ঢাকা, বৃহস্পতিবার 11 May 2017, ২৮ বৈশাখ ১৪২৩, ১৪ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

পরিবারসহ আতঙ্কে ধর্ষণের শিকার দুই ছাত্রী

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : রাজধানীর বনানীর দ্য রেইনট্রি হোটেলে পূর্ব পরিচিত সাফাত আহমেদের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়ে ধর্ষণের শিকার দুই ছাত্রীর করা মামলার পাঁচ দিনেও কোনো আসামী গ্রেফতার হয়নি। ফলে আতঙ্কে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ওই দুই ছাত্রীসহ তাদের পরিবারপরিজন। মামলার পাঁচ আসামীকে ধরতে নিষ্ফল অভিযান চালানো হয়েছে ঢাকা ও সিলেটে।

প্রথম থেকেই দুই ছাত্রী দাবি করে আসছেন, থানা পুলিশের কাছ থেকে তারা সঠিক ব্যবহার পাননি। পুলিশের গাফিলতির কারণেই আসামীরা পালিয়ে যেতে পেরেছে। তরুণীদের অভিযোগ, প্রভাবশালী হওয়ায় ধর্ষকরা থানা পুলিশকে কিনে নেয়। এখন মাফিয়াদের দিয়ে তাদের ক্ষতি করাতে পারে। পুলিশের ভেতর থেকেই হয় তো অসাধু কেউ তাদের কাছে আগেই অভিযানের খবর পৌঁছে দেয়।

এদিকে , ওই জোড়া ধর্ষণকা-ে সারা দেশে তোলপাড় চলছে । সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ,সংগঠন সভা সমাবেশের মাধ্যমে নিন্দা জানাচ্ছে। জড়িতদের গ্রেফতারে আইনশৃংখলাবাহিনীর শৈথিল্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে । 

ধর্ষণের শিকার দুই তরুণীসহ সংশ্লিষ্টদের ধারণা, অভিযানের আগেই হয় তো কোনো না কোনোভাবে খবর পেয়ে যাচ্ছে আসামীরা। আতঙ্কে ওই দুই ছাত্রী এখন ক্লাসেও যেতে পারছেন না। বাসা থেকে বের হতেও ভয় পাচ্ছেন। দুই ছাত্রীর পরিবারের সদস্যরাও বাসা থেকে খুব একটা বের হন না। তাদের শঙ্কা আসামীরা প্রভাবশালী হওয়ায় ধর্ষণের মেডিকেল প্রতিবেদনও পাল্টে যেতে পারে।

ঘটনার শিকার এক ছাত্রী বলেন, ‘আসামীরা গ্রেফতার না হওয়ায় তারা আতঙ্কে বাসা থেকে বের হতে পারছেন না। তারা আসামীদের গ্রেফতার চান। তাদের বিচার চান। তারা অনেক প্রভাবশালী। টাকা দিয়ে পুলিশকে প্রথমদিকে মামলা নিতে দেয়নি। দুই দিন ঘোরানোর পর মামলা নিয়েও পুলিশ আসামীদের গ্রেফতার করছে না। এখন আবার মেডিকেলে প্রভাব ও টাকার বিনিময়ে ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন তারা ঘুরিয়ে দিতে পারে।’

এদিকে, ধর্ষণ মামলার মূল আসামী সাফাত আহমেদের বাবা আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদারের বিরুদ্ধে তার সাবেক পুত্রবধূ ভাটারা থানায় জিডি করেছেন।

বনানী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুল মতিন ওই তরুণীর বরাত দিয়ে বলেন, ৪০ দিন আগে ধর্ষণের শিকার ওই দুই ছাত্রী বিপর্যস্ত ছিলেন। মামলা করলে কিংবা আইনের আশ্রয় নিলে ও পুলিশ-র‌্যাবকে জানালে তাদের হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেয়া হচ্ছিল। যে কারণে মামলা করতে সাহস পাননি বলে জানিয়েছেন তারা। তিনি বলেন, আসামীদের মধ্যে সাফাত ও নাঈম দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং তারা ওই দুই ছাত্রীর বন্ধু। অস্ত্রের মুখে তারা ওই দুই ছাত্রীকে জিম্মি করে হোটেলের একটি কক্ষে নিয়ে রাতভর আটকে রেখে মারধর এবং হত্যার ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ করে। সেটা তারা ভিডিও করে। আসামীদের অপর তিনজন ধর্ষণে সহায়তা ও ভিডিওধারণ করে বলে মামলায় বলা হয়েছে। মামলা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আসামীদের গ্রেফতারে তাদের বাসায় অভিযান চালানো হয়েছে। সম্ভাব্য স্থানেও অভিযান চলছে।

পুলিশের গুলশান জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আবদুল আহাদ জানান, মঙ্গলবার প্রধান আসামী সাফাত আহমেদের বাড়িতে দুই ঘণ্টা তল্লাশি চালানো হয়। মূল আসামীকে সেখানে পাওয়া যায়নি। বাসায় তার পাসপোর্টও ছিল না। ওই আসামীসহ অপর চার আসামীকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। থানা পুলিশের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্যান্য সংস্থাও চেষ্টা করছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, দুই ছাত্রীর মেডিকেল পরীক্ষার জন্য পাঁচ সদস্যের বোর্ড গঠন করা হয়েছে। একসঙ্গে সবার তো আর প্রভাবিত হওয়ার সুযোগ নেই। পরীক্ষায় যা পাওয়া যাবে সেই প্রতিবেদনই দেয়া হবে।

ধর্ষণ মামলার মূল আসামী সাফাত আহমেদের বাবা আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ বলেন, ছেলের সাবেক স্ত্রী ফারিয়া মাহবুব পিয়াসার ষড়যন্ত্রের শিকার তিনি। সে ওই দুই মেয়েকে থানায় নিয়ে গেছে। ধর্ষণ মামলা তো ১২ ঘণ্টার মধ্যে হয়, এক মাস পরে হয় না। এখন মেডিকেল পরীক্ষা দেয়া হয়েছে। সেখানে প্রমাণ হলে ছেলে অপরাধী হবে।

সাফাতের সাবেক স্ত্রী ফারিয়া মাহবুব বলেন, ঘটনার শিকার মেয়ে দুটি তার কাছে অভিযোগ নিয়ে গিয়েছিল। তিনি ঘটনা শুনে বলেছেন, ওরা অনেক টাকার মালিক। তাদের কিছু হবে না। এরপরও ওই ছাত্রীরা নিজেদের ইচ্ছায় মামলা করেছেন। অথচ প্রধান আসামীর বাবা দিলদার আহমেদ এ জন্য তাকে দায়ী করে তার বিরুদ্ধে মানহানিকর কথা বলছেন। এ জন্য তিনি বাধ্য হয়ে নিজের নিরাপত্তার জন্য থানায় জিডি করেছেন। তিনি আরো বলেন, ২০১৫ সালে তাদের বিয়ের পর সাফাতের বাবা দিলদার আহমেদ বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। এ জন্য ওই সময়ে তাকে মেরে ফেলারও হুমকি দিয়েছিলেন। তখন সাফাত নিজেই ভাটারা থানায় তার বাবার বিরুদ্ধে জিডি করেছিল।

দুই ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে সাফাতের বাবার অভিযোগের বিষয়ে ফারিয়া মাহবুব বলেন, এজাহারে ঘটনার শিকার ছাত্রী তাকে খালাতো বোন হিসেবে উল্লেখ করেছে দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছেন। ওই ছাত্রীকে জিজ্ঞেস করলে সে বলেছে, পুলিশই একজন অভিভাবক হিসেবে ওই নামটি দিতে বলেছে।

পিয়াসার দাবি, ঘটনা ভিন্ন দিকে নিতে সাফাতের বাবা বনানী থানার ওসিকে দিয়ে এজাহারে ভিকটিমদের আত্মীয় হিসেবে তার নামটি লিখে দিয়েছেন। এখন তাকে জড়িয়ে উল্টাপাল্টা বলছেন। এ জন্য তিনি তার বিরুদ্ধে জিডি করেছেন।

গত ২৮ মার্চ রাতে রাজধানীর বনানীর দ্য রেইনট্রি হোটেলে পূর্বপরিচিত সাফাত আহমেদের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়ে রাতভর ধর্ষণের শিকার হন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী। ওই ঘটনায় গত ৬ মে শনিবার সন্ধ্যায় আপন জুয়েলার্সের অন্যতম কর্ণধার দিলদার আহমেদের ছেলে সাফাত আহমেদ এবং ই-মেকার্স ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের পরিচালক নাঈম আশরাফকে প্রধান অভিযুক্ত করে মামলা করেন এক ছাত্রী। মামলার অপর তিন আসামীর একজন সাদমান সাকিফ রেগনাম গ্রুপের পরিচালক। অপর দুই আসামীর একজন সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল এবং তার দেহরক্ষী আবুল কালাম আজাদ। ওই তিনজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণে সহযোগিতা করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

সালোয়ার কামিজ পরীক্ষার আবেদন

দুই ছাত্রীকে ধর্ষণ করার অভিযোগে দায়ের করা মামলার এক ভিকটিমের সালোয়ার-কামিজ রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য আবেদন করেছে পুলিশ। গতকাল বুধবার ঢাকা মহানগর হাকিমের আদালতে এ আবেদনটি করেন বনানী থানার ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র) মোহাম্মদ আব্দুল মতিন। আবেদনের ওপর শুনানি আজ বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হবে বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে।

 মোহাম্মদ আব্দুল মতিন বলেন, মামলা দায়েরের সময় ধর্ষণের আলামত হিসেবে এক ভিকটিমের সালোয়ার-কামিজ জব্দ করা হয়েছে। তাতে কোনো ধরনের পুরুষের বীর্য আছে কিনা তা রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য গতকাল বুধবার আদালতের কাছে অনুমতি চাওয়া হয়েছে। আদালত অনুমতি দিলে তা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে।

 রেইন ট্রি হোটেল বন্ধ ও আপন জুয়েলার্স বর্জনের দাবি

দুই তরুণী ধর্ষণের ঘটনায় বনানীর ‘দ্য রেইন ট্রি’ হোটেল বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে শাহবাগে ‘ছাত্র-শিক্ষক-লেখক-শিল্পী-সাংবাদিক-সংস্কৃতিকর্মীবৃন্দে’র সমাবেশে আপন জুয়েলার্স বর্জনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। বনানীর হোটেলে ধর্ষণের বিচার দাবিতে গতকাল বুধবার বিকেলে  শাহবাগে আয়োজিত সমাবেশে এ দাবি জানানো হয়। 

সমাবেশের আয়োজক জীবনানন্দ জয়ন্ত বলেন, রেইন ট্রি হোটেলের ভূমিকা খুবই সন্দেহজনক। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি এ মামলার বিচার কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করুন।‘আর আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ টাকার জোরে তার ছেলের বিরুদ্ধে করা মামলাটি ভিন্ন খাতে নেয়ার চেষ্টা করছেন। তাদের টাকার উৎস আপন জুয়েলার্সের পণ্য বর্জন করতে হবে।’

এ সময় অ্যাডভোকেট ইমতিয়াজ মাহবুব বলেন, ধর্ষণের মতো ঘটনায় শুধু বিচার চাইলেই হবে না। এক্ষেত্রে আমাদের মানসিকতারও পরিবর্তন দরকার।‘ সেদিন বনানীর ওসি মামলা নেননি, মামলা নিতে দেরি করেছেন। কিন্তু তার ঊর্ধ্বতন লোকজন কেন বিষয়টির সুরাহা করেননি। ডিসি, আইজিপি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কেন মামলা নেয়ার জন্য নির্দেশনা দেননি।’

সমাবেশে ধর্ষণে অভিযুক্ত তিন প্রধান আসামীসহ এতে জড়িত সবাইকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার করার আল্টিমেটাম দেয়া হয়। সমাবেশের সঞ্চালক রবিন হাসান এ সময় বলেন, এ ৭২ ঘণ্টার মধ্যে যদি তাদের গ্রেফতার না করা হয়, তাহলে শাহবাগ থেকে বনানী পর্যন্ত অভিযাত্রা করবে তারা। তারা বনানী থানার সামনে অবস্থান করবে। এই অভিযাত্রায় সাধারণ মানুষকে অংশ নেয়ার আহ্বান জানানো হয় সমাবেশে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ