ঢাকা, শনিবার 29 April 2017, ১৬ বৈশাখ ১৪২৩, ০২ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিচার প্রার্থীদের প্রতি আরো মানবিক হওয়ার আহ্বান

ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণ দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা -ছবি : বাসস

বাসস : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিচার প্রার্থীদের প্রতি আরো মানবিক হতে এবং সেবার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে এসে তাদের ভোগান্তি লাঘবে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বিচারক ও আইনজীবীদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘শুধু আইন আর অবকাঠামো সুবিধা বৃদ্ধি করে বিচারপ্রার্থী মানুষের ভোগান্তি কমানো সম্ভব নয়। আমাদের বিচারক এবং আইনজীবীদের আরও মানবিক এবং জনগণের প্রতি সেবার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। ’

 শেখ হাসিনা গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস-২০১৭’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে একথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রের প্রধান তিনটি অঙ্গ- আইন, বিচার ও শাসনবিভাগকে একে অপরের সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে পরিচালিত হতে হবে। তা না করে এই অর্গানগুলো একে অপরকে দোষারোপ করতে থাকলে কোন রাষ্ট্রই সঠিকভাবে পরিচালিত হতে পারে না।

তিনি এ বিষয়টিতে সবাইকে সতর্ক থাকারও নির্দেশ দেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বস্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চাই।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এমন একটি সমাজ বিনির্মাণ করতে চাই, যেখানে ধনী-দরিদ্রের কোন বৈষম্য থাকবে না এবং জনগণ সংবিধানের মৌলিক অধিকারসমূহ ভোগ করে নিজেরা নিজেদের ভাগ্যোন্নয়ন ঘটাতে পারবেন।

 শেখ হাসিনা তৃণমূল পর্যায়ে সরকারি আইনি সহায়তা কার্যক্রমের বিস্তার ঘটিয়ে এটিকে একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু সালেহ শেখ মো. জহিরুল হক এবং জাতীয় আইনগণ সহায়তা সংস্থার ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অসহায়, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত বিচারপ্রার্থী জনগণের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ সুগম করার লক্ষ্যে আমরা ‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন -২০০০’ পাশ করি। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসে সরকারি আইন সহায়তা প্রদান কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।

তিনি বলেন, ২০০৯ সালে আমরা সরকার গঠন করে এই আইনকে গতিশীল করি। এ সংক্রান্ত আরও আইন ও বিধি প্রণয়ন করি। দুস্থ, অসহায় ও দরিদ্র বিচারপ্রার্থী জনগণ এর সুফল ভোগ করছেন। জনগণের অধিকার রক্ষায় আমরা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা করেছি।

বিচার বিভাগের উন্নয়নে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার বিকল্প নেই। বাংলাদেশে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠায় আওয়ামী লীগ সরকার সব সময়ই আন্তরিক।

 শেখ হাসিনা বলেন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে সংবিধানে সুবিচার ও সাম্যের বাণীকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে ঘোষণা করেন। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নে যথাযথ গুরুত্ব প্রদান করেন।

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু নিজে ভুক্তভোগী ছিলেন বলেই সকলের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য সংবিধানে মানবাধিকারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করেন।

সবকার প্রধান বলেন, বিনাদোষে এবং বিনাবিচারে বঙ্গবন্ধুকে বছরের পর বছর জেলখানার নির্জন সেলে একাকী বন্দী করে রাখা হয়েছিল। বিচারের নামে প্রহসনও হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ‘কারাগারের রোজনামচা’ পড়লে আমরা জানতে পারি কী দুঃসহ দুঃখকষ্ট তাকে সহ্য করতে হয়েছে।

সরকার প্রধান বলেন, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৭ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত ৮ বছরে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৩৯ জন নারী-পুরুষ শিশুসহ মোট ২ লক্ষ ৩১ হাজার ৬ শত ২৬ জন ব্যক্তিকে সরকারি খরচে আইনগত সহায়তা দেয়া হয়েছে। এছাড়া একই সময়ে সরকারি আইন সহায়তা কার্যক্রমের মোট ৪৬ হাজার ৫৪৬টি মামলা নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

তিনি বলেন, জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার মাধ্যমে বিগত ৮ বছরে সুপ্রীম কোর্টে মোট ১ হাজার ৬ শত ৯৩টি আপীল মামলা নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

মামলাজট নিরসন ও মামলার দীর্ঘসূত্রিতা দূর করতে তাঁর সরকার আইনি সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আদালতে বিচারাধীন মামলাসমূহ বিকল্প পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তির পাশাপাশি দেওয়ানী কার্যবিধি সংশোধন করা হয়েছে। ফৌজদারী কার্যবিধি সংশোধনের কাজ চলছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন,জ্বালানি সেক্টরে একজন জেলা জজ সহ সাত সদস্যের ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে এবং জ্বালানি সেক্টরের সকল বিরোধ প্রচলিত আদালতের পরিবর্তে এই ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, তাঁর সরকার বিচার বিভাগে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার চালু করেছে। এতে বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের অর্থায়নে অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ণ সিডনি ইউনিভার্সিটিতে ৫শ’৪০ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অধঃস্তন আদালতের দেড় হাজার বিচারকের উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য সম্প্রতি ভারতের ন্যাশনাল জুডিসিয়াল একাডেমির সঙ্গে দুটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।

 শেখ হাসিনা বলেন, প্রত্যেক চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে আইনগত সহায়তা প্রদানের জন্য ভিন্ন ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া, দাগী আসামীদের আদালতে আনা-নেয়ার পৃথক যানবাহন থাকবে এবং কারাগার থেকেই ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তাদের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করারও উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ