ঢাকা, বুধবার 17 May 2017, ০৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, ২০ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বনানীর জোড়া ধর্ষণকাণ্ডের ঘটনা ও ভিডিও ধারণের কথা স্বীকার করেছে গাড়িচালক বিল্লাল

গতকাল মঙ্গলবার ধর্ষক সাফায়েতের গাড়িচালক ও গানম্যানকে আদালতে হাজির করে পুলিশ -সংগ্রাম

# সংবাদ সম্মেলনে ডেকে যা বললো রেইনট্রি কর্তৃপক্ষ 

# হোটেলটির সিসিটিভি সার্ভার জব্দ, গোয়েন্দাদের হাতে অজানা তথ্য

# আপন জুয়েলার্সের আরও ২১২ কেজি স্বর্ণালঙ্কার ‘আটক’

# এমপি হারুনকে নিয়ে ক্ষুব্ধ ঝালকাঠির আওয়ামী লীগ নেতারা

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : রাজধানীর অভিজাত এলাকাখ্যাত বনানীর রেইনট্রি হোটেলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই তরুণীকে ধর্ষণ ও ধর্ষণের ভিডিও ধারণের কথা প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেছে ওই ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত সাফাত আহমেদের গাড়িচালক বিল্লাল হোসেন (২৭)। বিল্লালকে গ্রেফতারের পর সোমবার রাতে র‌্যাব-১০ এর অধিনায়ক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন মাতুব্বর কাওরানবাজারে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। 

এর আগে, সোমবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে রাজধানীর ওয়ারির নবাবপুরের ‘দি-নিউ ঢাকা বোর্ডিং আবাসিক হোটেল’ থেকে বিল্লাল হোসেনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-১০ এর একটি দল। রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণের শিকার দুই তরুণীর দায়ের করা মামলার পাঁচ নম্বর আসামী সে। 

গাড়িচালক বিল্লালের বরাত দিয়ে র‌্যাব-১০ এর অধিনায়ক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন মাতুব্বর জানান, বনানী থানায় ভিকটিমরা মামলা করার পর বিষয়টি আসামীরা অনলাইনে জানতে পারে। তখন আসামী সাফাত, সাদমান সাকিফ, সাফাতের দেহরক্ষী আজাদ ওরফে রহমত আলীকে গাড়িতে নিয়ে চালক বিল্লাল হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের দিকে যায়। সেখানে তারা একটি হোটেলে খাওয়া-দাওয়া করার পর গাজীপুর হয়ে মাওনা দিয়ে সিলেটে চলে যায়। সাফাত ও সাদমান সাকিফ সিলেটে সাফাতের নানাবাড়িতে থাকে। সাফাতের দেহরক্ষী আজাদ ও গাড়িচালক বিল্লাল একটি রিসোর্টে থাকে। পরবর্তীতে দেহরক্ষী আজাদ রিসোর্ট থেকে চলে যায়। বিল্লাল নিজেও সিলেট থেকে ছাতক চলে যায়। সে ছাতক থেকে আবার সিলেট ও সিলেট থেকে রোববার ভোরে ঢাকায় আসে। এরপর নবাবপুরের ওই হোটেলে সে সুজান নামে উঠে। সেখান থেকে সন্ধ্যায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। 

র‌্যাব-১০ এর অধিনায়ক আরও বলেন, ‘বিল্লাল আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলার জন্য ঢাকায় এসেছিলো। আইনজীবীর সঙ্গে সে কথাও বলেছে। কিভাবে কি করবে, সেসব পরামর্শ করেছে কয়েক দফা। এর মধ্যেই তাকে গ্রেফতার করা হয়। ’

সেদিন রেইনট্রি হোটেলে কী কী ঘটেছিল তার বিস্তারিত বর্ণনাও দিয়েছে বিল্লাল। সে ভিকটিমদের গাড়িতে আনা-নেয়ার কথাও জানিয়েছে বলে জানান র‌্যাব-১০-এর এই অধিনায়ক। তিনি জানান, বিল্লাল সবাইকে বিভিন্ন জায়গা থেকে হোটেলে এনে ভোর রাত ৪টার দিকে সাফাতদের বাড়িতে গাড়ি রেখে ফের রেইনট্রি হোটেলে ফিরে আসে। এরপর সাফাত তাকে হোটেল কক্ষে যেতে বলে। বিল্লাল কক্ষে যাওয়ার পর সাফাত তাকে কক্ষের বাথরুমে যেখানে ফলস পার্টিশন দেয়া, সেখানে দাঁড় করিয়ে রাখে। এ সময় ধর্ষণের ঘটনাটি সে ভিডিও করে। পরে সকালে একটি ভাড়া করা মাইক্রোবাসে করে দুই তরুণীকে বাসায় পাঠায় সাফাত। ঘটনার সবকিছু প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেছে গাড়িচালক বিল্লাল। গ্রেফতারকৃত বিল্লালের গ্রামের বাড়ি নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার রামেশ্বরের দাঁড়িডোমায়। রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় সে থাকতো। 

ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিযোগ এনে গত ৬ মে বনানী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন বেসকারকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী। তারা মামলার এজাহারে উল্লেখ করেন, ‘২৮ মার্চ পূর্বপরিচিত সাফাত আহমেদের জন্মদিনের দাওয়াত দিয়ে তাদের বনানীর কে ব্লকের ২৭ নম্বর সড়কের ৪৯ নম্বরে রেইনট্রি নামের হোটেলে নিয়ে যায়। সেখানে দুই তরুণীকে হোটেলের একটি কক্ষে আটকে রেখে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে ধর্ষণ করে সাফাত ও নাঈম। ’ এ ঘটনা সাফাতের গাড়িচালক বিল্লালকে দিয়ে ভিডিও করানো হয় বলেও উল্লেখ করা হয় এজাহারে। 

যা বললো রেইনট্রি কর্তৃপক্ষ

সংবাদ সম্মেলন ডেকে সাংবাদিকদের তোপের মুখে অনেকটা এলোমেলো, অসম্পূর্ণ বক্তব্য দিয়েছে দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনাস্থল হিসেবে আলোচিত বানানীর রেইনট্রি হোটেল কর্তৃপক্ষ। গতকাল মঙ্গলবার হোটেলের লবিতে এই সংবাদ সম্মেলনে ইংরেজিতে লিখিত বক্তব্য দেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক এইচ এম আদনান হারুন, যিনি ঝালকাঠি-১ আসনের আওয়ামী লীগের সাংসদ বজলুল হক হারুনের ছেলে। এসময় সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের মুখে নিরুত্তর থাকতে দেখা যায় তাকে। বক্তব্যে তিনি ধর্ষণের ঘটনা তদন্তে সহায়তার প্রতিশ্রুতি ছাড়াও জড়িতদের শাস্তি দাবি করেন। সংবাদ সম্মেলনে হোটেলের মহাব্যবস্থাপক ফ্রাঙ্ক ফরগেটও ইংরেজিতে বক্তব্য দেয়া শুরু করলে সাংবাদিকরা আপত্তি তোলেন। পরে হোটেলের অর্থায়নকারী হুমায়রা গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক রেজা গোলাম মোস্তফা বাংলায় লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান। 

বনানীর চার তারকা মানের ওই হোটেলটি পরিচালনা করেন আদনান হারুনের ভাই মাহির হারুন। 

অভিযোগ রয়েছে, মাহিরের বন্ধু পরিচয়েই গত ২৮ মার্চ ওই হোটেলে উঠেছিলেন ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামী সাফাত আহমেদ। তার জন্মদিনের কথা বলেই দাওয়াত দেয়া হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া দুই তরুণীকে। ধর্ষণের শিকার দুই তরুণীর একজনও ওই রাতে মাহির নামে একজনের দেখা পাওয়ার কথা গণমাধ্যমকে বলেছিলেন। তাদের জোর করে রুমে নেয়ার আগে মাহিরকে দেখার কথা জানিয়ে ওই তরুণী বলেন, “মাহির নামের একজন নিজেকে হোটেলটির মালিক পরিচয় দিয়ে সেদিন সাফাতের জন্মদিনের জন্য একটি কেক উপহার নিয়ে এসেছিলেন।” 

এই বিষয়ে রেজা গোলাম মোস্তফা বলেন, “প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে, গ্রাহক আকর্ষণের কথা মাথায় রেখে শুরু থেকেই আগত অতিথিদের জন্ম ও বিবাহবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে কমপ্লিমেন্টারি কেক দিয়ে থাকে রেইনট্রি। তারই ধারাবাহিকতায় ঘটনার দিন হোটেল কর্তৃপক্ষ আসামী সাফাতের জন্মদিনের কেক প্রদান করেছে। এই কেকের সঙ্গে মাহির হারুনের ব্যক্তিগত সংশ্লেষ নেই। 

আসামীদের হোটেলে চেক-ইন ও চেক-আউটের সব তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং সেগুলো তদন্তকারী কর্তৃপক্ষকে দেয়া হয়েছে বলে রেজা গোলাম মোস্তফার ভাষ্য। 

ঘটনার দিনের সিসিটিভি ফুটেজ ডিলিট করা হয়েছে- গণমাধ্যমে প্রকাশিত এমন সংবাদের বিষয়েও একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করান গোলাম মোস্তফা। তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হোটেল ব্যবস্থাপনায় কোথাও ৩০ দিনের অধিক সময় সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ করা হয় না। এই হোটেলেও ৩০ দিন পর্যন্ত সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ করা হয়। ৩০ দিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওভাররাইট হয়ে পুরাতন ডাটা মুছে গিয়ে নতুন ডাটা সংরক্ষিত হয়। “এ ঘটনা ঘটার ৩৮ দিন পর হোটেল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সিসিটিভি ভিডিও ফুটেজ ওভাররাইট হয়ে গেছে।” ১৪ মে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অভিযানে মদ উদ্ধার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন গোলাম মোস্তফা। 

এর আগে ১৩ মে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ‘প্রতিটি কক্ষে তল্লাশি চালিয়ে কোনো কিছুই’ উদ্ধার করতে পারেননি মন্তব্য করে তিনি বলেন, “তাহলে কীভাবে ১৪ মে শুল্ক বিভাগের অভিযানে হোটেলের একটি কক্ষে ১০ বোতল মদ পাওয়া গেল- সেটা আমাদেরও প্রশ্ন আপনাদের বিবেকের কাছে।” 

তাহলে শুল্ক গোয়েন্দারা আপনাদের ফাঁসানোর জন্য সঙ্গে করে মদ নিয়ে এসেছিলেন কিনা- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে আদনান হারুন বলেন, “এ বিষয়ে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই।” 

ঘটনার দিন রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত হোটেলের মহাব্যবস্থাপক ফ্রাঙ্ক ফরগেট হোটেলে অবস্থান করেছিলেন জানিয়ে গোলাম মোস্তফা বলেন, “ঘটনার দিন হোটেল কার্যক্রমে তিনি কোনো অস্বাভাবিকতা দেখেননি বলে মন্তব্য করেননি- এটি শুধুই হোটেল অপারেশন অর্থে বলেছিলেন। এমন কি ভিকটিমরা হোটেল কর্তৃপক্ষকে কোনো অভিযোগও করেনি।” 

হোটেলের ছাদে জন্মদিনের অনুষ্ঠান কতক্ষণ চলেছিল- এমন প্রশ্নে ব্যবস্থাপনা পরিচালক আদনান হারুন বলেন, “বিষয়টি তদন্তাধীন। আমি কিছু বলতে পারব না।” 

একইভাবে ‘তদন্তাধীন বিষয় বলে’ সাংবাদিকদের আরও প্রশ্ন এড়িয়ে যান কর্মকর্তারা; এক পর্যায়ে কিছু না বলেই সংবাদ সম্মেলন থেকে চলে যান তারা। 

ধর্ষণ মামলার চার আসামী আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত, তার বন্ধু সাদমান সাকিফ, সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল হোসেন ও দেহরক্ষী রহমত আলী গ্রেফতারের পরে রিমান্ডে রয়েছেন। মামলার আরেক আসামী নাঈম আশরাফ এখনও পলাতক। 

অভিযোগকারী তরুণীদের একজন জানিয়েছিলেন, পীড়াপীড়িতে বাধ্য হয়ে তারা রেইনট্রি হোটেলে সাফাতের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। তাদের নিতে গাড়ি নিয়ে এসেছিলেন সাফাতের গাড়িচালক ও দেহরক্ষী। ধর্ষণের সময় দেহরক্ষী রহমতকে দিয়ে ভিডিও ধারণ করা হয়েছিল বলেও দাবি করেন ওই তরুণী। ধর্ষণের আলোচিত ঘটনার পর রেইনট্রি হোটেলে শুল্ক গোয়েন্দারা অভিযান চালিয়ে অবৈধ মদ উদ্ধারসহ নানা অনিয়ম পাওয়ার কথা জানায়। ভ্যাট ফাঁকি,শুল্ক ফাঁকি ও মুদ্রা পাচার- এই তিন অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতিও চলছে। রেইনট্রির মালিকদের তলবও করা হয়েছে। 

রেইনট্রির সিসিটিভি সার্ভার জব্দ, গোয়েন্দাদের হাতে অজানা তথ্য

রেইনট্রি হোটেলের সিসিটিভির সব ফুটেজ এখন সিআইডির ডিজিটাল ল্যাবে। হোটেলে যতগুলো ক্যামেরা ছিল, সবগুলোর ফুটেজ ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ও ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের নারী-কর্মকর্তাদের যৌথ টিম উদ্ধার করেছে। ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিওগুলো প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ওই হোটেলের অনেক অজানা তথ্যই এখন গোয়েন্দা পুলিশের হাতে। পুলিশের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এই তথ্য পাওয়া গেছে। 

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রেইনট্রি হোটেল কর্তৃপক্ষ ফুটেজ সংরক্ষণের কথা বারবার অস্বীকার করেছে। তারা গণমাধ্যমকেও জানিয়েছে এক মাসের বেশি সময়ের ফুটেজ তারা সংরক্ষণ করে না। হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বনানী থানা পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তারাও একই কথা বলতে থাকেন। 

বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি যখন চরমে, তখনই গোয়েন্দা পুলিশ ও ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের কর্মকর্তারা দফায় দফায় হোটেলে অভিযান পরিচালনা করেন। বিভিন্ন ধরনের আলামত জব্দের পাশাপাশি রেইনট্রি হোটেলের ফুটেজ সংরক্ষণের সার্ভার মেশিনও জব্দ করেন তারা। 

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের আইটি এক্সপার্ট কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে ওই সার্ভারে অনেক ফুটেজের অস্তিত্ব নিশ্চিত হলে তা আরও পরীক্ষার জন্য রোববার (১৪ মে) পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির ফরেনসিক পরীক্ষাগার ও ডিজিটাল ল্যাবে হস্তান্তর করা হয়। ধর্ষণের শিকার তরুণীদের ব্যবহৃত বিভিন্ন পোশাকও সিআইডির কাছে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। 

সিআইডির কর্মকর্তারা জানান, সিআইডির দুটি টিম আলামতগুলোর পরীক্ষা শুরু করে দিয়েছে। ফরেনসিক পরীক্ষাগারে তরুণীদের ব্যবহৃত পোশাক থেকে আসামীদের ডিএনএ শনাক্তকরণ,পাশাপাশি রেইনট্রি হোটেলে মামলার আসামীদের উপস্থিতি ও বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডের ডিজিটাল পরীক্ষা করছে সিআইডির পৃথক টিম। 

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, রেইনট্রি হোটেলের সিসিটিভি ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণকারী যন্ত্র ও ফুটেজ সংরক্ষণকারী সার্ভার মেশিনে অনেক ফুটেজ পাওয়া গেছে। সেখান থেকে ওই রাতের ঘটনার ভিডিও ছাড়াও পরবর্তীতে ওই হোটেলে আসামীদের যাতায়াত ও যোগাযোগের তথ্যও পরীক্ষা করা হচ্ছে। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে গোয়েন্দা পুলিশের একজন সাইবার ক্রাইম বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা বলেন, যে কোনও ধরনের ডিভাইস বা ডিজিটাল যন্ত্র থেকে মুছে ফেলা সর্বশেষ তথ্য উদ্ধারের প্রযুক্তিও আছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির হাতে। কাজেই হোটেল কর্তৃপক্ষ উদ্দেশ্যমূলক কোনও ফুটেজ সরিয়ে ফেললেও সেই তথ্যও জানা যাবে। সর্বশেষ ডিলিট করা ফুটেজও উদ্ধার করা সম্ভব হবে। 

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ- কমিশনার (মিডিয়া) মো. মাসুদুর রহমান বলেন, ‘রেইনট্রি হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণের সার্ভার জব্দ করা হয়েছে। সার্ভার মেশিনের ডিজিটাল পরীক্ষার জন্য সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এছাড়া সিআইডির ফরেনসিক পরীক্ষাগারে আসামীদের ডিএনএ শনাক্তকরণের জন্য ধর্ষণের শিকার তরুণীদের ব্যবহৃত পোশাকও দেয়া হয়েছে। ’

সাফাতের গাড়িচালক, দেহরক্ষী রিমান্ডে

ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামী আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদের গাড়িচালক বিল্লাল হোসেন ও দেহরক্ষী রহমত আলীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে দিয়েছে আদালত। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) নারী সহায়তা ও তদন্ত বিভাগের পরিদর্শক ইসমত আরা অ্যানি তাদের ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে ১০ দিনের হেফাজতে নেয়ার আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিকালে মহানগর হাকিম লস্কার সোহেল রানা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বিল্লালকে ৪ দিন ও রহমতকে ৩ দিনের হেফাজতে নেয়ার অনুমতি দেন বলে আদালত পুলিশের এসআই আব্দুল মান্নান জানান। 

দুই আসামীর পক্ষে আদালতে রিমান্ড বাতিল চান আইনজীবী শেখ হেমায়েত হোসেন মোল্লা। 

এসআই মান্নান বলেন, এজলাসে দুই আসামীকে বিমর্ষ দেখা গেছে। তারা আদালতে বিচারক বা সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। 

আপন জুয়েলার্সের আরও ২১২ কেজি স্বর্ণালঙ্কার ‘আটক’

দ্বিতীয় দিনের অভিযানে আপন জুয়েলার্সের আরেকটি বিক্রয় কেন্দ্র থেকে ২১২ কেজি স্বর্ণালঙ্কার ‘আটক’ করেছেন শুল্ক গোয়েন্দারা। সোমবার অভিযানের পর শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মইনুল খান সাংবাদিকদের বলেছেন, তাদের এই ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। 

ধর্ষণের মামলায় মালিকের ছেলের বিরুদ্ধে মামলার পর রোববার রাজধানীতে আপন জুয়েলার্সের পাঁচটি শাখায় অভিযান চালিয়ে প্রায় তিনশ কেজি সোনা ও হীরার গহনা ‘আটক’ করেন শুল্ক গোয়েন্দারা। 

সোমবার গুলশান ২ নম্বর সার্কেলের সুবাস্তুু টাওয়ারের বিক্রয় কেন্দ্রে অভিযান চালিয়ে ২১২ কেজি সোনা আটকের কথা জানান শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাইফুর রহমান। তিনি বলেন, “সুবাস্তু টাওয়ার বিক্রয়কেন্দ্রে থেকে ২১২ কেজি সোনা পাওয়া গেছে, যার মূল্য প্রায় ৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৫ কেজি সোনার তথ্য প্রমাণাদি দেখাতে পেয়েছে তারা।” ওই বিক্রয় কেন্দ্র থেকে ১১ কোটি ১৪ লাখ টাকা মূল্যের ১৮৪০ ক্যারেট হীরা আটকের কথাও জানান তিনি। এর মধ্যে ৬০০ ক্যারেটের কাগজপত্র আপন জুয়েলার্স কর্তৃপক্ষ দেখাতে পেরেছে বলে সাইফুর জানান। 

বনানীতে দুই ছাত্রীকে ধর্ষণের মামলার প্রধান আসামী সাফাত আহমেদের বাবা দিলদার আহমেদ আপন জুয়েলার্সের অন্যতম মালিক। এই পরিবারের বিরুদ্ধে সোনা চোরাচালানের অভিযোগ থাকায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশে একটি অনুসন্ধান কমিটি করে তদন্ত চালাচ্ছে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর। 

শুল্ক কর্মকর্তা সাইফুর রহমান বলেন, “আমরা এই ডায়মন্ড ও সোনাগুলো তাদের জিম্মায় দিয়ে আসছি এবং দোকান সিলগালা করে দিয়েছি। তারা বলছে, বাকি কাগজগুলো ১৭ তারিখের মধ্যে দেখাতে পারবে।” 

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মইনুল খান জানান, স্বর্ণ ও রতœ সংগ্রহের তথ্যে অস্বচ্ছতা এবং মালিকের ‘অবৈধ সম্পদের’ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবেই শুল্ক আইনের বিধান অনুসারে ওই অলঙ্কার তারা ‘আটক’ করেছেন। ‘ব্যাখ্যাহীনভাবে’ সোনা ও হীরার গয়না মজুদের অভিযোগে আপন জুয়েলার্সের মালিকদের তলবও করেছে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ। আগামী ১৭ মে বেলা ১১টায় তাদের কাকরাইলে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের সদরদপ্তরে কাগজপত্রসহ হাজির হতে বলা হয়েছে। 

এদিকে আপন জুয়েলার্সে শুল্ক গোয়েন্দাদের এই অভিযানকে হয়রানিমূলক দাবি করে তার নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি। 

এমপি হারুনকে নিয়ে ক্ষুব্ধ ঝালকাঠির আওয়ামী লীগ নেতারা

এতদিন চাপা ছিল, রেইনট্রি হোটেলে তরুণী ধর্ষণের ঘটনার পর দলীয় সংসদ সদস্য বজলুল হক হারুনকে নিয়ে ঝালকাঠির আওয়ামী লীগ নেতাদের সেই ক্ষোভ এখন বেরিয়ে এসেছে। ২০০৮ সালের প্রথমবার নির্বাচিত হওয়ার পর দশম সংসদেও ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঁঠালিয়া) আসন থেকে আওয়ামী লীগের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছেন বি এইচ হারুন। ধর্ম মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হারুন আওয়ামী লীগের ঝালকাঠি জেলা কমিটির সদস্য এবং রাজাপুর উপজেলা কমিটির সভাপতি। 

দুই তরুণী ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর ঢাকার বনানীতে রেইনট্রি হোটেল এখন আলোচিত। হারুনের জমির উপর গড়ে ওঠা ওই হোটেলটির মালিকানা তার সন্তানদের, ছোট ছেলে মাহির হারুনই মূলত এটি চালান। 

ধর্ষণের ঘটনার পর শুল্ক গোয়েন্দারা রোববার অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে রাখা মদ জব্দ করেন। ভ্যাট ফাঁকির প্রমাণ পাওয়ার কথাও জানান তারা। রাজউক বলছে, আবাসিক এলাকায় অবৈধভাবে ওই হোটেল চালানো হচ্ছে। 

সারাদেশের মতো ঝালকাঠিতেও রেইনট্রি হোটেলের ঘটনা এখন আলোচিত, সেই সঙ্গে সমালোচিত হচ্ছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য হারুনও। যে কমিটিতে হারুন সভাপতি, সেই রাজাপুর উপজেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল ইসলাম মাতুব্বরও তার সমালোচনামুখর। 

রিয়াজুল বলেন, “২০০৮ সালের নির্বাচন থেকেই আমরা তাকে (হারুনকে প্রত্যাখ্যান করে আসছিলাম। গত নির্বাচনের আগেও আমরা তার প্রতি অনাস্থা জানিয়েছিলাম। “এখন তার হোটেলে ছাত্রী ধর্ষণ ও মাদক জব্দ হওয়া এলাকায় আওয়ামী লীগের জন্য একটি বড় ধাক্কা। এতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।” 

হারুনের সংসদীয় আসনের অপর উপজেলা কাঁঠালিয়ার আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক তরুণ সিকদার বলেন, “সে আমাদের দলীয় ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। আমরা তাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছি।” 

আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রকে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন রাজাপুর উপজেলা সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল। তিনি বলেন, “এখানে (রাজাপুরে) বিএনপির সংগঠন অনেক শক্ত, তাই রাজনৈতিকভাবেও বিষয়টি দলের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে।” 

নানা ব্যবসায় যুক্ত হারুনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তার তিন ছেলে নাহিয়ান হারুন, আদনান হারুন ও মাহির হারুনই চালান। হারুনের ছোট ভাই মজিবুল হক কামাল রাজাপুর উপজেলার গালুয়া ইনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং ঝালকাঠি জেলা আওয়ামী লীগের সমাজ কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক। হারুনের বাবা রাজাপুর উপজেলার কানুদাশকাঠি গ্রামের আব্দুর রব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ