ঢাকা, শনিবার 29 April 2017, ১৬ বৈশাখ ১৪২৩, ০২ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

আতঙ্কে ব্যবসায়ীরা ॥ প্রভাব পড়তে পারে প্রবৃদ্ধিতেও

 

এইচ এম আকতার : নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে চলছে কাউন্ট ডাউন। বাকি ৩২ দিন। দিন যতো ঘনিয়ে আসছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ততোই বাড়ছে। প্রতিটি সেবা খাতে ভ্যাট সংযুক্ত করায় দুর্বিষহ নাগরিক জীবন। নয়া ভ্যাট আইনে দুশ্চিন্তায় রয়েছে নাগরিকরাও। এই আইন বাস্তবায়নে বাড়বে প্রতিটি পণ্যমূল্য। তার সাথে বাড়বে মূল্যস্ফীতিও। নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে জিডিপির প্রবৃদ্ধি এবং নতুন বিনিয়োগেও। তবে সরকার বলছে জিডিপির প্রবৃদ্ধি আরও বাড়বে। 

মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) আইন ২০১২ বাস্তবায়ন হবে চলতি বছরের পহেলা জুলাই থেকে। এটি ২০১৬ সালের জুলাই থেকে বাস্তবায়ন হওয়ার কথা থাকলেও নানা জটিলতার কারণে সম্ভব হয়নি। এমনকি যারা ভ্যাট আইন প্রয়োগ করবেন তাদেরও এই আইনের অস্পষ্টতা নিয়ে সন্দেহ ছিল। জটিলতা ও অস্পষ্টতা দূরীকরণের লক্ষ্যে কমিটি গঠন কিংবা নানা বৈঠক হলেও কার্যত ফলপ্রসূ কিছুই হয়নি। ব্যবসায়ীদের দু’একটি সংগঠন বাদে অন্যরা ঢালাওভাবে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপের বিপক্ষে।

সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে এফবিসিসিআই যৌথ কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের দাবি ছাড়াও ভিন্ন ভিন্ন হার রেখে ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে। এর মধ্যে উৎপাদন খাতের জন্য ১০ শতাংশ এবং সেবা খাতের জন্য সর্বোচ্চ সাত শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব ছিলো।

প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী একজন দোকানদারকেও ঢালাও ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হবে। কিন্তু অনেক পণ্যেমূল্যে সংযোজিত হয় না। তাহলে কেন দোকানদার ১৫ শতাংশ ভ্যাট দেবে? এতে পণ্যমূল্যও বৃদ্ধি পাবে। অনেক পণ্যমূল্যে ভ্যাট সংযুক্ত রয়েছে। সেসব পণ্য বিক্রিতে নির্ধারিত মূল্যের উপর আবারও নতুন করে ভ্যাট দিতে হবে। কারণ দোকানিকে মোট বিক্রির উপরই মাস শেষে ভ্যাট দিতে হবে। এ পর্যায়ে পণ্যমূল্য ও ভ্যাট সংগ্রহ দোকানদারদের জন্য বড় বিড়ম্বনার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। উৎপাদন পর্যায় থেকে শুরু করে খুচরা পর্যন্ত দফায় দফায় ভ্যাট দিতে গিয়ে ক্রেতারাও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে। এতে স্থানীয় শিল্পের টিকে থাকাও কষ্টকর হবে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশীয় অনেক পণ্যের উপর ভ্যাট নেই। কিন্তু এখন বিক্রিত সব পণ্যের উপরই বিক্রেতাকে ভ্যাট দিতে হবে। তাহলে দেশীয় পণ্য কিভাবে ভ্যাট রেয়াতি সুবিধা পাবে। দেশীয় পণ্য যদি কর রেয়াতি সুবিধা না পায় তাহলে বিদেশী পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতায় কোনোভাবেই টিকে থাকতে পারবে না। এতে করে সংকটে পড়তে পারে দেশীয় উদ্যোক্তারা। নতুন করে আর কোনো উদ্যোক্তা বিনিয়োগে সাহস পাবে না। এতে করে বিনিয়োগ আরও স্থবির হয়ে পড়বে।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এ বিষয়ে কোনো সমঝোতায় নারাজ। তিনি ব্যবসায়ীদের তুলে ধরা আতঙ্ক, শিল্প খাতের ওপর এর সম্ভাব্য বিরূপ প্রভাব আমলে না নিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে বড় শিল্প মালিক সবার কাছ থেকে বাড়তি রাজস্ব আদায় করতে চান। এ অবস্থায় শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকেই একমাত্র ভরসা মানছেন ব্যবসায়ীরা। আগামী ১ জুন নতুন বাজেট ঘোষণায় ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে সহনীয় পর্যায়ে না নামালে শেখ হাসিনার কাছে যাবেন ব্যবসায়ীরা।

তবে ভ্যাটের ইতিবাচক দিক তুলে ধরে ইতোমধ্যেই নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোডর্ (এনবিআর)। তাদের এ প্রচারে যুক্ত করা হয়েছে সরকার দলীয় বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী নেতাকে। তারা বলছেন, নতুন ভ্যাট আইন অনেক ভালো। এতে হয়রানি অনেক কমবে। সাধারণ ব্যবসায়ীরা না বুঝেই এই আইনের বিরোধিতা করছে।

সাধারণ ক্রেতারা বলছেন, প্রতিটি পণ্য ক্রয়ে সরকারকে ভ্যাট দেয়া হচ্ছে। তার সাথে আবার নতুন করে খুচরা বিক্রি পর্যায়ে ভ্যাট যুক্ত হলে প্রতিটি পণ্যের মূল্য বেড়ে যাবে। এতে জনগণের ওপর করের বোঝা আরও বাড়বে। জনগণ প্রতিটি সেবাপণ্যে ভ্যাট দিয়ে থাকলেও নাগরিক কোনো ধরনের সুযোগ সুবিধা পায় না। আর একারণেই তারা আর ভ্যাটের বোঝা নিতে চায় না। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাড়িভাড়া থেকে শুরু করে প্রতিটি সেবার জন্যই প্রতি মাসে নাগরিকদের ভ্যাট দিতে হচ্ছে। এসবের বিনিময়ে কি সেবা তারা রাষ্ট্রের কাছ থেকে পেয়ে থাকেন। সেবা বঞ্চিত এসব নাগরিক নতুন করে আর ভ্যাট দিতে রাজি নয়। দোকানির বিক্রির ওপর ভ্যাট ধার্য্য করা হলেও মূলত জনগণের পকেট থেকে এ টাকা কেটে রাখা হবে।

বিভিন্ন দেশের অবস্থা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাংলাদেশ ১৫ শতাংশ হারে সব পণ্যে ভ্যাট বসালে এশিয়ার অগ্রসরমান ও দ্রত বর্ধনশীল বিভিন্ন দেশের তুলনায় চাপে পড়বেন শিল্প মালিক ও ভোক্তারা। এশিয়ার দুই বৃহৎ অর্থনীতির দেশ চীন ও ভারতে সর্বোচ্চ ভ্যাট ১৫ শতাংশের চেয়ে কম। চীনে বর্তমানে চার স্তরের ভ্যাট রয়েছে। এর মধ্যে খুচরা পণ্য, বিনোদনসাগ্রী, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ক্যাটারিং সার্ভিস, মোবাইল কল, পোস্টাল, ট্রান্সপোর্ট ও লজিস্টিকসের ওপর ১১ শতাংশ, আর্থিক ও বীমা সেবা, ইন্টারনেট ডাটা, তথ্য-প্রযুক্তি ও কনসাল্টিংয়ের ওপর ৬, জাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর ৩ এবং স্থানীয় শিক্ষার ওপর ২ শতাংশ ভ্যাট রয়েছে। ভারতে রাজ্য ও পণ্যভেদে ১২ দশমিক ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ভ্যাট আরোপ করে গত ১ এপ্রিল থেকে ‘ন্যাশনাল গুডস এন্ড সার্ভিসেস ট্যাক্স সিস্টেমস’ চালু হয়েছে। অর্থনীতিতে বাংলাদেশের প্রায় সমকক্ষ ভিয়েতনাম শুধু বিলাস পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আদায় করে। অন্যান্য বেশির ভাগ পণ্যে ভ্যাট ১০ শতাংশ। তবে খাদ্যপণ্য, পরিবহন, মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি, কৃষিপণ্য ও সেবা খাতের ওপর ভিয়েতনামে ভ্যাট ৫ শতাংশ। রফতানি পণ্য ও রফতানি সহযোগী পণ্য, কৃষি উপকরণ, সার ও প্রাণিখাদ্যের ওপর কোনো ভ্যাট বসায়নি দেশটি। এশিয়ার অগ্রসরমান অর্থনীতির দেশ সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডে ভ্যাট ৭ শতাংশ। মালয়েশিয়া ২০১৫ সালের ১ এপ্রিল থেকে ৬ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায় করছে।

সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করা হলে রাজস্ব আয় কতোা বাড়বে, সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও ভোক্তাপর্যায়ে এর কতোা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, সে বিষয়ে কোনো সমীক্ষা অর্থ মন্ত্রণালয় বা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) করেনি। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকেও এ ধরনের কোনো গবেষণা নেই। তবে দুই পক্ষই নিশ্চিত যে নতুন আইন প্রয়োগ করা হলে ভ্যাট আদায় বাড়বে, ভোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে। তবে এই চাপ সামগ্রিক অর্থনীতিতে কতোা প্রভাব ফেলবে সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা নেই কোনো পক্ষেরই।

অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআরের কর্মকর্তারা জানান, নতুন ভ্যাট আইন নিয়ে বিতর্ক চললেও সরকার এর বাস্তবায়ন থেকে সরে আসবে না। কারণ এর পরের অর্থবছরের সর্বোচ্চ ছয় মাস পরই নির্বাচন হবে। তাই এখনই এটি বাস্তবায়ন শুরু না করলে তা আর সম্ভব হবে না। তবে সরকার শুরু থেকেই আইনটি প্রয়োগে খুব বেশি কঠোর হবে না। কারণ নতুন আইনে উৎপাদন ও বিপণনের বিভিন্ন স্তরে ভ্যাট আরোপের কথা বলা হয়েছে। সঠিকভাবে ভ্যাট পরিশোধ করতে হলে বিভিন্ন স্তরের ক্রেতা-বিক্রেতাকে বেচা-বিক্রির হিসাব রাখতে হবে। সারা দেশের ব্যবসায়ীদের হিসাবে অভ্যস্ত করাসহ তাদের ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার ব্যবহারে বাধ্য করতে যে বেশ সময় লাগবে, সে ব্যাপারে সজাগ নীতিনির্ধারকরা। আগামী সংসদ নির্বাচনের পরে সরকার আইনটি কঠোরভাবে বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেবে।

এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ বলেন, প্যাকেজ ভ্যাট বহাল কিংবা টার্নওভার ট্যাক্সসীমা বাড়ানো আমাদের মূল লক্ষ্য নয়। এফবিসিসিআই চায় দেশের শিল্পের বিকাশ ঘটুক। এ জন্য দেশে উৎপাদিত শিল্পপণ্যের ওপরে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপের যে সিদ্ধান্ত রয়েছে, তা কমানোর দাবি আমাদের। এতো বেশি হারে ভ্যাট বসালে দেশী পণ্যের মূল্য বেড়ে যাবে। ফলে ক্রেতাদের চাহিদা কমবে। এতে শিল্পের ক্ষতি হবে। অন্যদিকে, সম্পূরক শুল্ক কমে যাবে। তাতে আমদানি পণ্যের দাম কমবে। এ অবস্থায় দেশী শিল্পের স্বার্থ রক্ষা ও ভোক্তার চাহিদা বাড়ানোর মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার কমানোর কোনো বিকল্প নেই। 

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, ১৫ শতাংশ ভ্যাট আদায় করা হলে পণ্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতি দুইই বাড়বে। ভোক্তাদের মধ্যে ব্যাপক বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে এবং এতে খুচরা বিতরণ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এখনি বিকল্প চিন্তা জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নতুন আইনে যে কোনো ব্যক্তি হিসাবপত্র সংরক্ষণ করলে তার পক্ষে রেয়াত নেয়ার সুযোগ রয়েছে। সেই হিসেবে কিছু ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট হবে না। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় পূর্ণাঙ্গ হিসাব রাখা সম্ভব হবে না। বিশেষত ছোট সরবরাহকারী বা ব্যবসায়ীদের পক্ষে তা সম্ভব নয়। ফলে তারা উপকরণ কর রেয়াত নিতে ব্যর্থ হবেন। এক্ষেত্রে তাদের ওপর বাড়তি ভ্যাট পড়বে। কিন্তু যারা বড় ব্যবসায়ী, তারা হিসাবপত্র রাখার কারণে উপকরণ কর রেয়াত নিতে পারবেন। এ কারণে উপকরণ কর রেয়াত নিতে ব্যর্থদের জন্য আলাদা ভ্যাটের হার নির্ধারণের পক্ষে মত দেন তারা।

নতুন আইনে ব্যবসা পর্যায়ে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত বার্ষিক বিক্রি (টার্নওভার) ভ্যাটমুক্ত। তবে এ জন্য হিসাবপত্র দেখাতে হবে। ৩০ লাখ টাকা থেকে ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভারের ওপর ৩ শতাংশ এবং ৮০ লাখ টাকার উপরে টার্নওভারে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট প্রযোজ্য। এসব সীমা আরো বাড়িয়ে দেওয়ার পক্ষে ব্যবসায়ীরা।

এদিকে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই ভ্যাট আইনের ৬৩ ধারার সংশোধন করে দোকান প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক টার্নওভারের ওপর শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ হারে মূসক ধার্য করার দাবি জানিয়েছে। সংগঠনের মতে, এতে ভোক্তাগণ সহজেই ভ্যাট পরিশোধে আগ্রহী হবেন এবং ব্যবসায়ীগণ তালিকাভুক্ত হয়ে আহরিত টার্নওভার কর পরিশোধ করতে উৎসাহী হবেন। ব্যবসায়ীদের পক্ষে বলা হয়েছে, উপকরণ কর রেয়াত গ্রহণের ক্ষেত্রে ভ্যাট আইনে প্রদত্ত টার্নওভার করের ওপর প্রদত্ত ভ্যাট রেয়াত গ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়নি। যেটা আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত ভ্যাট ক্রেডিট চেইন ব্যবস্থার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ