ঢাকা, শনিবার 29 April 2017, ১৬ বৈশাখ ১৪২৩, ০২ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং মানবতার হাহাকার রাহাত হাসান আকাশ

- ইসলাম এমন একটি বিধান যা বুকে নিয়ে বয়ে  বেড়ায় শান্তির পয়গাম। যা মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত একমাত্র চলার পথ।
নিশ্চয়ই ইসলামই আল্লাহর নিকট একমাত্র মনোনীত জীবন ব্যবস্থা (সূরা ইমরান ১৯)
আর এই ইসলামই মানবজীবনে মুক্তি, শান্তি, সফলতার একমাত্র পন্থা। ইসলাম সঠিকভাবে বুঝার জন্য আল্লাহ হযরত আদম (আ). থেকে শুরু  করে রাসূলে করিম সা. পর্যন্ত ৮ জন রাসূল সহ অনেক নবী পাঠিয়েছেন। সকল নবী রাসূলের দাওয়াতের বিষয় একটিই ছিল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই)। আর ইসলামকে অনুসরণ করার জন্য ছোট বড় সর্বমোট ১০৪টি কিতাব নাযিল করেছেন যার মধ্যে আল-কোরআন সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ। আর এই কোরআন সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, “আমি এই কিতাবে কোনো কিছুই বাদ দেইনি।” আনআম : ৩৮ আর রাসূল (স) এর বাণী হলো,
যদি কেউ আল্লাহর বাণী কোরআন ও হাদীসকে অনুসরণ করে তাহলে কোনদিনও পথ ভ্রষ্ট হবে না। [ বিদায় হজ্জ]
রাসূল (স) এর অমীয় বাণীকে বুকে লালন করেই রাসূল (স) এর পরবর্তী ইসলামী খেলাফতের শাসকবৃন্দ ইসলামের এই প্রজ্জলিত আলোক শিখা পৌঁছিয়ে দিয়েছে সমগ্র বিশ্বে। রাসূল (স) যে খেলাফতের ভিত্তি মদিনাতে স্থাপন করেছিলেন তার পরবর্তী খলিফাগণ তা প্রসারিত করার লক্ষ্যে আপ্রাণ কাজ করেছেন। যার ফলশ্রæতিতে ফ্রান্সের পিরিনিজ পর্বতমালা থেকে  ইন্দোনেশিয়া যাকার্তায় কায়েম হয়েছিল এক প্রদীপ্ত সালতানাতের। খিলাফতে রাশিদার ৩০ বছর এবং তার পরের উসমানীর শাসনামলে এই আলো উজ্জ্বল করেছিল অর্ধজাহানব্যাপী। এ সময় যেমনিভাবে অনুশীলন হতো সঠিক ইসলামের তেমনি ভাবেই আলো জ্বলছিল দুনিয়াব্যাপি। সেই আলোর ধুমকেতু যেমনিভাবে ভারতবর্ষে এসেছিল মুহাম্মদ বিন কাশিমের হাত ধরে। তেমনিভাবেই স্পেনের আকাশে দেখা দিয়েছির  এমন একটি ক্ষেত্রের যার ছায়া সকলের নিকট পৌঁছে দিল সমভাবে। অন্ধকারাচ্ছন্ন স্পেনকে আলোর চাহনি দিল তারিক বিন যিয়াদের ইদ্দোম সাহসী এক ঘূর্ণীঝড়। যে ঝড় মিথ্যা কলুষিত স্পেনে এনেছিল আলোর সরল পথ।
স্পেনের সমৃদ্ধ ইতিহাস...
৭ম শতক ছিল দুনিয়ার বুকে এক নতুন সূর্যের উদয়ের সময়। পৃথিবী দেখেছিল এক নতুন শক্তিকে, যাদের নগন্য শক্তি পৃথিবীর বিশাল বিশাল ঝড়ের গতিপথ ঘুরিয়ে দিয়েছে। আল্লাহ ও তার রাসূলের বাণীকে সত্য প্রমাণিত করার জন্য নিজের জীবনকে তুচ্ছ মনে করে যারা অর্জন করেছিল অর্ধজাহানের খিলাফত। ৭ম শতকের প্রথম দিকেই দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়েছিল ইসলামের আলো। রোমান, ভারতবর্ষ, এশিয়া, তুর্কিস্থানসহ অর্ধজাহানে তখন চলছিল মুসলমানদের স্বর্ণালী ইতিহাস গড়ার সময়। ঠিক এমনই সময় স্পেনের ইতিহাস লেখা হচ্ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারায়। তৎকালে স্পেনের রাজা ছিল পথরিক রাজ রডরিক। সে খ্রিস্টান হলেও ইহুদীদের উপর আর ছিল খুব ক্ষোভ। স্পেনে তখন চলছিল জাতী প্রথার চরম রূপ। এ জাতী প্রথার শিকার ছিল ইহুদীরা। সমকালীন সময়ের প্রথা অনুসারে অভিজাত শ্রেণীর লোকেরা তাদের মেয়েদের আদব-কায়দা শিক্ষার জন্য তাদের রাজদরবারে পাঠাতেন। তখন কিউটার শাসনকর্তা ছিল কাউন্ট জুলিয়ান। সে ইহুদী হলেও সে ছিল রাজার একান্ত প্রিয়। সে তার মেয়ে ফ্লোরিন্ডাকে নিয়ম অনুযায়ী রাজদরবারে পাঠায়। তাকে শিক্ষা দেয়া তো দূরের কথা তার উপর চালালো পাশবিক মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। ফ্লোরিন্ডা তার খবর জানিয়ে চিঠি লিখলো তার বাবার কাছে। মেয়ের দূর্দশার কথা জানতে পেরে রাগে ছুটে গেলেন রাজদরবারে রাজাকে হত্যা করতে কিন্তু সে তা না করে সম্মানের সহিত তার মেয়েকে নিয়ে যাবার জন্য অনুমতি চাইলেন। রাজা মনে করেছিল সে এখানকার কোনখবর জানেনা। তাই রাজা ফ্লোরিন্ডাকে তার বাবার সাথে পাঠিয়েদিল। জুলিয়ানের অনেকগুলি পোষা ঈগল, যা রাজার খুব পছন্দের ছিল। তাই জুলিয়ানকে বিদায় দেবার সময় রাজা তাকে বলে সে যেন কিউটা পৌঁছে কিছু ঈগল তার জন্য পাঠিয়ে দেয়। তার কথার পরিপ্রেক্ষিতে জুলিয়ান বলে আমি এমন সব ঈগল পাঠাবো যা আপনার রাজ্যের চেহারা পাল্টিয়ে দেবে। জুলিয়ানের সেই ঈগল ছিল মুসিলমদের ঐক্যবদ্ধ এক বাহিনী। তার জন্যই কিউটা থেকে জুলিয়ান গেল কায়রোয়ানে।
কায়রোয়ান ছিল মরক্কোর সীমান্তবর্তী এলাকা। যা ছিল মুসলিম সেনাপতি মুসা বিন নুসায়েরের দখলে। সে শুধু মওকা খুঁজছিল স্পেন আক্রমণের। অবশেষে আসলো সেই মুহাজির মুসার কাছে মুসাকে তার মেয়ের উপর ঘটে যাওয়ার কাহিনী বললেন। সাথে সাথে মুসাকে আমন্ত্রণ জানালেন স্পেন অভিযানের .... জুলিয়ানের এই আবেদন লুফে নিল মুসা। তিনি খলিফা ওয়ালিদ বিন আমালিতের  কাছে অনুমতি নিয়ে তিনি খলিফা ওয়ালিদ বিন আমালিতের কাছে অনুমতি নিয়ে ৪০০ সৈন্যের একটি পরীক্ষামূলক অভিযান চালালেন। এ অভিযানে সফল হওয়ার পূর্ণ অভিযানের জন্য আবেদন করলেন ওয়ালিদের নিকট। চূড়ান্ত অভিযানের অনুমতি পাবার পর কায়রোয়ান থেকে ৭০০০ সৈন্যের বাহিনী ৪টি যুদ্ধজাহাজে পাঠালেন স্পেনের উদ্দেশ্যে। যার সেনাপতি ছিল তারিক বিন যিয়াদ।
কায়রোয়ান বন্দর থেকে তারিক মাত্র ৭০০০ সৈন্য নিয়ে ৪টি জাহাজে করে স্পেনের উদ্দেশ্যে রওনা করলো মুসলিম বাহিনী। ৭১১ সালের ২১ এপ্রিল জাহাজে আরোহণের কিছুক্ষণ পরই তারিক জাহাজে ঘুমিয়ে পড়ে। গভীর রাতে স্বপ্নে তিনি রাসূল সা. এর যিয়ারত লাভ করেন। স্বপ্নে রাসূল সা. তাকে আশ্বস্ত করে বলেন “হে তারিক, তুমি অগ্রসর হও । চিন্তিত হইও না, তুমিই সফল হবে। এই স্বপ্ন দেখে তারিক বিপুল উদ্যমে অগ্রসর হয় আন্দালুসিয়ার দিকে। সৈন্যদল নিয়ে বাদ ফজর জিব্রাল্টার প্রণালীতে সবুজ ভূমিতে নামলো তারিক।জাহাজ নোঙর ফেললো কিউটার বন্দরে (জাবালুত তারিক/ বর্তমান নাম যার জিব্রাল্টার প্রণালী)।৭০০ সৈন্যে ও ৪ টি জাহাজ ভাসছিল ভূমধ্যসাগরের স্পেন তীরে। ফজর নামাজ পড়ে জাহাজ থেকে নামলেন তারিক। স্পেনে নেমে দিলেন এক ভয়ংকর ঘোষণা। তিনি মাল্লাদের বললেন “সবকটি জাহাজে আগুন লাগিয়ে দাও।” তার এই অবাক করা সিদ্ধান্ত মানতে পারছিল না। অনেকে। তখন তারিক তাদের উদ্দেশ্যে বললেন “হে মুজাহিদ মুসলিম ভাইয়েরা, এখন তোমাদের পালাবার বা পিছু হটার কোন রাস্তা নেই। তোমাদের সামনে জিহাদের ময়দান আর পিছনে আলজিয়ার্সের অথৈ সমুদ্র। এখন তোমাদের যেকোন একটা পথে চলতে হবে, হয় আত্মহত্যা করে জাহান্নামে যেতে হবে নতুবা শাহাদাৎ বরণ করে জান্নাতের অমীয় সুধা পান করতে হবে, এছাড়া তৃতীয় কোন পথ  খোলা নেই।” এই বক্তব্যের পর সৈন্যরা প্রস্তুত হলো নতুন ভাবে, সিদ্ধান্ত নিল, শহীদ হবার।
স্পেনে তারিকের আগমনের খবর পেয়ে রাজা রডিরিক তার বিশ্বস্ত সেনাপতি থিওডোমির কে পাঠালেন ইসলামের অগ্রযাত্রা থামানোর জন্য। কিন্তুু আল্লাহ চেয়েছিলেন ইসলামের বিজয়। মুসলিম বাহিনী ও থিরডোমির মধ্যে অনেকগুলো খন্ড যুদ্ধ হলো। জয়ী হলো ইসলামের নগন্য শক্তিই। বার বার পরাজয়ের পর থিওডোমির রাজা রডরিকের কাছে চিঠিতে লিখলেন” এমন এক জাতীর আমি আজ মুখোমুখি, যারা খুব বিস্ময়কর। তারা আকাশ থেকে নেমে এসেছে নাকি জমিন ফুঁড়ে উঠে এসেছে তা আল্লাহই জানে। এখন আপনি নিজে যিদি তাদের বিরুদ্ধে না নামেন তাহলে তাদের অগ্রযাত্রা আর রোধ করা যাবে না।”রডরিক তার সেনাপতির এই চিঠি  পেয়ে প্রায় ১ লক্ষ সৈন্য নিয়ে এগিয়ে গেলেন মুসলিমদের উদ্দেশ্যে। এখবর পেয়ে তারিক মুসার কাছে আরো  সৈন্য সহায়তা চাইলে মুসা মাত্র ৫০০০ সৈন্যের একটি কাফেলা তারিকের কাছে পাঠালেন।
লাক্কা প্রান্তরে উভয় বাহিনী মুখোমুখি হলো লড়াইয়ের জন্য ১০০০০০ এর বিরুদ্ধে মাত্র ১২০০০। তবুও মনোবল হারালেন না মুসলিম বাহিনী। তাদের মনোবল দেখে রডরিকই ভয় পাচ্ছিল। ৮ দিন স্থায়ী হবার পর আসলো সেই মুহূর্ত। মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ নগন্য শক্তির কাছে হার মানলো রডরিকের বিশাল বাহিনী। নিহত হলো রাজা রডরিক। কোন কোন মতে জানা যায় তারিক নিজ হাতে তাকে হত্যা করেছিল কিন্তু ঐতিহাসিকদের মতে রডরিক ওয়াদেল কুইভারের উত্তাল স্রোতে হারিয়ে গিয়েছিল, কারণ তার ঘোড়া নদীতে ভেসে উঠতে দেখা গিয়েছিল। ৩০ এপ্রিল রডরিকের মৃত্যুর পর মুসলিম বাহিনী স্পেনের জনগণের সাহায্যে জয় করলো মালাগা, কর্ডোভা, ভিগোসহ বেশ কিছু অংশ।
স্পেনে তারিকের বিজয়ের খবর শুনে মুসা নিজেই কায়রোয়ান থেকে কিছু লোক নিয়ে স্পেনে আসলো। তিনিও স্পেনের বিভিন্ন শহর আয়ত্তে আনার পর তারিকের সাথে টলেডোলে গিয়ে মিলিত হলেন। তারপর তাদের আক্রমণে ইসলামের ছায়ায় আসে বর্তমান রাজধানী মাদ্রিদ, সারাগোসা, টারাগোনা, বার্সেলোনা এবং পিরিনিজ পর্বতমালা পর্যন্ত সমগ্র অঞ্চল।
৭১১ খ্রিষ্টাব্দে তারিক বিন যিয়াদের স্পেন বিজয়ের পর ১৪৯২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৮০০ বছর মুসলমানরা স্পেনে বিচরণ করে  স্পেনের ইতিহাস সমৃদ্ধ করে। স্পেনের প্রথম বাদশাহ স্পেনের স্বপ্নদ্রষ্টা মুসা বিন নুসায়েরের পুত্র আব্দুল আজিজের আমল থেকেই স্পেনের ইতিহাস লেখা হয় স্বর্ণের কলম দিয়ে। এসময় সমগ্র স্পেনে ইসলাম ধর্মের দ্রুত বিকাশ লাভ করে। তৎকালীন স্পেন ছিল শিক্ষা-সংস্কৃতি, জ্ঞান- বিজ্ঞান, শিল্প-বাণিজ্য, সাহিত্য, অর্থনীতি, দর্শন, গবেষণায় ইউরোপের কেন্দ্রবিন্দু। মুসলিম শাসনামলে স্পেনের রাজধানী ছিল (Granada)। এসময় মুসলমানরা স্পেনে অসংখ্য মসজিদ শুধুমাত্র গ্রানাডাতেই মসজিদের সংখ্যা ছিল ১৭০০। এসবের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল কর্ডোভা গ্রান্ড মসজিদ। স্পেনের অন্যতম বিশ্ববিদ্যালয় লা-মাদরাজা যার পূর্বের নাম আল মাদ্রাসা এ সময় মুসলমানরা গ্রানাডায় তৈরী করেন বর্তমান বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণ আল হামরা (লাল প্রাসাদ)যা বর্তমান, স্পেনের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র । কিন্তু স্পেনে মুসলমানদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চাকে এগিয়ে নিতে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে তা হলো কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়। এখান থেকে শিক্ষালাভ করেই ছাত্ররা সূচনা করে শিল্প বিপ্লবের। শিক্ষা ক্ষেত্রকে আরো উন্নত করার জন্য গ্রানাডায় তৈরী করা হয় তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় লাইব্রেরী। যার নাম দেওয়া হয় আল ইলম বর্তমানে গ্রানাডা স্ট্রেটস লাইব্রেরী। স্পেনে কাগজের প্রচলনও শুরু করে মুসলমানরা। আধুনিক ইউরোপে যে সমস্ত আচার-আচরণ, রীতি-নীতি প্রচলন আছে যার বড়াই করে সমগ্র বিশ্ব তার সবই মুসলমানরা আমদানি করেছিল। বর্তমান ইউরোপের সবচেয়ে বড় ফুটবল স্টেডিয়াম যা বার্সেলোনায় অবস্থিত তাছিল তৎকালীন মুসলিম সেনাবাহিনীর প্রধান প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। স্পেনে মুসলমানদের হাতের ছোঁয়া পড়েছিল চিত্র শিল্পেও। যার ফল স্বরূপ আজকের দুনিয়ায় পেইন্ট শিল্পের অন্যতম বাজার স্পেন।
দীর্ঘ ৮০০ বছরের মুসলিম শাসনের সময় স্পেনের মানবতাকে ডুকরে কেঁদে উঠতে হয়নি। নির্যাতিত-নিষ্পেষিত জাতী পেয়েছিল একটি শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র। যেখানে নারীরা তাদের অধিকারের জন্য আন্দোলন করতো না, গরীব-দূখীদের না খেয়ে মরতে হতো না, জোর করে ধর্মান্তরিতর সাথে কেউ পরিচিত ছিল না। স্পেনের এই শান্তি সুশাসনের প্রভাব পড়লো পাশের রাষ্ট্রগুলোতেও। ফলে একই সাথে ইসলামের দাওয়াত পৌছালো ইউরোপের আনাচে কানাচে। সমগ্র বিশ্বের Model হলো আন্দালুসিয়া। মুসলিম শাসিত এই ৮০০ বছর শুধু স্পেনের নয় বরং তুর্কিস্থান, মধ্যআফ্রিকা, এশিয়া, ভারতীয় উপমহাদেশ, ইরান, ইরাকসহ অর্ধজাহানের স্বর্ণযুগ। এসময় একাধারে দুনিয়া ব্যাপী ইসলামের প্রসার ঘটতে থাকে।যা দেখে টনক নড়ে উঠে ক্রুসেডিয়দের। তারা হিংসার ছোবল মারেন মুসলমানদের প্রতি। স্পেন থেকে মুসলমানদের বিতাড়িত করার জন্য আঁটতো মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও April Fool....
 ৮ম-১৫ শতাব্দী এই দীর্ঘ ৮০০ বছর মুসলমানরা স্পেনে বিচরণ করে স্পেনকে গড়ে তুলেছিল ইউরোপের রাজধানী। এ সময় স্পেন যেমনি ভাবে সমৃদ্ধ হয় ঠিক তেমনি ভাবেই স্পেনের উপর কুনজর পড়ে ইহুদী-খ্রিস্টান চক্রের। যার ফলেই অঢ়ৎরষ ঋড়ড়ষ  এর মতো একটি ঘটনা স্পেনের বুক লাল করেছিল।স্পেন দখলের পর মুসলমানদের ইচ্ছা ছিল ইউরোপে জয়ের। কিন্তু ইউরোপ জয় করতে গিয়ে মুসলমানরা বুঝতে পারলো এর জন্য তলোয়ারের চেয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান বেশী কার্যকর।এর ফলে মুসলিম সমাজ তখন শিক্ষার দিকে ঝুকে পড়লো। কিন্তু খ্রিষ্টানরা তাদের পদ্ধতির পরিবর্তন করলো না। তারা সেই তলোয়ারকেই ধরে রইলো। ফলে ৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ই মে মাসারার যুদ্ধের পর থেকে খ্রিষ্টানদের নানামুখী আগ্রসন নিতে থাকে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে আক্রোশ ছিল ক্রুসেডিয়দের তা আরও শক্তিশালী রূপ ধারণ করে ১০ম শতাব্দীতে। ১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দে সম্পূর্ণ ইসলামী দুনিয়ার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠে খ্রিষ্টানদের ভয়াবহ তুফান। এই তুফানের কবলে পড়ে ১০৯৮ সালে মুসলমানদের হাত থেকে এন্টিয়ক হারিয়ে যায়। এরপর থেকে শুরু হয় খ্রিষ্টানদের মুসলিম নিধন আন্দোলন। এন্টিয়ক যুদ্ধে জয়ের পর তারা মনোবল নিয়ে আক্রমণ চালায় ইসলামী খিলাফতে। আর সেই লোলুপ দৃষ্টি স্পেনের দিকে আসে ১২৫০ খ্রিষ্টাব্দে। খ্রিষ্টান গোয়েন্দারা মুসলমানদের ঐক্যে ভাঙন ধরানোর জন্য ইসলাম গ্রহণ করে ইমামতি শুরু করে স্পেনের বিভিন্ন মসজিদে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের মধ্যে নতুন কিছু (বিদায়াত) প্রবেশ করিয়ে মুসলমানদের ঈমানে আঘাত হানা। কারণ তা রা জানতো মুসলমানদের অশির যুদ্ধে পরাজিত করা যাবে না। তাই স্পেন আক্রমণকারী এক খ্রিষ্টান নেতা বলেছিলেন,” আমাদের এই অভিযান সে দিনই অগ্রসর হবে যেদিন দেখবে গ্রানাডা সীমান্তে পাহারারত মুসলিম শিশুরা তলোয়ার ছেড়ে সেতারার তার নিয়ে খেলা করছে।” আর মুসলিমদের হাতে সেই তলোয়ারের পরিবর্তে সেতার তুলে দেয়ার দায়িত্ব ছিল আলেম লেবাসে মুনাফিকদের উপর। ১২৫০-১৪৬৯ এই দীর্ঘ ২’শ বছর খ্রিষ্টীয় স্পাইরা মুসলমানদের সাথে এতই ঘনিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিল যে পানির মধ্যে তেলের অন্তরণ একাকার হয়ে গিয়েছিল।
১৪৬৯ খ্রিষ্টাব্দ... : মুসলিম বিদ্বেষী খ্রিষ্টানদের পোপ ৫ম ফার্ডিন্যান্ড ও রাগী ইসাবেলা মুসলিম নিধনের জন্য পরস্পরে বিবাহ করে।মুসলিম সেনা কমান্ডার মুগীরাকে আবু দাউদ নামক এক খ্রিষ্টানদের দালার মালাগাতে নিয়ে শহীদ করে। এই থেকে শুরু হয় খ্রিষ্টানদের চক্রান্ত। আবু দাউদ মুগীরকে খবর দেয় মালাগার একটি এলাকা মুসলমানদের সহযোগীতার জন্য একজন নেতা চাচ্ছে যাতে করে তারা সেনাদলে যোগ দিতে পারে। এই খবর শুনে মুগরীরা চুটে যায় মালাগা কিন্তু সেখানে পৌছাবার আগেই আবু দাউদের ভাড়া করা গুন্ডারা মুগীরাকে হত্যা করে মালাগার রাজপথে ফেলে রাখে। এরপর তারা মুগীরার ছেলে বদরকে হত্যা করতে আসলে বদরের চাচা তাকে নিয়ে চিরতরে আল হামরা থেকে পালিয়ে গ্রানাডা সীমান্তের এক গহীন জংগলে আশ্রয় নেয়। এরপর থেকে স্পেন সীমান্তে শুরু হয় খ্রিষ্টানদের আক্রমণ। ১৪৮৩ সালে ফার্ডিন্যান্ড একটি ছোট বাহিনী দিয়ে আক্রমণ চালায় মালাগা সীমান্তে।এই সময় তারা মালাগার খাদ্যভান্ডারে আগুন লাগিয়ে দেয়। অজস্র মানুষকে হত্যা করে তারা মালাগা দখলে নিতে চায় কিন্তু তৎকালীন স্পেনের বাদশাহ আবুল হাসান মালাগা উদ্ধারের জন্য সেখানে গেলে আবু দাউদ হাসানের ছেলে আব্দুল্লাহকে প্ররোচনা দিয়ে স্পেনের মসনদে বসায়। আব্দুল্লাহ মসনদে বসেই খ্রিষ্টানদের দালালী করতে শুরু করে। আবুল হাসান এই খবর শুনে অসুস্থ হয়ে মালাগাতেই মারা যায়।
১৪৮৯ এর ৪ঠা ডিসেম্বর : ফার্ডিন্যান্ড আক্রমণ চালায় রেজার নগরীতে। মুসা বিন আবিগাচ্ছান বদর বিন মুগীর কে নিয়ে তাদের প্রতিরোধ করতে গেলে আব্দুল্লাহ তাদের রুখে দাঁড়ায়। আব্দুল্লাহর এই সব কাজের পেছনে হাত ছিল আবু দাউদের। সে তাকে স্বপ্ন দেখায় সমগ্র স্পেনের রাজা হবে সে। বদর আব্দুল্লাহর কাছ থেকে পালিয়ে গেলেও মুসা আব্দুল্লাহর সৈন্যদের কাছে আটক হয়। ফলে মুসলমানদের জন্য কেবল গ্রানাডা ছাড়া সকল জায়গাই প্রকিূলে চলে যায়। নিজ দেশ থেকেই মুসলমানরা বিতারিত হতে থাকে। স্পেনের দরজা মালাগা দখলের পর ফঅর্ডিন্যান্ডের পরবর্তী টার্গেড পরে উত্তরের রাইয়ান থেকে দক্ষিণের আল মিরিয়া। এ এলাকার দায়িত্ব ছিল আল জাগলের উপর।তার এই সালতানাতে ছিল সমৃদ্ধ সেনাবাহিনীইে এলাকায় হামলার প্রস্তুতি শুরু হয় আবু দাউদের এক কুবুদ্ধির পর। সে রাজা ফার্ডিন্যান্ডের কাছে বলে আমাদের কিছু কিছু সৈন্য হামলা করবে ভিগো, তাহলে মুসলিমদের দৃষ্টি থাকবে ভিগোর দিকে আর তখন আমরা আল মিরিয়া আক্রমণ করবো। সেই অনুযায়ী একটি ছোট দল যায় ভিগোর দিকে আর এই খবর শুনার পর বদর (সীমান্ত ঈগল) ছুটে যায় ভিগোর দিকে, আর আল জাগল যায় আল মিরিয়ার দিকে। বদরের কাছে প্রথম দিনই গুটিয়ে যায় খ্রিষ্টানরা। অন্যদিকে আল জাগলের চতুরতায় এবারের মতো আল মিরিয়া রক্ষা পেলেও আব্দুল্লাহ আল মিরিয়া থেকে আল জাগলকে বিতাড়িত করে। এর পর আল মিরিয় ও ভিগো এক সাথে আক্রমণ করে খ্রিষ্টানরা। বদর মনসুরকে সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব দিয়ে এমন সময় ভিগো পৌছায় যখন ভিগোর উপর দিয়ে খ্রিষ্টানদের এক ঝড় বয়ে গেছে। ভিগোবাসী দুর্ভিক্ষে জর্জরিত হলে খ্রিষ্টানরা প্রতিটি রাস্তায় পরিখা খনন করে ভিগোকে খাদ্যশূন্য করে দেয়। সামনে ও পেছন থেকে হামলা এবং মুনাফেকদের হামলায় বদরের প্রায় ২ হাজার সৈন্য শহীদ হয়। মারাত্মকভাবে আহত হয় বদর।
দুর্ভিক্ষে জর্জরিত হয়ে ভিগোবাসী আল পিকরার সবক’টি কিল্লার দরজা খুলে দেয়। ফলে মালাগা, টলেডোর সাথে খ্রিষ্টানদের দখলে যায় ভিগো। এরপর মুসলমানদের কাছে থাকে শুধু গ্রানাডা। আব্দুল্লাহ গ্রানাডা দখলের জন্য ফার্ডিন্যান্ডকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিলে কারাগার থেকে পালায় মুসা বিন আবিগাচ্ছান। সে দেখা করলো বদরের সাথে। বদরের ৩ হাজার সৈন্য নিয়ে অবরোধ করলো আবু আব্দুল্লাহর প্রসাদ। ইতিমধ্যে আবু আব্দুল্লাহর চাকর আবুল কাসেম ফার্ডিন্যান্ডের সাথে একটি চুক্তি করে। ফলে মুসলমানরা হারিয়ে ফেলে তাদের ঈমানী শক্তি। তাই শেষবারের মতো গ্রানাডার ১০ লাখ মুসলমানদের জাগাতে প্রকম্পিত হলো শের-এ-গ্রানাডার শেষ গর্জন। তার এই গর্জন চিরদিন আল হামরার প্রসাদের লৌহ কপাট খুঁজে বেড়াবে। বক্তব্য শুরুর পূর্বে মুসা আল হামরার সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠে ২ রাকায়াত নফল নামাজ পড়লেন তারপর আল-হামরার নিচে দাঁড়িয়ে নিজের শেষ সাথী ঘোড়ার পিঠে বসে গ্রানাডাবাসীর জন্য তার শেষ নসীহত। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ