ঢাকা, সোমবার 08 May 2017, ২৫ বৈশাখ ১৪২৩, ১১ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর নিয়ন্ত্রণহীন -দুদক চেয়ারম্যান

স্টাফ রিপোর্টার : মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কাছ থেকে শীর্ষ মাদক কারবারিদের তালিকা নিয়ে সেই ঠিকানায় কাউকে না পেয়ে ক্ষোভ ঝেড়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। গতকাল রোববার রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর আয়োজিত ‘মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন: আমাদের করণীয়’ শীর্ষক এক আলোচনা অনুষ্ঠানে নিজের ক্ষোভ উগরে দেন তিনি।

দুদক চেয়ারম্যান জানান, গত বছরের জুনে অধিদপ্তর থেকে ১৭ বড় মাদক ব্যবসায়ীর তালিকা নিয়ে অভিযানে চালিয়ে দেখেন, সবগুলো ঠিকানাই ভুয়া। “আমার কাছে মনে হয়েছে যে এই নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর আসলে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে কি না? সমস্যাটা কী? সমস্যা মূলত আমার কাছে মনে হয়েছে, টাইম ফর অ্যাকশন অ্যান্ড টাইম ফর চ্যালেঞ্জিং ট্রুথ।”

মাদক ব্যবসায়ীদের তথ্য অধিদপ্তরের কাছে নেই, এটা মানতে নারাজ সাবেক সচিব ইকবাল মাহমুদ। “মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কি জানে না, কারা মাদকের ব্যবসা করে? এটা আমি বিশ্বাস করতে মোটেও রাজি না,” তিনি আগামী এক মাসের মধ্যে সঠিক তালিকা পাঠাতে বলেছেন অধিদপ্তরকে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব ফরিদ উদ্দিন আহম্মদকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “আপনাকেও বলতে চাই অনুগ্রহ করে মাদক ব্যবসায়ীদের সঠিক ঠিকানা আমাদেরকে দেন।” সঠিক ঠিকানা ছাড়া অভিযানে গেলে নির্দোষ ব্যক্তিরাও অন্যায়ের শিকার হতে পারেন বলে নিজেদের সতর্ক অবস্থান বলে জানান দুদক চেয়ারম্যান। কমিশনের কাছে দেশের বড় ৩৬৫ জন মাদক ব্যবসায়ীর একটি তালিকা থাকার কথা জানান তিনি। “আপনাদের (আলোচক) একজন ইতোমধ্যে বলেছেন, এর মধ্যে অনেক ক্ষমতাধর লোকজনও আছেন। আমরা তা জানি।আমরা তাদেরকে কোনো ছাড় দেব না। হয় মাদকের ব্যবসা ছাড়বেন, অথবা জেলে যাবেন।”

মাদক ব্যবসা এখতিয়ারের মধ্যে না হলেও এর সঙ্গে দুর্নীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকায় তা দুদকের আওতার মধ্যে চলে আসে বলে জানান ইকবাল মাহমুদ। “এই ব্যবসায়ে জড়িতরা কেউ ট্যাক্স দেয় না, এটা একটি অবৈধ ব্যবসা। এটা কালো টাকা, এটা দুর্নীতির টাকা। দুর্নীতি দমন কমিশন মাদক ব্যবসায়ীদের বিষয়ে সজাগ রয়েছে।”

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ইকবাল মাহমুদের বক্তব্য শেষে কয়েকজন আলোচক সচিব ফরিদ উদ্দিন আহম্মদের কাছে তালিকার ভুল ঠিকানা নিয়ে প্রশ্ন করেন। তখন সচিব বলেন, “ডিজি (অধিদপ্তরের মহাপরিচালক) সাহেব জয়েন করেছেন আমার পরে। আমরা দুজনই একেবারে নতুন। এক মাস আমাদের সময় দেন, এক মাস পর আমরা তালিকাসহ দেব।”

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব ফরিদ উদ্দিন আহমেদ মাদক নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সুপারিশ করেন। তিনি বলেন, মাদক সরবরাহের রাস্তা বন্ধ, সচেতনতা বৃদ্ধি, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে মাদক সচেতনতা বাড়াতে সেমিনার, কর্মশালা, স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সমন্বয়, মনিটরিং জোরদার করাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

এরপর ফের মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, “প্রত্যেকটি জেলার হিসাব তাদের (অধিদপ্তর) কাছে আছে। আমি তাদেরকে এক মাস সময় দিয়েছি, আমি যখন ধরেছি, এটা শেষ করব।” অধিদপ্তরের বাইরে অন্য কারও কাছে মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা থাকলেও তা কমিশনকে দেওয়ার অনুরোধ জানান ইকবাল মাহমুদ।

৫ বছরে ইয়াবাসেবী বেড়েছে ৭৭% : অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী। জাতিসংঘ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে মাদকাসক্তদের মধ্যে ৮৪ শতাংশ পুরুষ এবং ১৬ শতাংশ নারী। “সমাজের বিত্তশালী থেকে শুরু করে নারী, শিশু ও কিশোররাও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।” আগে যারা ফেনসিডিলে আসক্ত ছিল, তারা বর্তমানে ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়েছে বলে জানান অরূপ রতন। “গত ২০০৮ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে ইয়াবাসেবীর সংখ্যা ৭৭ শতাংশ বেড়েছে।” এ ছাড়া ৯৮ ভাগই ধূমপান থেকে মাদকাসক্ত হন।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের সদস্য অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার। মা-বাবাদের সন্তানকে সময় দিতে হবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক পরিমল কুমার দে সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন।

অনুষ্ঠানের সভাপতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সালাহউদ্দিন মাহমুদ বলেন, মাদকের ভয়াবহতা রোধে অধিদপ্তর স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

সালাহউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘২০১৫ সালে ১০ লাখ পিস ইয়াবা ধরা হয়েছে। গত বছরে ৩৫ লাখ ইয়াবা আটক করা হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ৫০ বার অভিযান চালানো হয়েছে। আমরা চাইলেই মাদক রাতারাতি বন্ধ করতে পারব না। এর জন্য সামাজিক আন্দোলন দরকার।’ মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সীমাবদ্ধতা আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি নেই, এটা একটা বড় সীমাবদ্ধতা।’ এটি হলে তাঁদের অন্যের মুখাপেক্ষী হতে হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের পক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের রাশেদা রওনক খান, শিক্ষার্থীদের পক্ষে গ্রিংন ইউনিভার্সিটির এলিছা ইসলাম পায়েল এবং অভিভাবকদের পক্ষে রাজধানীর দোলাইড়পাড়ের বাসিন্দা সিরাজ মিয়া বক্তব্য দেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ