ঢাকা, বৃহস্পতিবার 11 May 2017, ২৮ বৈশাখ ১৪২৩, ১৪ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ক্রয় ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অর্থে ওজোপাডিকো এমডির ৩২ দিন বিদেশ সফর

 

খুলনা অফিস : গত দুই বছরে ৩২ দিন বিদেশ সফর করেছেন ওয়েষ্ট জোন পাওয়ার ডিষ্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাডিকো) ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. শফিক উদ্দিন। আর এসব সফরের ব্যয়ভার বহন করেছে বিভিন্ন কোম্পানি ও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। যেসব প্রতিষ্ঠানের মালামাল যাচাই-বাছাই করতে বিদেশে যাবেন তাদের টাকায় বিদেশ সফর হলে মালামালের গুণগত মান সঠিকভাবে যাচাই হবে কি না এমন প্রশ্নও দেখা দিয়েছে সচেতন মহল থেকে।

ওজোপাডিকোর কোম্পানি সচিব আব্দুল মোতালেব স্বাক্ষরিত পাঁচটি দপ্তরাদেশে দেখা যায়, কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ২০১৫ সালের ২ আগস্ট থেকে চলতি বছর ১৩ মার্চ পর্যন্ত বিগত দুই বছরে চারদিন মালয়েশিয়া, ১৫দিন চীন, চারদিন দক্ষিণ কোরিয়া, পাঁচদিন দক্ষিণ আফ্রিকা এবং সাতদিন ভারত সফর করেছেন। ৩৩/১১ কেভি সাব-স্টেশনের অকেজো প্যানেল মেরামত ও স্থাপন কার্যক্রম সরাসরি প্রত্যক্ষকরণ এবং এ বিষয়ে কারিগরি অভিজ্ঞতা অর্জনের নাম দিয়ে ২০১৫ সালের ৩ আগষ্ট থেকে মালয়েশিয়া ভ্রমণ করেন ওজোপাডিকোর এমডি। সে দেশের ট্যামকো সুইচগিয়ার নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অর্থে তাদের কোম্পানীর মালামাল ক্রয়ের জন্য তিনি সেখানে যান বলেও ১৮৭২ নম্বর স্মারকের দপ্তরাদেশে উল্লেখ রয়েছে।

এ ব্যাপারে ওজোপাডিকো কর্তৃপক্ষের অংশীদার সিবিএ’র সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয় শ্রমিক লীগের খুলনা জেলা শাখার যুগ্ম সম্পাদক শেখ আলমগীর বলেন, প্রথমত যাদের টাকায় বিদেশ সফর হবে তাদের মালামালের গুণগত মান নিয়ে যেমন প্রশ্ন দেখা দিতে পারে তেমনি ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে তার ওই সফরের পরিবর্তে কারিগরি পরিচালকের যাওয়াটাই জরুরি ছিল। 

এভাবেই ওজোপাডিকোর এমডি ২০১৬ সালের ১৩ থেকে ১৯ মার্চ প্রি-পেমেন্ট মিটার প্রস্তুত প্রণালী দেখতে চীনের হেক্সিং ইলেকট্রিক্যাল কোম্পানী লি. এর অর্থে চীন, একই বছর ১২ থেকে ১৯ জুলাই প্রি-পেমেন্ট মিটার দেখার জন্য বাংলাদেশের জয়েন্ট ভেনচার আইডিয়াল ইলেকট্রিক্যাল এন্টারপ্রাইজ লি: ও চায়নার সেনজেন ইনহেমিটার কোম্পানি লি:-এর অর্থায়নে এবং সর্বশেষ চলতি বছর ৯ মার্চ হতে চায়নার হেক্সিং কোম্পানির অর্থে পাঁচদিন দক্ষিণ আফ্রিকা ভ্রমণ করেন। 

এছাড়া ওজোপাডিকোর এমডি কোরিয়ার কোটরা নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে চারদিন দক্ষিণ কোরিয়া এবং নবেম্বর মাসে ভারতের এল এন্ড টি ইলেকট্রিক্যাল এন্ড অটোমোশন কোম্পানির অর্থায়নে সাতদিন ভারত সফর করেন। বর্তমানেও এমডি বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর সাথে বিদেশে অবস্থান করছেন।

ওইসব প্রতিষ্ঠানের অর্থে বিদেশ সফরকে অবশ্য ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন ওজোপাডিকোর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। কেননা এতে ওজোপাডিকোর অর্থ খরচ থেকে বেচে যায় বলে উল্লেখ করেন ওজোপাডিকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. শফিক উদ্দিন। তিনি বলেন, তিনি যা করেছেন কোম্পানির স্বার্থেই করেন। সুতরাং এ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কোন অবকাশ নেই। 

অবশ্য বিদেশী কোম্পানি ও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সাথে কর্তৃপক্ষের আর্থিক লেদেনের বিষয়টি উল্লেখ করে ওজোপাডিকো সিবিএ’র মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক শাহীন আহম্মেদ বলেন, অনেক সময় ঢাকায় বোর্ড মিটিংয়ে আন অফিসিয়ালী ঠিকাদারদের ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়। কর্তৃপক্ষের সাথে ঠিকাদারদের এমন আঁতাতকে তিনি মানসম্মত মালামাল ক্রয় না হবারও আশংকা করেন। তিনি বলেন, যাদের অর্থে সবকিছু হবে তাদের বিরুদ্ধে অফিসিয়াল নোট দিতে গিয়ে হয়তবা কলম থেমে যাবে কর্তৃপক্ষের। একইসাথে দু’মাসে একাধিক বোর্ড সভা করে কোম্পানীর অর্থ অপচয় হয়। বোর্ড সভার মাধ্যমে এমডির নিজস্ব স্বার্থ হাসিল ছাড়া কোম্পানীর উল্লেখযোগ্য কোন সাফল্য আসেনি বলেও তিনি উল্লেখ করেন। 

নগরীর বয়রাস্থ ওজোপাডিকোর সদর দপ্তরের গেস্ট হাউজের একটি সূত্র জানায়, বিগত দু’বছর ২০১ নম্বর কক্ষটি ব্যবহার করলেও ওজোপাডিকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কোন ভাড়া পরিশোধ করেননি। পক্ষান্তরে বিদ্যুৎ ভবনের গেষ্ট হাউজটি দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ থাকলেও শুধুমাত্র তিনি যে কক্ষটিতে থাকেন কয়েক লাখ টাকা খরচ করে সেটি বিলাশবহুল করা হয়েছে। 

কোম্পানির বিধি অনুযায়ী প্রতিদিন একশ’ টাকা করে ভাড়া দেয়ার কথা ওই কক্ষের জন্য। অথচ কোম্পানীর কাছ থেকে তিনি প্রতিমাসে অর্ধলক্ষ টাকা বাড়িভাড়া গ্রহণ করেন।

এ প্রসঙ্গে ওজোপাডিকোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু হাসান বলেন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক যখন খুলনায় আসেন তখন তিনি ২০১ নম্বর কক্ষে থাকেন। তবে এখনও অফিসিয়ালী ওই রুমের ভাড়ার বিলটি দাখিল করা হয়নি।

এভাবে কর্তৃপক্ষের প্রধান কর্তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের কারণেই কোম্পানীর রাজস্ব আয় কমে যাচ্ছে বলেও সাধারণ শ্রমিকরা দাবি করেন। আর এসব অনিয়মের প্রতিবাদ করতে গিয়েই বর্তমানে ওজোপাডিকোতে কর্তৃপক্ষের সাথে সিবিএ’র দূরত্ব চলছে।

ক্ষোভ প্রকাশ করে সিবিএ’র সভাপতি সৈয়দ তারিকুল ইসলাম বলেন, গত বছর ২২ সেপ্টেম্বর সিবিএ নির্বাচনের পর এখনও পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে সিবিএ’কে কোন পত্র দেননি। যদিও শ্রম আইন অনুযায়ী ওজোপাডিকো সদর দপ্তরে সিবিএ’র জন্য একটি কক্ষ সংস্কার করা হচ্ছে। সংস্কার করাকালীন ওই কক্ষে অবস্থান করে সিবিএর কার্যক্রম পরিচালনা করা হলেও এ নিয়েও প্রতিপক্ষের গাত্রদাহ হয়। যে কারণে পরাজিত ট্রেড ইউনিয়নের ইন্ধনে কর্তৃপক্ষ নানা ষড়যন্ত্র করছেন।

এ ব্যাপারে কোম্পানি সচিব আবদুল মোতালেব বলেন, সদর দপ্তরের একটি কক্ষ সিবিএ’র জন্য সংস্কার হলেও সেটি তাদের নামে বরাদ্দ না দেয়া পর্যন্ত তারা তা ব্যবহার করতে পারেন না। তবে সাত মাস আগে নির্বাচন হলেও কিভাবে কার্যক্রম চলবে জানতে চাইলে তিনি বলেন এটি তাদের নিজস্ব ব্যাপার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ