ঢাকা, সোমবার 01 May 2017, ১৮ বৈশাখ ১৪২৩, ০৪ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

অর্থমন্ত্রী ও ব্যবসায়ী নেতাদের পাল্টাপাল্টি হুমকি

# আন্দোলনে নামলে দমন করা হবে ---অর্থমন্ত্রী

# আন্দোলনে নামলে সরকার ব্যর্থ হবে ---আবু মোতালেব

স্টাফ রিপোর্টার : নতুন ভ্যাট আইন (মূসক বা ভ্যাট) বাস্তবায়ন নিয়ে অর্থমন্ত্রী ও ব্যবসায়ীরা পরস্পরকে পাল্টাপাল্টি হুমকি দিয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, নতুন ভ্যাট আইন নিয়ে আন্দোলন করলে দমন করা হবে। সরকার কোনভাবেই ছাড় দিবে না। আর ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, এমন আইন করা ঠিক হবে না যাতে ব্যবসায়ীরা রাজপথে নামতে বাধ্য হন।

গতকাল রোববার এ মূসক সমস্যার সমাধানে আয়োজিত বৈঠকে সমাধান না হয়ে প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন অর্থমন্ত্রী ও ব্যবসায়ীরা নেতারা। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আগামী ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পরামর্শক কমিটির ৩৮তম সভায় অর্থমন্ত্রী ও ঐক্য পরিষদের সভাপতি এ ধরনের মন্তব্য করেন।

এনবিআর ও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন দ্য ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) এ সভার আয়োজন করে। এতে এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান সভাপতিত্ব করেন। এ সময় বক্তব্য রাখেন, এফবিসিসিআই সভাপতি মাতলুব আহমাদ, এফবিসিসিআইয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট শফিঊল ইসলাম মহিউদ্দীন, ব্যবসায়ী ঐক্য পরিষদের সভাপতি আবু মোতালেব, ডিসিসিআই সভাপতি আবুল কাসেম খান, বাংলাদেশ উইমেন চেম্বারের সভাপতি সেলিমা আহমেদ, এমটবের মহাসচিব নুরুল কবীর, বেসিস সভাপতি মোস্তফা জব্বার প্রমুখ।

নতুন ভ্যাট আইন প্রসঙ্গে ব্যবসায়ী ঐক্য পরিষদের সভাপতি আবু মোতালেব বলেছেন, এমন আইন বাস্তবায়ন করা যাবে না, যেটা হলে ব্যবসায়ীরা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়। নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন হলে আমরা ছাত্রদের মত আন্দোলনে যাব। কারণ, ভ্যাট আইনের পরে ব্যবসায়ীরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আইন করে লাভ হবে না, আমরা আন্দোলনে নামলে আপনারা ব্যর্থ হবেন।

তিনি বলেন, এর আগেও আমরা এই ভ্যাট আইন নিয়ে আন্দোলন করেছি। কিন্তু আমাদের সেই দাবি সরকার মানেনি। আমরা বেশ কয়েকটি সুপারিশ করেছি কিন্তু সরকার তা রাখেনি। ব্যবসায়ীদের দিক অবশ্যই সরকারকে দেখতে হবে। তা না হলে ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে আবারও রাজপথে নামবে।

ঐক্য পরিষদের সভাপতির বক্তব্যে জবাবে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, যদি আপনারা আন্দোলন করেন, তবে আমরা তা দমন করব।

সভার এক পর্যায়ে ব্যবসায়ী ঐক্য পরিষদের সভাপতি আবু মোতালেব বলেন, আমাদের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য আলাদাভাবে খেয়াল রাখতে হবে। নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের দিকে যাচ্ছে সরকার। অথচ কোনো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি।

দাতা সংস্থা আইএমএফের প্রকল্প রয়েছে প্রশিক্ষণের জন্য। কিন্তু কাউকে কোনো প্রশিক্ষণ না দিয়ে কি করে এই আইন বাস্তবায়ন হবে- এই প্রশ্ন তুলে তিনি আরও বলেন, এমন আইন বাস্তবায়ন করা যাবে না, যেটা হলে ব্যবসায়ীরা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে। এর আগে ভ্যাট আইন নিয়ে ছাত্ররা আন্দোলনে নেমেছিল। আমরা নামতে চাই না। এতে দেশের ক্ষতি, আমাদেরও ক্ষতি।

এ সময় নজিবুর রহমান তাকে থামানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু বক্তব্য চালিয়ে যান আবু মোতালেব। এর প্রেক্ষিতে ক্ষেপে যান অর্থমন্ত্রী।

মন্ত্রী বলেন, অনেক বলেছেন। কিছু করতে পারবেন না, আন্দোলন করেন কিছু হবে না। দেশে ৮ লাখ আয় কর দেওয়ার মতো ব্যবসায়ী রয়েছেন, ভ্যাট দেয় মাত্র ৩২ হাজার। আপনারা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে কতজন ভ্যাট দেন? যদি আপনারা আন্দোলন করেন, তবে আমরা তা দমন করব।

এ সময় ব্যবসায়ীরা হইচই বাধিয়ে দেন। অনেকে পিছন থেকে বলতে থাকেন আমাদের ডেকেছেন কেন। বের করে দেন। ব্যবসায়ীদের সমস্যা দেখবেন না তাতো হতে পারে না। ভ্যাট আইনের ব্যাপারে একটি কমিটিও করা হয়েছে। কিন্তু সে কমিটির কোন সুপারিশ রাখা হয়নি। তাহলে কেন কমিটি করা হলো।

পিছন থেকে অনেকই বলেন, আপনারা গায়ের জোড়ে অনেক কিছুই করছেন। আমাদের কোন কথা আপনারা শুনছেন না। এটা হতে পারে না। খুচরা বিক্রি পর্যায়ে কোনভাবেই ১৫ শতাংশ ভ্যাট আদায় করা ঠিক হবে না। এটি সরকারে বিবেচনায় নিতেই হবে। তা না হলে আমরা আবারও রাজপথে ছাত্রদের মত আন্দোলনে নামবো।

এরপর এফবিসিসিআইয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট শফিঊল ইসলাম মহিউদ্দীন ব্যবসায়ীদের থামানোর চেষ্টা করেন।

তিনি বলেন, হাসিনা সরকার ব্যবসা বান্ধব সরকার। ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হয় এমন কিছু তিনি (প্রধানমন্ত্রী) করবেন না। প্রয়োজনে আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের দাবি নিয়ে যাবো। অর্থমন্ত্রী আন্দোলন দমনের কথা বলার পর উপস্থিত ব্যবসায়ী নেতারা হট্টগোল শুরু করেন। এসময় এনবিআর চোয়ারম্যান মোঃ নজিবুর রহমান ও এফবিসিসিআই সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমেদের হস্তক্ষপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আসে।

পরবর্তী সময়ে সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, আবু তালেবের বক্তব্য আমার পছন্দ হয়নি। তিনি থ্রেট দিয়েছেন। এটা মোটেও ঠিক হয়নি। তিনি যুদ্ধ বাধিয়ে দিবেন, এমন একটা ভাব। এটা ঠিক না। আমরা এথানে বসছি আলোচনা করতে। তাহলে এ ধরনের কথা কেন, ভবিষ্যতে এটি খেয়াল রাখবেন। যেন এই টাইপের কথা না হয়।

এরপর ‘আই এম সরি টু সে’ বলে বক্তব্য শেষ করেন অর্থমন্ত্রী। বক্তব্য শেষ করেই তিনি অনুষ্ঠানস্থল থেকে বেড়িয়ে যান।

এ সময় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, বর্তমানে দেশে ৮ লাখ ৬৪ হাজার নিবন্ধিত করদাতা আছেন। তাদের মধ্যে ৩২ হাজার রিটার্ন দাখিল করেছেন। আপনারা ক্ষুদ্র ও মাঝারী শিল্পের কতজন রিটার্ন দিয়েছেন তার তালিকা আমাকে দেন। আপনারা কতজন ভ্যাট জমা দেন। আন্দোলন করে কিছু হবে না, আন্দোলন করলে দমন করা হবে।

মন্ত্রী আরো বলেন, আজ আমরা আলোচনা করতে বসেছি কিন্তু আবদুল মুতালিব হুমকি দিচ্ছেন, আমি কথাগুলো একটুও পছন্দ করি নাই। আবদুল মুতালিবের কথাগুলো তুলে নেওয়া উচিত। এখানে আলোচনা হচ্ছে, এখানে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে লাভ নেই।

 তিনি বলেন, আমরা যদি ট্যাক্স রেট ৩ থেকে ৫ বছরের জন্য ঘোষণা করতে পারলে ভালো হয়। কর্পোরেট ট্যাক্স কমানোর চিন্তা করছে সরকার।

আইটি খাতে করমুক্ত সনদের বিষয়ে বেসিস সভাপতি মোস্তফা জব্বারের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী বলেন, করমুক্ত সনদ এনবিআর কেন দেননি? দিস ইজ রিয়েলি অবজ্যাকশান্যাবল। এটা মাস্ট ইস্যু করা উচিত। ১ সপ্তাহের মধ্যে এটা ইস্যু করতে হবে।

সেলিমা আহমেদের নারীর করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাবে মুহিত বলেন, আগামী বছর থেকে আয়কর সীমা স্থায়ী করে দেওয়া হবে। আমেরিকাসহ উন্নত দেশগুলোর মতো আয়ের লিমিট দেওয়া হবে। লিমিটের বেশি আয় হলে অবশ্যই ট্যাক্স দিতে হবে।

ভোক্তা স্বার্থ সুরক্ষায় আইনের প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, টোব্যাকো ট্যাক্সে বাংলাদেশ দুর্বল। আগামী অর্থবছর টোব্যাকো ট্যাক্স ভালো হবে। বিড়িকে দেশ থেকে বিদায় করতে হবে। বিড়ি নিয়ে অনেক মিথ আছে। বিড়ি এখন নেই, সব লো কোয়ালিটির সিগারেটের পরিণত হয়েছে।

কর্পোরেট ট্যাক্স, সিম ট্যাক্স কমানোসহ এমটবের মহাসচিব নুরুল কবীরের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী বলেন, মোবাইল অপারেটররা হায়েস্ট কর্পোরেট ট্যাক্স দেন। এবার সর্বোচ্চ কর্পোরেট কর পুনঃবিবেচনার চিন্তা করছি। স্পেকটামের লাইন্সেসে ভ্যাট প্রত্যাহারেরও চিন্তা আছে।

আবুল কাসেম খানের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে মুহিত বলেন, মোবাইল মানি ট্রান্সফারে মানি লন্ডারিং হচ্ছে। বিকাশের ব্যাপারে ইতোমধ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। মোবাইল মানি ট্রান্সফারের বিষয়েও পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। দেশীয় শিল্পকে বাঁচাতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

আগামী বাজেটকে উচ্চাবিলাসী বাজেট উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, আগে ট্যাক্স দেওয়ার সময় হয়রানি ঘটনা ঘটতো, সেজন্য অনেকেই ট্যাক্স নেটে আসতে চাইতো না। এ সংস্কৃতিকে আমরা সফলভাবে বিদায় করেছি। এখন মানুষ ট্যাক্স দিতে চায়। ট্যাক্স দেওয়াকে বাহাদুরী মনে করে। তরুণ প্রজন্মও ট্যাক্স দিতে আগ্রহী। আমাদের ই-টিআইএন নিবন্ধন সাড়ে ২৮ লাখ ছাড়িয়েছে, এ সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। তাই আগামী বাজেট উচ্চাবিলাসী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ