ঢাকা, রোববার 07 May 2017, ২৪ বৈশাখ ১৪২৩, ১০ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বৈশাখী ঝড়

-হারুন ইবনে শাহাদাত
উজানের ঢলে এবার বৈশাখেই হাওর টইটম্বুর। দূর থেকে দেখলে মনে হয় অথৈ সাগর। কাছে গেলে বিশাল বারিধির ওপর ভাসমান শাপলা শালুকের সবুজ পাতা আর সাদা ফুলের অপরূপ দোলা জানান দেয় এটা সাগর নয় হাওর। হাওরের পানিতে সাগরের মতো বড় ঢেউ জাগে না, গর্জনও নেই। আছে মৃদু বাতাসের দোলা। কিন্তু কালবৈশাখী ঝড়ের সময় মন ভোলানো রূপ পাল্টে যায়। হাওরের পানির মিশকালো রঙের দিকে তাকালে বড় বড় সাঁতারুদেরও আত্মা কেঁপে ওঠে। প্রায় প্রতি বছরই নৌকা ডুবে মানুষ মারা যায় কালবৈশাখী ঝড়ে। তারপরও হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবন থেমে থাকে না। ঝড় আসবে জেনেও তারা নৌকা ভাসায়।
জাহিদকে আজ এই বিশাল হাওর পাড়ি দিয়ে ওপারের গাঁয়ে ওর নানাবাড়ি যেতে হবে। ওর নানা ভাইয়া অসুস্থ। ছোট মামা ইঞ্জিন নৌকা নিয়ে ওদের নিতে এসেছেন। নানাবাড়ির কথা মনে হলেই মনটা খুশীতে লাফাতে থাকে। কিন্তু এবারের যাওয়াটা অন্য রকম। এবার খুশীতে নয়, নানা ভাইয়ার জন্য ভালবাসার টানে জাহিদের মনটা ছটফট করছে। ওর তর সইছে না। মায়ের চোখে পানি। এবার আর জাহিদের মা ওর ছোট মামার জন্য বিশেষ কোন আয়োজন করলেন না।
তাড়াতাড়ি নাওয়া-খাওয়া শেষ করে জাহিদ আর তার বোন জায়েদাকে নিয়ে নৌকায় উঠলেন। তীরের বেগে নৌকা চালালেন ছোট মামা। কিন্তু একি? আকাশে কালো মেঘের এত আনাগোনা কেন? বাতাসের ভাব লক্ষণও ভাল মনে হচ্ছে না। ওরা অনেক দূর এসেছে। হাওরের চারদিকে পানি আর পানি। পিছন ফিরলে জাহিদদের বাড়ি, কিন্তু তাও অনেক দূর। নানাবাড়ির দূরত্বও কম নয়। ভয় আর আতংক এসে ভিড় করলো মামার চোখে মুখে। মায়ের অবস্থা বুঝতে পারছে না জাহিদ। নানাভাইয়ার অসুখের খবর শোনার পর থেকেই তার মুখের হাসিখুশী ভাব মিলিয়ে গেছে। মনে মনে দোয়া কালাম পড়ছেন। আঁচল দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে চোখও মুছছেন।
বাতাসের বেগ বেড়ে গেল। এখন দুপুর। কিন্তু মনে হচ্ছে অন্ধকার রাত। কড়াৎ কড়াৎ শব্দে বাজ পড়ছে। বাজ পড়ার শব্দের ঝলকানিতে হাওরের অন্ধকারের রূপ আরো ভয়ংকর মনে হয় জাহিদের কাছে। সে নৌকার ছইয়ের ভিতর ওর মায়ের কাছে গিয়ে বসে সুরা এখলাস, ফালাক, নাস পড়তে লাগলো।
মা মনে মনে পড়ছেন, আয়াতুল কুরসি। মামা চিৎকার করে দোয়া ইউনুস পড়ছেন আর শক্ত হাতে হাল ধরে আছেন।
না মামার শক্ত হাতের বাঁধন মানছে না হাল। বাতাসের দোলায় টালমাটাল নৌকা। ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেছে। নৌকা কোন দিকে চলছে ওরা কেউ বুঝতে পারছে না। এই বুঝি ডুবে যায়। মামা নৌকার পাটাতলে বসে পড়লেন। জাহিদ সুরা পড়ার ফাঁকে দোয়া পড়ছে, ‘হে আল্লাহ্ এ বাতাস তোমার হুকুমেই বইছে, শুধু তুমিই পার এ বাতাসকে আমাদের জন্য কল্যাণময় করতে।’ কতক্ষণ চললো কালবৈশাখীর তা খেয়াল করার ফুরসত ওরা পায়নি। আস্তে আস্তে বাতাস কমে গেল। ওরা লক্ষ্য করলো ওদের নৌকাটি ঠায় দাঁড়িয়ে আছে শাপলা শালুকের লতায় আটকে, কিন্তু এ কোথায়? ছোট মামা লগি দিয়ে নৌকাটি ছাড়িয়ে ভাল করে লক্ষ্য করলেন, সূর্য এখনো ডুবেনি। মেঘের আড়ালে উঁকি দিচ্ছে। পশ্চিম আকাশে আবির রঙ ছড়িয়ে বিদায়ের আয়োজনে ব্যস্ত সূর্যটা।
‘ঐ তো নানাবাড়ির বাঁশঝাড় দেখা যাচ্ছে’ ছইয়ের নীচ থেকে বের হয়ে চিৎকার করে উঠে জাহিদ। মামা তাকিয়ে দেখেন তাই তো । ঐ তো দেখা যাচ্ছে। আর মাত্র পাঁচ মিনিটের পথ। তিনি নৌকার ইঞ্জিন চালু করে আবার শক্ত হাতে হাল ধরলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ