ঢাকা, সোমবার 08 May 2017, ২৫ বৈশাখ ১৪২৩, ১১ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মামলার পর দুই ছাত্রীর শারীরিক পরীক্ষা সম্পন্ন ॥ কোনো আসামী গ্রেফতার হয়নি 

স্টাফ রিপোর্টার : বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে রাজধানীর বনানী থানায় হওয়া মামলার পাঁচ আসামীর মধ্যে কেউ এখন পর্যন্ত গ্রেফতার হয়নি। মামলার এজাহার থেকে পাঁচ আসামীর মধ্যে চারজনের নাম জানা গেছে। তবে ‘তদন্তের স্বার্থে’ গতকাল রোববার বনানী থানা-পুলিশ আসামীদের নাম-ঠিকানা কিছুই জানাতে চায়নি। আসামীরা সবাই প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য হওয়ায় পুলিশ সব কিছুতে রাখঢাক করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মামলা নিতেও বনানী থানা পুলিশ টালবাহানা করেছে। 

শনিবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে বনানী থানা-পুলিশ ধর্ষণের মামলা নেয়। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা প্রভাবশালী হওয়ায় মামলা দায়ের করতে দুই ছাত্রীকে টানা ৪৮ ঘণ্টা যুদ্ধ করতে হয়। হয়রানি বাড়াতে মেডিকেল পরীক্ষার নামে দুই ছাত্রীকে দীর্ঘ সময় থানায় বসিয়ে রাখা হয়। রাত ১০টার দিকে তদের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে পাঠানো হয়। 

মামলার বাদী গতকাল জানান, তিনি পাঁচজনকে আসামী করে মামলা করেছেন। তদন্তের স্বার্থের দোহাই দিয়ে গতকাল বনানী থানা-পুলিশ আসামীদের নাম-ঠিকানা জানাতে অপারগতা প্রকাশ করে। 

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার (ডিসি-মিডিয়া) মাসুদুর রহমান গতকাল রোববার বলেন, এজাহারভুক্ত কোনো আসামীকে গ্রেফতার করা যায়নি। আসামীদের গ্রেফতার করার চেষ্টা চলছে। আজ (রোববার) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুই ছাত্রীর শারীরিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। 

মেডিক্যাল বোর্ড গঠন, শারীরিক পরীক্ষা সম্পন্ন : ধর্ষণের শিকার হওয়া দুই তরুণীর ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য পাঁচ সদস্যের একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের (ঢামেক) ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ড. সোহেল মাহমুদকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- মমতাজ আরা, নিলুফার ইয়াসমিন, কবিতা সাহা ও কবির সোহেল। 

গতকাল দুপুর ১টার দিকে বনানী থানার দুই নারী পুলিশ ভুক্তভোগীদের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার থেকে ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে আসেন। 

ড. সোহেল মাহমুদ বলেন, ‘ভিকটিমদের মাক্রোবায়োলজি, রেডিওলজিক্যাল এবং ডিএনএ প্রোফাইলিং পরীক্ষার জন্য আনা হয়েছে। পরীক্ষা শেষে প্রতিবেদন পেতে ১৫/২০ দিন সময় লাগবে। প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর এ বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে ঘটনাটি বেশ কিছুদিন আগের হওয়ায় ধর্ষণের আলামত পাওয়া কঠিন হবে। তাই এখন আমরা তথ্য প্রমাণের (এভিডেন্সেরও ওপর) ওরপ নির্ভরশীল।’

সোহেল মাহমুদ জানান, ওই দুই ছাত্রীর শারীরিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল পাঁচ সদস্যের বোর্ড গঠন করে তাদের শারীরিক পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়েছে। 

পুলিশ ও ভিকটিম সূত্রে জানা গেছে, ধর্ষণের শিকার দুই তরুণী রাজধানীর দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। গত ২৮ মার্চ পূর্বপরিচিত সাদাত আহমেদ ও নাইম আশরাফ ওই শিক্ষার্থীদের জন্মদিনের দাওয়াত দেয়। ওইদিনই তারা ওই ছাত্রীদের বনানীর কে ব্লকের ২৭ নম্বর সড়কের ৪৯ নম্বর দ্য রেইন ট্রি নামের একটি হোটেলে নিয়ে যায়। সেখানে জন্মদিনের অনুষ্ঠান চলার সময় দুই তরুণীকে হোটেলের একটি কক্ষে আটকে রেখে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। পরদিন বিষয়টি জানাজানি হলে হত্যার পর লাশ গুম করার ভয় দেখিয়ে তাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। পরে দুই তরুণী তাদের নিকেতনের বাসায় ফিরে আসে। প্রথমে ভয়ে বিষয়টি কাউকে না জানালেও পরে পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তারা মামলা করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু আসামীরা প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান হওয়ায় বনানী থানা পুলিশ প্রথমে তাদের মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায়। 

ধর্ষণের ভিডিও করেছিল ধর্ষকরা : দুই তরুণীকে ধর্ষণের ঘটনাটি ভিডিও করেছিল ধর্ষকরা। এরপর ভিডিও প্রকাশ করে দেয়ার হুমকি দিয়ে আসছিল তারা। এতে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল বলেও মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়। 

তরুণীদের দায়ের করা মামলার এজাহারে বলা হয়, সাদমান সফিক তাদের পূর্ব পরিচিত। প্রায় দুই বছর থেকে তার সঙ্গে পরিচয় রয়েছে। ঘটনার ১০-১৫ দিন আগে গুলশান-২ নম্বরের ৬২ নম্বর রোডের ২ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা দিলদার আহমেদের ছেলে সাফাত আহমেদের সঙ্গে পরিচয় হয় তাদের। এরপর জন্মদিনের দাওয়াত দিয়ে গত ২৮ মার্চ সাফাত আহমেদ তার গাড়ি পাঠিয়ে ড্রাইভার ও বডিগার্ডের মাধ্যমে তরুণীদের বাসা থেকে বনানীর রেইনট্রি হোটেলের ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়। 

এজাহারে আরও বলা হয়, সেখানে অনেক লোক থাকবে এবং অনুষ্ঠানটি হবে হোটেলের ছাদে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর কোনও ভদ্র লোককে আমরা দেখতে পাইনি। সাফাত, নাঈম ও সফিক ছাড়াও সেখানে আরও দু’জন মেয়ে ছিল। তাদের ওই হোটেলে নিয়ে যাওয়ার পর আগে থেকে সেখানে থাকা অন্য দু’টো মেয়েকে সাফাত ও নাঈম বার বার নিচে নিয়ে যাচ্ছিল। সেখানকার পরিবেশ ভালো না লাগায় আমরা চলে যেতে চাচ্ছিলাম। এক পর্যায়ে তাদের দু’জনকে একটি কক্ষে নিয়ে জোরপূর্বক মদ্যপান করিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়। এ সময় সাফাত তার ড্রাইভার বিল্লালকে ধর্ষণের ভিডিও করতে নির্দেশ দেয়। তখন ড্রাইভার বিল্লাল ধর্ষণের দৃশ্য ভিডিও করে। পরবর্তীতে সাফাত তার দেহরক্ষীকে তরুণীদের বাসায় পাঠিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে ও ভয়ভীতি দেখায়। তাদের হুমকি ও লোকলজ্জার ভয়ে এক পর্যায়ে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন তারা। যে কারণে মামলা করতে বিলম্ব হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়। 

শনিবার বিকালে তরুণীরা বনানী থানায় হাজির হয়ে ধর্ষকদের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার আসামীরা হচ্ছেন, সাফাত আহমেদ, নাঈম আশরাফ, সাদমান সফিক, ড্রাইভার বিল্লাল, সাফাত আহমেদের বডিগার্ড (অজ্ঞাত) নাম উল্লেখ করা হয়। 

ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান জোনের এডিসি আব্দুল আহাদ বলেন, ‘ধর্ষণ ঘটনায় জড়িতদের ধরতে পুলিশের একাধিক টিম বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে। তবে এখনও কোনও আসামী ধরা পড়েনি।’ রেইনট্রি হোটেলের ওই দিনকার ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হোটেল কর্তৃপক্ষ সর্বশেষ একমাসের ফুটেজ সংরক্ষণ করে থাকে। তাই ধর্ষণের ঘটনার কোনও ফুটেজ পাওয়া যায়নি।’

রেইনট্রি হোটেলের এক কর্মকর্তা নাম-পরিচয় প্রকাশ না করে বলেন, তাদের একটা কক্ষ ভাড়া নিয়েছিল ধর্ষকদের ওই গ্রুপটি। এর বাইরে আর কোনও কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি বলেন, যা বলার পুলিশকেই বলব। 

মামলা দায়েরের পর শনিবার রাতেই দুই তরুণীকে তেজগাঁওয়ের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে নিয়ে যায় পুলিশ। সেখান থেকে গতকাল দুপুরে তাদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিয়ে যাওয়া হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ