ঢাকা, মঙ্গলবার 09 May 2017, ২৬ বৈশাখ ১৪২৩, ১২ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিদেশে ভাল নেই বাংলাদেশী শ্রমিকরা

# প্রশিক্ষণ না থাকায় পারিশ্রমিক কম # ৩ বছরেই লাশ হয়ে দেশে ফিরেছেন ১০ হাজার # হাজার হাজার শ্রমিক কারাগারে বন্দী # প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ পান না শতকরা ৮৫ জন
ইবরাহীম খলিল : সুখের আশায় ভিটেমাটি বিক্রি করে কিংবা ধার-দেনা করে বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশীরা ভাল নেই। নানা কারণে তারা বিদেশে মানবেতর জীবন যাপান করছেন। ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করার কারণে অনেকেই বিদেশের মাটিতে মৃত্যুবরণ করছেন। আর আইন না জানার কারণে হাজার হাজার শ্রমিক বিদেশে বছরের পর বছর কারাগারে মানবেতর জীবন যাপন করছে। বিশেষ করে নারী শ্রমিকরা বিদেশে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন। নানা নির্যাতনের শিকার হয়ে কেউ দেশে ফিরে আসছেন। আর দালালদের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে অনেক টাকা খরচ করে বিদেশে গিয়ে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ না পেয়ে অনেকে হতাশা নিয়ে দেশে ফিরে আসছেন। আবার অনেকেই বিদেশের মাটিতেই অকালে মৃত্যুবরণ করছেন। এক্ষেত্রে বিপদে স্থানীয় বাংলাদেশী দূতাবাস থেকেও সহায়তা পাওয়া যায় না বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এবিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রীর বক্তব্য হচ্ছে, সেদেশের আইন না মানার কারণে যদি কেউ কারাগারে যায় তাহলে কিছুই করার নেই। সেদেশে থাকতে হলে আইন মেনেই থাকতে হবে।
পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য ১৬ বছর আগে স্ত্রী-সন্তান দেশে রেখে সৌদি আরব গিয়েছিলেন গাজীপুরের শ্রীপুরের বাসিন্দা ফজলুল হক। সম্প্রতি ছুটিতে দেশে আসা ফজলুল হক আফসোস করে বলেন, সৌদিতে আমি ১৬ বছর ধরে কিছুই করতে পারিনি। এরপরও আমাকে আবার চলে যেতে হবে। ৪৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যেই কাজ করতে হবে। কেবল ফজলুল হক নন। তার মত এমন কষ্টের দিন কাটছে বহু প্রবাসী শ্রমিকের। এদিকে জানা বা অজানাভাবে আইন ভেঙ্গে বিদেশের কারাগারে বন্দী জীবন কাটাচ্ছে বাংলাদেশের বহু শ্রমিক।
পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এককোটির বেশি বাংলাদেশী কাজ করছে। কঠোর পরিশ্রম করে তারা দেশে রেমিটেন্স পাঠাচ্ছে। কিন্তু তাদের সুরক্ষার কাজটি যাদের করার কথা তারা করছেন না ঠিক মতো।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব মতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এক কোটির বেশি বাংলাদেশী রয়েছেন, তাদের ৮৭ শতাংশই কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়া বিদেশে পরি জমিয়েছেন। এদের বড় একটি অংশেরই নেই কোনো দক্ষতা; শিক্ষাগত যোগ্যতাও কম। ইংরেজি ভাষা জানা নেই অধিকাংশেরই। ফলে বিদেশে বাংলাদেশীরা ভালো চাকরি পান না। ফলে তাদের বিদেশে গিয়ে ঝুকিপূর্ণ কাজ করতে হয়। কিন্তু এতে পারিশ্রমিকও কম পাচ্ছেন। বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যের অশিক্ষিত এবং আধা-প্রশিক্ষিত শ্রমিকদের বেশি সরবরাহ করছে। এসব শ্রমিক প্রশিক্ষিত বাংলাদেশীর তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ কম পারিশ্রমিক পাচ্ছেন।
পরিসংখ্যান বলছে, গত তিন বছরে লাশ হয়ে ফিরেছেন সাড়ে ১০ হাজার বাংলাদেশী। এ হিসাবের বাইরে অনেকের লাশ অর্থ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের অভাবে বিদেশের মাটিতেই দাফন করা হয়েছে। এসংখ্যা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিগত চার বছরে এ মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পেয়েছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে। ২০০৫-এর তুলনায় ২০১৬ সালে এ বৃদ্ধির হার ৬০ শতাংশ।
পর্যবেক্ষক মহলের অভিমত, প্রবাসে বাংলাদেশী মৃত্যুর হার বৃদ্ধির প্রধান কারণ সুষ্ঠু শ্রম ব্যবস্থাপনা। বিভিন্ন দেশে কর্মরতদের বেশির ভাগই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। অদক্ষতার পাশাপাশি শারীরিক সক্ষমতার অভাব ও পুষ্টিহীনতা মৃত্যুর অন্যতম কারণ।
এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে বর্তমানে ৩৮টি দেশের কারাগারে বন্দী রয়েছে প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশী শ্রমিক। আটক বন্দীদের মধ্যে মিয়ানমারে ৯৮, সিঙ্গাপুরে ৮৭, নেপালে ১২, যুক্তরাষ্ট্রে ২৬, ভারতে ২ হাজার ৩৩৭, গ্রীসে ১২৩, জাপানে ৬৫, থাইল্যান্ডে ২৩, পাকিস্তানে ১৯, ফ্রান্সে ৪৬, যুক্তরাজ্যে ২১৮, কাতারে ১১২, সৌদি আরবে ৭০৩, জর্ডানে ৩৭, মিশরে ৫, দক্ষিণ কোরিয়ায় ১৬, তুরস্কে ৬৮, জর্জিয়া ২৬, কিরগিজস্তানে ১, ওমানে ১ হাজার ৪৮, বাহরাইনে ৩৭০, লেবাননে ২, মালয়েশিয়াতে ২ হাজার ৪৬৯, চীনে ৫, হংকংয়ে ২৪, মঙ্গোলিয়ায় ১, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১০৯৮, ব্রুনাইয়ে ৫, ইতালিতে ৫১, ইরাকে ১২১, মরিশাসে ৭, মেক্সিকোতে ৯৭, আজারবাইজানে ৬, মরক্কোতে ২, দক্ষিণ আফ্রিকাতে ১১, ব্রাজিলে ১, অস্ট্রেলিয়াতে ৩৯ এবং কুয়েতে ২৬১ জনসহ মোট ৯ হাজার ৬৪০ জন বাংলাদেশী কারাগারে আটক রয়েছেন।
এই বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশীক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি বলেন, ওই সকল দেশের আইন যদি আমাদের বাংলাদেশী শ্রমিক না মানে তাহলেতো তাদের কারাগারে যেতেই হবে। সুতরাং আমরা যাওয়ার সময়ই বলে দেই যে, ঐ দেশের আইন যেন আমাদের শ্রমিকরা মেনে চলে।
এদিকে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে কাজ করছে ২০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশী নারী। গত বছরে সরকারিভাবে এক লাখেরও বেশি নারী শ্রমিক কাজ করতে গিয়েছে বিভিন্ন দেশে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হিসেব অনুযায়ী গত এক দশকে নারীদের বিদেশে যাওয়ার সংখ্যা দশগুণ বেড়েছে। এরসাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নারীর নিরাপত্তাহীনতা। বিদেশে গিয়ে নানারকম তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরছেন তারা।
বাংলাদেশ অভিবাসী মহিলা শ্রমিক এসোসিয়েশনের সভানেত্রী লিলি জাহান জানান, দালাল বা আত্মীয়Ñস্বজনদের মাধ্যমে যারা যাচ্ছেন তাদের মধ্যে বেশিরভাগই নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে রয়েছে। তার অভিমত মেয়েরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সৌদি আরবে। সরকারিভাবে যেসব মেয়েরা বিদেশে যাচ্ছেন তাদের জন্য হোস্টেল করা হয়েছে। ৮ ঘন্টা কাজের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং বেতনের জন্য স্মার্ট কার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু দালালের খপ্পরে পরে যারা বিদেশে যাচ্ছেন তারা পড়ছেন বিপাকে।
গবেষক ড. জাহিদ হোসেন বলেন, যেসব বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বিদেশে কর্মী পাঠায়, তারা কর্মী খোঁজার ক্ষেত্রে মূলত স্থানীয় দালালদের ওপর নির্ভরশীল। এসব দালাল বিদেশ যেতে প্রকৃত যে খরচ হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ আদায় করে বিদেশ গমনেচ্ছুদের কাছ থেকে। অন্যদিকে যেসব কর্মী বিদেশ যান, সেখানে যাওয়ার পর তারা প্রতিশ্রুতির চেয়ে কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য হন। একই সঙ্গে মাত্র ১৭ শতাংশ বিদেশ গমনেচ্ছু যথাযথ কাজ পান। বাকীরা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ পান না। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ