ঢাকা, শনিবার 29 April 2017, ১৬ বৈশাখ ১৪২৩, ০২ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

দেশের প্রথম সর্ববৃহৎ নৌযান মেরামত কারখানা বাস্তবায়নে শঙ্কা

 

খুলনা অফিস : দেশের প্রথম সর্ববৃহৎ নৌযান মেরামত কারখানা বাস্তবায়নে আশংকা দেয়া দিয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যবসা বান্ধব নগরীর কাস্টমঘাট এলাকাটি বেছে নেয়ায় গত সোমবার থেকে লাগাতার আন্দোলনে নেমেছেন খুলনার রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীসহ এলাকাবাসী। ফলে প্রকল্পটি ওই স্থানে বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি সরকারি বহু জমি অব্যহৃত অবস্থায় পড়ে আছে, সেইসব জমিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হোক। কাস্টমঘাট এলাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়বে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নগরীর কাস্টমঘাট এলাকায় দেশের সর্ববৃহৎ নৌ-যান মেরামত কারখানা নির্মাণ করতে যাচ্ছে সরকার। এর পাশেই নির্মাণ হবে নৌযান প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট। সরকারের যানবাহন অধিদপ্তর এটি নির্মাণ করবে। এজন্য নদীর পশ্চিম তীরের রকি ডকইয়ার্ড থেকে ৬০০ মিটার দৈর্ঘের প্রায় তিন একর জায়গা ৯৯ বছরের জন্য ইজারা দেয়া হয়েছে। গত ১৭ এপ্রিল এই ইজারা দলিলে স্বাক্ষর করেছেন খুলনার জেলা প্রশাসক নাজমুল আহসান ও যানবাহন অধিদপ্তরের পরিচালক মুনশী শাহাবুদ্দীন আহমেদ। ওই দিনই কাগজ-কলমে জমির দখল তাদের বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে।

খুলনা জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই নৌযান মেরামত কারখানা ও একটি আধুনিক নৌযান প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট নির্মাণের জন্য জায়গা খুঁজছিলো সরকার। গত বছর যানবাহন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা খুলনা সফরের আসলে কাস্টমঘাট এলাকায় সরকারি খাস জমিতে প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউটটি নির্মাণের প্রস্তাব দেন। জেলা প্রশাসন এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিলে ওই এলাকার ৩ একর জায়গায় যানবাহন অধিদপ্তরের নামে বরাদ্দ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়। গত ৩০ নবেম্বর ভূমি মন্ত্রণালয় অকৃষি খাস জমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা মোতাবেক কেন্দ্রীয় কারখানা নির্মাণের লক্ষ্যে সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের অনুকূলে বরাদ্দ দেয়।

কাঠ ব্যবসায়ী মো. ইউসুফ আলী বলেন, খুলনার ব্যবসায়ীরা এক সময়ে আতঙ্কের মধ্যে ব্যবসা করেছে। নগরীর শীর্ষ সন্ত্রাসী কুখ্যাত এরশাদ শিকদারের সন্ত্রাসের কারণে, ৪, ৫ ও ৬নং ঘাটের ব্যবসায়ীরা যশোরের নওয়াপাড়া ও কাস্টমঘাট এলাকায় তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছেন। এখন যদি এসব ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করা হয় তাহলে ব্যবসায়ীদের আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না। তিনি আরো বলেন, ভৈরব নদীর পাড়ে অবস্থিত টুটপাড়া মৌজার এই জমির দাম রয়েছে ৫৭ কোটি ৩২ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। কিন্তু মাত্র এক লাখ এক হাজার টাকা প্রতীকি মূল্যে সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের অনুকূলে এই দলিল হস্তান্তর করা হয়েছে। ওই দলিল বাতিল করে ব্যবসায়ীদের অনুকূলে এই জমি ৯৯ বছরের জন্য বরাদ্দ দিলে আমরা ৫৭ কোটি ৩২ লাখ ৭৩ হাজার টাকা দিতে রাজী আছি। এই টাকা সরকার অন্য কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় করতে পারবে। আমরাও শঙ্কামুক্ত হয়ে নির্বিঘেœ ব্যবসা করতে পারবো।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, নগরীর টুটপাড়া মৌজার এই জমির বাজার দাম রয়েছে ৫৭ কোটি ৩২ লাখ ৭৩ হাজার টাকা কিন্তু মাত্র এক লাখ এক হাজার টাকা প্রতীকি মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সংসদ সদস্য মুহাম্মদ মিজানুর রহমান মিজান বলেন, ৩০/৪০ বছর ধরে ওই জায়গায় অনেক গৃহহীন মানুষ আবাদ করেছেন। তারা সেখানে নিজেদের বসবাস যোগ্য করে করে পরিবার পরিজন নিয়ে থাকছেন। তাদের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাসহ নানা শ্রেণি পেশার মানুষ রয়েছেন। আর এই প্রজেক্ট করার মতো উত্তম স্থান এটা নয়। রূপসা ব্রিজের পর থেকে নদীর এপার ওপার অনেক বড় বড় ফাঁকা সরকারি জায়গা পড়ে আছে। সেখান থেকে একটি ভালো স্থান এ প্রজেক্টের জন্য উত্তম জায়গা হবে বলেও মত দেন তিনি। তিনি আরও জানান, এ বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসকের সাথে কথা বলেছি, যাতে শহরের ব্যস্ততম এ স্থানে নৌযান মেরামত কারখানা ও নৌযান প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট নির্মাণ করা না হয় সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য। 

এ ব্যাপারে পরিবহন কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) মুনশী শাহাবুদ্দীন আহমেদ বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মোতাবেক এখানে একটি আধুনিক নৌযান মেরামত কারখানা এবং অত্যাধুনিক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মতো একটি ভালো কাজের শুভ সূচনা হলো। অচিরেই এটির নির্মাণ কাজ শুরু হবে।

এদিকে গত সোমবার নগরীর কাস্টমঘাট এলাকায় মানববন্ধন কর্মসূচি, মঙ্গলবার জেলা প্রশাসক’র মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছেন এলাকাবাসীসহ ব্যবসায়ীরা। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় খুলনা জেলা পরিষদ প্রশাসকের অফিস কক্ষে জেলা পরিষদ প্রশাসক শেখ হারুনুর রশীদের সাথে মতবিনিময় সভা করেছেন কাস্টমঘাট ব্যবসায়ীবৃন্দ ও কাস্টমঘাটবাসী। 

এ সময় ব্যবসায়ীরা বলেন, দীর্ঘ ৫০ বছরের অধিককাল ধরে কাস্টমঘাট এলাকায় গড়ে উঠেছে বৃহৎ ব্যবসায়িক কেন্দ্র। ব্যবসাবান্ধব হিসেবে পরিচিত লাভ করেছে গোটা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। এ এলাকার ব্যবসায়ীরা সরকারের নিকট থেকে নদীর তীরবর্তী খাদা-খন্দকে ভরা অসমতল এবং ব্যবসার অনুপযোগী খাস জমি একসনা বন্দোবস্তো নিয়ে বহু কষ্ট ও অর্থের বিনিময়ে জমিকে উন্নত করে ব্যবসার উপযুক্ত করে গড়ে তুলেছে। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইট, বালু, সিমেন্ট, পাথর, কয়লা, কাঠসহ বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। এই বৃহৎ ব্যবসায়িক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে ৩০ হাজার লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য করে পরিবার পরিজনের ভরণ-পোষণ করছেন। এসব ব্যবসায়ীদের লাখ লাখ টাকা লগ্নি রয়েছে। বাকী পাওনা রয়েছে লাখ লাখ টাকা। ব্যাংক ঋণ নিয়ে তারা ব্যবসা করছেন। কিন্তু ওই প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে এসব ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করা হলে তারা সর্বশান্ত হয়ে পড়বে। লগ্নিকৃত অর্থ আদায় ও ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে পারবে না। পাশাপাশি এই বৃহৎ ব্যবসায়িক অঞ্চলটি হারিয়ে যাবে। এই বৃহৎ ব্যবসায়িক অঞ্চলটি ধ্বংস না করে অন্য সুবিধাজনক স্থানে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার দাবি জানান।

ব্যবসায়ীদের কথা শুনে জেলা পরিষদ প্রশাসক শেখ হারুনুর রশীদ বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কথা বলবেন বলে আশস্ত করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক এম ডি এ বাবুল রানা, ২২নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুস সাত্তার খলিফা, ২২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. মাহবুব কায়সার, বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শহীদুল ইসলাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ওহিদুজ্জামান, খুলনা জেলা সমবায় ইউনিয়নের সভাপতি ইয়াকুব আলী খান পলাশ, সাবেক কাউন্সিলর কণিকা সাহা, ব্যবসায়ী ইউসুফ আলী খান, কাজল ইসলাম, আব্দুল হালিম, সেলিম ভূইয়া, আবুল কালাম, মিন্টু হালদার, দুলাল মল্লিক প্রমুখ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ