ঢাকা, বুধবার 17 May 2017, ০৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, ২০ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

কলাগাছের আঁশ থেকে আসবাব

-এম এস শহিদ
২০১৪ সালের শেষের দিকে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বস্ত্র প্রকৌশল বিভাগের তৎকালীন ছাত্র সাগর দাস শিশির ও তার বন্ধু রফিকুল ইসলাম কলাগাছ থেকে কিভাবে আঁশ তৈরি করা যায় তা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। পরবর্তীতে এই দলে যোগ দেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ অমি ও আশিস সরকার। আর তাদের সহযোগীতায় এগিয়ে আসেন ওই বিশ্ববিদল্যায়ের সহকারী অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম। ব্যাপক গবেষণার পর অবেশেষে তারা সাফল্য পেলেন। কলাগাছ থেকে তারা তৈরি করে ফেললেন আঁশ। পরীক্ষায় দেখা গেল, পাটের মতোই এ আঁশ শক্তিশালী। আঁশের কম্পোজিট তৈরীর পর আরও আশাবাদী হলেন তারা। এ আঁশ দিয়ে তৈরী করা যাবে হার্ডবোর্ড, যা দিয়ে নানা ধরনের আসবাব বানানো যাবে। সেই সাথে তৈরী করা যেতে পারে, কাঁচা ঘরের বেড়া-চাল, তৈরী করা যাবে সুতা, কাপড়, ও কাগজ। সহকারী অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে জানান, বিশ্বের কয়েকটি দেশ কিছুদিন ধরে কলাগাছের আঁশ নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছে এবং এ ব্যপারে সাফল্যও পাওয়া গেছে। তবে বাংলাদেশে কলাগাছের আঁশ নিয়ে গবেষনার কথা তার জানা নেই। তার কয়েকজন ছাত্র এ বিষয়ে গবেষণা করতে চাইলে তিনি আন্তরিকভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। মাত্র দেড় বৎসরের সেই গবেষনা এখন সফল পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছে। গবেষক দলের প্রধান সাগর দাস শিশির বলেন, পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে কলার আবাদ হয়। চিরায়ত প্রথানুযায়ী কলা সংগ্রহের পর সাধারণত গাছটি কেটে ফেলা হয়। সাগর দাস শিশির বলেন, পরিত্যক্ত সেইগাছ থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু তৈরীর চিন্তা দীর্ঘদিন ধরে ঘুরপাক খাচ্ছিল।
গবেষনার শুরুতে কলাগাছের বাকল সংগ্রহ করে ৭০ থেকে ১০ দিন পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়। বাকল পচে গেলে তা থেকে আঁশ সংগ্রহ করে শুকানো হয়। এই আঁশগুলোকে প্রক্রিয়াজাতের পর পৃথক পৃথক কম্পোজিট করে নানা জিনিস তৈরী করা সম্ভব। শিশির আরও বলেন, নমুনা হিসেবে তারা কয়েকটি কম্পোজিট তৈরী করেছেন। তারা পরীক্ষা করে দেখেছেন, কলাগাছের আঁশের একটা কম্পোজিট পাট-কাঠি বা কাঠের  তৈরী হার্ডবোর্ডের থেকে শক্তিময়তা কোনো অংশে কম নয়। শিশির জানান, অধ্যাপক আজহারুল ইসলামের মতো বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা প্রকৌশলী মেসলেম উদ্দিন ও তাদের সাথে এ গবেষণায় শুরু থেকে সম্পৃক্ত রয়েছেন। গবেষক দলের আরেক সদস্য আশিস সরকার বলেন, রাস্তা কিংবা ভবন নির্মানের শুরুতে মাটির ওপর পলিথিন রেখে ঢালাই দেয়া হয়। এক্ষেত্রে পলিথিনের পরিবর্তে কলাগছের আঁশের তৈরী কম্পোজিট জিওটেক্সটাইল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
তাহলে নির্মাণকে আরও স্থায়ীত্ব দেয়া যাবে। কলাগাছের আঁশ থেকে মণ্ড তৈরী করে তা দিয়ে মানসম্পন্ন কাগজ তৈরী করা সম্ভব বলে দলের আরেক সদস্য আবু সাঈদ অমি জানান। কোস্টারিকার গবেষকরা ইতোমধ্যে এ কাজে সফলতা পেয়েছেন।
আঁশকে প্রক্রিয়াজত করে সুতা ও কাপড় তৈরী করা যায়। জাপানে কলার আঁশ ব্যবহার করে গরমের পোশাক বানানো হচ্ছে। নাইজেরিয়ায় এটি থেকে স্যানিটারি ন্যাপকিল তৈরী হয়। আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলে ঘরবাড়ি নির্মাণে বাঁশ-কাঠ ব্যবাহার করা হয়। এর পরিবর্তে কলাগাছের আঁশ ব্যবহার করা হলে তা আরও বেশি সাশ্রয়ী ও টেকসই হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, কলাগাছের আঁশের একটি কম্পোজিট পাঠকাঠি বা কাঠের তৈরী হার্ড-বোর্ডের চেয়ে মজবুত কোনো অংশে কম নয়। এর সহনক্ষমতা ৩৫ দশমিক ৩২ সেন্টিনিউটন পারটেক্সট।
পাটের জাতভেদে সহন-ক্ষমতা ২৫ থেকে ৪০ সেন্টিনিউটন পর্যন্ত হয়। পাটের বিকল্প হিসেবে সমান শক্তির আঁশ হিসেবে কলাগাছের আঁশ ব্যবহার করা যেতে পারে।  গবেষক দলে সদস্যরা জানান, তারা সহজে কলাগাছ থেকে ঘরের বেড়া বা চাল তৈরীর কৌশল গ্রামাঞ্চলের মানুষকে শিখিয়ে দিতে চান। কয়েকজন মেধাবী তরুণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে এ গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এ গবেষণায় প্রচুর অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এখন পর্যন্ত তারা ব্যক্তিগতভাবে এ-গবেষণার ব্যয়ভার বহন করছেন। তবে এ গবেষনাকে আরও সাফল্যম্ডত করতে সরকারি-বেসরকারি সাহায্য সহযোগিতার প্রয়োজন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ