ঢাকা, বৃহস্পতিবার 18 May 2017, ০৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, ২১ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ক্রেডিট কার্ডের উচ্চ সুদ হারে শোষণ অব্যাহত

এইচ এম আকতার : ক্রেডিট কার্ডের উচ্চ সুদ হারে শোষণ অব্যাহত রয়েছে। হিডেন চার্জের (অপ্রদর্শিত চার্জ) পিষ্ট থেকে গ্রাহকদের বাঁচাতে সুদ হার বেঁধে প্রজ্ঞাপন জারি করলেও তা আমলে নিচ্ছে না ব্যাংকগুলো। লাগাম টানতে সুদের হার বেঁধে দিলেও অধিকাংশ ব্যাংক বলছে প্রজ্ঞাপনের খবর জানে না। অনেকে জানলেও বাস্তবায়নে গরিমসি করছে। ফলে বেঁধে দেয়া সুদের হার কবে থেকে কার্যকর হবে তাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

জানা গেছে, প্রতিবেশি দেশগুলোয় এ হার ১২-৩০ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে তা সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ। হিডেন চার্জসহ প্রায় ৪০ শতাংশ সুদ কেটে নেয়া হচ্ছে। গত কয়েক বছরে আমানতের সুদহার অর্ধেকে নেমে এলেও ক্রেডিট কার্ডের সুদহার কমেনি। গণমাধ্যমে এমন সংবাদ প্রকাশের পর সুদ হার কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনায় দেখা যায়, ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে দেশি ব্যাংকগুলোর প্রকাশ্য সুদহার বিশ্বের অন্যান্য দেশের ব্যাংকগুলোর তুলনায় অনেক বেশি নিচ্ছে। এর ওপর রয়েছে ২০ থেকে ৩০ রকমের ‘হিডেন চার্জ’। সব মিলিয়ে গড় সুদহার পড়ছে ৪০ শতাংশের বেশি। এদিকে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ব্যাংকগুলোয় ক্রেডিট কার্ডের বার্ষিক সুদ হচ্ছে ১৮ থেকে ৩০ শতাংশ, মিয়ানমারে ১২ দশমিক ৮৪ থেকে ১৩ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ১৯ দশমিক ৬৮ থেকে ২৪ শতাংশ, চীনে ১৮ দশমিক ৫৫ থেকে ২৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

জানা গেছে, গত কয়েক বছরে আমানতের সুদহার অর্ধেকে এসেছে। বিভিন্ন ধরনের ঋণের সুদহার কমেছে। কিন্তু ক্রেডিট কার্ডের সুদহার কমেনি। বরং ক্ষেত্রবিশেষ বেড়েছে। বেড়েছে আনুষঙ্গিক চার্জও। এদিকে কার্ডধারীর সংখ্যা দ্রুত বেড়ে ১০ লাখে পৌঁছালেও চড়া সুদের কারণে এ সংখ্যা এখন আর বাড়ছে না, বরং কমছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, প্রতি মাসে ১৫ থেকে ১৬ হাজার ব্যবহারকারী ক্রেডিট কার্ড জমা দিচ্ছেন ব্যাংকগুলোতে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গত বৃহস্পতিবারে জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এখন থেকে ব্যাংকগুলো যে সুদে ভোক্তা ঋণ দিয়ে থাকে, তাদের ক্রেডিট কার্ডে সুদের হার তার চেয়ে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ বেশি নিতে পারবে। বর্তমানে ভোক্তা ঋণের সুদ হার সর্বনিম্ন ৯ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ। সে হিসেবে ক্রেডিট কার্ডের সবোর্চ্চ সুদ হার হবে ১৪-১৯ শতাংশ পর্যন্ত। এর বেশি সুদ কোন ব্যাংকই নিতে পারবে না।

রাষ্ট্রায়াত্ব সোনালী ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, প্রজ্ঞাপন সম্পর্কে এখনও জানিনা। তবে অর্থমন্ত্রনালয় থেকে আইন পাস হয়েছে জানি। প্রজ্ঞাপন জারি হলেও ব্যাংক অভ্যন্তরীণ সভা ডেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে যে, কবে থেকে তা কার্যকর হবে। প্রায় একই কথা জানালেন জনতা ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার থেকে আমি অফিসের বাইরে। তাই বিষয়টি এখনও জানি না। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আইন করলে তা অবশ্যই বাস্তবায়ন করা হবে। না জানার তালিকায় বেসরকারি কয়েকটি ব্যাংকও রয়েছে।

ঢাকা ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান আব্দুল হাই শিকদার বলেন, পত্রিকায় দেখেছি। ব্যাংকগুলো তাদের সভা ডেকে হয়তো এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে। সেক্ষেত্রে সময় লাগতে পারে। এটা হয়তো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হতে হতে জুলাই মাস লেগে যেতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ থেকে, নাকি ব্যাংকের বাস্তবায়নের তারিখ থেকে ক্রেডিট কার্ডের সুদ হিসেব করা হবে এমন প্রশ্নের জবাবে শফিকুল আলম বলেন, সুদ হিসেব কার্যকরের তারিখ নিয়ে খুব সমস্যা হবে না। প্রজ্ঞাপন জারি ও আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাঝামাঝি সময় থেকে হয়ত সুদ হিসেব করা হতে পারে। তবে একটু সময় লেগে যেতে পারে।

এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান বলেন, এই মুহূর্তে আমি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছি। প্রজ্ঞাপন সম্পর্কে কিছুই জানি না। না জেনে মন্তব্য করতে রাজি নই। ২৩ মে বাংলাদেশে আসবো। তারপর সিদ্ধান্ত।

তবে এ বিষয়ে কঠোর রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বলেন, যেদিন থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে সেদিন থেকেই নতুন হারে সুদ ধার্য করতে হবে ব্যাংকগুলোকে। শুধু তাই-নয় ওই আদেশে সুদ হার ছাড়াও যেসব শর্ত দেয়া আছে তার সবগুলোই পরিপালন করতে হবে।

ভোক্তা ঋণ বা কনজিউমার লোন বলতে বুঝায়, সাধারণত গৃহঋণ, মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারসহ ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়ি কেনা বাবদ, চিকিৎসা এবং বিয়েসহ ব্যক্তিগত প্রয়োজনের পাশাপাশি গৃহস্থালি পণ্য কেনার জন্য প্রদত্ত ঋণ। এর পরিমাণ হতে পারে ১০ হাজার থেকে ১ কোটি টাকার বেশি। বিভিন্ন মেয়াদে পরিশোধ করার সুযোগ দেয়া হয় গ্রহীতাদের। ব্যাংকভেদে এ ঋণের সুদের হার হয় আলাদা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তফসিলভুক্ত ৫৭ টি ব্যাংকের মধ্যে ৩০টি বর্তমানে ক্রেডিট কার্ডে ঋণ সুবিধা দিয়ে আসছে।

জানা গেছে, এসব ব্যাংকের কর্মকর্তারা লোভনীয় অফার দিয়ে ক্রেডিট কার্ড করছে। নানা সুযোগ সুবিধার কথা বললেও সর্বোচ্চ সুদ হারের কথা উল্লেখ্য করেন না। আধুনিক ব্যাংকের নামে গ্রাহকদের সুদের দড়ি গলায় ঝুলিয়ে নামে বেনামে হিডেন চার্জ কর্তন করছে ব্যাংকগুলো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অভিযোগ করেও কোন সুরহা হয়নি। প্রতি নিয়তই তারা নানা হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

ক্রেডিট কার্ডে ব্যাংকগুলোর অতি উচ্চ সুদের বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ব্যাংক সংশ্লিষ্ট অযাচিত বিষয়ের নিয়ন্ত্রণকারী বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ব্যাপারে সার্কুলার জারি করলে ব্যাংকগুলো বাস্তবায়নে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলার বাস্তবায়ন না করলে অবশ্যই ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

 গ্রাহকদের অভিযোগ, ক্রেডিট কার্ডে কেনাকাটা করা মানেই ফাঁদে পা দেয়া। লোন নিয়ে বাজার করলেই দিতে হয় প্রায় দ্বিগুণ। মাত্রাতিরিক্ত সুদের পাশাপাশি ডলারের রেট নিয়েও ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে রয়েছে বেশ অভিযোগ। ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে যারা বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহার করেন, তারা ব্যাংকে বিল পরিশোধ করতে গেলে ডলারের বাজার রেটের চেয়ে দেড় থেকে দুই টাকা বেশি দরে পরিশোধ করতে হয়।

দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের একটি বেসরকারি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারী এডভোকেট শাহ আলম সরকার। তিনি সুদের এ উচ্চ হারে ক্ষোভ প্রকাশ করে দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, এক পয়সাও লিমিট ক্রস করলে ৪০০ থেকে সাড়ে ৪০০ টাকা ‘ওভার লিমিট ফি’, আবার লাস্ট ডেট ছুটির দিন হলেও ‘লেট পেমেন্ট ফি’সহ নানা রকম হিডেন চার্জ দিতে হয়। নানা অজুহাতে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ সুদ হারের এ তালবাহানার ঋণ মরণফাঁদ ছাড়া আর কিছুই নয়। লাস্ট ডেট ছুটির দিন হলেও পরের অফিস ডে’তে লেট পেমেন্ট ফি ছাড়া বিল পরিশোধ করা যায় না- যা সবচেয়ে বড় ধরনের ধোঁকাবাজি। তবে ক্রেডিট কার্ডের সুদ হার কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারণ করে দিয়েছে শুনে খুব খুশি হয়েছি। এটি আরও আগেই করা উচিৎ ছিল। এই নীতিমালা বাস্তবায়ন হলেই কেবল সুফল পাবে সাধারণ গ্রাহকরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ