ঢাকা, সোমবার 01 May 2017, ১৮ বৈশাখ ১৪২৩, ০৪ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

দেশে আইনের শাসন নেই তাই বেশি কথা বলতে হয় -প্রধান বিচারপতি

 

স্টাফ রিপোর্টার : প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহা বলেছেন, বাংলাদেশে প্রধান বিচারপতির কথা বেশি বের হয় এবং বেশি কথা বলতে হয়, কারণ এ দেশে আইনের শাসন নেই। অন্যান্য দেশে প্রধান বিচারপতিরা এতো কথা বলেন না, কারণ সেসব দেশে আইনের শাসন রয়েছে। কিন্তু আমাকে বলতে হয়, আমার কথা বেশি বের হয়, কারণ এখনো দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়নি। 

সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন কোনো আইন বাংলাদেশে হতে দেয়া হবে না। এমন কোনো আইন করলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে উল্লেখ করে প্রধান বিচপারপতি বলেন, জনগণের অধিকার ক্ষুণœ করে সংবিধানে এমন সংশোধন করা হলে তা বাতিল করে দেবেন সুপ্রিম কোর্ট। আপনারা তিন-চতুর্থাংশ বা একেবারে হান্ড্রেড পার্সেন্ট মিলে সারা সংবিধানটাকে স্ক্র্যাপ করতে পারেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট যদি দেখে তার মূল ভিত্তি নষ্ট হয়ে গেছে, আইনের শাসনের প্রতি আঘাত আসছে, ইনডিপেনডেন্স অব জুডিশিয়ারিতে আঘাত আসছে। জনগণের ফান্ডামেন্টাল রাইটস যেসব অধিকার রয়েছে, তাহলে আমরা বলব, ততটুকু বেআইনি বলে দেব।

প্রসঙ্গত গত বুধবার আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছিলেন, বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির মতো কোনো দেশের প্রধান বিচারপতি প্রকাশ্যে এত কথা বলেন না। কোন কষ্ট থাকলে তা তিনি নির্বাহী বিভাগকে জানাতে পারেন। তাহলে আমরা হয়তো সেগুলো সুরাহা করার চেষ্টা করতে পারি আইন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান দিবস উপলক্ষে এক সাংবাদিক সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইন মন্ত্রী এ কথা বলেন। আইন মন্ত্রী বলেন, প্রধান বিচারপতিকে আমি অত্যন্ত সম্মান করি। আমার কথা হচ্ছে, নিশ্চয় উনি প্রয়োজনে বলেন, আমি এটা অস্বীকার করি না। কিন্তু উনি কথাগুলো যদি পাবলিকলি না বলে আমাদেরকে জানান, তাহলে আমরা হয়তো সেগুলো সুরাহা করার চেষ্টা করতে পারি। 

গতকাল রোববার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমি আইন ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ও প্রথম ব্যাচের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। ভূমি আইন ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান খ্রিস্টিন রিচার্ডসনের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য রাখেন ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. সেলিম ভূঁইয়া এবং আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সরকার আলী আককাস। এসময় বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগের চেয়ারম্যান, শিক্ষক, সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিচারপতিরা আইন শিক্ষা দেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের দেশেও এই সংস্কৃতি চালু করতে হবে। পরবর্তীতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে একদিন আইনের ক্লাস নেবেন বলেও জানান তিনি। 

প্রধান বিচারপতি বলেন, আইন সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর মধ্যে ভূমি আইন হচ্ছে আইনের মূল স্তম্ভ। অথচ সুপ্রিম কোর্টে ভূমি আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ আইনজীবী হাতেগোনা পাঁচ থেকে ছয়জন। আর ঢাকা কোর্টে মাত্র চার থেকে পাঁচজন। আর বাকি সব আইনজীবীই ভূমি আইন বিষয়ে জ্ঞাত নয়। আমাদের দেশের বেশির ভাগ ভূমি আইন ব্রিটিশ শাসনামলের করা, যার মধ্যে অনেকগুলো ত্রুটিপূর্ণ। বর্তমানে অনেক ভূমি আইন সংস্কার করা জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রকৃত আইনের শাসন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শ্রমিক ও কৃষকরা। মাটি ও মানুষের পক্ষে আইন জানতে হলে ভূমি আইন অতীব জরুরি। 

প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা বলেন, আইনজীবীরা এখন সারা বছর কাঁচা টাকার পেছনে দৌড়ায়। তারা (আইনজীবী) ফৌজদারী মামলার জন্য সারা বছর দৌড়-ঝাঁপ করেন, যাতে গরম গরম টাকা পকেটে পড়ে। জামিনের দিন কোর্টে মানুষের ভিড়ে দাঁড়ানোর জায়গা থাকে না। অথচ মামলার জামিন হওয়ার পর ট্রায়াল (বিচার) চলাকালে কোর্টে কখনো আইনজীবী থাকে না বা কখনো আবার আসামী থাকে না।

তিনি আরও বলেন, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন উন্নত দেশ হওয়ার পূর্বশর্ত হচ্ছে আইনের শাসনের সঠিক বাস্তবায়ন। আইনের শাসন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হলে এবং দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সংবিধান মেনে চললে সভ্য ও উন্নত জাতিতে পরিণত হওয়া সম্ভব। এজন্য আইন, শাসন ও বিচার ব্যবস্থাকে একে অন্যের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে হবে। সংবিধানকে সমুন্নত রাখার জন্য আইনের শাসনের প্রতি সবার শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে। 

এর আগে গত ২৫ এপ্রিল হবিগঞ্জ বার এসোসিয়েশনের দেয়া এক সংবর্ধনায় প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছিলেন, বিচার বিভাগের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করেছে সব সরকার। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রশাসন চায় না। তারা বিচার বিভাগকে নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে। বিচার বিভাগ সবসময় প্রশাসন ও আইন বিভাগের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করে-মন্তব্য করে প্রধান বিচারপতি আরও বলেন, প্রশাসনের লোকজন অবসরে গেলে তাদেরও রক্ষা করে বিচার বিভাগ। চাকরিকালে বিভিন্ন সমস্যায় তাদেরও বিচার বিভাগেই যেতে হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ