ঢাকা, রোববার 07 May 2017, ২৪ বৈশাখ ১৪২৩, ১০ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সরকার ভারতকে খুশি করতে রামপালে ‘গ্যাস চেম্বার’ স্থাপন করছে

খুলনা অফিস : বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, সুন্দরবন সংলগ্ন পশুর নদীর তীরে নির্মাণাধীন রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র দক্ষিণাঞ্চলকে বিষাক্ত গ্যাস চেম্বারে পরিণত করবে। কয়লা পোড়ানোর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় সুন্দরবনের জীব বৈচিত্র্য ধ্বংস হবে, বন্যপ্রাণী প্রজনন ক্ষমতা হারাবে, নদ-নদীতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হবে। উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্র চাই, তবে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হলে সুন্দরবনের অক্সিজেন কারখানাটি বাঁচানো যাবেনা। লক্ষ্য কোটি মানুষের প্রতিবাদের মুখেও অগণতান্ত্রিক সরকার শুধুমাত্র ভারতকে খুশি করতে এখানে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে অনড় রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, দেশ থেকে পাচার হওয়া টাকা দিয়ে সরকারি দলের নেতারা তাদের স্ত্রীদের নামে কানাডায় বাড়ি বানিয়েছেন। কানাডার সেই এলাকাটি বেগমগঞ্জ নামে পরিচিতি পেয়েছে। সরকারি দলের নেতারা উন্নয়নের নামে লুটপাট করে ফুলে-ফেঁপে নাদুস-নুদুস হচ্ছে। তারা সরকারি ব্যাংক থেকে ভুয়া নামে ঋণ নিয়ে বিদেশে অর্থ পাচার করেছে। তিনি হাওরের দুর্গত এলাকার অসহায় মানুষের ক্রন্দনকে নিয়েও আওয়ামী লীগের মন্ত্রী এমপিরা বিদ্রুপ ও তামাশা শুরু করেছে। যেখানে হাজার হাজার মানুষ অর্ধাহারে অনাহারে থেকে দিন কাটাচ্ছে। আর তাদেরকে সাহায্য সহযোগিতা না করে বিনাভোটের মন্ত্রী এমপিরা নোংরামী শুরু করেছে। তাদের সুরে সর মিলাচ্ছেন কতিপয় আমলারা। তার মধ্যে এক আমলা ইতোমধ্যে বলেছে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার অর্ধেক লোক যদি মারা না যায়, তাহলে সে এলাকাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করা যায় না। এরা মানুষ নয়, নরপিসাশ। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা ময়ুর সিংহাসন রক্ষা করতে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে ভারতকে খুশী করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ১০ টায় খুলনা প্রেসক্লাব মিলনায়তনে দেশের বর্তমান রাজনীতি, দলীয় অবস্থান ও ঐক্য সম্পর্কে মহানগর বিএনপির প্রতিনিধি সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
খুলনা মহানগর বিএনপি’র উদ্যোগে প্রতিনিধি সভায় বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও খুলনা মহানগর সভাপতি সাবেক এমপি নজরুল ইসলামএর সভাপতিত্বে প্রধান বক্তা ছিলেন চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য এম নুরুল ইসলাম দাদু ভাই। বিশেষ অতিথি ছিলেন কেন্দ্রীয় তথ্য বিষয়ক সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল, সহ-প্রচার সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আলীম, বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ও জয়ন্ত কুমার কুন্ডু, সহ-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার মো. আশরাফউদ্দিন বকুল, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য রবিউল ইসলাম রবি। এতে বক্তৃতা করেন মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কেসিসির মেয়র মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, জেলা বিএনপির সভাপতি এডভোকেট এস এম শফিকুল আলম মনা, মহানগর  সিনিয়র  সহ-সভাপতি সাহারুজ্জামান মোর্ত্তজা, কাজী সেকেন্দার আলী ডালিম, সৈয়দা নার্গিস আলী, মীর কায়সেদ আলী, জাফরউল্লাহ খান সাচ্চু, সিরাজুল ইসলাম, ফখরুল আলম, অধ্যক্ষ তারিকুল ইসলাম, এডভোকেট ফজলে হালিম লিটন, অধ্যাপক আরিফুজ্জামান অপু, সিরাজুল হক নান্নু, এস এম আরিফুর রহমান মিঠু, শফিকুল আলম তুহিন, এডভোকেট মাসুদ হোসেন রনি, এডভোকেট গোলাম মাওলা, আজিজুল হাসান দুলু, আজিজা খানম এলিজা, মুজিবর রহমান, শেখ সাদী, হাসান মেহেদী রিজভী, সরদার রবিউল ইসলাম, এম এ সালেক, শেখ ইমাম হোসেন এবং অধ্যাপক ওয়াহিদুজ্জামান। বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান মুরাদের পরিচালনায় পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে কর্মসূচির সূচনা করেন ওলামা দলের মহানগর সাংগঠনিক সম্পাদক হাফেজ শফিকুল ইসলাম। এরপর গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামে নিহত সকল রাজনৈতিক কর্মী এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাস্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম ও আরাফাত রহমান কোকোর রুহের মাগফিরাত করে বিশেষ দোয়া মোনাজাত করা হয়। রুহুল কবির রিজভী সভার সূচনাতে একবার প্রারম্ভিক বক্তব্য রাখেন। এরপর তৃণমূলের কর্মীদের বক্তব্য শেষ হলে তিনি সমাপনী বক্তব্য দেন।
এদিকে বিকেলে একই স্থানে জেলা বিএনপির সভাপতি এডভোকেট এস এম শফিকুল আলম মনার সভাপতিত্বে ও মনিরুল হাসান বাপ্পী ও জিএম কারুজ্জামান টুকুপরিচালনায় প্রতিনিধি সভায় উপরেল্লিখিত কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। এখানে স্থানীয় প্রতিনিধিদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ড. মামুন রহমান, ডা. গাজী আব্দুল হক, সাধারণ সম্পাদক আমীর এজাজ খান, জুলফিকার আলী জুলু, মনিরুজ্জামান মন্টু, সরদার আলাউদ্দিন মিঠু, এডভোকেট মোমরেজুল ইসলাম, শেখ আব্দুর রশিদ, সাইফুর রহমান মিন্টু, আবুল খয়ের খান, ডা. আব্দুল মজিদ, এডভোকেট জি এম আব্দু সাত্তার, মোশাররফ হোসেন মফিজ, হাসনাত রিজভী মার্শাল, খায়রুল ইসলাম জনি, নুরুল আমিন বাবুল, মোজাফ্ফর হোসেন বাবু প্রমুখ।
খুলনা মহানগর ও জেলার সকল ওয়ার্ড, থানা, ইউনিয়ন বিএনপির নেতাকর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর্মসূচিতে অংশ নেন। কর্মসূচিকে ঘিরে সর্বস্তরের কর্মীদের মাঝে উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হয়। প্রতিনিধি সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তৃণমূলের কর্মীরা নানা সমস্যা তুলে ধরেন এবং দলকে সংঘটিত ও ঐক্যবদ্ধ করতে সম্মেলনের মাধ্যমে তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে বিএনপি এবং সকল অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের কমিটি গঠনের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করেন। প্রতিনিধি ও আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ প্রেসক্লাব মিলনায়তনে এবং বিপুল সংখ্যক কর্মী-সমর্থকরা বাইরে রাস্তায় ও প্রেসক্লাব চত্বরে অবস্থান নেন। তারা কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে মিছিলে স্লোগানে স্বাগত জানান।
প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্পর্কে রুহুল কবির রিজভী বলেন, এর মধ্যদিয়ে আমাদের প্রিয় দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব দুর্বল হয়ে পড়েছে। এতে স্বাধীনতা প্রিয় মানুষ ক্ষুব্ধ হয়েছে। বিএসএফ প্রতিদিন বাংলাদেশীদের হত্যা করছে। সামরিক চুক্তির অর্থ আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে বন্ধক রাখা। একাদশ জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে বলেন, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনকে সরকার যাদুঘরে পাঠিয়েছে। দেশে এখন হাসিনা মার্কা গণতন্ত্র চলছে। তার পিতা একদলীয় বাকশালকে চূড়ান্ত রূপ দিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ইতিহাসের বিবৃতি ঘটিয়েছেন এবং জনগনের ভোট ছাড়া একদলীয় বাকশাল কায়েমের পথে অগ্রসর হয়েছেন। এ কারণে শেখ হাসিনার অধীনে জাতীয় নির্বাচন নয়, নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা করেই নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আর সে জন্যই বিএনপি আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সকল বিভেদ অনৈক্য ভুলে ইস্পাত কঠিন ঐক্য গড়ে তুলে ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের পতন নিশ্চিত করতে হবে।
মেঘালয়ের বিষাক্ত পানি প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় বিএনপির এ নেতা বলেন, আকষ্মীক পানির ঢলে মাছসহ আমাদের জলজ প্রাণি মারা গেছে। সরকার এর প্রতিবাদ পর্যন্ত করেনি। স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতি করলে শাস্তি হবে এই মর্মে সংসদে আইন প্রণয়ন হতে যাচ্ছে। যাতে করে এই দুঃশাসনের বিরুদ্ধে লেখকরা সত্য ইতিহাস তুলে ধরতে পারবেনা। সত্য  লিখলে তাদের আদালতের কাঠগড়ায় দাড় করানো হবে।
দেশে অঘোষিত সামরিক শাসন চলছে-উল্লেখ করে তিনি বলেন, আজকের প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতার সত্য ইতিহাস লেখা সম্ভব হবেনা। এ দুঃশাসন এবং অগণতান্ত্রিক পরিস্থিতি থেকে দেশ এবং জাতিকে রক্ষায় তিনি ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনে শরীক হওয়ার জন্য দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রতি আহবান জানান।
সারা দেশে বিএনপির কর্মসূচিতে পুলিশ ও আওয়ামী ক্যাডাররা হামলা চালাচ্ছে অভিযোগ এনে তিনি বলেন, পাঁচ ভাগে দ্বিধা বিভক্ত থাকার পরও সব পক্ষ ছাড় দিয়ে আজকের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে করতে পারবে জানলে পুলিশ প্রশাসন এই ছোট্ট অডিটোরিয়ামেও বিএনপিকে কর্মসূচি করার অনুমতি দিতো না। তিনি বলেন, দেশে এখন গণমাধ্যমগুলো নিয়ন্ত্রিত, কিন্তু সাংবাদিকরা স্বাধীনচেতা। তারা অনেক কিছু লিখতে চাইলেও মালিকপক্ষ সরকারি হুমকির কারণে অনেক সত্য প্রকাশ করেন না, অথবা সরকারের খুশি মতো তথ্য প্রকাশ করেন।
খুলনা বিএনপির গ্রুপিং লবিং প্রসঙ্গে প্রকাশিত নানা সংবাদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপি ইনুর জাসদ নয়। এখানে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা রয়েছে। নানা সমালোচনা ও পক্ষ-বিপক্ষের মধ্য দিয়ে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। শেখ হাসিনা তার ময়ুর সিংহাসনকে রক্ষা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। কিন্ত মনে রাখতে হবে, এ দেশের মাটির গভীর থেকে জাতীয়তাবাদী চেতনার এক একজন সৈনিকের জন্ম হয়। শেখ হাসিনার পুলিশের এতো গুলী নেই নেই যে, সমস্ত জাতীয়তাবাদের সৈনিকদের হত্যা করা যাবে, জাতীয়তাবাদী চেতনাকে এ মাটি থেকে নিঃশেষ করা যাবে। দেশে আবারও নতুন করে মামলা, গণগ্রেফতার  ও নির্যাতন শুরু হয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, গদি রক্ষা করতে এখন তার পুলিশ মৃত ব্যক্তির নামেও মামলা দিচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ