ঢাকা, বুধবার 17 May 2017, ০৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, ২০ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

খুলনায় ভারতীয় ভিসার আবেদনে জাল সনদের ছড়াছড়ি

খুলনা অফিস : খুলনা মহানগরীর  শেখপাড়া তেতুঁলতলা মোড়ে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার শাখা। এখানে ভারতীয় ভিসা আবেদনের ফরম জমা নেয়া হয়। স্টেট ব্যাংকের এই শাখায় প্রতিদিন হাজার খানেক আবেদনকারী তাদের ভিসার জন্যে আবেদন জমা দেন। ভিসা পেতে আবেদনকারীকে পাসপোর্টের সঙ্গে ব্যাংক সলভেন্সি সার্টিফিকেট, জমির পর্চা, বিদ্যুৎ বিলসহ বেশ কিছু কাগজপত্র জমা দিতে হয়। এগুলো সব স্থায়ী আবাসের প্রমাণপত্র। আবার ব্যাংক একাউন্ট থাকতে হবে সোনালী ব্যাংক বা রাষ্ট্রয়াত্ত কোন ব্যাংকে। একাউন্টে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে টাকা আছে তাও দেখাতে হয়। ভিসা প্রত্যাশীরা যাদের সব কাগজপত্র নেই, তারা দালালদের দিয়ে এসব ভুয়া কাগজ তৈরি করেন, তাই জমা দেন। দালালরা এই কাগজ তৈরির জন্যে টাকা নেন। এমনকি ব্যাংকের হিসাব বিবরণীও তারা জোগাড় করে দেন। নিজের ব্যাংক হিসাব বা টাকা জমা থাকার কোন কিছু প্রয়োজন পড়ে না।
সোমবার সকালে এখানে অটো হতে নামেন এক দম্পতি। তাঁদের দিকে দু’যুবক এগিয়ে আসেন। জানতে চান, ভিসা করাবেন কি-না। তারা সম্মতিসূচক মাথা দোলান। একপ্রকার জোর করেই তাদের কাছ থেকে ওই যুবকদ্বয় কাগজপত্র, পাসপোর্ট নিয়ে নেন। তারা সেগুলো পরখ করে বলে, বিদ্যুৎ বিলে আপনার নামের মিল নেই। পুরুষ লোকটি বলেন, বিদ্যুৎ বিল ্মা-বাবার নামে। তারপরও ওই দু’যুবক বলেন, এটা জমা দিলে ভিসা পাবেন না। আমাদের কাছে দেন। আর ৩০০ টাকা দিন, আমরা ঠিক করে দিচ্ছি। ওই দম্পতি তাদের কাছে কাগজপত্রগুলো গুলো দিয়ে দেন। ঘন্টা খানেক পর ওই দুই যুবকের একজন এসে দম্পতির পুরুষ সদস্যকে তার নিজের নামের বিদ্যুৎ বিল দিয়ে কাগজপত্রগুলো ফেরত দেন।
যদি ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে ভিসা পাওয়া যায়, তবে এসব কাগজপত্র জমা নেয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ভিসা প্রত্যাশী পাইকগাছার হরিঢালী গ্রামের আব্দুল গফ্ফার।
এরপর আসেন সাতক্ষীরার বয়োবৃদ্ধ হরিপদ দাশ। এ সময় বয়স্ক এক ব্যক্তি তার কাছে এসে ওই দুই যুবকের ন্যায় কাগজ পত্র দেখতে চান। তিনি তাদেরকে বলেন, তোমরা কি ভিসা অফিসের লোক। যদি হও তাহলে বাইরে কেন। আমি কোন লোকের কাছে কাগজ পত্র দেব না। তাদেরকে বলেন, তোমাদের ঠিক করতে হবে না। আমার সব কাগজ ঠিক আছে। ভিসা না দিলে যাবো না। এ কথা বলেই তিনি ব্যাংকের ভিতরে প্রবেশ করেন।
জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁর বাড়ি সাতক্ষীরা জেলার সাতক্ষীরা সদরে। তিনি চিকিৎসার জন্যে ভারতে যেতে চান। ভারতে তাঁর মেয়ে, জামাই, ভাইঝি বসবাস করেন। তাদের সাথেও দেখা করতে চান। তাই ভিসার আবেদন করছেন। সাতক্ষীরা পৌর শহরের এক কম্পিউটারের দোকান থেকে তিনি ভিসার আবেদন জমা দেয়ার জন্যে ‘সিরিয়াল’ নিয়েছেন। সেখানে ব্যাংকের কাগজপত্রসহ অন্যান্য কাগজপত্র তৈরী করতে এক হাজার ৬ শ’ টাকা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমার ব্যাংকে একাউন্ট নেই। ব্যাংকে টাকাও নেই। কিন্তু ভিসা নিতে ব্যাংকে টাকা আছে এমন সার্টিফিকেট দিতে হয়। তাই বাধ্য হয়ে টাকা দিয়ে ব্যাংকের কাগজ নিয়েছি।’
ভিসার আবেদন ফরম পূরণের জন্য একজন গ্রাহকের কাছ থেকে পাসপোর্ট প্রতি ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা আদায় করা হয়। যার প্রকৃত ব্যয় ৩০ থেকে ৫০ টাকা। নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে পাসপোর্ট অনুযায়ী সব তথ্য পূরণ করে দুটি পাতা প্রিন্ট দিতে হয়। সাধারণভাবে এই ওয়েরসাইটে প্রবেশ করা যায় না।
এজন্যে ফরম পূরণ করে দেয়ার নামে একটি চক্র গড়ে উঠেছে। তারাই প্রয়োজনে নাগরিক সনদপত্র, বিদ্যুৎ বিল বা টেলিফোন বিলের কপি, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, জমির পর্চা, জাতীয় পরিচয়পত্র, শির্থীদের পরিচয়পত্র, চাকরিজীবীদের প্রত্যয়নপত্রসহ সব তৈরি করে দেন। এরজন্যে প্রতিটি কাগজের জন্যে তিন’শ থেকে দেড় হাজার, কখনও তারও বেশী টাকা আদায় করা হয়।
ভুয়া কাগজপত্র সম্পর্কে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্টেট ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, ভিসা আবেদনের সঙ্গে জমা দেয়া কাগজপত্র যাচাই-বাছাইকালে অনেকগুলো ভুয়া ধরাও পড়ে। এ কারণে অনেকে ভিসা পাচ্ছেন না। আবার অনেকেই ভিসা পাচ্ছেন। অনেকের পাসপোর্টও আটকে থাকছে মাসের পর মাস। পাসপোর্ট ফেরত পাওয়ার পর আবেদনকারীরা আবারও দালালের কাছে যাচ্ছেন। টাকার বিনিময়ে ফের জাল সার্টিফিকেট বানিয়ে আবেদন করছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ