ঢাকা, শনিবার 29 April 2017, ১৬ বৈশাখ ১৪২৩, ০২ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

আজ ভয়াল ২৯ এপ্রিল

দৃশ্যটি ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল মহাপ্রলয়ংকারীর। ফাইল ছবির ইনসেটে জীবন্ত সাক্ষী ভূমি কর্মকর্তা আবুল মনসুর

শাহজালাল শাহেদ, চকরিয়া : আজ ভয়াল ২৯ এপ্রিল। গা আঁতকে উঠে এখনও। শিউরে উঠে লোমগুলো। এইদিনে শোকাতুর মানুষগুলো স্বজন হারানোর বেদনায় ডুকরে কাঁদে আর চোখের জলে বুক ভাসায়। সেই জলে ভেসে যায়নি লালন করা বেদনাগুলো। দুঃসহ স্মৃতি বয়ে ২৬টি বছর পার হলেও হৃদয়ের ক্যানভাসে আঁচড়ে পড়া দাগ কাটেনি উপকূলবাসীর। আর উপকূলীয় জনপদের দাগ না কাটা এমনই এক জীবন্ত সাক্ষী বিচ্ছিন্ন দ্বীপ কুতুবদিয়ার বাসিন্দা ভূমি কর্মকর্তা (তহশীলদার) মোহাম্মদ আবুল মনসুর। সেদিন তিনি আগুনের শিখা দেখেছিলেন বাতাসের সাথে। মানুষের উঠান ভিটের সীমানা চিহ্ন মুছে পরিণত হয়েছিল মহাপ্রলয়ংকর। প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে পরোক্ষভাবে অনুভব করেছিলেন কতো ভয়াবহ হয়েছিল প্রলয়ংকরী ঘুর্ণিঝড়। তার মতে, ৫ মিনিটের যাতায়াত হয়েছিল সেদিন ৪৫ মিনিটেরও বেশি। তার দেয়া সাক্ষাতকারটি গণমাধ্যমে হুবুহু তুলে ধরা হলো। তিনি জানান- আজ থেকে ২৫ বছর আগের কথা। এমন হৃদয় বিদারক দুঃসহ স্মৃতি ভুলবার নয়। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল (আজ) রাতে প্রলয়ংকরী ঘুর্ণিঝড় নিঃস্ব করে দেয় উপকূলীয় অঞ্চল কুতুবদিয়া, বাঁশখালী, মহেশখালীর ধলঘাট, মাতারবাড়ীসহ আরও অনেক উপকূলীয় এলাকা। ওই সময় আমি ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। স্কুলে যাই সেদিন; হঠাৎ সকাল ১১টায় শিক্ষকগণ স্কুলের সকল ছাত্র-ছাত্রীদের হল রুমে ডেকে জানান, ৯নং মহবিপদ সংকেত দেয়া হয়েছে, যে কোন সময় ঘুর্ণিঝড় উপকূলীয় এলাকায় আঘাত আনতে পারে, তাই আজ ক্লাস হবে না। স্কুল ছুটি হয়ে গেল, বাড়ি চলে গেলাম। আছরের নামাযের পরপর গুড়িগুড়ি বৃষ্টি শুরু হলো, নেমে এলো চারদিকে অন্ধকার। তখন ১০নং মহাবিপদ সংকেত। ভয় পেলাম না, কারণ অতীতে ওই রকম বিপদ-মহাবিপদ সংকেত বহুবার শুনেছি-দেখেছি। যাই হোক, সন্ধ্যা নামার পর আব্বা বাড়ির সবাইকে (আমার দাদা, দাদী, চাচা, চাচী সকলে মিলে যৌথ পরিবার) বললেন, সকলে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাও; তাড়াতাড়ি রাতের খাবার খেয়ে চলে যাচ্ছিলাম গ্রামের বাড়ি থেকে ১ কিলোমিটার দূরে কুতুবদিয়া স্টেশনে। হঠাৎ অর্ধেক যেতে না যেতে উত্তর-পূর্ব দিক থেকে বাতাস শুরু হলো; গাছের ঢালপালা ভেংগে পড়তে লাগল রাস্তার ওপর! ভয়ে ভয়ে একে অপরকে সাহায্য করে চলতে লাগলাম। ততক্ষণে চারদিকে শুধু মানুষ আর মানুষ ঘরবাড়ি ফেলে নিরপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটে যাচ্ছে স্টেশনের দিকে। ৫ মিনিটের পথে কেটে গেল ৪৫ মিনিটের মতো। কোন রকম পৌঁছলাম স্টেশনের দোতলা একটি ভবনে। খুব জোরে বাতাস বইতেছিল। রাত ১১টার সময় বাতাসের দিক পরিবর্তন হয়ে পূর্ব-দক্ষিণ দিকে থেকে বইতে লাগল। তখন বাতাসের গতি দ্রুত বাড়তে লাগল, রাত ১২.১৫ টার দিকে হঠাৎ বাতাসের গতির দিক পরিবর্তন হয়ে যখন দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে মোড় নেয়, তখন বাতাসের সাথে আগুনের শিখা আসতে লাগলো। আর চতুর্দিকে শুধু হাহাকার আর চিৎকার; পানি..! পানি..! শুনতে শুনতে দেখি চারদিকে শুধু পানি আর পানি! ততক্ষণে সবকিছু ল-ভ- হয়ে যায়, ভেসে যায় লক্ষ লক্ষ মানুষ, গরু, ছাগল। পানিতে বিলীন হয়ে যায় অনেক গৃহপালিত পশু এবং মানুষের ঘর-বাড়ি। ততক্ষণে নষ্ট হয়ে যায় মানুষের তিলে তিলে গড়ে উঠা স্বপ্ন। ভোরের আলো যখন ফুটতে লাগলো ততক্ষণে পানি নেমে গেলো। আশ্রয়স্থান থেকে নেমে দেখি গাছপালা, ঘরবাড়ি ভেঙ্গে চতুর্দিক যেনো একটি বিরান মাঠ। সোজাকথা মাঠের মতই লেগেছিল। ১২.১৫টা থেকে ভোর ৪.৩০টা পর্যন্ত সময়ের মাঝে মারা যায় লক্ষ লক্ষ মানুষ। অনেকেই লাশ খুঁজে পাননি। আমার নানী, খালা, খালাত বোন, খালাত ভাই ভেসে যায়। কিন্তু লাশ পাওয়া যায় মাত্র আমার খালার। প্রতিটি পরিবারেই একই অবস্থা। 

প্রলয়ংকরী ঘুর্ণিঝড়ের জীবন্ত সাক্ষী ভূমি কর্মকর্তা আবুল মনসুর বলেন, আজকের এইদিনে শোকার্ত অনেক মানুষ স্বজন হারানোর স্মৃতি মনে করে নীরবে কাঁদছে-কাঁদবে। গ- না বেয়ে আসা পর্যন্ত গড়াবে চোখের অশ্রু। তারপরও মানুষ বাস করে এসব জায়গায়; কারণ বাঁচতে হবে সংগ্রাম করে। 

তাই উপকূলবাসীর একটাই আবেদন, যে করেই হোক সরকারের সহযোগিতায় সংশ্লিষ্ট মহল চতুরপাশে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে উপকূলীয় এলাকা রক্ষায় এগিয়ে আসেন। এমনটাই প্রত্যাশা দুই যুগ ধরে স্মৃতি বয়ে বেড়ানো শোকাহত মানুষগুলোরও।

এদিকে দিবসটিকে কেন্দ্র করে উপকূলীয় জনপদের ঘূর্ণি আক্রান্ত বাসিন্দারা বিভিন্ন ব্যানারে নানান কর্মসূচি পালন করবে বলে জানা গেছে। তৎমধ্যে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, এতিমদের মাঝে খাবার বিতরণ ও স্মৃতিচারণমূলক আলোচনা সভা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ