ঢাকা, রোববার 07 May 2017, ২৪ বৈশাখ ১৪২৩, ১০ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মৃত্যুদণ্ড দেয়ার ক্ষেত্রে ভারতে দ্বিমুখী মানদণ্ড কেন -ওয়াইসি

৬ মে, পার্সটুডে : ভারতের মজলিশ-ই ইত্তেহাদুল মুসলেমিন (মিম) প্রধান ব্যারিস্টার আসাদউদ্দিন ওয়াইসি গুজরাট দাঙ্গার সময় বিলকিস বানু গণধর্ষণ-হত্যা মামলায় আসামীদের শাস্তি প্রসঙ্গে দ্বৈত মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ওই মামলায় তিনি হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সরকারকে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করার আহ্বান জানিয়েছেন। ভারতে বহুলালোচিত নির্ভয়া গণধর্ষণ-হত্যা মামলায় সুপ্রিম কোর্ট গতকাল (শুক্রবার) চার আসামিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছে। এর আগে নিম্ন আদালত ও হাইকোর্টও আসামীদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিয়েছিল।
অন্যদিকে, ওই ঘটনার একদিন আগে বৃহস্পতিবার ভারতের মুম্বাই হাইকোর্ট ২০০২ সালে ভয়াবহ গুজরাট দাঙ্গার সময় বিলকিস বানু গণধর্ষণ-হত্যা মামলায় ১১ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাবাসের সাজা দেয়।
হায়দ্রাবাদের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আসাদউদ্দিন ওয়াইসি বলেন, ‘আসামিরা গুজরাট দাঙ্গার সময় কেবল গর্ভবতী বিলকিস বানুকে ধর্ষণই করেনি বরং তার মাসুম শিশু সন্তানকে পাথর দিয়ে থেঁতলে হত্যা করা হয়। বিলকিস বানুর বোন, মা এবং পরিবারের অন্য সদস্যদেরও হত্যা করা হয়েছিল। আমার মনে হয় ওই মামলায় আসামিদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া উচিত ছিল।’
ওয়াইসি বলেন, তিনি হাইকোর্টের রায়কে সম্মান করেন কিন্তু জানতে চান মৃত্যুদণ্ড দেয়ার ক্ষেত্রে দ্বিমুখী মানদণ্ড কেন?
ওয়াইসি বলেন, তিনি ইয়াকুব মেমনের মৃত্যুদ- নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু এটা সকলেই জানেন যে, ১৯৯৩ সালে মুম্বাই বিস্ফোরণ মামলায় তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা ছিল না। তা সত্ত্বেও আদালত তার বিরুদ্ধে আনুষঙ্গিক প্রমাণ পেয়েছিল। 
ওয়াইসি বলেন, গুজরাটে যখন বিলকিস বানুকে গণধর্ষণ করা হয়েছিল এবং তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়েছিল সে সময় নরেন্দ্র মোদি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তার সরকার ওই মামলার সঠিক তদন্ত না করায় সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআইয়ের হাতে তা তুলে দেয়।  
তিনি বলেন, ‘আমি মুসলিম নারীদের অধিকারের (তালাক ইস্যুতে) জন্য কথা বলা মোদি সরকারের কাছে জানতে চাই- তারা কী মুম্বাই হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে যাতে অপরাধীরা মৃত্যুদণ্ডের সাজা পায়?’ 
গুজরাটে মুসলিম নিধনযজ্ঞের সময় নিরাপত্তার সন্ধানে ছোট ট্রাকে চড়ে পালাচ্ছিলেন বিলকিস বানু ও তার পরিবারের সসদস্যসহ আরো ১৭ জন। এদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন বিলকিসের আপনজন। কিন্তু তারা আহমেদাবাদের কাছে দাহোদ জেলার রাধিকাপুরে হিন্দুত্ববাদী দুর্বৃত্তদের কবলে পড়েন। ১৯ বছর বয়সী বিলকিসের চোখের সামনে তার পরিবারের ১৪ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ৪ জন নারী ও ৪টি শিশু। বিলকিসের চোখের সামনে নৃশংসভাবে  পাথরে মাথা থেঁতলে  দিয়ে হত্যা করা হয় তার শিশু সন্তান সালেহাকে। নিহত হন বিলকিসের মা হালিমা এবং তার বোনও। দুর্বৃত্তদের হাতে পাঁচ মাসের গর্ভবতী বিলকিস বানু পাশবিকভাবে ধর্ষিতা হন। তার শরীর ক্ষতবিক্ষত করে দেয় হিংস্র উন্মত্ত জনতা।
বিলকিসকে মৃত ভেবে বিবস্ত্র অবস্থায় ফেলে যায় ওই দুর্বৃত্তরা। সেসময় পুলিশ বিলকিসের ধর্ষণের অভিযোগ না নিয়ে হুমকি দিয়ে বিতাড়িত করে। হাসপাতালের চিকিৎসকরাও সেবাধর্ম শিকেয় তুলে রেখে তাকে সাহায্য করেননি।
কিন্তু বিলকিসের অদম্য জেদ ও সাহসের কাছে পরাস্ত হতে হয় তৎকালীন মোদির পুলিশকে। শেষপর্যন্ত ধর্ষণের অভিযোগ নিতে বাধ্য হয় পুলিশ। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন বিলকিস বানু।
২০০৩ সালের ডিসেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট ওই ঘটনার সিবিআই তদন্তের আদেশ দেয়। ২০০৪ সালের জানুয়ারিতে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে সিবিআই। বিলকিসের পরিবারের সদস্যদের লাশ কবর থেকে তুলে পুনরায় পরীক্ষা করে কেন্দ্রীয় এই তদন্ত সংস্থা।
সাক্ষীদের প্রাণহানির আশঙ্কায় বিলকিসের আবেদনের ভিত্তিতে ২০০৪ সালের আগস্টে সুপ্রিম কোর্ট ওই মামলা মুম্বাই দায়রা আদালতে স্থানান্তর করে।
২০০৮ সালে ১৩ জনকে দোষী সাব্যস্ত করে আদালত। ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে যশবন্ত নাই, গোবিন্দ নাই, শৈলেশ ভাট, রাধেশ্যাম শাহ, বিপিনচন্দ্র যোশী, কেশরভাই ভোহানিয়া, রাজুভাই সোনি, মিতেশ ভাট, রমেশ চন্দন, প্রদীপ মোরধিয়া এবং বাকাভাই ভোহানিয়াসহ ১১ জনের যাবজ্জীবন কারাদ- হয়।
বিলকিস বানুর বয়ান বিকৃত করায় তিন বছরের কারাদণ্ড হয় লিমখেড়া থানার পুলিশ কর্মকর্তা সোমভাই গোরির। পরবর্তীতে তিনি মারা যান।
সাজাপ্রাপ্তরা মুম্বাই হাইকোর্টে শাস্তির বিরুদ্ধে আবেদন করলে আদালত গত ৪ মে বৃহস্পতিবার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা বহাল রাখার নির্দেশ দেয়। অন্যদিকে, নিম্ন আদালতে ধর্ষণ ও হত্যার প্রমাণ লোপাটের সঙ্গে জড়িত থাকা দুই চিকিৎসক, পাঁচ পুলিশকর্মী রেহাই পেলেও মুম্বাই হাইকোর্ট পুনরায় তাদের অভিযুক্ত করেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ