ঢাকা, মঙ্গলবার 16 May 2017, ০২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, ১৯ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

লঞ্চযাত্রীদের সতর্কতা অবলম্বন করা প্রসঙ্গে

এম এ হক : [দুই]
গত বছর বৈশাখ মাসের (এপ্রিল ও মে) মধ্যে তেমন কোন ঝড়-তুফান, ঘূর্ণিঝড় হয়নি। আমরা ৩ সন্তানসহ এমবি যুবরাজ-১ লঞ্চে উঠি ও ডেকে বসি। গরমের কারণে লঞ্চের মাঝ বরাবর (যেখান থেকে মালামাল উঠানামা করায়) স্ত্রী ২ ছেলে ও ১মেয়েকে নিয়ে সেখানে বসি। লঞ্চ পয়সারহাটের উদ্দেশ্যে ঢাকা থেকে ছেড়ে যায় সন্ধ্যা ৬টায়। লঞ্চে যাত্রীর সংখ্যা অনুমান প্রায় ২/৩ শত। আমরা লঞ্চে উঠে মোটামুটি সাইটে বসে বাতাস খাচ্ছি। যখন ফতুল্লা ছাড়ালো তখন বাহিরে তাকিয়ে দেখি উত্তর-পশ্চিমাকাশে প্রচন্ড কালোকালো মেঘ। আমি একটু ‘থ’ খেয়ে দাঁড়িয়ে চিন্তা করছি যে, কালবৈশাখী ঝড়ের দিনে (এমবি যুবরাজ-১) ছোট লঞ্চে উঠলাম কেন? এ কথা চিন্তা করতে না করতেই বাহিরের দিক থেকে ধমকা হাওয়া বইতে থাকে। প্রথম ধমকা হাওয়ায় লঞ্চ কাত হয়ে যাওয়ায় ভয়ও পেয়ে যাই আমি ও আমার সন্তান এবং লঞ্চের সকল যাত্রী। লঞ্চের যাত্রীদের অনেকে লঞ্চের খাম্বা জড়িয়ে কান্না শুরু করে দেয়, চেচামেচি করতে থাকেন অনেকেই, কেউ আল্লাহকে ডাকে, কেউ ডাকে বগবানকে, কেউ দোহাই দেয়, কেউ আবার বড়গলায় আজান দেয় এবং কলেমা পড়ে ও জিকির করে। আমি  ধৈর্য্যসহকারে ছোট মেয়েটাকে নিয়ে লঞ্চের যে সাইট দিয়ে ঝড় আসছে সেই সাইটে যাইতে চাইলে চোখে বালু ঝড় এসে চোখে বালু পরে চোখ বন্ধ হয়ে যায় আর কিছুই দেখি না। ধমকার পর ধমকা হলেও আমি আমার মেয়ে বাচ্চাকে হাতছাড়া করিনি। মেঝো ছেলে, সেঝো ছেলে ও ছোট ছেলেকে বাতাসে উড়িয়ে ফেলে দিতে চাইলেও ওরা নিজেরা নিজেরা যেখানে কম বাতাস লাগে সেখানে আস্তে আস্তে চলে আসে হামাগুড়ি দিয়ে।
ধমকা হাওয়া ঝড়ের কারণে আমি জোড় গলায় চিল্লানি দিয়ে কেরাণি ও সুকানির কাছে চলে যাই আর ধমক দিতে থাকি এবং বলতে থাকি লঞ্চপাড়ে ভিড়াতে। তারা উল্টোভাবে আমাকে ধমক দিয়ে বলে আমরা কি কিছু বুঝিনা! আপনি চিল্লাপাল্লা করবেন না। আমিও আবার পাল্টা ধমক দিতে থাকি এবং লঞ্চের অনেক যাত্রীরা নদীর পাড়ে লঞ্চ নিতে বললে লঞ্চের স্টাফরা চিল্লাপাল্লা করতে থাকে আমাদের সাথে। আমরা কয়েকজন তাদের সাথে চিল্লাপাল্লা করতে থাকি এবং আমি আল্লাহ-বিল্লা করতে থাকি। পাঁচ সাতটি ধমকা হাওয়ার পরে লঞ্চ কর্তৃপক্ষ লঞ্চটি ইটেরভাটার পাশে (মানে ফতুল্লা থেকে বের হলে তার বরাবর অপর পাড়ে গিয়ে) লঞ্চটি ভিড়ায়। লঞ্চে এমন ধাক্কা লাগলো যে আমরা সবাই হামাগুড়ী খেয়ে যাই। লঞ্চ ভিড়ানোর কিছুক্ষণ পরেই ঝড় থেমে গেলেও পাড় থেকে লঞ্চ আর নামছে না। তখন বরিশাল থেকে ছেড়ে আসা একটি লঞ্চ এসে আমাদের লঞ্চকে নামিয়ে দিয়ে যায়। আমরা সবাই হতবম্ব হয়ে যাই ও সেই থেকে আমার স্ত্রী আর সে লঞ্চে উঠতে চায় না এবং সেই থেকে অসুস্থ হয়ে যায়। আজ অবদি যুবরাজ-১ লঞ্চটি বন্ধ করে রাখেনি, এখনও চালাচ্ছে ঢাকা টু পয়সারহাটের লাইনে। দেশে ঝড়-তুফান ও পদ্মা নদীর কারণে যুবরাজ-১ চলাচল করাটা খুবই বিপদজনক। যুবরাজ-১ লঞ্চের মালিককে বললেও তারা সে ব্যাপারে কোন গুরুত্ব দেয়নি এবং বিশেষ করে লঞ্চ কর্তৃপক্ষ লঞ্চটি আর বন্ধও করেনি। ২০১৭ সালেও দেখি সেই লঞ্চ চলছে এই ঝড় বৃষ্টি ও তুফানের মধ্যে অনেক মানুষ মনের সাহস হারাচ্ছে। 
গত ২০০৫ সালের দিকের ঘটনা। আমি ও আমার বড় মেয়ে ঢাকা থেকে পয়সারহাটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে যাই। তখন লঞ্চ ছিল এমভি মিতালী-৩। আমি ও বড় মেয়ে ফারজানা ইয়াসমিন লঞ্চে উঠি। পয়সার হাটের লঞ্চে করেই আমরা যথারীতি সুষ্ঠুভাবে বাড়িতে গিয়ে উঠি এবং সপ্তাহ খানেক পরে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। সম্ভবত রবিবার ঢাকার উদ্দেশ্যেই রওয়ানা হয়ে আসি ঢাকার উদ্দেশ্যে। তখন যে লঞ্চে এসেছি তার নাম মনে নেই। তখন মরহুম আবদুল মজিদ মুন্সি ভাই বলে ডাকি। তিনিও সে লঞ্চে ছিল। সন্ধ্যার দিকে লঞ্চ বাবুগঞ্জ ছাড়িয়ে আসলে প্রচন্ড ঘূর্ণিঝড় হয় ও লঞ্চ থামাতে বাধ্য হয় এবং চরে গিয়ে লংগর করে। ঝড় থামলে আবার লঞ্চ ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে বড় নদীতে বের হয়ে আসলেই খবর পাই যে, পয়সারহাটের মিতালী-৩ লঞ্চ পাগলায় ডুবে যায়। তাতে যাত্রীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ থেকে ৪’শ। আমি এর আগের সপ্তাহে এই লঞ্চে করে ঢাকা থেকে বাড়িতে রওয়ানা হয়ে যাই। ভোরে লঞ্চে ঢাকায় আসলেই পাগলায় দেখি লঞ্চ ভুট করা। আসে পাশের লোকজনের হাহাকার ও হৃদয় বিদারক দৃশ্য। আমি অফিসে এসে সাথে সাথে পাগলায় চলে যাই। পাগলায় গিয়ে দেখি এক লাশ। লাশটি চিনে তাকে নিতে আসে এলাকার লোকজন। সেই লঞ্চে আমার ভাইগ্না কাওছার খান মারা যায় ৩তলা থেকে পড়ে এবং বোনের ঘরের মেয়ে ভাগ্নী জামাইর লাশ পাওয়া গেল। তাকে নিয়ে যায় বরিশাল জেলার উজিরপুর থানার ভরাকোটা ইউনিয়নের মুন্সির তাল্লুক হাই স্কুল ও মহিলা মাদ্রাসার কাছে। 
২০০৬ সালে মিরেরহাট থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে এমভি পারাবত-৬ লঞ্চে উঠি। লঞ্চে উঠে ঘুমাই সবাই, চাঁদপুর আসলেই ঘুম ভেঙ্গে যায়। চাঁদপুর আসতেই রাত ৩টা বাজে প্রায়। লঞ্চ চাঁদপুর থেকে ছেড়ে ৬০ হয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে যায়। পদ্মা নদীর মাঝামাঝি আসলেই ঘূর্ণি ঝড় শুরু হয়। তখন লঞ্চের এপাশ থেকে ওপাশে লোকজন দৌঁড়াদৌরি করতে থাকে। ঝড় ও বৃষ্টির মধ্যে কিছু লোক চাঁদর গায়ে দিয়ে আল্লাহর জিকিরে মশগুল হয়ে যায়। আমরাও আল্লাহকে স্মরণ করতে থাকি এবং তওবা তিল্লা করে রেডি হয়ে যাই। আমার সাথে বড় মেয়ে ফারজানা ইয়াসমিনকে নিয়ে আল্লাহর জিকিরে মশগুল হয়ে যাই। লঞ্চ গিয়ে চরে উঠিয়ে দেয়। পাশে আরো ২/৩টি লঞ্চ ভিড়ায়। পাশে বসে শোনা যায় যে কান্নার রোল। এক দেড় ঘন্টা পরে ঝড় আস্তে আস্তে থেমে যায়। মুন্সিগঞ্জের নদীতে আসে। ঝড়ের সময় মানত করা হয় ১০ রাকাত নামায আদায় করা হবে। সবাইকে বলে দেই যে আপনারা আজ বাসায় গিয়ে দশ দশ রাখাত নামায আদায় করবেন। আমি আদায় করে থাকি।
লঞ্চের যাত্রীদের জন্য যে সমস্যা : লঞ্চের যাত্রীদের জন্য লঞ্চ কর্তৃপক্ষ না রাখছেন বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, না রাখছেন যাত্রীদের জন্য ভাল খাবার ও বসার স্থান। তাছাড়া সদর ঘাটের কোন লঞ্চেই বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা নেই, পরিবেশমত টয়লেটের ব্যবস্থা নেই, টয়লেট কম থাকায় যাত্রীদের কষ্ট হয়, দাঁড়িয়ে থাকতে হয় আধাঘন্টার বেশী সময়। ডায়রিয়া, আমাশা, বমি, পেট ব্যথা এবং আঘাতে কেটে, ফেটে গেলেও নেই কোন ডাক্তার ও এমনকি ডায়রিয়া বা বমির সময় জরুরি ঔষধের কোন ব্যবস্থাও নেই। বাহিরের খাবার বিক্রি করে ফেরিয়ালারা। তারা ফেরি করে যে খাবার বিক্রয় করে তা মানসম্মত নয়, হোটেলে তরিতরকারী, মাছ, গোশত রান্না করে বুড়ি গংগা নদীর ময়লা পানি দিয়ে ও বিশুদ্ধ পানি দিয়ে রান্না করা হয় না এবং ফেরিয়ালারা ও লঞ্চ দোকানদাররা খাবারের দামও রাখে চড়া। ফেরিয়ালারা জোড় জুলুম করে লঞ্চে উঠে খাবার বেচাকেনা করলেও তারা একঘাট থেকে অন্য ঘাটে নামতে-উঠতে পারেনা। তাহলে তারা মার খায় বলে ফেরিয়ালারা জানায়।
লঞ্চ যাত্রীদের টাকায় লঞ্চ মালিক চলেন, তাই বলে যাত্রীদের ভাল বসার জায়গা, বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের ব্যবস্থা নেই কেন? যাত্রীদের থাকা খাওয়া ও বসার ব্যবস্থা করতে এতো অনিহা কেন? তারা কি মানুষ নয়। যাত্রীদের সাথে ভাড়ার বিষয়টি নিয়ে লঞ্চ কর্তৃপক্ষ অনেক বাড়াবাড়ি করে। ঢাকা থেকে চাঁদপুরের ভাড়া নেয় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা করে। ঢাকা থেকে বাবুগঞ্জ, বাহের চর, দোয়ারিকা, শিকারপুর, উজিরপুর, চৌধুরীর হাট, গালা (মিরেরহাট), বানারীপাড়া ভাড়া নেয় এখন ২০০ থেকে ২৫০ টাকা করে। আবার যুবরাত-১-এ, তরিকা-২তে ঢাকা থেকে চাঁদপুর, বাবুগঞ্জ, বাহেরচর, দোয়ারিকা, শিকারপুর, উজিরপুর, চৌধুরীর হাট, গালা (মিরেরহাট), হাবিবপুর, হারতা, বিশারকান্দি, সাতলা, বাগদা, পয়সারহাটে ভাড়া নেয় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা করে। যেখানে হুলারহাটের লঞ্চে মিরেরহাট নেয় ২০০ টাকা করে এবং ঢাকা থেকে হারতায় নেয় ২৫০ টাকা করে। ঈদের সময় জনপ্রতি ভাড়া নেয় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা করে। দেখার নেই কেউ। যাত্রীদের সাথে ব্যবহার করা রুঢ় ভাষায়। খারাপ ভাষা ছাড়া কেরানীরা ব্যবহার করে না। এগুলো লঞ্চ মালিক কর্তৃপক্ষ দেখে না দেখার ভান করেন। অনেক অনেক লঞ্চ মালিকরা যাত্রীদের নামার সময় ১২ বছরের কম বয়সী বাচ্চাদের ভাড়া আদায় করে থাকে। সরকারের কোন নিয়ম কানুন লঞ্চ মালিকরা মানেন না। বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, বাচ্চা, পঙ্গু, রোগী, অসহায় গরীব লোকদের এবং হান্যহারা ব্যক্তিদের কাছ থেকে ভাড়া না নেয়ার জন্য অনুরোধ জানাই।
সেই সাথে লঞ্চ যাত্রীদের জীবনের নিরাপত্তা দান, লঞ্চের বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা, পরিষ্কার পানি দিয়ে রান্না করার ব্যবস্থা করা, ভাড়া আরো কম নেয়া, ১৫ বছরের নিচের বয়সের সন্তানের ভাড়া না নেয়া, হান্যহারা ব্যক্তিদের এবং গরীব, অসহায় লোকদের ভাড়া হাফ করে নেয়ার জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও লঞ্চ মালিক কর্তৃপক্ষের কাছে আকুল আবেদন জানাই। [সমাপ্ত]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ