ঢাকা, শনিবার 13 May 2017, ৩০ বৈশাখ ১৪২৩, ১৬ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মিথ্যা দিয়ে সত্য চাপা দেয়াই আজ বাহাদুরি

খান মুহাম্মদ ইয়াকুব আলী : একটি গল্প দিয়ে শুরু করি, এক গ্রামে ছিলো একজন অতিব গরীব ও সহজ সরল মানুয়। লোকটি কখনোই মিথ্যা কথা বলতো না। পুরো গ্রামে তার ছিলো সুনাম ও গ্রহণযোগ্যতা। একদিন লোকটি গহীন বনের মধ্যে একটি বড় মাপের স্বর্ণের বল পেয়েছিল, গ্রামের লোকেরা যাকে মাণিক্য বলে থাকে। সহজ সরল লোকটি এমন একটি মহামূল্যবান সম্পদ পাওয়ার পর মহা চিন্তায় পরে গেলো। এ সম্পদ কিভাবে ব্যাবহার করবে আর কোথায়ই বা রাখবে। হঠাৎ করে তার মাথায় একটি চিন্তা এলো, আর তা হলো ওই গ্রামেই একজন সম্মানিত লোক ছিলেন যাকে গ্রামের সবাই বিশ্বাস করতো এবং তার নিকট মালামাল গচ্ছিত রাখতো। সহজ সরল লোকটি তার মাণিক্যটি ওই বিশ্বস্ত লোকের নিকট রাখলো। গ্রাম্য বিশ্বস্ত লোকটি ওই সরল লোককে বললো, এ মাণিক্যের কথা আর কারো নিকট বলবে না। তোমার যখন দরকার তখনই নিয়ে যাবে। প্রিয় পাঠক! এতক্ষণে মনে হয় বুঝে ফেলেছেন এরপর গ্রাম্য বিশ্বস্ত লোকটি কি করেছিলো? যখন হাবা লোকটি তার মাণিক্য চাইতে গেলো অমনি গ্রাম্য সে ব্যাক্তি বলে ফেললো, কিসের মাণিক্য? এ নিয়ে যখন হৈচৈ শুরু হয়ে গেলো তখন কিছু লোক বললো, এ হাবাকে আমরা কোনোদিন মিথ্যা বলতে দেখিনি, তার কথা শুনতে চাই। হাবা লোকটি পুরো ঘটনা খুলে বলার পর গ্রাম্য বিশ্বস্ত বলে খ্যাত লোকটি বললো- এ হাবা পাগল হয়ে গেছে। সহজ সরল ব্যাক্তি এবার দুঃখ বেদনা আর লজ্জায় এ গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছে আর বলছে এ গ্রামেই আমি থাকবো না। হাটতে হাটতে সে আবার সেই গহীন জঙ্গল দিয়ে চলছে। হঠাৎ দেখতে পেলো একজন কালো মানুষ তার দিকে আসছে এবং একজন অতিব সুন্দর মানুষ তাকে অতিক্রম করে চলে যাচ্ছে। হাবা তখন সুন্দর লোকটিকে সালাম দিয়ে নিজের দুঃখের কথা বললো। সুন্দর লোকটি বললো দেখো আমি হলাম সত্য আর ওই যে দেখছো কালো মানুষটি সে হচ্ছে মিথ্যা। আমি নিজেই এ গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছি। তুমি তার কাছে যাও সে তোমাকে উপকার করতে পারবে। হাবা লোকটি তাই করলো, কালো মানুষটি হাবার সব কথা শুনার পর বললো, তুমি আবার সে গ্রামে যাও এবং এলাকাবাসীকে ডেকে বলো যে, আমি তার কাছে দুইটি মাণিক্য রেখেছিলাম। হাবা লোকটি তাই করলো এবার কান্নাকাটি করে গ্রামবাসীকে বলছে আমি এ গ্রাম ছেড়ে চিরদিনের চলে যাবো আপনারা শেষ বারের মতো আমার একটি কথা শুনুন। গ্রামবাসী তার প্রতি দুর্বল হয়ে বললো, বলো তুমি কি বলতে চাও। হাবা ব্যক্তি বললো আমার একটু ভুল হয়ে গেছে আমি আসলে তার কাছে মাণিক্য রাখছিলাম দুইটি। বিশ্বস্ত বলে খ্যাত লোকটি হেসে দিয়ে বললো, দেখলেনতো সে যে আসলেই পাগল তাই প্রমাণ হলো। মজলিস থেকে একজন দাঁড়িয়ে বললো আমরা জানি এ লোক কখনো মিথ্যা বলে না এবং বারবার আপনার কথাই কেন বলবে? অন্য একজন বললো বেটা মাণিক্য বের কর। তৃতীয়জন মারলো জোরে লাথি, অমনি সে বলে উঠলো আপনারা আমার কথা শুনুন, হাবা আমার কাছে একটি মাণিক্যই রেখেছিলো। উপস্থিত গ্রামবাসী বললো মিথ্যাবাদী তোর কথা আর বিশ্বাস করি না। মাণিক্য দুইটা বের কর তা না হলে তোর পরিণতি হবে ভয়াবহ। পরিশেষে বিশ্বস্ত বলে খ্যাত ব্যাক্তি সমস্থ সম্পদ বিক্রি করে হাবাকে দেয় এবং হাবা সুখে শান্তিতে জীবন যাপন কররতে থাকে। অন্যদিকে বিশ্বস্ত বলে খ্যাত ব্যাক্তির অবস্থা কি হলো তা কি আর বলার অপেক্ষা রইলো? প্রিয় পাঠক! ওই হাবা লোকটির মতো গ্রাম না ছাড়লেও দুঃখ আর বেদনায় লেখালেখি করার ইচ্ছে দমিয়ে ফেলি। কি হবে লিখে? কে শোনে কার কথা। এখন চলছে একেবারে দিনকে রাত আর রাতকে দিন বানানোর প্রতিযোগিতা। দেশের কর্তাব্যক্তিরাও ওই পলিসিতেই আছেন, সাহেব বলেন চমৎকার হে চমৎকার, মোসাহেব বলেন চমৎকার যে হতেই হবে, সাহেবের মতে অমতকার। দেশের কর্তা ব্যক্তিদের মতের বিরুদ্ধে গেলে পরিণতি কি তা আর বলে লাভ নেই। সুপ্রিম কোর্টের সামনে যে মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে, সেটি নাকি মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর প্রতিচ্ছবি, যার এক হাতে তলোয়ার অন্য হাতে দাঁড়িপাল্লা। যার অর্থ দাঁড়ায় ন্যায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আপোষহীন। প্রশ্ন জাগে ন্যায় প্রতিষ্ঠা কিভাবে করবেন? মিথ্যা দিয়ে দিয়ে কি কখনো সত্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব? দেশ থেকে গণতন্ত্র বিতারিত করে, ভোট কেটে অন্যের অধিকার ক্ষুন্ন করে কখনো কি ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব? ভিন্ন মতের লোকেরা কথা বললেই হয় দেশদ্রোহী না হয় আদালত অবমাননার মামলা। বর্তমানে মাননীয় প্রধান বিচারপতি বিবেকের তাড়নায় কিছু কথা বলেছেন। তাও শাসক গোষ্টির জ্বালার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তারা বলছেন “কোনো দেশের প্রধান বিচারপতি প্রকাশ্যে এতো কথা বলেন না”। জবাবে আবার মাননীয় প্রধান বিচারপতি বলেছেন “দেশে আইনের শাসন নেই বলেই এতো কথা বলতে হয়”। আমাদের জানতে ইচ্ছে হয় “আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক মানের হয়নি, এটা নিজেদের সাজানো”। এ কথা বললে যদি আদালত অবমাননার অপরাধে আদালতে হাজির হতে হয়, তবে “দেশে আইনের শাসন নেই শাসকদের ইচ্ছে মতো আইন চলছে”। এ কথা কোন পর্যায় পরে? আরো মজার বিষয় হচ্ছে, যখন কোনো মামলার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়, তখন আরজিতে কি লিখা হয়? লিখা হয় “যে আদালত এ রায় দিয়েছেন সে আদালত আমার মক্কেলের আরজি ভালোভাবে অনুধাবন না করেই এক তরফাভাবে এ রায় দিয়েছেন, আমি এর বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে সঠিক প্রতিকার চাই”। এতে কি আদালত অবমাননা হলো? প্রকৃতপক্ষে জনগণের নিকট যাদের কোনো জবাবদিহিতার ব্যাপার না থাকে তারা যা ইচ্ছে তাই করতে পারে, কারণ এ জনগণের ভোটের তার কোনো প্রয়োজন হবে না। কিন্তু জনগণের ভোটের অধিকার ছিনিয়ে নিলে তার পরিণতি কি হয় তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন সাবেক রাস্ট্রপতি জনাব হুসেইন মুহাম্মদম এরশাদ। বর্তমানে যেভাবে গুম, হত্যা, ক্রোস ফায়ার, বিরোধী মতের উপর অন্যায়ভাবে মামলা হামলা, ভোটকেটে ক্ষমতা দখল করা এবং বৈধ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের দেখলেই ধরে জেলে ঢুকানো, পর্দানশীন নারীদের জঙ্গি বলে গ্রেফতার করার মতো মারাত্মক কাজগুলো সম্পাদন করা হচ্ছে অত্যান্ত দক্ষতা আর যোগ্যতার সাথে। এসব কার্যক্রম কি সততা আর বিশ্বস্ততার কোনো তালিকায় পড়ে? অথচ শাসক গোষ্ঠির কতো অহংকার, আমরা কতো ভালো কাজ করছি, উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দিয়েছি। প্রকৃতপক্ষে এগুলোই হচ্ছে সেই মিথ্যা যেগুলোকে সত্য বলে চালানো হচ্ছে আর এ মিথ্যাই সত্যের উপর চেপে বসেছে। এ কারণেই বলতে হয় মিথ্যা দিয়ে সত্য চাপা দেয়াই যেনো আজ বড় বাহাদুরি। এ সব বাহাদুররা অযথা একটি মাণিক্য গোপন করে দুইটি ফেরত দিয়েও কুল পাবে না আবার শরীরের উপর দিয়েও বয়ে যেতে পারে মারাত্মক ঘূর্ণিঝড় তাও সরণে রাখতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ