ঢাকা, শনিবার 13 May 2017, ৩০ বৈশাখ ১৪২৩, ১৬ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

 শাফাত ৬ সাদমান ৫ দিনের রিমান্ডে

ধর্ষক সিফাত ও সাদমানকে গতকাল শুক্রবার আদালতে হাজির করা হয় -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীর বনানীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রীকে ধর্ষণ মামলার আসামী শাফাত আহমেদ ও সাদমান সাকিফকে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। গতকাল শুক্রবার তদন্তকারী কর্মকর্তা তাদের আদালতে হাজির করে একেকজনকে ১০ দিন করে রিমান্ডের আবেদন জানায়। শুনানি শেষে ঢাকার মহানগর হাকিম রায়হানুল ইসলাম শাফাতকে ছয়দিন ও সাদমানকে পাঁচদিনের রিমান্ডের আদেশ দেন। 

এর আগে গতকাল দুপুর ৩টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেট রায়হানুল ইসলামের আদালতে তোলা হয় আসামীদের। এ সময় আসামী শাফাত আহমেদ ও সাদমান সাকিফ আদালতে এসে গণমাধ্যম থেকে মুখ লুকানোর চেষ্টা করে। কখনও পুলিশের পেছনে গিয়ে, কখনও হাত দিয়ে মুখ ঢাকার চেষ্টা করে তারা। দুপুর আড়াইটার দিকে ডিবি কার্যালয় থেকে এই দুই আসামীকে ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে নেয়া হয়।

এদিকে আসামী শাফাত আহমেদ ও সাদমান সাকিফকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ধর্ষণের সত্যতা মিলেছে বলে জানিয়েছেন ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (অপরাধ) কৃষ্ণপদ রায়। 

তিনি বলেন, সিলেট থেকে গ্রেফতার করে আনার পর প্রাথমিকভাবে আসামীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সেখানে ধর্ষণের সত্যতা মিলেছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য তাদের জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে পুলিশের এ কর্মকর্তা এসব কথা জানান।

পুলিশের এই যুগ্ম কমিশনার বলেন, এই মামলার তদন্ত একটি মডেল তদন্ত হয়ে থাকবে। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে, সেটা আর থাকবে না। দেশবাসীর মনে যে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে, সেটা দূর হবে। পুলিশ সব অনুরাগ-বিরাগের ঊর্ধ্বে ওঠে কাজ করছে এবং করবে।

কৃষ্ণপদ রায় জানান, মামলাটির তদন্ত কাজের সুবিধার্থে একটি সহায়ক তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। কমিটির প্রধান ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) কৃষ্ণপদ রায়। অন্যরা হচ্ছেন ডিবি উত্তরের উপকমিশনার (ডিসি) শেখ নাজমুল আলম, গুলশান বিভাগের ডিসি মোস্তাক আহমেদ ও উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন সেন্টারের ডিসি ফরিদা ইয়াসমিন।

এর আগে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সিলেটের মদিনা মার্কেট এলাকা থেকে আসামীদের গ্রেফতার করা হয়। তাদের গ্রেফতারে ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগ ডিবি ও পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের বিশেষ দল অভিযান পরিচালনা করে।

যেভাবে ধরা পড়লেন শাফাত-সাদমান : পুলিশ জানায়, শাফাত আহমেদ ও সাদমান সাকিফ গত ৮ মে ঢাকা থেকে সিলেট যান। এদিন দুপুরে তারা সিলেটের দক্ষিণ সুরমার একটি রিসোর্টে গিয়েছিলেন। রিসোর্টে উঠতে না পেরে তারা জালালাবাদ এলাকায় অবস্থিত এক লন্ডনপ্রবাসীর বাড়িতে আশ্রয় নেন। এই বাড়ি থেকেই বৃহস্পতিবার রাতে তাদের গ্রেফতার করা হয়।

পুলিশ জানায়, শাফাতের পারিবারিক বাড়ি সিলেটে। সিলেটে এসে শাফাত তার এক মামার সাহায্য চান। মামা তার এক লন্ডনপ্রবাসী বন্ধুর বাড়িতে শাফাত ও সাদমানের থাকার ব্যবস্থা করেন। এর আগে দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে করা মামলার আসামীদের দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেফতার করতে পুলিশ সদর দপ্তরকে নির্দেশ দেন আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক। এই নির্দেশের পর পুলিশ সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখার একটি দল সিলেটে যায়।

পুলিশ সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখার বিশেষ দলটি সিলেটে গিয়ে সেখানকার গোয়েন্দাদের সাহায্য নেয়। শাফাত ও সাদমান তাদের মোবাইলসহ অন্যান্য ডিভাইস বন্ধ রেখে লুকিয়ে ছিলেন। তবে সিলেটে থাকা শাফাতের এক মামার মোবাইলে দুজনের ফোনালাপের প্রমাণ পাওয়া যায়। মামাকে ধরার পর শাফাত ও সাদমানের অবস্থান জানা যায়।

শাফাতের মামা পুলিশের কাছে দাবি করেন, প্রথমে সাহায্য করতে চাননি তিনি। অনেক পীড়াপীড়ির পর রাজি হন। তার লন্ডনপ্রবাসী এক বন্ধুর বাড়ি জালালাবাদ এলাকায়। বাড়িটিতে একজন তত্ত্বাবধায়ক থাকেন। ওই বাড়িতে শাফাত ও সাদমানের থাকার ব্যবস্থা করেন। জালালাবাদের ওই বাড়ি থেকেই তারা গ্রেফতার হন দুই ধর্ষক। 

প্রসঙ্গত, জন্মদিনের পার্টিতে ডেকে নিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ এনে গত ৬ মে বনানী থানায় মামলা করেন এক ছাত্রী। মামলার আসামীরা হলেন আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে শাফাত আহমেদ, নাঈম আশরাফ, সাদমান সাকিফ, সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল হোসেন ও দেহরক্ষী আবুল কালাম আজাদ।

মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, গত ২৮ মার্চ রাত ৯টা থেকে পরদিন সকাল ১০টা পর্যন্ত আসামীরা মামলার বাদী এবং তার বান্ধবী ও বন্ধু শাহরিয়ারকে আটক রাখেন। অস্ত্র দেখিয়ে ভয়-ভীতি প্রদর্শন ও অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করেন। বাদী ও তার বান্ধবীকে জোর করে ঘরে নিয়ে যান আসামীরা। বাদীকে সাফাত আহমেদ একাধিকবার এবং বান্ধবীকে নাঈম আশরাফ ধর্ষণ করেন। আসামী সাদমান সাকিফকে দুই বছর ধরে চেনেন মামলার বাদী। তার মাধ্যমেই ঘটনার ১০-১৫ দিন আগে সাফাতের সঙ্গে দুই ছাত্রীর পরিচয় হয়।

এজাহারে আরো বলা হয়েছে, ঘটনার দিন সাফাতের জন্মদিনে দুই ছাত্রী যান। সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল ও দেহরক্ষী তাদের বনানীর ২৭ নম্বর রোডের দ্য রেইনট্রি হোটেলে নিয়ে যান। হোটেলে যাওয়ার আগে বাদী ও তার বান্ধবী জানতেন না, সেখানে পার্টি হবে। তাদের বলা হয়েছিল, এটা একটা বড় অনুষ্ঠান, অনেক লোকজন থাকবে। অনুষ্ঠান হবে হোটেলের ছাদে। সেখানে যাওয়ার পর তারা ভদ্র কোনো লোককে দেখেননি। সেখানে আরো দুই তরুণী ছিলেন। বাদী ও বান্ধবী দেখেন, সাফাত ও নাঈম ওই দুই তরুণীকে ছাদ থেকে নিচে নিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় বাদীর বন্ধু ও আরেক বান্ধবী ছাদে আসেন। পরিবেশ ভালো না লাগায় তারা চলে যেতে চান। আসামীরা তখন তাদের গাড়ির চাবি শাহরিয়ারের কাছ থেকে নিয়ে নেন। তাকে খুব মারধর করেন। ধর্ষণ করার সময় সাফাত গাড়িচালককে ভিডিওচিত্র ধারণ করতে বলেন। বাদীকে নাঈম আশরাফ মারধর করেন। এরপর বাদী ও বান্ধবীর বাসায় দেহরক্ষী পাঠানো হয় তথ্য সংগ্রহের জন্য। তারা এতে ভয় পেয়ে যান। লোকলজ্জার ভয় এবং মানসিক অসুস্থতা তারা কাটিয়ে উঠে পরে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে আলোচনা করে মামলার সিদ্ধান্ত নেন। এতে মামলা দায়ের করতে বিলম্ব হয়।

শাফাত, তার বাবা ও আপন জুয়েলার্সের হিসাব তলব

রাজধানীর বনানীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগের ঘটনায় আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ ও তার ছেলে শাফাত আহমেদের যাবতীয় ব্যাংক হিসাব তলব করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।

শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মইনুল খান জানান, বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যম সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আমরা জানতে পেরেছি যে বহুল আলোচিত ধর্ষণের ঘটনাটি চাপা দিতে বিপুল অর্থ খরচের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। আমরা এখন তদন্ত করে দেখছি এই অর্থের উৎস ডার্টি মানি কি-না। এ ছাড়া তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম অস্বচ্ছ কি-না, তাও খতিয়ে দেখছি।

বৃহস্পতিবার রাতে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর থেকে দিলদার ও শাফাত আহমেদের ব্যাংক হিসাব চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এই দুজনের পাশাপাশি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আপন জুয়েলার্সেরও ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশেই শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর বহুল আলোচিত আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ ও শাফাত আহমেদের সার্বিক ব্যবসায়িক লেনদেনের তদন্ত শুরু করে বলে শুল্ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।

প্রঙ্গত, গত ৬ মে বনানী থানায় পাঁচজনকে আসামী করে একটি ধর্ষণ মামলা করেন ধর্ষণের শিকার হওয়া একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, এক পরিচিত ব্যক্তির জন্মদিনের পার্টিতে অংশ নিতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হন তারা। বনানীর রেইনট্রি হোটেলের দুটি কক্ষে আটকে রেখে তাদের ধর্ষণ করা হয়।

মামলার পাঁচ আসামী হলেন শাফাত আহমেদ, নাঈম আশরাফ, সাদমান সাকিফ, শাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল ও তার দেহরক্ষী আবুল কালাম আজাদ। বৃহস্পতিবার রাতে সিলেটে গ্রেফতার হন শাফাত ও সাদমান। তারা বর্তমানে পুলিশী রিমাণ্ডে রয়েছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ