ঢাকা, শনিবার 06 May 2017, ২৩ বৈশাখ ১৪২৩, ০৯ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

জীবনযুদ্ধে জয়ী রাজাপুরের  শারমিনের এসএসসি জয়

ঝালকাঠিতে প্রতিবাদী কিশোরী শারমিনকে সম্মাননা ক্রেস্ট ও সনদ প্রদান করছেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু এমপি

মোঃ আতিকুর রহমান, ঝালকাঠি : বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া সাহসী শারমিন জীবনযুদ্ধে জয়ী হয়ে আন্তর্জাতিকভাবে সাহসী নারী হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া সেই শারমিন এবার এসএসসি জয় করেছে। রাজাপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে জিপিএ ৪.৩৮ পেয়েছে। এতেও পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারে নি শারমিন। তার আকাক্সক্ষা ছিলো জিপিএ ৫ পাওয়া। জীবনের বিভীষিকাময় বর্ণনা দিতে গিয়ে শারমিন জানায়, বয়স কম হলেও তখন এটুকু বুঝতে পারছিলাম, আমার ওপর যা হচ্ছে তা পুরোপুরি অন্যায়। আমার মায়ের ইচ্ছায়, পৃষ্ঠপোষকতায় সেই অন্যায় সিদ্ধান্ত আমার ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছিল। সে বলে, ‘আমি বিয়ের ব্যাপারে শুরুতেই মাকে না করে দিই। কিন্তু মা কিছুতেই এটা মানেননি বরং চাপ প্রয়োগ করেছেন। শারীরিক নির্যাতন করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে আমি কী করব, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। বাবা বিদেশে থাকেন। কার কাছে যাব, কী করব, কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। একবার চিন্তা করি আত্মহনন করে এই নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্ত হব। আবার ভাবি, এটাও হবে হেরে যাওয়া।’ কিন্তু হেরে গেলে তো চলবে না। তাই এই চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে শারমিন। ‘সিদ্ধান্ত নিই, যে করেই হোক আমাকে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। এরপর নিজে থেকেই সাহসী হলাম। একদিন বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে এক সহপাঠীকে বিষয়টি জানাই। এরপর চলে যাই সরাসরি থানায়। মা আর ওই ছেলের বিরুদ্ধে মামলা করি।’ ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সত্যনগর গ্রামের কবির হোসেনের মেয়ে শারমিন। মা গোলেনূর বেগম। কবির হোসেন সৌদিপ্রবাসী হওয়ায় শারমিনকে নিয়ে তার মা গোলেনূর রাজাপুর শহরের থানা সড়কে ভাড়া বাড়িতে থাকতেন।

২০১৫ সালের জুলাই মাসের কথা। শারমিন তখন রাজাপুর পাইলট বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী। মা গোলেনূর এই বয়সেই শারমিনের বিয়ে ঠিক করেন প্রতিবেশী স্বপন খলিফার (৩২) সঙ্গে। শারমিন মায়ের এই সিদ্ধান্তে রাজি না হওয়ায় নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করেন। এতেও টলেনি সে। পরে শুরু হয় শারীরিক নির্যাতন। ২০১৫ সালের ৬ আগস্ট। শারমিনকে চিকিৎসা করানোর কথা বলে তার মা খুলনায় নিয়ে যান। সেখানে গিয়ে দূর সম্পর্কের এক মামার বাড়িতে তোলেন। সেখানে আগে থেকেই ছিলেন স্বপন। ৭ আগস্ট সকালে শারমিন বাসা থেকে কৌশলে পালিয়ে রাজাপুরের উদ্দেশে রওনা দেয়। স্বপন ও তার লোকজন শারমিনের পিছু নেন। পিরোজপুরে এসে কথিত স্বামী স্বপন ও তার লোকজন শারমিনকে ধরে ফেলেন এবং বাস থেকে নামিয়ে রাজাপুরে নিয়ে যান। এখানে এনে শারমিনদের থানা সড়কের বাড়িতে আটকে রাখেন। ১৬ আগস্ট এই বন্দীদশা থেকে পালিয়ে সহপাঠী নাদিরা আক্তারের বাড়িতে যায় এবং সব খুলে বলে। এরপর দুজনে মিলে স্থানীয় সাংবাদিকদের সহায়তায় সরাসরি ওই দিন রাতে রাজাপুর থানায় হাজির হয়। মা ও কথিত স্বামীর বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করে। পরে পুলিশ শারমিনের মা গোলেনূর বেগম ও কথিত স্বামী স্বপন খলিফাকে গ্রেফতার করে। আর তাকে ঝালকাঠির জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মো. শফিকুল করিম তার দাদি দেলোয়ারা বেগমের জিম্মায় দেন। এরপর থেকে সে দাদির কাছে থেকেই পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। শারমিনের এই সাহসিকতার জন্য স্বর্ণকিশোরী ফাউন্ডেশন ২০১৫ সালে তাকে স্বর্ণকিশোরী পুরস্কার দেয়। চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল সাহসী নারী হিসেবে সে আন্তর্জাতিক পুরস্কার পায়। এখন লক্ষ্য কী? শারমিন দৃঢ়তার সঙ্গে বলে, ‘আমি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাই। আইনজীবী হওয়ার ইচ্ছা আছে। তার দাদি দেলোয়ারা বেগম এখন শারমিনকে নিয়ে এই বাড়িতেই থাকেন। সবুজ ছায়াঘেরা সত্যনগর গ্রামে তাদের বাড়িটা বেশ নির্জন-নিরিবিলি। দেলোয়ারা বেগম বললেন, ‘ওরে নিয়া খুব চিন্তা আমার। প্রতিদিন স্কুলে নিয়া যাই, আবার সঙ্গে নিয়া আসি। বাইরে কোথাও গেলে সঙ্গে যাই। ওর জীবনটা ধ্বংসের মুখে ফেলে দিয়েছিল ওর মা। খুব সাহস করে একাই এর প্রতিবাদ করেছে। শত বাধা-বিপত্তির মধ্যেও নিজের সিদ্ধান্ত পাল্টায়নি। এখন সবাই ওকে নিয়ে গর্ব করে। আমরাও গর্বিত।’ শারমিনকে সাহায্য করেছিল সহপাঠী নাদিরা আক্তার। সে বলল, ‘ভালো লাগছে ওর দুঃসময়ে আমি পাশে ছিলাম।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ