ঢাকা, রোববার 07 May 2017, ২৪ বৈশাখ ১৪২৩, ১০ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

চট্টগ্রামের উন্নয়নে সমন্বয় নেই ॥ নগরীর পানিবদ্ধতা নিরসনে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি

চট্টগ্রাম অফিস : পানিবদ্ধতা দূর করাসহ সামগ্রিক নগর উন্নয়নে চট্টগ্রামে একজন সমন্বয়কারী দরকার। খাল দখল  করে নির্মিত শহরের ১৩৯টি ভবন বিজিএমইএ ভবন ভাঙ্গতে দেয়া সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আলোকেই ভাঙ্গতে কোন বাধা নেই। চট্টগ্রামের উন্নয়নে মহানগরের সংসদ সদস্যদের সমন্বিত উদ্যোগ নেই, অথচ তা জরুরি। চসিকের সাথে চউকের সমন্বয় নেই, যা অপরিহার্য। পানিবদ্ধতা রোধে নাগরিক করণীয়' শীর্ষক মুক্ত নাগরিক সংলাপে আলোচকগণ এ কথা বলেন। মুক্তসংলাপে আলোচকগণ নগর উন্নয়নে  চট্টগ্রামে সমন্বয়কারী হিসেবে  জনপ্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানের প্রধান  হিসেবে মেয়রকেই দায়িত্ব নিতে হবে বলে উল্লেখ করেন। এলক্ষ্যে প্রয়োজনে আইনি ভিত্তি দিয়ে মেয়রকে দায়িত্ব প্রদানের দাবি ওঠে।  মুক্তসংলাপটিতে এক টেবিলে বসে পানিবদ্ধতা সংকটের সমাধান খোঁজার চেষ্টা করেছেন তিনজন ভিসিসহ শিক্ষাবিদ সাংবাদিক স্হপতি প্রকৌশলী, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার ব্যক্তিত্বসহ বিভিন্ন পেশার নাগরিক প্রতিনিধিগণ। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক), চট্টগ্রাম ওয়াসার নগর পরিকল্পনাবিদ, প্যানেলমেয়র,পানিবদ্ধতা স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যানসহ দায়িত্বশীলরা।  পানিবদ্ধতার সংকট তারা চিহ্নিত করে সমাধানের পথ বাতলে দিয়েছেন কিছু পরামর্শ আর প্রস্তবনায়।
থিয়েটার ইন্সটিটিউট, চট্টগ্রাম (টিআইসি) এ আয়োজক সংগঠন চট্টগ্রাম নাগরিক উদ্যোগের আহবায়ক,  চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও সঞ্চালনায় এতে কী নোট উপস্থাপন করেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও সাদার্ন ইউনিভার্সিটির উপউপাচার্য প্রকৌশলী আলী আশরাফ। আলোচনায় প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়( চুয়েট)র উপাচার্য প্রকৌশলী ড. মুহাম্মদ রফিকুল আলম, চট্টগ্রাম বিজ্জান ও প্রযুক্তি বিশ্ব বিশ্ববিদ্যালয় (ইউএসটিসি) উপাচার্য প্রফেসর ডা. প্রভাত চন্দ্র বড়ুয়া, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের প্রসিকিউটর এড. রানা দাশগুপ্ত, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা: সেলিম জাহাঙ্গীর, বিএমএ’র সভাপতি ডা: মুজিবুল হক খান, আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এড. মুজিবুল হক,চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ.কে.এম ফজলুল্লাহ, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী মাহমুদুল ইসলাম খান, চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) প্রকৌশলী নাজমুল হক, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি শাহীনুল ইসলাম, চট্টগ্রাম চেম্বারের পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ চৌধুরী, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনী, আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এড. মুজিবুল হক, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জলাবদ্ধতা বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন, খোরশেদ আলম, নাগরিক উদ্যোগে চট্টগ্রামের প্রধান সমন্বয়কারী প্রকৌশলী অভিজিৎ কুমার দেব প্রমুখ।
পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ও আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুন্যালের প্রসিকিউটর এডভোকেট রানা দাশগুপ্ত বলেন, আমাদের পরিকল্পনা আছে কিন্তু বাস্তবায়ন নেই। সমাধানের পথ বাতলে দেওয়া হয়েছিল ১৯৯৫ সালে প্রণীত নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে মহাপরিকল্পনা গত বাইশ বছরেও হল না কেন? এর বাধা কোথায়? যে কোন সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়নে একজন প্রধান সমন্বয়কারী দরকার।  জনপ্রতিনিধি সংস্থার প্রধান হিসেবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রধান সমন্বয়কারী হতে পারেন। তার ক্ষমতার আইনী ভিত্তি দিতে হবে। তাহলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও বাধা দূর হবে এবং মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে জবাবদিহিতা নিশ্চিত।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির প্রো-ভিসি প্রকৌশলী আলী আশরাফ বলেছেন চট্টগ্রামে ১৯৬৫ সাল থেকে পানিবদ্ধতার সমস্যা ছিল। আমেরিকার মিসিগিনির একটি সংস্থার রির্পোটে এই তথ্য দেওয়া আছে। ১৯৬৩ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সামনে রাস্তায় ৩ ফুট পানি দাড়িয়ে গিয়েছিল। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, চট্টগ্রামের পানিবদ্ধতা নিরসন ও উন্নয়নের জন্য ওয়াসা ও সিডিএর একাধিক মহাপরিকল্পনা রয়েছে। এ সমস্ত মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়ন শেষ হয়নি। কিন্তু আজ পর্যন্ত ওয়াসার পানি নিষ্কাশনে সুষ্ঠু কোন ব্যবস্থাপনা নেই। ১৯৯৫ সালের প্রণীত মহাপরিকল্পনার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮০ কোটি টাকা। এখন লাগবে কয়েক হাজার কোটি টাকা।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রকৌশলী ড. রফিকুল আলম বলেন, আইনের বাধ্যবাধকতা ছাড়া কোন সমন্বয় সম্ভব নই। তাই আইনগত কাঠামোতে সমন্বয় সম্ভব হলে কোন প্রতিবন্ধকতা থাকবে না।
ইউএসটিসি’র ভিসি প্রফেসর ড. প্রভাত চন্দ্র বড়–য়া নগরীর খাল নালাগুলোর বর্তমান ধারণ ক্ষমতা, দিনের বেলায় শহরের লোকসংখ্যা নির্ধারণ ও তার প্রভাব চিহ্নিতকরণে একটি রেপিট সার্ভে করা ও জনসচেতনতা তৈরিতে ডকুমেন্টরির তৈরির তাগিদ দেন। তিনি বলেন, পানিবদ্ধতা বহুমাত্রিক সমস্যা। ভূ-প্রাকৃতিক কারণে অবস্থান এবং জলবায়ু পরিবর্তন এ্ই সমস্যার ক্ষেত্রে প্রভাব রাখে। পানিবদ্ধতা নিরসনে খাল খননের জন্য সরকারি টাকা জুলাই মাসের মধ্যে পাওয়া গেলে  তা কাজে লাগে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাটালের অধ্যক্ষ প্রফেসর সেলিম মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেনচট্টগ্রাম মহানগরীর পানিবদ্ধতা নিরসনে চাই সমন্বিত উদ্যোগ ও বাস্তবমুখী পরিকল্পনা। এ জন্য শুধুমাত্র কোন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোন সরকারি ও আধা সরকারি সংস্থাকে দায়ী করা যাবে না। কারণ এ সমস্যা সমাধানে একাধিক মহাপরিকল্পনা প্রণীত রয়েছে। কিন্তু কোনটি বাস্তবায়ন হয়নি। সমন্বিত উদ্যোগ ও সমন্বয়ের অভাবে এগুলো বাস্তবায়ণ হয়নি। আজ সকালে নগরীর থিয়েটার ইনস্টিটিউটে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা রোধে নাগরিক করণীয় শীর্ষক এক মুক্তসংলাপে বক্তাগণ এ কথা বলেন।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি শাহীনুল ইসলাম বলেছেন, চট্টগ্রাম শহর পানিতে ডুবে থাকলে দেখা গেছে খালের মুখে পাঁচশ গজের মধ্যে কোন পানিপ্রবাহ নেই। প্রায় প্রতিটি মুখগুলোতে ৫-১০টি অবৈধ স্থাপনা আছে। এই অবৈধ স্থাপনার তালিকা আমাদের কাছে আছে। কিন্তু স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি। এর অন্যতম কারণ হলো আমাদের কাছে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার নেই। আমার প্রায় রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ি। তিনি আশা প্রকাশ করেন স্বাভাবিক খালগুলোর পানি প্রবাহের ক্ষেত্রে অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করা গেলে শতকরা পানিবদ্ধতার সমস্যার ৮০ ভাগ নিরসন হবে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ.কে.এম ফজলুল্লাহ বলেন মাস্টার প্ল্যান প্রণয়নের সময় সকল সংস্থাকে যুক্ত করার চেষ্টা হয়। ১৯৮৮ সালের আগে চট্টগ্রাম ওয়াসায় ওয়াল্ড ব্যাংক আসেনি। তারপরেও আমরা একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ণ করতে পেরেছি।
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন চট্টগ্রামের সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী মো: হারুন বলেছেন আমরা যদি এই মুক্ত সংলাপের আলোচনার সংক্ষিপ্ত বিষয়বস্তু সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে তুলে ধরতে পারি তাহলে এই উদ্যোগ সফল হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী মাহমুদুল ইসলাম খান বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে এখন সাড়ে ৯ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ঢুকতে পারে। বন্দরের জেটিগুলোকে নাব্যতার কোন সমস্যা নেই। তিনি মহেশখাল বাঁধ প্রসঙ্গে বলেন জোয়ারের পানি যেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি রেজাউল করিম বলেন-চাকতাই খাল ভরাটের জন্য আশেপাশের অধিবাসীরাই দায়ী। তাদের মধ্যে নাগরিক সচেতনতার অভাব রয়েছে।
অন্য আলোচকগণ বলেন, চট্টগ্রামের পানিবদ্ধতার সমস্যাটি তিন দশকেরও বেশি। এ পানিবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদী কোন পরিকল্পনা না থাকায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে বেকায়দায় পড়তে হচ্ছে। মনে রাখতে হবে পানিবদ্ধতা নিরসনে সিটি কর্পোরেশনের পাশাপাশি সিডিএ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সড়ক ও জনপদ বিভাগ, ওয়াসা, পানি সম্পদ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সমান দায়িত্ব রয়েছে। এ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এ সংস্থাগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমন্বিত উদ্যোগের অভাব সমস্যা দিন দিন প্রকটতর হচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ