ঢাকা, শনিবার 29 April 2017, ১৬ বৈশাখ ১৪২৩, ০২ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

দ্বি-জাতি তত্ত্ব এক ঐতিহাসিক বাস্তবতা

মনসুর আহমদ : পূর্বপ্রকাশিতের পর
দ্বি-জাতি তত্বের বিরোধিতায় বুদ্ধিজীবী সমাজ : ভারতের হিন্দু সমাজ ও কংগ্রেসের আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে জিন্নাহ এ মহাসত্য ভারতবাসীর সামনে পেশ করতে বাধ্য হন। যে জিন্নাহ হিন্দু মুসলিম মিলনের অগ্রদূত বলে পরিচিত ছিলেন তিনিই শেষ পর্যন্ত পেশ করলেন দ্বি- জাতি তত্ত¡। দ্বি-জাতি তত্তে¡র বিরোধিতায় হিন্দু সমাজ নেমে পড়ল। প্রত্যেক ভূ-খণ্ডে জন্ম গ্রহণকারীদের একই জাতি হওয়া উচিত এধারণার বশবর্তী হয়ে পণ্ডিত জওহর লাল নেহেরু লিখলেন, “ভারতের মুসলিম সংখ্যালঘু নিয়ে মাতামাতির অর্থ কি দাঁড়ায়? এর অর্থ এটাই দাঁড়ায় যে, একটা জাতি রয়েছে এবং তা বিচ্ছিন্ন, ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত ও অনির্দিষ্ট। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এ ধারণাটা একবারেই বাজে বলে মনে হয়। আর অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটা খুবই অকার্যপোযোগী এবং বিবেচনার যোগ্য বলাই কঠিন। মুসলিম জাতীয়তার উল্লেখ করার অর্থই হলো ধর্মীয় ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ছাড়া আর কোন জাতিই দুনিয়ায় নেই। এ জন্যই আধুনিক অর্থে কোন জাতীয়তার বিকাশ সম্ভব হয়নি। (আমার জীবন কথা)
তিনি আর এক ধাপ এগিয়ে বলেন, “অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটা (আলাদা মুসলিম জাতি সত্তার ধারণা) অত্যন্ত অসংলগ্ন ও অবান্তর এবং একে বিবেচনার যোগ্য মনে করাই দুরূহ।”
হিন্দু নেতাদের অনুরূপ কিছু মুসলমান ব্যক্তিত্বও দ্বি-জাতি তত্বের সমালোচনায় নেমে পড়লেন। মুসলমান ব্যক্তিত্বের অন্যতম মওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী। তিনি যুক্ত জাতীয়তা ও ইসলাম শিরোনামে এক খানা পুস্তিকা প্রণয়ন করেন। তিনি যুক্ত জাতীয়তার পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে পুস্তিকায় লেখেন, “যুক্ত জাতীয়তার বিরোধীতা ও তাকে ধর্ম বিরোধী আখ্যায়িত করা সংক্রান্ত যে সব ভ্রান্ত ধারণা প্রকাশিত হয়েছে ও হচ্ছে, তার নিরসন করা অত্যাবশ্যক বিবেচিত হলো। ১৮৮৫ সাল থেকে কংগ্রেস ভারতের জনগণের কাছে স্বাদেশিকতার ভিত্তিতে জাতিগত ঐক্য গড়ার আবেদন জানিয়ে অব্যাহতভাবে জোরদার সংগ্রাম চালিয়ে আসছে। আর তার বিরোধী শক্তিগুলি সেই আবেদন অগ্রহণযোগ্য, এমনকি অবৈধ ও হারাম সাব্যস্ত করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের জন্য এ জাতিগত ঐক্যের চাইতে ভয়ংকর আর কিছুই নেই, এ কথা সুনিশ্চিত। এ জিনিসটা ময়দানে আজ নতুন আবির্ভূত হয়নি। বরং ১৮৮৭ সাল বা তার পূর্ব থেকে আবির্ভূত। বিভিন্ন শিরোনামে এর ঐশী তাগিদ ভারতীয় জনগণের মন মগজে কার্যকর করা হয়েছে। (পৃঃ ৫-৬) তিনি আর এক ধাপ এগিয়ে বলেন, “আমাদের যুগে দেশ থেকেই জাতির উৎপত্তি ঘটে থাকে।”
মওলানা সাহেবের এই পুস্তিতা প্রকাশিত হওয়ার পর নির্ভেজাল তাত্বিক দিক দিয়ে জাতীয়তাবাদের বিষয়ে পুংখানুপুংখ বিচার গবেষণা চালিয়ে মওলানা মওদূদী (রঃ) রচনা করেন “ইসলাম জাতীয়তাবাদ” পুস্তক। তিনি যুক্ত জাতীয়তাবাদের পক্ষের সব যুক্ত খণ্ডন করে দেখিয়েছেন যে, সমগ্র পৃথিবীর গোটা মানব বসতিতে মাত্র দু’টি দলের অস্তিত্ব রয়েছে; একটি আল্লাহর দল অপরটি শয়তানের দল। তাই এই দুই দল মিলে কখন এক জাতি হতে পারে না, যেমন পারে না তেল ও পানি মিশে এক হয়ে যেতে। মওলানার এই বই তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে।
লাহোর প্রস্তাবে দ্বি-জাতি তত্বের ভূমিকা : এ পুস্তকের সত্যতার উপরে নির্ভর করে ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ২৩শে মার্চ মুহম্মদ আলী জিন্নাহর সভাপতিত্বে এ সময়ে লাহের অধিবেশনে দ্বি-জাতি তত্বের ভিত্তিতে লাহোর প্রস্তাব গৃহিত হয় এবং মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গঠনের দাবি জানান হয়। এ, কে ফজলুল হক প্রস্তাবের উপস্থাপক ছিলেন। 
ফজলুল হক ছিলেন পাকিস্তান সৃষ্টির সংগ্রামী পুরুষদের মধ্যে অগ্রগণ্য। ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোরে অনুষ্ঠিত ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগ’ -এর ২৭তম অধিবেশনে এ. কে. ফজলুল হকের প্রস্তাবক্রমে নিম্ন লিখিত ভাষায় পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহিত হয়ঃ Resolved that it is the considered view oF this session of All India Muslim League that no constitutional plan would workable in this country or acceptable to the Muslims unless it is designed on the following basic principles, viz, that geographically contiguous units are demarcated into regions which should be so constituted, with such territorial readjustments as may be necessary, that the areas in which thw Muslims are numerically in majority as in the North –Western and Eastern zones of India, should be grouped to constitute Independent States in which the constituent units shallbe autonomous and sovereign বিপুল করতালি ও হর্ষধ্বনির দ্বারা প্রস্তাবটি অভিনন্দিত ও গৃহিত হয়। এ সামান্য আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, শেরে বাংলার রাজনীতি ছিল সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য, বিশেষ করে মুসলমানদের স্বার্থ অক্ষুন্ন রাখাই ছিল তাঁর জীবনের রাজনৈতিক লক্ষ্য।
এভাবে দ্বি-জাতি তত্বের ভিত্তিতে সৃষ্টি হয় পাকিস্তান। পরবর্তীতে পাকিস্তান ভেঙ্গে সৃষ্টি হয় বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্র। বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রধান চালিকা শক্তি ছিল দ্বি-জাতি তত্ব; যাকে ভ ুল প্রমাণ করার জন্য একদল বুদ্ধিজীবী উঠে পড়ে লেগেছেন। জিন্নাহর দ্বি-জাতি তত্ব হঠাৎ করে আপেল পড়ার মত কোন তত্ব নয়। এ তত্ব মানুষের সৃষ্টির সূচনা থেকে, বিশেষ করে ইসলামের আবির্ভাব থেকে সমাজে সুস্পষ্ট ছিল। আরবীতে একটি প্রসিদ্ধ প্রবাদ আছে “আল কুফরু মিল্লাতুন ওয়াহেদা”- সমস্ত কুফর জাতি এক জাতি এবং হাদিসে রয়েছে “আল মুসলেমু আখুল মুসলেমে”- এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। হোক তার নানা বর্ণের, নানা ভাষা ভাষী বা বিভিন্ন দেশের অধিবাসী। এ এক চরম সত্য। যেহেতু মুসলিম ধর্মের মূল শিরক বিবর্জিত ওহদানিয়াতের প্রতি বিশ্বাস ও তদানুযায়ী জীবনাচার। এই বিশ্বাসের রূপ রেখা প্রতিফলিত হয় মুসলিম সংস্কৃতিতে ও এরই সৃষ্ট শ্রেষ্ঠ চরিত্র দিয়ে।  কোরআন ধর্মের একত্বের উপরে জোর দিয়ে একে ঈমানের কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত করেছে। যে কারণে দেশের, ভাষার বিভিন্নতা সত্তে¡ও গোটা বিশ্বের মুসলিম সংস্কৃতিতে ঐক্যের সুর বিরাজমান। সব মুসলমান এক জাতি। অন্য দিকে না খোদাবাদ, ত্রি-তত্ববাদ, বহু খোদাবাদ মিলে একটি চিন্তা ও কৃষ্টি সৃষ্টি হয়েছে, যা সম্পূর্ণ ইসলামী আকিদা ও তাহজীব তমদ্দুন বিরোধী। তারা সব মিলে আর এক জাতি। তাই দ্বি-জাতি তত্ত¡ কোন কাল্পনিক স্বপ্ন বিলাস নয়।
অভিন্ন জাতীয়তাবাদের খোঁড়া যুক্তি : কিন্তু যারা এক জাতীয়তাবাদ বিশেষ করে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী তারা জেনেও না জানার ভান করেন যে, যেহেতু ইসলাম ধর্ম ও হিন্দু ধর্ম সম্পূর্ণ বিপরীত বৈশিষ্ট্যের সে কারণে মুসলিম সংস্কৃতি ও হিন্দু সংস্কৃতি কোন কালেই এক হতে পারে না। মুহম্মদ এনামুল হকের ভাষায়, ‘তাহারা বুঝিলেন সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে হিন্দু হিন্দুই এবং মুসলমান মুসলমানই, তাহারা পরস্পরের সহিত মিশিয়া এক জাতি হইতে পারে নাই ও পারিবে না।’ যদি বাঙালী সংস্কৃতির জোয়ারে মুসলিম সংস্কৃতির স্রোত ধারা থেমে যায় তা হলে জাতি হিসেবে মুসলিম জাতি বেশি দিন টিকবে না।  কারণ “জাতীয় জীবনের সঙ্গে জাতির কালচারের সেই রকম সম্বন্ধ -যেমন শরীরের সঙ্গে প্রাণের। যতদিন জাতীয় কালচার বর্তমান আছে, ততদিন জাতির মৃত্যু নেই। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সেই জাতীয় কালচারের সাহয্যেই জাতি সমস্ত বিপদ- আপদ অতিক্রম করে সিদ্ধির, মুক্তির উদার আকাশ তলে এসে দাঁড়ায়।” [এস ওয়াজেদ আলী]।
অভিন্ন জাতীয়তাবাদের ধ্বজা ধারীদের মনে রাখা উচিত যে, মুসলিম সংস্কৃতি কখনো বাঙালী সংস্কৃতির উপাদান হতে পারে না। কারণ “গাছ ও বীজের মধ্যে যা সম্পর্ক ধর্ম ও সংস্কৃতির সম্পর্কও তাই। ধর্ম থেকে সংস্কৃতির জন্ম, বীজ থেকেই গাছের জন্ম। গাছের মধ্যেও বীজ রয়েছে, সংস্কৃতির মধ্যেও ধর্ম লুকিয়ে রয়েছে।” -[আবুল মনসুর আহমদ ]
সুনীতি বাবুর মতে “যখন বাঙালী সংস্কৃতির সূত্রপাত হয় তখন কেহ বাঙালীর নিজস্ব অনার্য সংস্কৃতির দিকে দৃষ্টিপাত করে নাই; তখন যে ছাঁচে বাঙালীর সমাজ, বাঙালী ঐতিহ্য, রীতিনীতি শিল্প - সাহিত্য সবই ঢালা হয়েছিল, তাহা ছিল উত্তর ভারতের সর্বজয়ী হিন্দু [ অর্থাৎ ব্রাহ্মণ্য - বৌদ্ধ - জৈন] মন ব্রাহ্মণ্য - বৌদ্ধ - জৈন সমাজ, ঐতিহ্য, রীতিনীতি, শিল্প সাহিত্যের ছাঁচে।  যে ছাঁচে সৃজ্যমান বাঙালী জাতিকে ঢালা হইল, মোটের উপর সেই ছাঁচ এখনও বাঙালী সমাজে বিদ্যমান।”
তা ছাড়া আমরা যতই হিন্দু পিরিতিতে মজতে চাই না কেন হিন্দু সমাজ কখনই মুসলমানদেরকে বাঙালী হিসাবে গ্রহণ করতে তো রাজি নয়ই বরং তাদেরকে ম্লেচ্ছ, যবন ইত্যাদি কুরুচিপূর্ণ বিশেষণে নিন্দা করে থাকেন। সে কারণেই দ্বি-জাতি তত্বের উদ্ভব অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল। মুসলমানকে লীন করার চেষ্টা কোন ভাল পদক্ষেপ নয়। হিন্দু মুসলমানকে এক দেহে লীন করার প্রচেষ্টা যে ভাল কাজ নয় তা উপলব্ধি করে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,
“.. আজ আমাদের দেশে মুসলমান স্বতন্ত্র থাকিয়া নিজের উন্নতি সাধনের চেষ্টা করিতেছে। তাহা আমাদের পক্ষে যতই অপ্রিয় হউক এবং তাহাতে আমাদের আপাততঃ যতই অসুবিধা হউক, একদিন পরস্পরের যথার্থ মিলন সাধনের পক্ষে ইহাই প্রকৃত উপায়।” [ হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।]
প্রকৃত পক্ষে যারা দ্বি-জাতি তত্বকে ভুল প্রমাণিত করার চেষ্টা করেন তারা প্রকৃত পক্ষে ভুলের মধ্যেই আছেন। ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার বলেন,  মুসলমানেরা মধ্যযুগের আরম্ভ হইতে শেষ পর্যন্ত স্থল বিশেষে ১০০০ হইতে ৭০০ বৎসর হিন্দুর সঙ্গে পাশাপাশি বাস করিয়াও ঠিক পূর্বের মতোই আছে। অষ্টম শতাব্দীর আরম্ভে মুসলমানেরা যখন সিন্ধু দেশ জয় করিয়া ভারতে প্রথম বসতি স্থাপন করে, তখনও হিন্দু মুসলমানের মধ্যে যে মৌলিক প্রভেদ গুলি ছিল, সহস্র বছর পরেও এক ভাষার পার্থক্য ছাড়া ঠিক সেই রূপই ছিল ...
এই সত্যকে যারা অগ্রাহ্য করে যারা দ্বি- জাতি তত্বকে ভুল বলতে চান তারা প্রকৃত পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা চান না। ১৯৭১ সালে Indian Institute of Defence Studies এর পরিচালক  Mr. Subramanian পূর্ব বাংলা পরিস্থিতি সম্পর্কে ভরতে গিয়ে বলেছিলেন “What India must realize is the Fact that the break-up of East Pakistan is in our interest and we have an opportunity, the like of which will never come again.” ভারতের একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মিঃ সুব্রানিয়াম স্বামী দৈনিক ডেইলী মাদার ল্যাণ্ড পত্রিকায় লিখেছিলেন, “The territorial integrity of Pakistan is none of our business, That is Pakistan’sorry All we should concern ourselves wich is two question; It is break-up of Pakistan in our long-term national interest ? If so, can we do something about it? and the commentator concluded that the break- up of Pakisanis not only in our external security interests. India should emerge as super-power internationally and we have to nationally inte grate our citizens for this role. For this the dismemberment of Pakistan is an essential precondition. 
এ সমান্য লেখা থেকে সুস্পষ্ট যে, যারা পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য মর্মাহত তারাই বাংলাদেশকে ভারতের সাথে একাকার করে দিয়ে অভিন্ন দেশ, অভিন্ন জাতি হিসাবে দেখতে আগ্রহী। আর তাই জিন্নাহর উত্থাপিত দ্বি-জাতি তত্ব একটি ভুল তত্ত¡ ছিল প্রমাণ করার জন্য বৃথা কসরৎ করে যাচ্ছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ