ঢাকা, রোববার 07 May 2017, ২৪ বৈশাখ ১৪২৩, ১০ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বেপরোয়া মাদক-সন্ত্রাস

জীবন বিনাসী মাদকের আগ্রাসনের শিকার দেশের যুুব সমাজ। একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ সে দেশের যুব সমাজ। যুব সমাজ যদি সর্বনাশা মাদকে আসক্ত হয়, প্রতিনিয়ত নানা অবক্ষয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে- তবে সে দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্ঞান-গরীমা, উন্নয়ন ও অগ্রগতি হয় কীভাবে? জাতির ভবিষ্যৎ সমস্যাসংকুল ও অনিশ্চিত না হয়ে পারে কি? আমরা এই কলামে বহুবার বহুভাবে লিখেছি। আজ আবারো লিখছি, আমাদের বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় যুব সমাজের মধ্যে মাদকাসক্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে কেবল বেড়েই চলছে। সরকারি ও বেসরকারি পক্ষ থেকে প্রায়ই বলা হচ্ছে, এদেশের মাদকাসক্তদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশের বয়স ১৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। এতে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় যে, শিশু-কিশোর, তরুণ, যুবক, মহিলা- এমনকি বিভিন্ন পেশাজীবীর মধ্যেও মাদকাশক্তি ভয়াবহ আকারে বিস্তার লাভ করছে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বা এই পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যে সর্বনাশা মাদকাসক্তি ব্যাপক আকার নিয়েছে। এমন অসংখ্য খবর আছে, অবৈধ মাদক পাচারকারী ও চোরাকারবারীরা রাজধানী ঢাকা মহানগর থেকে শুরু করে সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের অবৈধ কালো ব্যবসার বিশেষ টার্গেটে পরিণত করেছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেবল মাদক বিক্রি-ই নয়, মাদক আনা-নেয়া, পরিবহন ও বিপণনের কাজেও তারা শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করছে। বিশেষ করে দেশের সীমান্ত এলাকায় অবৈধ মাদক চোরাকারবারীরা এটি করছে সবচেয়ে বেশি। মরণ নেশা অবৈধ মাদকের অবাধ বিস্তার এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদক আসক্তির সংখ্যা দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার কমে যাচ্ছে, পড়ালেখার প্রতি তাদের আগ্রহ কমছে, শিক্ষার মান ধসে পড়ছে এবং শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশের সমূহ অবনতি ঘটে চলেছে।
আমাদের এ কথাগুলো কারো কারো কাছে শুনতে অপ্রিয় হলেও অকাট্ট সত্য যে, সারাদেশে মাদকের সহজ প্রাপ্যতা, মাদকের বেপরোয়া বিস্তার ও আসক্তের সংখ্যা বৃদ্ধির আসল কারণ। প্রভাবশালী সংঘবদ্ধ লুটেরা চক্র দীর্ঘ বছর ধরে সাগর, নদী ও বিশাল সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে সর্বনাশা মাদক দেশে ঢোকাচ্ছে। গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিল ও ইয়াবা থেকে শুরু করে এমন কোনো মাদক নেই যা দেশে ঢোকাচ্ছে না। সাগর ও সীমান্ত পথে ঢোকানোর সাথে সাথেই তা দ্রুত ছড়িয়ে দিচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানী চক্র আমাদের বাংলাদেশকে ট্রানজিট কান্ট্রি হিসেবে ব্যবহার করছে বহু বছর ধরে। এদেশে এই চক্রের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক অবশ্যই রয়েছে। চোরাচালান হয়ে আসা মাদকের কিছু অংশ বিশ্বের অন্যান্য দেশে পাচার করা হচ্ছে আর বাকি অংশ এদেশেই বাজারজাত করা হচ্ছে। এদেশে সর্বনাশা মাদকের অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে যেমন শক্তিশালী কোনো ব্যবস্থা আজো গড়ে উঠেনি, ঠিক তেমনি এর চলাচল, ব্যবসা, কেনাবেচা ও সেবন বন্ধেও আইনানুগ কঠোর কোনো ব্যবস্থাই পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ফলে মাদকের বেপরোয়া আগ্রাসন ও ক্ষতি কেবল বেড়েই চলছে।
মাদকাসক্তি অভিশাপ হিসেবে গণ্য। যে কোনো মানুষ জীবনে একবার যে কোনো মাদকে আসক্ত হয়েছে, তার পক্ষে সুস্থ থাকা ও স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সর্বনাশা মাদক সুস্থ মানুষের শুধু শরীরকেই ধ্বংস করে না, তার অন্যান্য সব কিছুকেও ধ্বংস করে দেয়। মানুষ হিসেবে তার গুণ, বৈশিষ্ট্য, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ ধ্বংস করে তাকে পশুর স্তরে নামিয়ে দেয়। সর্বগ্রাসী মাদক একই সাথে মানুষের স্বাস্থ্য, উৎপাদন ক্ষমতা, অপরাধ, নিরাপত্তা ইত্যাদির সাথে তার সংশ্লিষ্টতা প্রতিপণ্ন করে। মানুষের স্বাস্থ্যের অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করে। উৎপাদনশীলতা নিঃশেষ করে দেয়। অপরাধ সংঘটনে প্ররোচকের ভূমিকা পালন করে। সমাজে জননিরাপত্তার যে ভয়াবহ সংকট আমরা প্রতিদিন লক্ষ্য করছি, তার মূলে রয়েছে মাদকের বড় ভূমিকা। এ বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়ার নয় যে, সারাদেশে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, রাহাজানি, অপহরণ, ধর্ষণ, খুন ইত্যাদি মারাত্মক অপরাধের সাথে জড়িতদের বেশিরভাগই বিভিন্ন মাদকে আসক্ত বলেই অপরাধ বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
আসল কথা হচ্ছে, আমাদের মূল্যবান সম্পদ যুব সমাজকে যদি আমরা সুরক্ষা করতে চাই, সমাজে অন্যায়-অপরাধ কমিয়ে আনতে চাই, সারাদেশে সর্বনাশা মাদক ও ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসকে নির্মূল করতে চাই, সমাজকে নিরাপদ ও বাসযোগ্য রাখতে চাই, সমাজের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চাই, সর্বোপরি দেশ ও জাতির কাক্সিক্ষত উন্নয়ন, সমৃদ্ধি এবং কল্যাণ নিশ্চিত করতে চাই, তবে সর্বনাশা মাদক ও ভয়াবহ মাদক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ চূড়ান্ত লড়াই ও বিজয় অবশ্যই অর্জন করতে হবে। দেশ ও জাতিকে মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত করতে হলে মাদকের অনুপ্রবেশ কঠোরভাবে ঠেকাতে হবে, মাদকের অবাধ চলাচল, বিপণন ও কেনাবেচা বন্ধ করতে হবে। মাদক চোরাচালান ও ব্যবসার নেটওয়ার্ক সমূলে গুঁড়িয়ে দিতে হবে এবং মাদক চোরাচালান ও ব্যবসার সাথে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের কথা হচ্ছে, সারাদেশে মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন ও গোটা জাতিকে মাদকের অভিশাপ থেকে মুক্তির জন্য শুধু প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থাই যথেষ্ট নয়, এর জন্য দেশব্যাপী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা বড় বেশি প্রয়োজন। সামাজিক প্রতিরোধের জন্য সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিই পূর্বশর্ত।
দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে মাদক-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সামাজিক, সাংগঠনিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ-পদক্ষেপ নিতে হবে। সব বয়স ও শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে সর্বনাশা ও বেপরোয়া মাদক-সন্ত্রাসের ধ্বংসাত্মক ও ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরা যায় এবং তাদের মধ্যে ক্রমান্বয়ে সচেতনতা ফিরে আসে, তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই মাদকাসক্তের সংখ্যা কমবে। সেই সাথে বেপরোয়া মাদক সন্ত্রাসের মারাত্মক ঝুঁকিও কমে আসে। এক্ষেত্রে সকল স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ ও মাদ্রাসার শিক্ষক সমাজ এবং আলেম-ওলামা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, অভিভাবক মহল ও সমাজের সচেতন মানুষ নিয়ামক ভূমিকা পালন করতে পারেন। আর সরকারকে দেশব্যাপী বেপরোয়া মাদক ও মাদক সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম আরো জোরদার করতে হবে। অবহেলা করলে আদৌ কি সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ