ঢাকা, শনিবার 06 May 2017, ২৩ বৈশাখ ১৪২৩, ০৯ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

গণপরিবহন সংকট দূরীকরণে সরকারের দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত

আবু মালিহা : আমাদের দেশের সড়ক ও জনপথ কতটুকু নিরাপদ তা এখনো কেউ বলতে পারে না। বেসরকারী হিসেব মতে ঢাকা শহরে ৫ থেকে ৭ লক্ষাধিক গাড়ি বা পরিবহন চলাচল করে। এর মধ্যে সরকারী গাড়িসহ বেসরকারী গাড়ী বা পরিবহন চলাচলের মাধ্যমে জনপরিসেবা বা জনগণের কল্যাণে নিয়োজিত থাকে। অর্থাৎ যানবাহন ছাড়া আজকাল যাতায়াত ব্যবস্থা চিন্তা করা যায় না। বিশেষ করে সাধারণ জনগণ বিভিন্ন বিভিন্ন কাজে যাতায়াতের জন্য বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও অফিস আদালতে যাওয়া আসার জন্য গণপরিবহন ছাড়া সম্ভব হবে না বা যথাসময়ে কর্মস্থলে পৌঁছা দুষ্কর হয়ে যাবে, তাই গণ-পরিবহনের গুরুত্ব সর্বাধিক। কিন্তু বাংলাদেশের এ ব্যবস্থা কতটুকু স্বস্তিদায়ক বা জনকল্যাণে নিয়োজিত! যদি দৈনন্দিন জীবনের যাতায়াত ব্যবস্থা চিন্তা করি তবে অবশ্যই বলা যায় তা স্বস্তিদায়ক নয় বা সুখকর নয়। এতে বিড়ম্বনা বা দুর্ভোগ যা আছে, তা বলে শেষ করা যাবেনা। প্রতিনিয়তই রীতি বা নিয়ম মাফিক কোন যানবাহনই চলাচল করেনা, পাশাপাশি ভাড়া নির্ধারণ ও সঠিক নয়। এ যাবৎ কাল দেখে আসছি রাজধানী সহ বিভিন্ন জেলা শহরগুলোতে যাত্রী পরিবহনের সাথে ভাড়া নিয়ে নানা ধরনের বাক-বিতন্ডা, উচ্চ-বাচ্চ বা হাতাহাতি পর্যন্ত হয়ে থাকে। অর্থাৎ সরকার কর্র্তৃক বেঁধে দেয়া মূল্যনির্ধারণের চাইতে অধিক ভাড়া আদায়ের একটা অভিযোগ প্রতি নিয়তই শুনতে হচ্ছে এবং এ নিয়ে কখনো কখনো গাড়ির মালিক-শ্রমিক এবং জনগণের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া সহ নানা প্রকার উদ্ভূত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
অর্থাৎ পরিবহন সেক্টরগুলোতে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি অহরহই ঘটে যাচ্ছে। এতে সরকার বা মালিক পক্ষ থেকে কোন প্রকার সমাধান বা সুষ্ঠু নীতিমালা প্রণয়ন বা প্রয়োগের ব্যবস্থা দেখা যায় না। কী জন্য এবং কেন সুরাহা হচ্ছে না, তা কেউ বলতে পারছে না। অথচ কয়েকদিন পরপরই এ নিয়ে মালিক শ্রমিক বা যাত্রী সাধারণের সাথে নানা ধরনের বিতণ্ডাসহ হরতাল, ভাংচুর এবং অবরোধের মত বিষয়গুলো অবলীলায় ঘটে যাচ্ছে। এতে কারো কোন মাথাব্যথা নেই বা দায়বদ্ধতা নেই বলেই মনে হচ্ছে, অনেকটা সেই প্রবাদ বাক্যের মত ‘জোর যার মুল্লুক তার’। মাঝে মধ্যে দু’র্মুখুরা বলে থাকেন যে, অবৈধ সরকার বা অনির্বাচিত সরকার কতটুকুই বা দেশের কল্যাণ করতে পারবে। যাদের অস্তিত্বই হচ্ছে অগণতান্ত্রিক সরকার তাদের দ্বারা জনকল্যাণ চিন্তা খুব বেশি আশা করা যায়না। সে যাই হোক, কিন্তু আমাদের কথা হচ্ছে সাধারণ জনগণের অপরাধ কোথায়! রাজনীতির গ্যাড়াকলে পরে তো সাধারণ জনগণের দুর্ভোগ পোহাবার তো কথা নয়। যে ধরনের সরকারই আসুক না কেন, কোন না কোন নিয়ম-নীতি তো অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে। এ মানবিক বোধ বা শৃঙ্খলা তো থাকা দরকার। অবৈধ সরকার হিসেবেই তো দেশ অনেক দিন যাবৎ এ সরকারের অধীনে চলে আসছে বলে যার অনেকটাই স্থিতিশীল গভর্মেন্ট। দীর্ঘদিন ধরে সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে অবশ্যই একটা দক্ষতা অর্জন করেছে। তারপর কোন না কোনভাবে নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকা- পরিচালনা করছে। সেহেতু সব সেক্টরগুলোকেই তো নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা প্রয়োজন, অন্তত সড়ক পরিবহন যোগাযোগ, রেল যোগাযোগ ও নৌ যোগাযোগসহ সব ধরনের যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটা পরিকল্পনা বা সুনির্দিষ্ট রুল-রেগুলেশন ইস্টাবলিস্ট করা দরকার। নইলে, যে নৈরাজ্য পরিস্থিতি দিনে দিনে এমনভাবে চেপে বসছে তখন আর জনগণ কোন সেবাই পাবে না।
প্রসঙ্গক্রমে বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের গণপরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে সারা দেশে একটা হৈ চৈ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকার যাত্রী পরিবহন ব্যবস্থা বড়ই নাজুক পরিস্থিতিতে রয়েছে যা এখনো নিরসন হয়নি। প্রতিদিনই ভাড়া নিয়ে বাক-বিতন্ডা হচ্ছে এবং স্বাভাবিক কর্মকা- ব্যহত হচ্ছে জনগণের। মালিক পক্ষ সরকারের সাথে সমঝোতায় আসতে পারছে না বলে গাড়ী নামানো বন্ধ করে রাখে এতে পরিবহনের অভাবে রাস্তায় ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয় আবার কেউ কেউ হতাশ হয়ে পদব্রজেই  চলতে হয়। তবুও তো জীবন চালাতে হবে। এহেন পরিস্থিতির নিরসন কীভাবে হবে বা কীভাবে করা উচিৎ সে ব্যাপারে সরকার কী আদৌও চিন্তা ভাবনা করছে। না কি এখানেও রাজনীতির টু-পাইস ইনকামের দিকেই সরকারের মহল বিশেষের নজর বেশী, তা অবশ্য আমরা সাধারণ জনগণ বোধের অগম্য। তা, যাই হোক আমরা চাই এর সত্যিকারের নিরসন এবং জনগণের দুর্ভোগ লাঘব। কিন্তু এর কী কোন সমাধানের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে! সাধারণ জনগণের এটা এক বিরাট প্রশ্ন?
ইতোমধ্যে বিরোধী রাজনীতিকদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সরকার জনগণের ভোগান্তি দেখেও দেখছেন না। সচেতন রাজনীতিকরা বলছেন, ঢাকা শহরে প্রায় দেড় কোটিরও অধিক লোক বসবাস করছে, পরিবহন সংকটের কারণে রাজধানীবাসী চরম বিপাকে পড়েছেন। বিশেষ করে সবচেয়ে বেশী ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন মহিলারা। এতগুলো মানুষকে চরম ভোগান্তির মধ্যে ফেলে দিয়ে সরকার তামাশা দেখছে।
সরকারের কারণেই পরিবহন ক্ষেত্র এহেন নৈরাজ্যজনক অবস্থা চলছে। বর্তমান সরকার জনগণের নির্বাচিত নয় বলেই তারা জনগণের ভোগান্তি দেখেও দেখছেন না।’ এক্ষেত্রে চরম নৈরাজ্যজনক অবস্থার জন্য ঢাকাবাসী সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাহেবকেই দায়ী করছে। তারা বলছেন, ওবায়দুল কাদের বলেছেন, পরিবহন মালিকরা খুবই প্রভাবশালী। জাতি জানতে চায়, এসব প্রভাবশালী লোক কারা? তারা সরকারের ভেতরের লোক কিনা তা জনগণ জানতে চায়? তারা যতই প্রভাবশালী হোকনা কেন তাদের নাম প্রকাশ করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। অন্যদিকে জাতীয় কমিটি সাংবাদিক সম্মেলন করে ২৫ দফা তুলে ধরেছেন। এতে পরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে সেনা মোতায়েনেরও সুপারিশ করা হয়েছে কমিটির নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকে। গত ২২ এপ্রিল রাজধানীর পুরানা পল্টনের মুক্তিভবনে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে এসব সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে। এতে আরো উপস্থিত ছিলেন গণতন্ত্রী পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য নূরুর রহমান সেলিম, জাতীয় কমিটির উপদেষ্টাম-লীর সদস্য হাজী মোহাম্মদ শহীদ মিয়া সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। এতে নেতৃবৃন্দ দৃঢ়তার সাথে বলেন, ২৫ দফা বাস্তবায়ন করলে জাতি দুর্ভোগ থেকে রেহাই পাবে এবং পরিবহন সেক্টরে শান্তি শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। প্রতিটি জাতীয় পত্র পত্রিকা এ সমস্ত সুপারিশ মালা প্রকাশিত হয়েছে।
সত্যিকার ভাবে যদি এ সমস্ত সুপারিশ মালা সরকার নিরপেক্ষভাবে গ্রহণ করে এবং বাস্তবায়নের জন্য আন্তরিকভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করে, তবে আশা করা যায় উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দেয়া যাবে এবং জনগণের দুর্ভোগ লাঘব হবে। পরিশেষে সরকারের কাছে জনগণের আবেদন ঢাকাবাসীর চরম ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে জরুরী ভিত্তিতে সমাধানের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করবে এবং বর্তমান চরম সংকটপন্ন পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাবে। এই প্রত্যাশায় জনগণ সরকারের কাছে অনুরোধ করছে জরুরী ভিত্তিতে এ সংকট উত্তরনের জন্য। তা নাহলে জনগণের আস্থা সরকারের প্রতি শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। পরিশেষে বলতে চাই, গণপরিবহন সংকট দূরীকরণে সরকারের দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।
-লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ