ঢাকা, শনিবার 06 May 2017, ২৩ বৈশাখ ১৪২৩, ০৯ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বায়ু দূষণের বৃহত্তম উৎস হবে রামপাল

রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র

# অকালে প্রতিবছর মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়বে ৬ হাজার মানুষ 

# প্রতিবছর ২৪ হাজার শিশু কম ওজনে জন্ম নিবে 

# নরসিংদী থেকে কলকাতা পর্যন্ত দূষণ ছড়াবে 

স্টাফ রিপোর্টার : আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিনপিস এর কয়লা ও বায়ু দূষণ বিশেষজ্ঞ মিঃ লরি মাইলিভিরতা বলেছেন রামপালে প্রস্তাবিত ১৩২০ মেগাওয়াট মৈত্রী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র সারা বাংলাদেশের বায়ু দূষণকারী উৎসের মধ্যে বৃহত্তর একক উৎস হবে।

সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটি, ডক্টরস ফর হেলথ এন্ড এনভায়রনমেন্ট ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এর যৌথ উদ্যোগে গতকাল শুক্রবাব ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি একথা বলেন। এতে স্কাইপি’র মাধ্যমে মূল বক্তব্য রাখেন আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিনপিস এর কয়লা ও বায়ু দূষণ বিশেষজ্ঞ মিঃ লরি মাইলিভিরতা। ‘রামপাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র : সম্ভাব্য বায়ু দূষণ, বিষাক্ততা ও মানবদেহের উপর প্রভাব’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক এডভোকেট সুলতানা কামালের সভাপতিত্বে নির্ধারিত আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট শিশুবিশেষজ্ঞ ও ডক্টরস ফর হেলথ এন্ড এনভায়রনমেন্টের সভাপতি অধ্যাপক ডা. নাজমুন নাহার, স্বাস্থ্য গবেষক অধ্যাপক ডা. এম আবু সাঈদ, সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব ও বাপা’র সাধারণ সম্পাদক ডাঃ মোঃ আব্দুল মতিন এবং সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য শরীফ জামিল। সম্মেলনে মহিদুল হক খান, রুহিন হোসেন প্রিন্স ও মিহির বিশ্বাসসহ বাপা ও সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির অন্যান্য সদস্যগণ উপস্থিত ছিলেন।

লরি মাইলিভিরতা তার গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করে আরো বলেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উদগীরণ সুন্দরবন ইকোসিস্টেমসহ সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের এবং খুলনা, অশোকনগর, কল্যাণগড়, সাতক্ষিরা, বেগমগঞ্জ, বশিরহাট, নরসিংদি, নোয়াখালী, বাসীপুর ও কুমিল্লা অঞ্চলের উপরের বাতাসে বিষাক্ত ধূলিকণার মাত্রা বা পরিমাণ অধিকতর খারাপ করে দেবে। ঢাকা ও কলকাতার বাসিন্দারা, বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা বায়ু দূষণে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হবে। ঢাকার পাশ্ববর্তী নরসিংদী থেকে শুরু করে কলকাতার বসিরহাট পর্যন্ত এ দূষণ ছড়াবে। তিনি বলেন, সমগ্র কর্মক্ষম সময়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্গমন- স্ট্রোক, ফুসফুসের ক্যান্সার, বয়স্কদের হৃদযন্ত্রের ও শ্বাসতন্ত্রের রোগসমূহ, সাথে সাথে শিশুদের শ্বাস-প্রশ্বাসের উপসর্গ-এর ঝুঁকি অনেকগুণ বাড়িয়ে দেবে। এমনকি বাংলাদেশের বর্তমান বায়ু দূষণ মাত্রা যদি শূন্য হয়, কেন্দ্রটি নিজে একা ৬,০০০ (ছয় হাজার) মানুষের অকাল মৃত্যুর এবং ২৪,০০০ (চব্বিশ হাজার) কম ওজনের শিশুর জন্মের কারণ হবে। দিনের সময় কেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ প্রভাব হবে, কেন্দ্রটি কাছাকাছি অঞ্চলের পরিবেষ্টনকারী বাতাসের ২৪ ঘন্টার গড় নাইট্রোজেন অক্সাইড মাত্রা বর্তমান জাতীয় নগর গড়ের ২৫% পর্যন্ত বৃদ্ধি করবে, এবং সালফার ডাই অক্সাইড মাত্রা নগর গড়ের ৫০% পর্যন্ত বৃদ্ধি করবে। তিনি আরো জানান, অত্র অঞ্চলে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশী হওয়ায় ও প্রজেক্টে প্রণীত দুর্বল নির্গমন মাত্রার ব্যবহারের জন্য এই রকম আকারের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রক্ষিপ্ত বস্তুকণা স্বাস্থ্য প্রভাব তুলনামুলকভাবে বেশী হবে। টেন্ডারে নির্ধারিত সালফার ডাই অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, ধূলিকনা ও পারদ-এর নির্গমণ মাত্রা, প্রচলিত সেরা নিয়ন্ত্রণ মানদন্ড ও স্টেট-অভ-আর্ট প্রযুক্তির নির্গমণ মাত্রার চেয়ে পাঁচ হতে দশগুণ পর্যন্ত বেশী। তিনি জানান, কেন্দ্রটি অতি উচ্চ মাত্রায় শক্তিশালী স্নায়ুবিষ-‘পারদ‘ উদগীরণ করতে পারে যা শিশুদের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত করবে। রামপাল প্লান্ট হতে নির্গত পারদ, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চারিপার্শ্বের প্রায় ৭০ বর্গকিলোমিটার এলাকার মাছকে খাওয়ার অযোগ্য করার জন্য যথেষ্ট হবে। উপরন্তু প্লান্টের জীবদ্দশায় ১০,০০০ কেজি পারদ মিশ্রিত কয়লার ছাই পুকুরে জমা হবে যা বন্যায় প্লাবিত হতে পারে। এই অতিরিক্ত পারদ সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরের জলজ খাদ্য চক্রকে আরো ঝুঁকিতে ফেলবে, লক্ষ লক্ষ মানুষের উপর প্রভাব পড়বে যারা ঐ মাছ/জলজ প্রাণী খাবে।

এডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, পরিবেশ-প্রতিবেশ ও মানবিক দিক বিবেচনায় কয়লা ভিত্তিক প্রকল্প কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, যা আজ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত। তিনি বলেন, আমরা বারবার বিজ্ঞান ভিত্তিক তথ্য দিয়ে আসলেও সরকার এসব বিষয়গুলোকে কোন প্রকার বিবেচনায় না নিয়ে, বরং অসত্য তথ্য দিয়ে এরকম একটি সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রকল্প বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে। সরকার মুখে বললেও সুন্দরবন বাঁচানোর জন্য কোন প্রযুক্তি ও পরিকল্পনা রামপাল প্রকল্পে নেই। এই প্রকল্প নিয়ে সরকারের যে ইআইএ রিপোর্ট সেটি বিজ্ঞান ভিত্তিক নয় ও তার কোন স্বচ্ছতা নেই, আর এটি আমরা আগেই প্রত্যাখ্যান করেছি। 

তিনি বলেন, আমরা কোন স্বার্থ বা কারো সাথে আক্রোশ নিয়ে কোন কথা বলছি না। শুধুমাত্র সুন্দরবন রক্ষা এবং পরিবেশ-মানবিক ও জাতিকে রক্ষার স্বার্থেই রামপাল প্রকল্পের বিরুদ্ধে কথা বলছি এবং সেটা যথেষ্ট বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য নিয়েই বলছি। সংবিধানে স্বীকৃত জনগণই রাষ্ট্রের মালিক, তাই জনগনের স্বার্থ ও মতামতকে বিবেচনায় নিয়ে সুন্দরবন বিনাশী রামপাল প্রকল্প বাতিল করার আবারও জোর দাবি জানান তিনি।

অধ্যাপক ডা. নাজমুন নাহার বলেন, একদিকে চিকিৎসা বিজ্ঞান যখন শিশু মৃত্যুহার কমানোর জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং অনেক সফলতাও অর্জন করছে। অন্যদিকে সম্ভাব্য রামপাল প্রকল্পের নির্গত দূষণের কারণে ছয় হাজার শিশুর অকাল মৃত্যু ও ২৪ হাজার শিশু কম ওজন নিয়ে জন্ম গ্রহণ করবে, যার বিরাট অংশ পঙ্গুত্ব নিয়ে সমাজের বোঝা হয়ে থাকবে। আমাদের দেশে পরিবেশ সংকট এবং মা’দের বিষযুক্ত অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের কারণে ৪৮% ভাগ শিশু এমনিতেই স্বল্প ওজন নিয়ে জন্ম লাভ করছে। রামপালে ক্ষতিগ্রস্তরা যোগ হলে আমরাতো শিশু স্বাস্থ্য প্যরামিটারে আবারও পিছিয়ে যাব। গর্ভবতী মায়েরা মাছ ও শাকসবজির ওপরই অনেকটা নির্ভরশীল, অথচ এগুলোতেই রয়েছে ফরমালিন অথবা রাসায়নিক পদার্থ। বৈজ্ঞানিক তথ্য দিয়ে দেখা গেছে, রামপাল প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এর বিষাক্ততা সাগর-নদী ও মাটির সাথে মিশে গিয়ে শুধু ঐ এলাকা নয় বাংলাদেশের বিশাল অঞ্চলে এর প্রভাব পড়বে। এতে মাছ-শাকসবজিসহ কৃষিজমিতেও বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ ছড়িয়ে পড়বে। এর কুফলে ভবিষ্যতে শুধুমাত্র কম ওজনই নয়, প্রতিবন্ধী শিশু জন্মানোর আশংকা রয়েছে। তাই ভবিষ্যত সুস্থ প্রজন্মের স্বার্থেও রামপাল প্রকল্প বিষয় সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে।

অধ্যাপক ডা. এম আবু সাঈদ বলেন, রামপাল প্রকল্পের প্রভাবে মাটি-পানি-বায়ু দূষণ বাড়বে। যার প্রভাব পড়বে দেশের জনস্বাস্থ্যের ওপর। এই প্রকল্প থেকে নির্গত পারদ ও অন্যান্য দূষণের কারণে শিশুদের মস্তিষ্কের অসম্পূর্ণতা থেকে যায় এবং তার ফলে ¯œায়ুবিক ও মানসিক সমস্যা নিয়ে তারা জন্মগ্রহণ করবে, তৈরী হবে এক দৈহিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু প্রজন্ম। অতএব রামপাল প্রকল্প অবশ্যই পরিত্যাজ্য।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ