ঢাকা, সোমবার 08 May 2017, ২৫ বৈশাখ ১৪২৩, ১১ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ঝিনাইদহের মহেশপুরে জঙ্গি আস্তানায় অভিযান ॥ নিহত ২

আব্দুর রাজ্জাক রানা, ঝিনাইদহ থেকে ফিরে : খুলনা বিভাগের ঝিনাইদহের মহেশপুরের বজরাপুরে একটি জঙ্গি আস্তানা ঘিরে রাখে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিসিটিসি) ইউনিটের সদস্যরা। উপজেলার বজরাপুরের হঠাৎপাড়ার জঙ্গি জহুরুল ইসলামের বাড়িতে রোববার ভোর ৪টার দিকে সিসিটিসি ইউনিটের সদস্যরা অভিযান চালালে আত্মঘাতী বোমা হামলায় দুই জঙ্গি নিহত হয়। 

ঝিনাইদহ পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান জানান, জঙ্গিদের আত্মঘাতী বোমা হামলায় কাউন্টার টেরোরিজমের এডিশনাল এসপি নাজমুল হাসান, এস.আই মজিবুর রহমান ও ডিএসবির এস.আই মহসিন গুরুতর আহত হয়েছে। তাদেরকে প্রথমে কোটচাঁদপুর হাসপাতালে পরে ঝিনাইদহের সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ঝিনাইদহ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজবাহার আলী শেখ জানান, জঙ্গি আস্তানার বাড়িটি ঘিরে রাখার পর জঙ্গিরা পর পর চারটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে দুই জঙ্গি নিহত হয়। এ সময় একতলা ঐ বাড়ির মালিক জহুরুল ইসলাম, তার ছেলে জসিম ও বাড়ির ভাড়াটিয়া আলমগীর ও আতিয়ার রহমান নামের ৪ জনকে আটক করা হয়েছে।

এদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজ দিদার আহম্মেদ। তিনি জানান, এখানে নব্য জেএমবির আস্তানার খবর জানতে পেরে রোববার ভোরে সিটিটিসি অভিযান চালাতে যায়। দরজা ভেঙ্গে ঘরে প্রবেশ করতে গেলে মহেশপুর থানার ওসি আহম্মেদ কবিরকে জড়িয়ে ধরেন এক জঙ্গি। সেই সময় ওসি এবং ডিএসবি ফারুক ঐ জঙ্গিকে লাথি মেরে সরিয়ে বের হয়ে আসেন। এরপরই গোলাগুলী শুরু হয় এ সময় এক জঙ্গি আত্মঘাতী করে এবং আরেক জঙ্গি গুলীবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। তিনি বলেন এই মুহুর্তে নিহত জঙ্গিদের পরিচয় পাওয়া যায়নি। তবে একজনের নাম তুহিন বলে জানান ডিআইজি। 

তিনি আরো জানান, এই অভিযানের কোন নাম দেয়া হয়নি। ঢাকা থেকে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট আসার পর সর্বাত্মক অভিযান শুরু হবে। বর্তমানে বাড়িটি ঘিরে রাখা হয়েছে। তবে যে কোন সময় সিটিটিসি, পুলিশ, র‌্যাব, ডিজিএফআই, ডিবি অভিযানের জন্য প্রস্তুত আছে। জঙ্গি আস্থানার আশেপাশে ১৪৪ ধারা জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পুলিশের অভিযান অব্যাহত ছিল। 

এদিকে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বোম্ব ডিসপোজাল টিমের সদস্যরা ঢাকা থেকে ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছান। এ সময় সেখানে অবস্থান করছিলেন পুলিশের খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি দিদার আহম্মদ, ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সূত্র জানায়, ঢাকা থেকে বেশ কয়েকটি গাড়িযোগে বোম্ব ডিসপোজাল টিমের সদস্যরা বজরাপুর আসেন। গাড়ি থেকে নেমেই তারা তৎপরতা শুরু করেন। রাতে এ রিপোর্ট লেখার সময় বোম্ব ডিসপোজাল টিমের সদস্যরা সন্দেহভাজন জঙ্গিবাড়ির খুব কাছাকাছি অবস্থান করছিলেন। তবে কাছাকাছি কোনো লোক না থাকায় সেখানে কী হচ্ছে, তা কারো কাছে স্পষ্ট নয়।

চূড়ান্ত অভিযান শুরু হলেও ভোরের পর থেকে বাড়িটি থেকে গুলী-বোমার কোনো শব্দ আসেনি। ফলে বাড়িটিতে আদৌ আর কেউ আছেন কি-না, তাও কারো কাছে স্পষ্ট নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে কিছু জানানো হয়নি।

পুলিশের ভাষ্য, ঘটনার সময় আহত হন কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের এডিসি নাজমুল ইসলাম ও পুলিশের এসআই মহসিন ও মুজিবুর রহমান। তাদের প্রথমে কোটচাঁদপুর হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সেখান থেকে স্থানান্তর করা হয়। তবে তাদের এখন কোথায় চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি দিদার আহম্মদ বেলা সাড়ে ১২টার দিকে ঘটনাস্থলে আসেন। তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ওই বাড়িটি নব্য জেএমবির সদস্যরা আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল। নিহতরাও নব্য জেএমবির ক্যাডার। এদের একজন গুলীতে অন্যজন আত্মঘাতী বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন বলে তিনি জানান। তবে কোন পক্ষের গুলীতে একজন নিহত হয়েছেন, তা নিশ্চিত করতে পারেননি ডিআইজিপি। অভিযানের শুরু থেকেই সাংবাদিকসহ স্থানীয়দের ২০০ গজ দূরে অবস্থান করতে বলা হয়েছে। আশপাশের বাড়িগুলোও ফাঁকা করা হয়।

দিদার আহমেদ বলেন, ‘এখানে নব্য জেএমবির আস্তানার খবর জানতে পেরে রবিবার ভোরে সিটিটিসি অভিযান চালাতে যায়। সেই সময় মহেশপুর থানার ওসি আহমেদ কবিরকে এক জঙ্গি জড়িয়ে ধরে। তিনি জঙ্গিকে লাথি মেরে সরিয়ে বের হয়ে আসেন। পরে গোলাগুলী শুরু হয়। এসময় এক জঙ্গি আত্মঘাতী ও একজন গুলীবিদ্ধ হয়। পরে সেও মারা যায়।’ জঙ্গিদের ঘটানো বিস্ফোরণে সিটিটিসির এক কর্মকর্তাসহ পুলিশের তিন কর্মকর্তা আহত হয়েছেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. ইউসুফ আলী জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের জঙ্গি আস্তানায় আবু আলীকে খুঁজতে গিয়ে ঝিনাইদহে এই দুই আস্তানার খবর পাওয়া গেছে। 

বাড়িমালিক জহুরুল একজন চা-দোকানি : ঝিনাইদহের মহেশপুরের বজরাপুরে হঠাৎপাড়ায় সন্দেহভাজন জঙ্গি আস্তানাটির মালিকের নাম জহুরুল ইসলাম (৪০-৪২)। 

মহেশপুর থানার ওসি আহমেদ কবির বলেন, জঙ্গি সন্দেহে আটক জহুরুল ইসলাম একজন চা-দোকানি। খালিশপুর বাজার মসজিদের কাছে তিনি চায়ের দোকানদারি করতেন। তবে সম্প্রতি সেখান থেকে দোকানটি উচ্ছেদ হয় বলে জানাচ্ছেন স্থানীয়রা। এর আগে তিনি খাস্তাজাতীয় মিষ্টি বিক্রি করে সংসার চালাতেন।

তিনি বলেন, জহুরুল ইসলামের পিতার নাম নুরুল ইসলাম নুরু। জহুরুল অত্যন্ত ধর্মভীরু লোক। নিয়মিত নামাজ পড়া ছাড়াও তিনি ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতেন পুরোপুরি। আর অনুসারী ছিলেন চরমোনাই পীরের। তার বাড়ির স্ত্রীলোকেরা খুবই পর্দানসিন। 

প্রতিবেশী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘জহুরুল এখানে বাড়ি তৈরি করে ৮-১০ বছর বসবাস করছেন। নিরীহ, ধর্মভীরু মানুষ হিসেবেই তাকে দেখেছি। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার সংশ্রব দেখিনি।’

তবে পুলিশের খুলনা রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজিপি) দিদার আহমেদ জানিয়েছেন, বাড়িটি নব্য জেএমবির আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। নিহত দুইজনও নব্য জেএমবির ক্যাডার বলে তারা মনে করছেন। জহুরুল ইসলাম স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে ওই বাড়িটিতে বসবাস করতেন। তার তিন সন্তানের মধ্যে জসিমকে (২৫) আটক করেছে পুলিশ। অন্য দুটি মেয়ে-সায়রা (১৩) ও রাবেয়া (৭)।

উল্লেখ্য, এর আগে গত ২২ এপ্রিল ঝিনাইদহ সদর উপজেলার পোড়াহাটি গ্রামের ঠনঠনেপাড়ায় জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ইউনিটের সদস্যরা। অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন সাউথ প’ বা দক্ষিণের থাবা। প্রায় ৪ ঘণ্টা ৪৫ মিনিটের অভিযানে ওই জঙ্গি আস্তানা থেকে বিস্ফোরক তৈরি রাসায়নিক ভর্তি ২০টি ড্রাম, একটি সেভেন পয়েন্ট সিক্স বোরের পিস্তল, একটা ম্যাগাজিন, সাত রাউন্ড গুলী উদ্ধার করা হয়। চারটি বোমা নিস্ক্রিয় করা হয়। বাড়ির ভেতর থেকে ১৫টি জিহাদি বইও উদ্ধার করা হয়। পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের ৩০ জন এবং খুলনা রেঞ্জের পুলিশ, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), র‌্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ৪০০ সদস্য এই অভিযানে অংশ নেন। অপারেশন ‘সাউথ প’ (দক্ষিণে থাবা) সমাপ্ত ঘোষণার পর এক প্রেসব্রিফিংয়ে পুলিশের খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি দিদার আহমেদ জানিয়েছিলেন, বাড়িটিকে জঙ্গিদের বোমা তৈরির কারখানা বলা যেতে পারে। এই বাড়িতে তিন-চার জন জঙ্গি ছিল। তারা আগেই পালিয়ে গেছে। এই জঙ্গিদের সবাই জেএমবি ও নব্য জেএমবির সদস্য। এই বাড়িতে জঙ্গি সংগঠনগুলোর বিভাগীয় পর্যায়ের লোকজন আসা যাওয়া করতো।

ওই অভিযানের এক সপ্তাহের মাথায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে আরেকটি বাড়িতে অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সেখানে সোয়াটের ‘অপারেশন ঈগল হান্ট’ শেষে গত ২৭ এপ্রিল চারজনের লাশ উদ্ধার হয়, যারা নিজেদের ঘটানো বিস্ফোরণে নিহত হন বলে পুলিশের ভাষ্য। সেখানে নিহতদের মধ্যে ঝিনাইদহের আব্দুল্লাহ ছিলেন বলে পুলিশ কর্মকর্তারা সে সময় জানিয়েছিলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ