ঢাকা, বৃহস্পতিবার 11 May 2017, ২৮ বৈশাখ ১৪২৩, ১৪ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিপদে পোল্ট্রি ব্যবসায়ীরা

অনেক উপলক্ষেই দেশীয় শিল্পের বাধাহীন বিকাশ ঘটানোর জন্য সহযোগিতা দেয়ার আহবান জানানো হয়েছে। এই আহবানের মূলকথা হলো, বড়, মাঝারি বা ক্ষুদ্র যে ধরনের শিল্পই হোক না কেন, সে শিল্পকে ঋণসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সহযোগিতা দেয়ার পাশাপাশি প্রোটেকশন বা নিরাপত্তাও এমনভাবে দিতে হবে, যাতে বিশেষ করে বিদেশি শিল্প বা পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে দেশীয় শিল্প ও শিল্প মালিকদের বিপন্ন না হতে হয়। দেশীয় পণ্য যাতে মার না খায়, মালিকদেরও যাতে কেবলই লোকসান গুনতে না হয়। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে আজও পর্যন্ত দেশীয় কোনো শিল্প বা পণ্যই তেমন সহযোগিতা এবং প্রোটেকশন পায়নি। এখনো পাচ্ছে না। এর ফলে প্রায় সকল পণ্যের ক্ষেত্রেই দেশীয় শিল্প ও পণ্যকে বিদেশিদের সঙ্গে কঠিন এবং অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে। বড় কথা, প্রায় সব পণ্যের ক্ষেত্রেই দেশীয় শিল্প মালিকরা লোকসান গুনতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছেন। ব্যবসা তো গুটিয়ে ফেলতে হচ্ছেই, অধিকাংশকে সুদসহ ঋণের বোঝাও টানতে হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে।

দেশীয় শিল্পের সর্বশেষ একটি উদাহরণ হিসেবে এসেছে পোল্ট্রি তথা ডিম ও মুরগির ব্যবসা। গতকাল দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বিদেশি তথা বহুজাতিক কোম্পানির সীমাহীন দৌরাত্ম্যের কারণে ডিম ও মুরগির ব্যবসায় জড়িত খামারিরা এত বেশি বিপন্ন হয়ে পড়েছেন যে, তারা শুধু ব্যবসা গুটিয়ে নিতেই বাধ্য হচ্ছেন না, প্রতিবাদী আন্দোলনও শুরু করেছেন। এরকম এক উপলক্ষে গাজীপুরের খামারিরা সড়কের ওপর শত শত ডিম ভেঙে ফেলে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। দেশের আরো কিছু অঞ্চলেও একই ধরনের আন্দোলন শুরু হয়েছে। রিপোর্টে প্রতিবাদের কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে জানানো হয়েছে, প্রতিটি ডিম উৎপাদন করার জন্য খামারিদের সাত টাকা ব্যয় হলেও বিক্রির সময় তারা পাঁচ টাকার বেশি পান না। অর্থাৎ প্রতিটি ডিমে তাদের দু’টাকা করে লোকসান গুনতে হয়। অবস্থার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে খামারিরা জানিয়েছেন, একদিনের একটি ব্রয়লার মুরগির বাচ্চা তাদের গড়ে ৮০ টাকা দিয়ে কিনতে হয়। এই বাচ্চাকে বিক্রিযোগ্য করতে সময় লাগে ৩৫ থেকে ৪০ দিন পর্যন্ত। মুরগির খাদ্য ও ওষুধসহ খরচ পড়ে যায় ৬০ থেকে ৭০ টাকা। এভাবে এক কেজি ওজনের একটি মুরগির জন্য ব্যয় হয় ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা। কিন্তু বিক্রির সময় ১৩০ টাকার বেশি তারা পান না। ফলে প্রতিটি মুরগিতে তাদের লোকসান হয় ২০ থেকে ৩০ টাকা। অনেক সময় এমনকি এর চাইতেও বেশি। ওদিকে ডিমের ক্ষেত্রেও প্রতিটি বিক্রি করতে হচ্ছে অন্তত দু’টাকা করে লোকসান দিয়ে। কারণ, একটি মুরগিকে ডিম দেয়ার মতো অবস্থায় আনতে খরচ পড়ে যায় ১৫০-১৬০ টাবারও বেশি। ফলে প্রতিটি ডিমের উৎপাদন খরচ হয় সাত টাকা বা তারও বেশি। 

খামারিরা জানিয়েছেন, এত বিরাট লোকসানের প্রধান কারণ বিদেশি তথা বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। এসব কোম্পানি বিপুল পরিমাণে বিনিয়োগ করায় গড়ে তাদের ক্রয়মূল্য অনেক কম পড়ে। মুরগি ও ডিমের উৎপাদন ব্যয়ের দিক থেকেও তারা দেশীয় খামারিদের তুলনায় লাভজনক অবস্থায় থাকে। সময়ে সময়ে তারা এমনকি কম লাভেও ডিম ও মুরগি বিক্রি করে দেয়, যাতে দেশীয় খামারিরা লোকসান গুনতে বাধ্য হয়। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও-ও দেশীয় খামারিদের বিপদ বাড়িয়ে চলেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ও দেশীয় ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ঘুষ ছাড়া এবং সহজে ঋণ পাওয়া যায় না বলে খামারিরা ঋণের জন্য এনজিওদের কাছে যেতে বাধ্য হন। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এনজিওগুলোও যথেচ্ছ হারে সুদের বোঝা চাপিয়ে দেয়। ওদিকে ডিম ও মুরগি বিক্রির কোনো ক্ষেত্রেই যেহেতু লাভ হয় না বরং লোকসান গুনতে হয় সেহেতু অধিকাংশ খামারির পক্ষেই যথা সময়ে সুদসহ ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হয় না। ফলে সুদের পরিমাণ বাড়তে থাকে চক্রবৃদ্ধি হারে। পরিণতিতে খামারিরা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন। সে কারণে এরই মধ্যে শত শত খামারি তাদের ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন। তাই বলে এনজিওদের ঋণ ও সুদের কবল থেকে মুক্তি পাননি তারা। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে পড়েছে বলেই গাজীপুরের খামারিরা সড়কে ডিম ভেঙে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। দেশের অন্য সব অঞ্চলেও আন্দোলন শুরু করেছেন খামারিরা। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, পোল্ট্রি তথা ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের ব্যবসায় দেশীয় খামারিদের বিপদ আসলেও ভয়ংকর পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বিদেশি তথা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তারা যে দাবি জানিয়েছেন, আমরা সে দাবি সঠিক ও অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত মনে করি। কারণ, দেশীয় খামারিরা যেখানে কয়েক হাজার টাকার পুঁজি বিনিয়োগ করতে গিয়েও এনজিওদের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হন, বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সেখানে কয়েক কোটি টাকাও সহজেই বিনিয়োগ করে। একই কারণে তাদের পক্ষে যে কোনো দামে ডিম ও মুরগি বিক্রি করা সম্ভব হয়। অন্যদিকে দেশীয় খামারিদের নাভিশ্বাস ওঠে। তার ওপর রয়েছে এনজিওদের সুদের ব্যবসা, যার পেছনেও প্রকারান্তরে বিদেশিরাই প্রধান ও নিয়ন্ত্রকের ভ’মিকা পালন করছে। আমরা মনে করি, এমন অবস্থায় সরকারের উচিত দেশীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেয়া। সরকারকে এমন কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো যথেচ্ছ দামে ডিম ও মুরগি বিক্রি করতে না পারে। এজন্য প্রথমে ডিম ও মুরগির উৎপাদন ব্যয় হিসাব করতে হবে এবং তার ভিত্তিতে বিক্রির ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ করে দিতে হবে। ঘুষ ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার শিকার না হয়ে দেশীয় ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে খামারিরা যাতে সহজ শর্তে ঋণ পেতে পারেন সে ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। এনজিওদের ব্যাপারেও সরকারের দায়িত্ব কঠোর হওয়া। কারণ, এনজিওগুলো অতি উচ্চ হারে সুদ আদায় করে বলেও খামারিদের লোকসানের মুখে পড়তে হয়। এভাবে সব মিলিয়ে আমরা এমন আয়োজন নিশ্চিত করার দাবি জানাই, দেশীয় খামারিরা যাতে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য না হন এবং তারা যাতে কম পরিমাণে হলেও লাভে থাকতে পারেন। আমরা মনে করি, সরকারের উচিত নি¤œ মানের ব্যবসা হিসেবে দেখার পরিবর্তে পোল্ট্রি ততা ব্রয়লার মুরগি ও  ডিমের ব্যবসাকেও দেশীয় একটি শিল্প খাত হিসেবে বিবেচনায় নেয়া এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতার পাশাপাশি প্রোটেকশন বা নিরাপত্তা দেয়ার পদক্ষেপ নেয়া।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ