ঢাকা, শনিবার 13 May 2017, ৩০ বৈশাখ ১৪২৩, ১৬ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

পানিবদ্ধতা থেকে রক্ষা পেয়েছে সুজানগরের বিস্তীর্ণ গাজনার বিলের ১০ হাজার হেক্টর জমির ফসল

বেড়া (পাবনা) সংবাদদাতা : প্রবাদে আছে ‘বৃষ্টি পড়ে পাবনা; বিল ভরে গাজনা’। বৃষ্টির পানিবদ্ধতার কবল থেকে রক্ষা পেয়েছে সুজানগরের বিস্তীর্ণ গাজনার বিলাঞ্চলের প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমির ফসল। উজানের ঢলে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্ষণজনিত সৃষ্ট পানিবদ্ধতা নিষ্কাশন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় বিলের নিন্মাঞ্চলের প্রায় ১০০ একর জমির পাকা-আধাপাকা ধান, পাট পানির নিচে তলিয়ে যায়। এদিকে যমুনার পানি কমার পর সাগরকান্দির তালিমনগর স্লুইসগেট খুলে দেয়ায় সৃষ্ট পানিবদ্ধতা দূর হওয়ায় এলাকার কৃষকদের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে।

সরেজমিন ঘুরে তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, পাবনা সদর, সুজানগর ও সাঁথিয়া উপজেলার বৃষ্টির পানি মুক্তাহার বিল, ঘুঘুদাহ বিল, বিল গ্যারগা, গাঙভাঙ্গার বিল ও মোস্তার বিল, কানা বিল, জিয়ার জোলা, আত্রাই নদী, হিরন নদী, নাগনাখালী, বকশিয়ার খাল, সোনাপানির খাল ও ভাদুরঠাকুরের জেলা দিয়ে গাজনার বিলে হয়ে বাদাই নদীতে জমা হয়। সেই পানি পাবনা সেচ প্রকল্পের বণ্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের সাগরকান্দির তালিমনগরে বাদাই নদীতে নির্মিত স্লুইসগেট দিয়ে নিষ্কাশিত হয়ে যমুনা নদীতে পড়ে। সুজানগরের বৃহত্তর গাজনার বিলের সাথে জড়িয়ে রয়েছে বেশ কয়েকটি বিল ও নদী। বিলাঞ্চলের প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান, পাট, তিল ও অন্যান্য ফসলের আবাদ হয়েছে। এলাকার কৃষকরা বিলের নিচু এলাকায় আবাদ করেছেন আগাম জাতের বিআর-২৮ ও উঁচু জমিতে বিলম্বিত জাতের ২৯ ধান। পাকা ধান কাঁটা চলছে পুরোদমে। চলতি মওসুমে আগাম বৃষ্টি ও উজানের ঢলে যমুনা নদীর পানি অস্বাভাকি বৃদ্ধি পাওয়া পানি নিষ্কাশন কার্যক্রম বাঁধাগ্রস্ত হয়। এতে বিলের নিচু এলাকার প্রায় ১০০ একর জমির ধান ও পাট পানিতে তলিয়ে যায়। যমুনার পানি কমার সাথে সাথে নিষ্কাশন কর্যক্রম শুরু হওয়ায় জলাবদ্ধতা দুর হয়েছে। কৃষক ও দিনমজুরেরা ধান কাটছেন। সেই ধানের আঁটি নৌকায় এনে মহিষের গাড়ি ও নছিমনে করে বাড়িতে নেয়া হচ্ছে।

সুজানগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মঈনুল হক সরকার জানান, বিস্তীর্ণ গাজনার বিলে ১০ হাজার হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ফসল আবাদ হয়েছে। এবার গাজনার বিল এলাকায় এক হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আগাম জাতের বিআর-২৮ ও একটু বিলম্বিত জাতের বিআর-২৯ বোরো ধান চাষ হয়েছিল। প্রায় ৭ হাজার হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। এছাড়া এক হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে অন্যান্য ফসল আবাদ হয়েছে। তবে মওসুমের মাঝে যখন ধানের শিষ বের হয়, তখন প্রবল বৃষ্টি ও ঝড়ে পরাগায়ন ভাল হয়নি বলে শিষে চিটার পরিমাণ অন্যান্য বছরের চেয়ে বেড়েছে। আর জলাবদ্ধতায় বিলের নিচু এলাকায় ধান পাটের কিছু ক্ষতি হয়েছে। তবে বিলের পানি নিষ্কাশিত হওয়ায় ডুবে যাওয়া ধান পাট জেগে উঠেছে।

প্রবীণ রাজনীতিক পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি সাগরকান্দি ইউনিয়নের পুকুরনিয়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ তোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী বলেন, প্রবাদে আছে ‘বৃষ্টি পড়ে পাবনা, বিল ভরে গাজনা’। একটা সময় ছিল, যখন গাজনার বিল অঞ্চলে একটি ফসল আবাদ হতো। পানি উন্নয়ন বোর্ড ১৯৮০ সালে বণ্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও স্লুইসগেট নির্মাণের ফলে এখন রবি ফসল এবং আগাম জাতের বিআর-২৮ ও ২৯ ধান, পাট, তিলসহ অন্যান্য ফসল আবাদ হচ্ছে। নদী ও বিল খনন করায় দেশি প্রজাতির মাছের আবাদ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ অঞ্চলের কৃষকেরা সাধারণত পৌষ-মাঘ মাসে আগাম জাতের বিআর-২৮ ও ২৯ ধান রোপণ করেন। জলবায়ু পরিবর্তনে আবহাওয়া বিরূপ আচরণ করছে। এবছর চৈত্র মাস থেকেই ভারি বর্ষণ শুরু হয়েছে। ফলে পাবনা সদর, সাঁথিয়া ও সুজানগর উপজেলার বৃষ্টির পানি নেমে আসছে গাজনার বিলে। সেখান থেকে পানি বাদাই নদী দিয়ে তালিমনগর স্লুইসগেট হয়ে যমুনা নদীতে পড়ছে। উজানের ঢলে যমনায় আকস্মীক বন্যা দেখা দেয়। বিলের পানির উচ্চতার চেয়ে যমুনার পানির উচ্চতা বেশি হওয়া স্লুইসগেটের জলকপাট বন্ধ করে দেয়া হয়। এদিকে বৃষ্টিপাতে বিলে পানিবদ্ধতার সৃষ্টি হলে নিচু এলাকার প্রায় ১০০ একর জমির ফসল তলিয়ে যায়। যমুনায় পানি কমলে তিনদিন পর স্লুইসগেট খুলে দেয়ায় পানি নেমে যায়। এতে পানিবদ্ধতা দূর হয়েছে।

তালিমনগরে বেড়া পানি উন্নয়ন বিভাগের অধিন সুজানগর উপবিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী এ.এম রশিদ জানান, গত ৪ মে উজানের ঢলে যমুনা নদীর পানি আকস্মীক বৃদ্ধি পাওয়ায় সুজানগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আরিফুজ্জামানের পরামর্শে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী, সুজানগর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মেহেদী হাসানের উস্থিতিতে ওই দিন বিকেল ৪ টার মধ্যে স্লুইসগেটের ৬টি জলকপাটের ৫টি বন্ধ করা হয়। একটি জলকপাটে যান্ত্রিক ক্রটি থাকায় কৈটোলা পাম্পিং স্টেশন থেকে মেশিন এনে ত্রুটি মেরামত করে রাত ৯টার দিকে সেটি বন্ধ করা হয়। যমুনা নদীর পানি কমে যাওয়ায় ৭ মে বিলের পানি নিষ্কাশনের জন্য জলকপাট খুলে দেয়া হয়েছে।

চরবোয়ালিয়া গ্রামের কৃষক রমজান আলী বলেন, বোরো ধান ভাল হলে বিঘাপ্রতি ২৫ মণ পর্যন্ত ফলন হয়। চাষাবাদের খরচ বাদে ৪-৫ হাজার টাকা থাকে। পর্যায়ক্রমে অল্প অল্প খরচ করতে হয়। কিন্তু ফসল তোলার পর বিক্রি করে একসঙ্গে টাকা ঘরে আসে, এটাই মূলত লাভ। চিনাখড়া গ্রামের তাহেজ মন্ডল সোনাপানির খালে চার বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছেন। কামাল শেখ কানা বিলে দুই বিঘা জমিতে ধান ও ছয় বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছেন। তাদের জমিতে পানি উঠেছিল। সে পানি ৩ দিন পর নেমে গেছে। ধান কেটে গরুর গাড়িতে বাড়ি নিচ্ছেন। এই এলাকায় রবি ফসল পেঁয়াজ চাষের পর বৈশাখের শুরুতে পাট বপন করা হয়।

ডাব্লিউবিআরপি মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি দড়িমালঞ্চি গ্রামের মোঃ আব্দুস শুকুর বলেন, প্রায় ৩ হাজার জেলে ও জিয়ানি পরিবার গাজনার বিল এলাকার বিল ও নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। জ্যোষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি তালিমনগর স্লুইসগেটের জলকপাট খুলে দেয়া হয়। তখন যমুনার পানি স্লুইসগেট দিয়ে বিস্তীর্ণ বিল এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। পানির সাথে রেনু পোনা, ডিম ও মা মাছ বিলে আসে। বিল নদী খনন করায় মাছের বিচরণ ক্ষেত্র ও দেশী প্রজাতির মাছের উৎপাদন বেড়েছে।

বেড়া পানি উন্নয়ন বিভাগের সুজানগর উপ-বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মেহেদী হাসান বলেন, বিলের পানির উচ্চতার চেয়ে যমুনার পানির উচ্চতা বেশি হলে স্লুইসগেটের জলকপাট বন্ধ করে দেয়া হয়। যমুনার পানি না কমলে জলকপাট খুলে পানি নিষ্কাশন করা যাবে না। তবে গাজনার বিল প্রকলের আওতায় তালিমনগরে ডুয়েল সিস্টেম পাম্পিং স্টেশন নির্মাণ কাজ চলছে। এটি চালু হলে সেচ ও নিষ্কাশন উভয় কাজই চলবে। তখন যমুনায় পানির উচ্চতা বেশি হলে পাম্পিং স্টেশনের সাহায্যে পানি নিষ্কাশন করা সম্ভব হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ