোন দুর্যোগ মোকাবেলায় অতিরিক্ত ব্যবস্থা গ্রহণসহ উক্ত দুর্যোগের অধিকতর ক্ষয়ক্ষতি ও বিপর্যয় রোধে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি ও আবশ্যক হইলে স্থানীয় পর্যায়ের কোন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, গ্রুপ বা সংস্থা অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার নিমিত্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারের নিকট সুপারিশ পেশ করিতে পারিবে। 

(৩) উপ-ধারা (২) এর অধীন কোন সুপারিশ প্রাপ্ত হইলে জেলা প্রশাসক অনতিবিলম্বে বিষয়টির যথার্থতা যাচাইপূর্বক উহার মতামতসহ সংশ্লিষ্ট সুপারিশ সরকারের নিকট প্রেরণ করিবেন এবং সরকার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জাতীয় দুর্যোগ সাড়াদান সমন্বয় গ্রুপের সুপারিশ গ্রহণ করতঃ বিবেচ্য অঞ্চলকে দুর্গত এলকা ঘোষণার জন্য রাষ্ট্রপতির নিকট সুপারিশ পেশ করিতে পারিবে। 

(৪) এই ধারার অধীন দুর্গত এলাকা ঘোষণার বিজ্ঞপ্তি জারি করা হইলে উহার মেয়াদ অনধিক ২ (দুই) মাস পর্যন্ত বলবৎ থাকিবে যদি না উক্ত মেয়াদ অতিবাহিত হইবার পূর্বেই রাষ্ট্রপতি কর্তৃক উহা হ্রাস, বৃদ্ধি বা প্রত্যাহার করা হয়।” দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১২ এর ২২ ধারার কোনো উপধারায় দুর্গত এলাকা ঘোষণা করতে অর্ধেকের বেশি মানুষ মারা যাওয়ার কোনো শর্তের কথা উল্লেখ নাই। তবুও সচিব দুর্গত এলাকা ঘোষণা করতে হলে সুনামগঞ্জের অর্ধেক মানুষ মরতে হবে বলে অপমানজনক ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। 

এদিকে, বন্যার পর বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাওয়া বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলের বিপর্যয়কে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ ঘোষণা করে হাওরবাসীকে রক্ষায় দ্রত রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনে তারা হাওরের দুর্যোগ মোকাবিলায় নেয়া সরকারি-বেসরকারি প্রস্তুতিকে ‘অপ্রতুল’ বলে অভিযোগ করেছেন। 

‘হাওরের মহাবিপর্যয়ে উদ্বিগ্ন নাগরিকবৃন্দ’ ব্যানারে আয়োজিত উক্ত সাংবাদিক সম্মেলনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, তিন লাখ মানুষকে ৩০ কেজি করে চাল দেবে সরকার। কিন্তু আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ২৪ লাখ থেকে কমে তিন লাখ হলো কীভাবে। হাওরের বাঁধগুলো মেরামত ও নতুন করে নির্মাণে দুর্নীতির কারণেই ফসলহানি বলে অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতির এই অভিযোগ অনুসন্ধানেও নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। হাওরে বাঁধ নির্মাণে বিভিন্ন অনিয়ম এবং নকশাগত ত্রুটির কথাও বলেন সুলতানা কামাল। 

লেখক ও সাংবাদিক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণায় এত অনিচ্ছা কেন? সেখানে ২৪ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটা অনেক দেশের জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। এরপরও এটা জাতীয় দুর্যোগ না হলে কবে হবে? তিনি বলেন, এই দুর্যোগে হাওরের জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা সেইভাবে আমরা দেখছি না। আক্রান্ত এলাকায় ২৫-৩০ জন সংসদ সদস্য আছেন। কিন্তু এ পর্যন্ত ১০ জনও এলাকায় গিয়েছেন কি না আমরা সে খবর পাইনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ