ঢাকা, সোমবার 01 May 2017, ১৮ বৈশাখ ১৪২৩, ০৪ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

হঠাৎই ছিনতাই বেড়ে গেছে রাজধানীতে

 

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : খুলনার সোনাডাঙ্গা থেকে ছেলে প্রত্যয়কে নিয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ভাইয়ের বাসায় বেড়াতে যাওয়ার উদ্দেশে রাজধানীর গুলিস্তানে এসে নামেন সুলতানা আফরোজ (৩৫)। বাস থেকে নেমে গুলিস্তান শপিং সেন্টারের সামনে নারায়ণগঞ্জগামী অন্য একটি বাসের অপেক্ষায়। এক হাতে ছিল ভ্যানিটি ব্যাগ, অন্য হাতে ছেলেকে ধরা। এমন সময় একটি প্রাইভেট কার এসে ছোঁ মেরে টান। ওই কারে বসা তিন অজ্ঞাত যুবকের ছোঁ মারা টানের কাছে হাতে থাকা ভ্যানিটি ব্যাগটি সামলাতে গিয়ে রাজপথে লুটিয়ে পড়ে যান সুলতানা। রক্ষা করতে পারলেন না কিছুই। ছিনতাইকারীরা ৭০ হাজার টাকা, সাত ভরি স্বর্ণ ও একটি মোবাইল ফোনসহ ভ্যানিটি ব্যাগটি নিয়ে হাওয়া, তার সাথে পাওয়া কিছু আঘাতও। শুক্রবার দিবাগত রাত শেষে দিনের আলো উঁকি দেয়ার মুহূর্ত সাড়ে ৫টার দিকে এই ঘটনা। আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সুলতানা আফরোজের ঠোঁটে ৫টি সেলাই করা হয়েছে। এ ছাড়াও তার মাথায় আঘাত লেগেছে। তিনি এখন চিকিৎসাধীন।

ভোর রাত কি, গভীর রাত। দিনের যে কোন সময়েই ঘটছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। দিনদুপুরে ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটে চলেছে রাজধানী ঢাকাতে। এর কোন কোনটি নিয়ে উচ্চবাচ্য হওয়ার পরই টনক নড়ে আইনশৃংখলাবাহিনীর। তখন কিছুদিন তৎপরতা থাকে। ধরাও পড়ে ছিনতাইয়ের সাথে জড়িতরা। কয়েকটা দিন এবাবে চলার পর আবার পূর্বাবস্থা। সেই অবস্থারই সুযোগ নিয়ে চলে ছিনতাই, বাড়ে দুঃখ-যন্ত্রণা। সাথে সর্বস্ব হারানোর বেদনাও।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে প্রতিদিন ৫/৭ জন আহত হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আসেন। এদের কেউ জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়ে চলে যান আবার অনেকেই ভর্তি হন। হাসপাতালে কর্মরত পুলিশ সদস্যরা খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছেন, বেশির ভাগ লোকই মোবাইল ও মানিব্যাগ ছিনতাইয়ের শিকার হন।

তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম শাখার উপ কমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, ঢাকা শহরে আগের মতো অপরাধ নেই। বিশেষ করে আগে প্রতিদিন অনেক বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটতো। কিন্তু ডিএমপির তৎপরতার কারণে এটি অনেকাংশে কমে এসেছে। এখন নেই বললেই চলে। দু’একটা ঘটনা- এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এতো বড় একটি মেগাসিটির বিপুল সংখ্যক মানুষকে সেবা দিতে আরো বেশি পুলিশ দরকার। তবে ছিনতাই আগের মতো নেই এটি সত্য- বলেন তিনি।

পরিসংখ্যান বলছে, গত ২৫ এপ্রিল থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত চারদিনে ঢাকার চারটি স্পটে ৮টি ছোটবড় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এর একটির সাথে জড়িত কাউকে আটক বা গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান

২২ এপ্রিল দিবাগত রাত। সারারাত রিমঝিম বৃষ্টি। সোডিয়াম লাইটের হলুদ আলো নয় বরং ল্যামপোস্টের এলইডি লাইটের সাদা আলোয় রাস্তা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। এমনিতেই রাত ১২টার পর থেকেই ওই রাস্তা দিয়ে দুই চারজন লোক ছাড়া চলাচলের কেউ নেই। তার ওপর আবার বৃষ্টি। লোকজনের যাতায়াত নেই বললেই চলে। তবে হঠাৎ মাঝে মধ্যে দুএকজন লোক বিপদে পড়ে চলাচল করছে। রাত ৩টা। ওঁত পেতে থাকা ভদ্রলোক নিমিষেই হামলে পড়লো চলাচলকারী রাস্তার এক যুবকের ওপর। যুবকটির কাছে তেমন ব্যাগ-পোটলা কিছুই ছিল না। খালি হাতেই কোথাও যাচ্ছিলেন। কোমরের ওপরে ছুরিকাঘাত করে মোবাইল টান দিয়ে চলে গেলেন দুজন ভদ্রলোকবেশী ছিনতাইকারী। যুবকটি রক্তাক্ত অবস্থায় চিৎকার করতে থাকলেন। কিন্তু কে আসবে। সবাই তো বৃষ্টির রিমঝিম শব্দে ঘুমিয়ে পড়েছে। এর মধ্যেও চিৎকার শুনে স্নিগ্ধা নামে এক নারী তিন তলার ছাদে যান।

ওই নারী বলেন, ছেলেটির রক্ত ঝরছিল আর চিৎকার করে কাঁদছিল। কিছুক্ষণ পর একটি রিকশায় দুজন লোক ওই রাস্তা ধরে যাচ্ছিলেন। ছেলেটির এই অবস্থা দেখে ওই রিকশা দিয়ে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। তবে শেষ পর্যন্ত কোন হাসপাতালে ছেলেটি চিকিৎসা নিয়েছেন তা বলতে পারেননি ওই নারী।

পরদিন সকালের দিকে আশেপাশের লোকজনের কাছে স্নিগ্ধা জানতে পারেন, ওই রাতে একই জায়গায় ৫টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, গেন্ডারিয়া থানাধীন সতীশ সরকার রোডের পানবাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের মোড়ে এ ঘটনা ঘটে। প্রায় সময়ই সেখানে এ ধরনের ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। স্নিগ্ধা জানান, মাঝে মধ্যে পুলিশ টহল থাকলে ছিনতাই বন্ধ থাকে। 

এ ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে গেন্ডারিয়া থানার ওসি ও ডিএমপি থেকে বেশ কয়েকবার পুরস্কারপ্রাপ্ত ওসি মিজানুর রহমান বলেন, বৃষ্টির কারণে কয়েকদিন রাস্তায় পুলিশ টহল ছিল না। এই ফাঁকে কয়েকটি ছিনতাই হয়েছে বলে শুনেছি। তবে কারা এ কাজে জড়িত তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

এদিকে বনানী এলাকায় ২৫ এপ্রিল রাতে আলমগীর নামে এক ড্রাইভারকে গলায় ছুরি ধরে তার কাছে থাকা মোবাইল ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। আলমগীর একটি পত্রিকার সম্পাদকের গাড়ি চালক। তিনি সম্পাদককে গাড়িসহ বাসায় রেখে হেঁটে নিজ গন্তব্যে যাচ্ছিলেন।

আলমগীর বলেন, মোবাইল ও মানিব্যাগ না দিলে গলায় ছুরি চালিয়ে দিতো ছিনতাইকারী। ভয়ে সব দিয়ে দিয়েছি। ওই রাস্তায় রাত ১২টার দিকে কোনো পুলিশকে দেখতে পাইনি যে, তাদের ঘটনার বিষয়ে জানাবো। আর থানায় যাইনি কারণ আরো বেশি হয়রানি হওয়ার শঙ্কায়।

অন্যদিকে মোহাম্মদপুর থানাধীন বছিলা রোডে ২৬ এপ্রিল রাত ১টার দিকে ছিনতাইয়ের শিকার হন কাজী আব্দুল ওহাব। তিনি বলেন, গুলশানে একটি দোকানে কাজ শেষে বাসায় ফিরছিলেন। সঙ্গে কিছু টাকা ও একটি স্যামসাং মোবাইল ফোন ছিল। তিনজন ছিনতাইকারী এসে কি আছে চাইলে, আমি দৌড় দিতে শুরু করি। এরপর তারা আমাকে ধরে ফেলে। এরপর পেটে ছুরি চালায়। আমি নড়াচড়া করায় সামান্য কেটে যায়। এরপরই তারা সব নিযে যায়। থানায় গেলে পুলিশ জানায় আগে চিকিৎসা করান তারপর এসে অভিযোগ দিয়েন। তিনি সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন তবে পুলিশের কাছে অভিযোগ নিয়ে যাননি।

রাজধানীতে ১৩৫ স্পট

হঠাৎ করেই রাজধানীতে আবারও বেপরোয়া ছিনতাইকারী চক্র। ছিনতাই কাজে বেড়ে গেছে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারও। এসব ছিনতাইকারী চক্র ছিনতাই কাজে ব্যবহার করছে মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল। ছিনতাইকারী চক্রের টার্গেট মহিলাদের ভ্যানেটিব্যাগ, ব্যাগভর্তি টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ও মোবাইল ফোনসেট। রাজধানীর ৪৯টি থানার ৮টি ডিভিশনাল জোনে চিহ্নিত ১৩৫টি ছিনতাই স্পট। রাজধানীতে গড়ে প্রতি মাসে ২৩টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে বলে জানা গেছে। 

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকা মহানগর পুলিশের কাছে বেশিরভাগ ছিনতাইয়ের ঘটনার বিষয়ে ভুক্তভোগীরা বাড়তি ঝামেলা এড়াতে থানায় মামলা বা জিডি না করে হাসপাতালে বা ক্লিনিকে চিকিৎসা নিয়েই বাড়ি ফিরে যান। এ কারণে ছিনতাইয়ের সঠিক পরিসংখ্যান থাকে না থানাগুলোতে। ঢাকা মেডিক্যাল হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, রাজধানীতে গড়ে প্রতি মাসে কমপক্ষে ২৩টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। গত বছর জানুয়ারি থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত কেবলমাত্র ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ছিনতাইয়ের শিকার ২৬২ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। রাজধানীর ৪৯টি থানায় যেসব জিডি করা হয় তার বেশিরভাগই থানার আশপাশের রাস্তায় মোবাইল ও ল্যাপটপ ছিনতাইয়ের অভিযোগ। ভুক্তভোগীরা বলছেন, ছিনতাইকারীদের ধরতে পারছে না পুলিশ। থানায় অভিযোগ করেও খোয়া যাওয়া জিনিস ফেরত পাওয়া যায় না।

ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম, উত্তরা পূর্ব থানা এলাকা, বাড্ডা, বনানী, খিলক্ষেত, ভাষানটেক, মিরপুর, পল্লবী, কাফরুল, দারুস সালাম, নিউমার্কেট, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী, কদমতলী, গুলিস্তান, রামপুরা, হাজারিবাগসহ মহানগরীর থানা এলাকায় অন্তত প্রায় একশ ছিনতাইয়ের স্পটগুলোতে মোটরসাইকেলে, মাইক্রোবাসে ও অতর্কিত হামলা চালিয়ে নগদ টাকা ছিনতাই হচ্ছে। হঠাৎ করেই রাজধানীতে বেড়ে গেছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। প্রায় প্রতিদিনই রাজধানীর কোন না কোন স্থানে ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। ভুক্তভোগীরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতার কারণেই বাড়ছে ছিনতাই। ডিএমপির আটটি ক্রাইম জোনে শতাধিক ছিনতাইয়ের স্পট আর এসব জায়গায় সক্রিয় রয়েছে কয়েক ডজন ছিনতাইকারী চক্র। এদের মধ্যে মিরপুর ১ নম্বর গোলচত্বর থেকে টেকনিক্যাল মোড় পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করছে ছিনতাইকারী চক্রের একটি গ্রুপ। মেরুল বাড্ডা, রামপুরা মহাখালী, গুলশান, পান্থপথ, ফার্মগেট, মতিঝিল, ওয়ারী মৌচাক, হাতিরঝিল, শান্তিনগর, কাকরাইল, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া, বাবুবাজার, রাজারবাগ, কমলাপুর, ধানমন্ডি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য গড়ে উঠেছে এলাকাভিত্তিক ছিনতাইকারী চক্রের গ্রুপ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যদের ধরলেও খুব সহজেই জামিন পেয়ে বের হয়ে আসে তারা। এ কারণেই সহজে ঠেকানো যাচ্ছে না ছিনতাই তৎপরতা। জামিনে বের হয়ে আবার একই কাজ শুরু করে। ছিনতাই প্রতিরোধে থানা পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশ বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে যাচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ