ঢাকা, সোমবার 01 May 2017, ১৮ বৈশাখ ১৪২৩, ০৪ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিদ্যুৎ খাতের ব্যবসায় বেশী ঝুঁকছে বিদেশীরা

 

* সভরেন গ্যারান্টি হিসেবে রাষ্ট্র থাকায় সহজেই আকৃষ্ট হচ্ছে

* বিশেষ আইনে চুক্তিগুলো হওয়ায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে দরপত্র যাচাই-বাছাই হয় না

* জনগণের পকেট কেটে অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ

কামাল উদ্দিন সুমন: বিশেষ আইনে চুক্তি ও বেশি মুনাফার সুযোগ থাকায় বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতের ব্যবসায় বেশী ঝুঁকছে বিদেশীরা। একদিকে আইনের বাধ্যবাধকতা থাকায় বিদ্যুৎ খাতের হরিলুট নিয়ে কেউ কোন ‘টুঁ’ শব্দ করতে পারেনি আর এসুযোগ লুফে নিচ্ছে দেশী-বিদেশী চক্র। বিশেষ আইনে চুক্তিগুলো হওয়ায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে দরপত্র যাচাই-বাছাই হয় না। ফলে অযৌক্তিকভাবে বেড়ে যায় প্রকল্পের ব্যয়। আর এ ব্যয় সংকুলান করতে গিয়ে সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়াচ্ছে । আর বিদ্যুৎ খাতের সকল বোঝা চাপছে গ্রাহকের উপর। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) গত ছয় বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি লোকসান দিয়েছে। সর্বশেষ গত অর্থবছরে সংস্থাটির লোকসানের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা। এত লোকসানের পরও এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একের পর এক ব্যবসায়িক চুক্তিতে আবদ্ধ হচ্ছে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন , মূলত রাষ্ট্রের সভরেন গ্যারান্টি, লভ্যাংশ নিয়ে যেতে পারার নিশ্চয়তা, বিশেষ আইনে চুক্তি ও বেশি মুনাফার সুযোগ থাকায় বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতে ব্যবসায় ঝুঁকছে বিদেশীরা।

সূত্র জানায়, পটুয়াখালীর পায়রা সমুদ্র বন্দর এলাকায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক (এলএনজি) ৭৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র করতে চাইছে চায়না মেশিনারি ইন্ডাস্ট্রি কনস্ট্রাকশন গ্রুপ। নির্মাণ, মালিকানা ও পরিচালনা (বিওও) ভিত্তিতে এ কেন্দ্র স্থাপনে গত ২৫এপ্রিল মঙ্গলবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকও করেছে চীনা প্রতিষ্ঠানটি।

সূত্র জানায়, ভারত ও চীনের পাশাপাশি বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে জাপান, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া। কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র করবে জাপানের সুমিতোমো করপোরেশন, একই এলাকায় কয়লাভিত্তিক ৭০০ মেগাওয়াটের আরেকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র করবে সিঙ্গাপুরের সেম্বকর্প। এছাড়া মহেশখালীতে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র করবে মালয়েশিয়াও। দেশটির তেনেগা ন্যাশনাল বারহদ( টিএনবি) কোম্পানী এ কাজটি করবে ।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সময় বিদ্যুৎ খাত নিয়ে বেশ কয়েকটি চুক্তি হয়েছে দেশটির সঙ্গে। এর মধ্যে রয়েছে ত্রিপুরা থেকে অতিরিক্ত ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে বিপিডিবির সঙ্গে ভারতীয় এনটিপিসির মধ্যকার সম্পূরক চুক্তি এবং আদানির ঝাড়খ বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ ক্রয় বিষয়ে আদানি পাওয়ারের (ঝাড়খ) সঙ্গে চুক্তি।

এছাড়া সুন্দরবনের রামপালে কয়লাভিত্তিক ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ অর্থায়নে ভারতের এক্সিম ব্যাংক ও বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানির মধ্যে সুবিধা ব্যবস্থাপনা চুক্তি, ৩ হাজার মেগাওয়াট মেঘনাঘাট মৈত্রী বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে প্রথম পর্যায়ে ৭১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ক্রয় নিয়ে ভারতের রিলায়েন্স পাওয়ারের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ , জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের চুক্তিও সই হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে।

বাংলাদেশে পাল্লা দিয়ে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে চীনও। বর্তমানে পায়রা বন্দর এলাকায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে কাজ করছে বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে বিদেশী প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ বাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ বিভাগের নীতি গবেষণা শাখা পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, কোনো কোম্পানি বিনিয়োগের আগে রাষ্ট্রের ক্রেডিবিলিটির বিষয়টি দেখে। এছাড়া বিনিয়োগের রিটার্ন তুলতে পারবে কিনা, সে বিষয়টিও প্রাধান্য দিয়ে থাকে। এসব বিবেচনায় বাংলাদেশ বিদেশী কোম্পানিগুলোর কাছে সবচেয়ে উপযুক্ত দেশ মনে হচ্ছে। তাই তারা এখানে বিনিয়োগ করছে।

জানা যায়, ২০১৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভারতের তেমন কোনো বিনিয়োগ ও প্রভাব ছিল না। ওই বছরের ৩ ডিসেম্বর দেশটি থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হয়। এর পর গত বছরের ২৩ মার্চ ত্রিপুরা থেকে আরো ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ হয়। আগামীতে আমদানি করা বিদ্যুতের পরিমাণ ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে উভয় দেশ। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে দুই দেশের মধ্যে যে ৯ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি ও সমঝোতা সই হয়েছে, তার প্রায় ৭০ শতাংশই হয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে।

জ্বালানি তেলের দরপতনের কারণে গত বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেখানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রকল্প বাতিলের অনেক ঘটনা ঘটেছে, সেখানে বাংলাদেশে এ খাতে বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধি নিয়ে নানা ব্যাখ্যা দিচ্ছেন বিশে¬øষকরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সভরেন গ্যারান্টি হিসেবে রাষ্ট্র থাকায় বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতের প্রতি সহজেই আকৃষ্ট হচ্ছেন বিদেশী বিনিয়োগকারীরা। এছাড়া বিদ্যুৎ-জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বিশেষ আইনে চুক্তিগুলো হওয়ায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে দরপত্র যাচাই-বাছাই হয় না। ফলে অযৌক্তিকভাবে বেড়ে যায় প্রকল্পের ব্যয়। আর এ ব্যয় সংকুলান করতে গিয়ে সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়াচ্ছে। এতে অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ থাকছে বলেই বিদেশী কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছে।

অধ্যাপক ড. রিজওয়ান খান বলেন, বাড়তি মুনাফা পাচ্ছে বলেই বিদেশী কোম্পানি বাংলাদেশে বিনিয়োগ করছে। ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম দিন দিন বাড়বে। যেমন কুইক রেন্টাল ও রেন্টালের কারণে বেড়েছে।

বিদেশীদের পাশাপাশি এ খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে দেশের ব্যক্তি মালিকানাধীন বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানও। এর মধ্যে রয়েছে সামিট গ্রুপ, ওরিয়ন, ইউনাইটেড ও বেক্সিমকো গ্রুপ।

সূত্র জানায়, দেশে ২০১০-১১ অর্থবছরে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো উৎপাদনে আসতে শুরু করে। বেসরকারি খাতের এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনায় ওই অর্থবছরই লোকসানে পড়ে বিপিডিবি। ওই অর্থবছর সংস্থাটির লোকসান হয় ৬২ কোটি ৩০ লাখ ডলার। পরবর্তীতে লোকসানের পরিমাণ আরো বাড়তে থাকে। ২০১১-১২ অর্থবছর বিপিডিবির লোকসান বেড়ে দাঁড়ায় ৮১ কোটি ৭৯ লাখ ডলারে। তবে পরের অর্থবছর লোকসান কিছুটা কমাতে সক্ষম হয় পিডিবি। ২০১২-১৩ অর্থবছরে সংস্থাটির লোকসান হয় ৬৪ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। ২০১৩-১৪ অর্থবছর আবারো লোকসান বেড়ে হয় ৮৭ কোটি ৫৪ লাখ ডলার। এর পর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৯৩ কোটি ৬৭ লাখ ডলার লোকসান হয় বিপিডিবির।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ