ঢাকা, শনিবার 29 April 2017, ১৬ বৈশাখ ১৪২৩, ০২ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

একটি ছবি ও আঁখিজলে ভাসি

মুহাম্মদ আবদুল বাসেত : “ক্যামেরা ছুঁড়ে ফেলে শিশুর জীবন রক্ষা” শিরোনামে একটি জাতীয় দৈনিকের রিপোর্ট অঝোরে কাঁদিয়েছে আমাকে। মনে হচ্ছে অসংখ্য পাঠককেও আঁখিজলে ভাসিয়েছে রিপোর্টসংশ্লিষ্ট ছবিটি। পত্রিকার রিপোর্টটি এমন, সিরিয়ার আলেপ্পো শহরের পশ্চিমে বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত রাশিদিন এলাকার একটি তল্লাশি চৌকিতে অপেক্ষা করছিল কয়েকটি বাসের বহর। দেশটির অবরুদ্ধ শহরগুলো থেকে সরিয়ে নেয়া হচ্ছিল বাসিন্দাদের। এমন সময় বিস্ফোরকভর্তি একটি গাড়ি থেকে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ১২৬ জন প্রাণ হারায়, যার মধ্যে ৬৮টি শিশু ছিল। ঘটনাস্থলে পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলেন সিরিয়ার ফটো সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী আবদ আলকাদর হাবাক। বিস্ফোরণের নৃশংসতার দৃশ্য দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন তিনি। তখন তার চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন হতাহত ব্যক্তি। আগুন আর চিৎকার। এই হত্যাযজ্ঞ দেখে হাবাক তার ক্যামেরা ফেলে ছুটে যান আহত ব্যক্তিদের সহায়তায়। ছয়-সাত বছরের একটি শিশুকে উদ্ধার করে এ্যাম্বুল্যান্সের দিকে ছোটেন তিনি। পরিস্থিতি এমন একজন ফটো সাংবাদিক আগে ছবি তুলবেন, নাকি দুর্গতকে সহায়তা করবেন? হাবাক বেছে নেন মানবিকতা। হাবাক একটি শিশুকে উদ্ধার করে এ্যাম্বুলেন্সে দিয়ে আবার ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন আরেক শিশুকে বাঁচাতে। কিন্তু এসে দেখেন শিশুটি ততক্ষণে পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। তাকে বাঁচাতে না পেরে পাশেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন হাবাক।
সিরিয়ায় ঐ দিনের ঘটনার দৃশ্য ছিল এমন- প্রথম যে শিশুর কাছে হাবাক এগিয়ে গেলেন, সে তখন প্রায় আধমরা, এরপর তিনি দৌড় দেন আরেক জনের কাছে। কেউ একজন চিৎকার করে তাকে বলছিল, দূরে থাকো সেও মরে গেছে। কিন্তু হাবাক নিজে পরখ করে দেখতে চাইলেন, এগিয়ে গেলেন শিশুটির কাছে। শিশুটি কোনমতে শ্বাস নিচ্ছে। প্রাণ আছে। দ্রুত তিনি শিশুটিকে কোলে তুলে এ্যাম্বুল্যান্সের উদ্দেশ্যে ছোটেন, তখনো তার হাতে ঝোলানো সচল ক্যামেরা এই ধ্বংসযজ্ঞ রেকর্ড করে চলেছে।
এরকম ঘটনা বর্তমান বিশ্বে আর অপ্রতুল নয়। প্রতিনিয়তই খবরের শীর্ষে উঠে আসছে এরূপ হৃদয়বিদারক ঘটনা। প্রতিবেশি দেশ হিসেবে মিয়ানমারের সম্প্রতিককালের আরাকানের রোহিঙ্গা নিধনের সংবাদ ও ভিডিও ফুটেজগুলো বেশ অশ্রুসিক্ত করেছে ধর্ম ও শ্রেণিভেদে সকল মানুষকে। শুধু প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলোকে নয় বিশ্বের সকল প্রান্তের মানুষদের অনুভূতিতে নাড়া দিয়েছে যা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার বিবৃতি ও প্রতিবাদে মুখে বুলি আওড়ানো ও ঘুমন্ত অনেক মানবতাবাদীকেও জাগ্রত করতে সহায়ক হয়েছে। সেনাবাহিনী কর্তৃক ভুলডোজার দিয়ে রোহিঙ্গাদের তাজা রক্তের দাগ মুছে ফেলা হলেও আরাকানের বাতাস এখনও পোড়া মানুষের গন্ধ বয়ে বেড়ায়। সত্য উৎঘাটনের নিরপেক্ষ চোখ ও অনুভূতির মন নিয়ে সম্প্রতি মানবাধিকার কর্মীরা আরাকানে ধ্বংস বিধ্বস্ত অঞ্চল সফর করে নির্যাতনের মাত্রা কিছুটা হলেও আঁচ করতে পেরেছেন।
কথায় আছে, ‘অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর’। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের নির্যাতন অত্যাচারের চিহ্নগুলো এতবেশি সীমা অতিক্রম করেছে যা শক্ত হৃদয়ের অধিকারী ব্যক্তিকেও অশ্রুসিক্ত করেছে। কিন্তু অশ্রুজলেরও একটা সীমাবদ্ধতা আছে। যে ঘটনাগুলোও এখন বিশ্ব মিডিয়ার দরবারে নিত্তনৈমিত্তিক খবরে পরিণত হয়েছে। তেমনি বিশ্ববাসীও সম্পৃক্ত অঞ্চলসমূহের কুচক্রীমহলের মামুলী কাজ হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। বড় উদ্বেগের বিষয়-সিরিয়া, ইরাক, লেবানন, মিয়ানমার, মিসর, আফগানিস্তান, কাশ্মির, ইয়ামেনসহ বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের কথাই বলি, সবগুলো মানবতা বিরোধী কর্ম যেন একই সূত্রে গাঁথা। এক দেশের রেশ না কাটতেই অন্য দেশে লেগেই আছে নির্যাতনের চিত্র। মনে হয় যেন- এ ঘটনাগুলোর কল-কব্জা কোনো এক গোষ্ঠীর হাতেই আবদ্ধ। আরো আশ্চর্যের বিষয় হলো লোমহর্ষক ঘটনাগুলো লেগেই আছে মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতেই।
চলছে আজ পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর অস্ত্রের ঝনঝনানি, পারমাণুবিক শক্তির প্রতিযোগিতা ও অহংকার। বেড়েছে ক্ষমতার দাপট ও রাজত্ব দীর্ঘায়িত করার রণকৌশল। এক রাষ্ট্রনেতা হুমকি দিচ্ছে অন্য নেতাকে, যে কোনো সময়ে উড়িয়ে দেয়া হতে পারে তার রাষ্ট্রকে। আরে! এ কোন রণখেলা? যে খেলার বলি হয়েছিল হিরোশিমা নাগাসাকির লক্ষ লক্ষ নিরাপরাধ সাধারণ প্রাণ। তাহলে কি দোষে প্রাণ হারালো এ নিরীহ জনতা? যে ধ্বংসলীলার রেশ এখনও বহন করছে ঐ জনপদ। এমনকি ফসলি ভূমিগুলোও ফিরে পায়নি এখনও তাদের উর্বরতা শক্তি। যেখানে মুখ্য ক্ষমতালোভী রাষ্ট্রনেতাদের ক্ষমতার দাম্ভিকতাকে দীর্ঘায়িত করা ও নিজেদের স্বার্থকে রক্ষা করা। আসলে পৃথিবীর ইতিহাসও এটি স্বাক্ষ্য দেয় যে, নিরেট প্রজাসাধারণের স্বার্থে যুদ্ধ হয়েছে- এরকম যুদ্ধের সংখ্যা নগণ্য। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধসহ ছোটো-বড় অন্যান্য যুদ্ধগুলোও তাই প্রমাণ করে। এটি কেনো সাধারণ বিবেকে আসে না যে, স্রষ্টা পৃথিবীতে অগণিত সৃষ্টিরাজি সৃষ্টি করলেও মানবই হচ্ছে তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। মানবের সহায়তার জন্যই সৃষ্ট অন্যান্য সৃষ্টি। আর মানব জাতির কাজ হচ্ছে তারা পৃথিবী আবাদযোগ্য করবে, যাতে অন্যান্য সৃষ্টি সহজে বাস করতে পারে। তাহলে কোন যুক্তিতে গুটি কয়েকজনের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে প্রজাসাধারণ প্রাণ হারাবে? কেনো তৈরি হবে মানুষ, পশু-পাখী ও ফসলি ভূমি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেয়ার মরণঘাতী বিস্ফোরক? বিবেকের কত নি¤œ পর্যায়ে পৌঁছেছি আমরা, বিস্ফোরক উৎপাদনেও চলছে প্রকাশ্য প্রতিযোগিতা, পারমাণবিক তৈরিতে কোন দেশ কত অগ্রসর ও শক্তিশালী। যা এখন স্থান পাচ্ছে বিশ্ব খবরের প্রধান শিরোনামে। কৌতূহলী জনতা অনেকটাই গ্রহণ করেছে খেলার সংবাদের ন্যায়। আফ্সোসের বিষয়- অনেকেই আবার বাহ্বা দিচ্ছেন পারমাণবিক শক্তিশালী দেশগুলোকে। অন্যদিকে চুলচেড়া বিশ্লেষণে নেমেছেন অনগ্রসরমান দেশগুলোকে নিয়ে। অথচ যদি সাধারণভাবেও চিন্তা করি, বিশ্বের সকল মানুষ একই দেহ বা আত্মার ন্যায়। কিভাবে সম্ভব একই রক্ত-মাংসের মানুষ অন্য মানুষকে হত্যার মতো গর্হিত কাজ করা। কোন বিবেচনায় অঞ্চল দখলের নামে বোমা নিক্ষেপে এক রাষ্ট্রের নাগরিক অন্য রাষ্ট্রের নাগরিকদের ধ্বংস করে দিতে পারে। কবে হবে শেষ এ ধ্বংসলীলার প্রতিযোগিতা। প্রখ্যাত দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল অবশ্য অনুধাবন করতে পেরেছিলেন এর নেতিবাচক দিকটি। পারমাণবিক বোমা তৈরি ও বিশ্বযুদ্ধে বিরোধিতা করার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনার চাকরি থেকে বরখাস্ত ও কারাবরণও করতে হয়েছে তাঁকে। তার দর্শন ও প্রতিবাদই আজ প্রমাণিত পারমাণবিক আবিষ্কার ও এর ব্যবহার কতই না মানবতাহীন।
সা¤্রাজ্য বিজয়ের নামে ধ্বংসলীলা ও ক্ষমতা কুক্ষিগত করার নেশা ধ্বংস্তূপ থেকে রেহাই দেয় না যে জনপদের নারী পুরুষ এমনকি শিশুদেরকেও। শত্রু বা বিরোধী পক্ষকে লক্ষ্য করে বিমানে যত বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে,  বেশির ক্ষেত্রেই দেখা গেছে তা শত্রুর উপর আঘাত না হেনে, তার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশু ও নারীরা। যে হামলার পূর্বাপর সম্পর্কে তারা সম্যক ওয়াকিবহাল এবং অভিজ্ঞ। তাহলে ঐ সব অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করাও কি শিশুদের জন্য পাপ? জন্মের পর থেকেই যে গ্লানি পোহাতে হবে তাদেরকে।
বিশ্ব অর্থব্যবস্থার দিকে তাকালে বিষয়টি আরো স্পষ্ট- বিশ্বের অনক অঞ্চল এমনও রয়েছে যেখানে পেট ভরে ঠিকমতো খাবার গ্রহণের ব্যবস্থা নেই। সেখানে অনেক রাষ্ট্র মরণাস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক বোমাসহ বিস্ফোরকদ্রব্যে যে হারে বাজেট ও খরচ করছে তার সামান্য অংশ দিয়ে হলেও ঐ ক্ষুধিত-পীড়িতদের খাদ্য, চিকিৎসাসহ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও হয়ে যেতো। অথচ সে অস্ত্র ও বিস্ফোরক দ্রব্য ব্যবহৃত হচ্ছে ক্ষুধিত-পীড়িত ও অসহায় মানুষদের উপরই। আফ্রিকা মহাদেশের কিছু অঞ্চলসহ ধ্বংস-বিধ্বস্ত দেশ সমূহের শিশুদের ভিডিও ফুটেজ দেখলে মনে হয় যেনো এক একটি জীবিত কঙ্কাল। বিবেকের দরজায় বার বার প্রশ্ন উঁকি দেয়, বিশ্ব অর্থনীতির মানদ- তাহলে কিসের উপর প্রতিষ্ঠিত?
ক্ষমতা কুক্ষিগত করার শক্তি আর সন্ত্রাসী শক্তি যাই বলি- কোথায় তাদের শক্তির উৎস। তবে এটি সত্য, সংখ্যায় তারা নগণ্য। তাহলে বিশ্ববাসী কি মুষ্ঠিমেয় শক্তির কাছে জিম্মী হয়ে থাকবে? বিশ্বনেতাদের অন্তত একটি বিষয়ে জোর দেয়া উচিৎ- সাদা-কালো, ধর্ম-বর্ণ, অঞ্চলভেদে কোনো শিশু যেনো আর ধ্বংসস্তূপে পরিণত না হয় এবং ব্যবহৃত না হয় কোনো সাম্রাজ্য লোভীর যুদ্ধখেলার ক্রিড়নকে।
-লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ