ঢাকা, বৃহস্পতিবার 18 May 2017, ০৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, ২১ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সাড়ে ১৩ মণ স্বর্ণালঙ্কার ও ৪২৭ গ্রাম হীরা মজুদের কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেনি আপন জুয়েলার্সের তিন মালিক ॥ এক সপ্তাহ সময়

 * মামলার তদন্ত শেষ হচ্ছে দ্রুতই : পুলিশ

* তলবে হাজির হননি রেইনট্রি হোটেল কর্তৃপক্ষ ॥ সময় পেলেন ৭ দিন 

* আমাকে গ্রেফতার করলে সবাইকে জেলে যেতে হবে : আপনের মালিক দিলদার

* দুই তরুণীকে নিরাপত্তা দেয়ার নির্দেশ আদালতের

* আপন জুয়েলার্সে গ্রাহকদের গচ্ছিত সোনা সোমবার তুলে নেয়ার আহ্বান

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : রাজধানীর বনানীর আলোচিত জোড়া ধর্ষণকান্ডের পরিকল্পনাকারী প্লেবয় ও ছাত্রলীগ নেতা নাঈম আশরাফকে গরু খোঁজা খুঁজে অবশেষে ঘটনার ১০ দিন পর আইনশৃংখলাবাহিনীর সদস্যরা তাকে গ্রেফতার করেছে। ওই মামলার পলাতক দুই নম্বর আসামি আব্দুল হালিম ওরফে নাঈম আশরাফকে গতকাল বুধবার রাত পৌনে ৯টার দিকে মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ের টঙ্গীপাড়া থেকে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ সদর দফতরের গোয়েন্দা শাখা। গত রাতে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

মুন্সীগঞ্জের পুলিশ সুপার জাহেদুল আলম নাঈম আশরাফকে গ্রেফতারের খবরটি নিশ্চিত করে বলেন, ‘গোপন সূত্রে খবর পেয়ে পুলিশ সদর দফতরের গোয়েন্দা শাখার একটি দল স্থানীয় পুলিশের সহায়তা নিয়ে টঙ্গীপাড়া থেকে তাকে গ্রেফতার করে।’ এর আগে গত ১১ মে আলোচিত এই মামলার অন্যতম দুই আসামি সাফাত আহমেদ ও সাদমান সাকিফকে সিলেট থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

নাঈম আশরাফ নিজেকে আওয়ামী লীগ নেতার ছেলের বন্ধু বলে পরিচয় দিলেও তার গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জে বলে জানা গেছে। এর আগে যে সব সম্ভাব্য স্থানগুলোতে তার অবস্থানের কথা সেসব স্থানেও তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার কর্মকান্ডের উপস্থিতি ছিল বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। ওই জোড়া ধর্ষণকান্ডের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্তকারীদের কাছে পলাতক নাঈমের গুরুত্ব বেড়েই চলেছিল। কারণ ওই ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে তাকে পাওয়া গেলে অনেক তথ্যই বের হয়ে আসতো বলে জানিয়েছিলেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। এ জন্যই নাঈমকে গরু খোঁজা হয়।

এদিকে, শুল্ক গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে সাড়ে ১৩ মণ স্বর্ণালঙ্কার ও ৪২৭ গ্রাম হীরার মজুদের কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি আপন জুয়েলার্সের তিন মালিক। আর অবৈধভাবে মদ রাখা ও শুল্ক ফাঁকির অভিযোগের মুখে থাকা বনানীর রেইনট্রি হোটেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অসুস্থতার কথা বলে সময়ের আবেদন পাঠিয়েছেন আইনজীবীর মাধ্যমে। দুই পক্ষকেই আগামী ২৩ মে আবার শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কার্যালয়ে হাজির হতে বলা হয়েছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে নিয়ে।

আপন জুয়েলার্সের তিন মালিক দিলদার ও তার দুই ভাই গুলজার আহমেদ ও আজাদ আহমেদকে গতকাল বুধবার বেলা ১২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মইনুল খান। তিনি বলেন, গত ১৪ ও ১৫ মে গুলশান ডিসিসি মার্কেট, গুলশান এভিনিউ, উত্তরা, মৌচাক ও জিগাতলার সীমান্ত স্কয়ারে আপন জুয়েলার্সের শাখায় অভিযান চালিয়ে প্রায় সাড়ে ১৩ মণ স্বর্ণালঙ্কার ও ৪২৭ গ্রাম হীরার গয়না আটক করা হয় সেগুলোর বৈধ উৎসের কাগজপত্র দেখাতে না পারার কারণে। “তিনজন মালিক আজও (বুধবার) বৈধ কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। তারা আরও ১৫ দিন সময় চেয়ে লিখিত আবেদন করেছেন। শুল্ক গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও দলিল সংগ্রহ করে আগামী ২৩ মে বেলা ২টায় তাদের সশরীরে উপস্থিত হয়ে মজুদ স্বর্ণ ও ডায়মন্ডের ব্যাপারে শুনানিতে অংশ নিতে নির্দেশ দিয়েছে।” প্রাথমিকভাবে যেসব অভিযোগে আপন জুয়েলার্সে অভিযান চালানো হয়েছিল, ‘তা প্রমাণিত হয়েছে’ বলে দাবি করেন শুল্ক গোয়েন্দা প্রধান।

আপনের জন্য নির্দেশনা

মইনুল খান জানান, আপন জুয়েলার্সের বিপুল পরিমাণ সোনা ও হীরা গয়না আটক রাখা হলেও গ্রাহক ও তদন্তের স্বার্থে কিছু নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। জুয়েলার্সের

আপন জুয়েলার্সের বিভিন্ন শাখায় মেরামত ও পরিবর্তনের জন্য যারা ‘অক্ষত অবস্থায় অলঙ্কার গচ্ছিত রেখেছিলেন’, তারা ২২ মে বেলা ২টায় সংশ্লিষ্ট শাখায় উপস্থিত হয়ে রশিদ দেখিয়ে সেসব গয়না ফেরত নিতে পারবেন।আপন জুয়েলার্সের মালিকপক্ষ এ বিষয়টি সংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের জানিয়ে দেবে। তবে আটক সাড়ে ১৩ মণ স্বর্ণালঙ্কারে মধ্যে গ্রাহকদের গচ্ছিত স্বর্ণের পরিমাণ ১০ কেজির বেশি হবে না বলেই শুল্ক গোয়েন্দাদের ধারণা।

আপন জুয়েলার্স কর্তৃপক্ষ জিজ্ঞাসাবাদে বলেছে, তাদের শাখায় রেজিস্ট্রার ও নথিপত্র সিলগালা থাকার কারণে শুল্ক গোয়েন্দাদের অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বা কাগজপত্র দেখাতে পারছেন না তারা।তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে আজ বৃহস্পতিবার বেলা ২টায় শুল্ক গোয়েন্দাদের উপস্থিতিতে দোকান খুলে সেসব নথিপত্রের কপি সংগ্রহ করার অনুমতি দিয়েছে শুল্ক গোয়েন্দা দপ্তর।

যে প্রেক্ষাপটে শুনানি

আপন জুয়েলার্সের অন্যতম মালিক দিলদারের ছেলে সাফাত আহমেদ ও তার বন্ধুরা গত ২৮ মার্চ বনানীর রেইনট্রি হোটেলে জন্মদিনের দাওয়াতে ডেকে নিয়ে দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে ধর্ষণ করে বলে গত ৬ মে থানায় মামলা হয়।

দিলদার ও তার ভাইদের বিরুদ্ধে সোনা চোরাচালানের অভিযোগ থাকায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশে একটি অনুসন্ধান কমিটি করে তদন্ত শুরু করে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর।এর অংশ হিসেবে গত ১৪ ও ১৫ মে ঢাকায় আপন জুয়েলার্সের পাঁচটি শাখায় অভিযান চালিয়ে সোনা ও হীরার গয়না ‘আটক’ করা হয়, যার মোট দাম ১৭৯ কোটি টাকা। ওই সময়ই বনানীর হোটেল রেইনট্রিতে অভিযান চালান শুল্ক গোয়েন্দারা। চার তারকা ওই হোটেলের বিভিন্ন কক্ষ তল্লাশি করে ১০ বোতল বিদেশি মদ ও নথিপত্র জব্দ করা হয়।

শুল্ক গোয়েন্দারা জানান, হোটেল কর্তৃপক্ষ বারের লাইসেন্স দেখাতে না পারলেও সেখানে মদ রাখা হয়েছিল। গত জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে ভ্যাট নিবন্ধন নিলেও কোনো অর্থ পরিশোধ না করে ওই হোটেল কর্তৃপক্ষ আট লাখ ১৫ হাজার টাকা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে বলেও শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের অভিযোগ। এরপর গত ১৪ মে ‘ব্যাখ্যাহীনভাবে’ সোনা ও হীরার গয়না মজুদের অভিযোগে আপন জুয়েলার্স এবং অবৈধভাবে মদ রাখার অভিযোগে বনানীর রেইনট্রি হোটেলের মালিকদের তলব করা হয়।

এছাড়া ভ্যাট ফাঁকি, শুল্ক ফাঁকি এবং মানি লন্ডারিং- এই তিন আইনে রেইনট্রি হোটেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতির কথাও জানান শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের যুগ্ম পরিচালক শাফিউর রহমান।

বনানীতে আবাসিক এলাকায় কে ব্লকের ২৭ নম্বর সড়কের ৪৯ নম্বর বাড়িতে চার তারকা ওই হোটেলটির মালিক আল-হুমায়রা গ্রুপ। ঝালকাঠি-১ আসনে আওয়ামী লীগের সাংসদ বজলুল হক হারুন ওই গ্রুপের চেয়ারম্যান। তার মেয়ে হুমায়রার নামে ওই গ্রুপের নাম। তার চার ছেলেমেয়েই পরিচালনা পর্ষদে আছেন। 

সাংসদ হারুনের ছেলেদের মধ্যে এইচ এম আদনান হারুন আছেন ওই হোটেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে। তবে দেখাশোনা করেন মূলত তার ভাই মাহির হারুন। মাহিরের বন্ধু পরিচয় দিয়েই সাফাত ধর্ষণের ঘটনার দিন ওই হোটেলে উঠেছিলেন বলে হোটেলকর্মীরা পুলিশকে জানিয়েছেন। মামলার আসামিদের মধ্যে সাফাত, তার বন্ধু সাদমান সাকিফ, সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল হোসেন ও দেহরক্ষী রহমত আলী গ্রেপ্তারের পরে রিমান্ডে রয়েছেন।

সাফাতের বন্ধু সাদমান সাকিফ পিকাসো রেস্তোরাঁর অন্যতম মালিক ও রেগনাম গ্রুপের কর্ণধার মোহাম্মদ হোসেন জনির ছেলে। মামলার আরেক আসামি নাঈম আশরাফ এখনও পলাতক।

গত ৬ মে দায়ের করা মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ২৮ মার্চ রেইনট্রি হোটেলে সাফাত ও নাঈম দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে ধর্ষণ করেছিলেন। অন্য তিনজন ছিলেন সহায়তাকারী। অভিযোগকারী তরুণীদের একজন জানিয়েছিলেন, পীড়াপীড়িতে বাধ্য হয়ে তারা রেইনট্রি হোটেলে সাফাতের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। তাদের নিতে গাড়ি নিয়ে এসেছিলেন সাফাতের গাড়িচালক ও দেহরক্ষী। ধর্ষণের সময় দেহরক্ষী রহমতকে দিয়ে ভিডিও ধারণ করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেছেন ওই তরুণী।

বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারে নি আপন জুয়েলার্স

আপন জুয়েলার্স থেকে জব্দ করা সাড়ে ১৩ মন স্বর্ণের মধ্যে এক কেজিরও কোনো বৈধ কাগজ দেখাতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এ কারণে তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত ডার্টিমানি ও চোরাচালনের অভিযোগ প্রাথমিকভাবে সত্য বলে প্রতীয়মান হয়। বনানীর আলোচিত ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি সাফাত আহমেদের বাবার প্রতিষ্ঠান ‘আপন জুয়েলার্স’ থেকে জব্দ করা স্বর্ণের বিষয়ে গতকাল বুধবার বিকেল সাড়ে ৫টায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ মন্তব্য করেন শুল্ক ও গোয়েন্দা অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) ড. মইনুল খান।

শুল্ক ও গোয়েন্দা অধিদফতরের মহাপরিচালক মইনুল খান বলেন, ‘এই বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও ডায়মন্ডের বৈধ সরবরাহের কোনো কাগজ দেখাতে পারেনি আপন জুয়েলার্স কর্তৃপক্ষ। তারা বৈধ কাগজ দেখানোর জন্য সময় চেয়েছেন। আমরা সময় দিয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘জব্দ করা স্বর্ণের মধ্যে এক কেজিরও বৈধ কাগজ তারা দেখাতে পারেনি। বৈধ কাগজ না দেখানো মানে আমাদের অনুসন্ধান ও তথ্য সত্য বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। অর্থাৎ ডার্টিমানি ও চোরাচালনের অভিযোগ সত্য বলে প্রাথামিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে।’ ‘বৈধ কাগেজ দেখাতে তাদের ২৩ মে পর্যন্ত সময় দেয়া হয়েছে’ বলেও জানান তিনি।

শুল্ক গোয়েন্দারা জানান, ‘ডার্টি মানি’র অনুসন্ধানে রাজধানীতে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন শাখায় তল্লাশি চালানো হয়। এ সময় বৈধ কাগজ দেখাতে না পারায় সাড়ে ১৩ মন স্বর্ণ জব্দ করা হয়।

আমাকে গ্রেফতার করলে সবাইকে জেলে যেতে হবে : দিলদার

নিজেদের জুয়েলারি ব্যবসা ‘বৈধ’ দাবি করে বনানীর হোটেলে দুই তরুণী ধর্ষণে অভিযুক্ত সাফাত আহমেদের বাবা আপন জুয়েলার্সের অন্যতম মালিক দিলদার আহমেদ বলেছেন, ‘এটা আমাদের বৈধ ব্যবসা। আমাকে যদি ডার্টি মানি ও স্বর্ণ চোরাচালানের জন্য গ্রেফতার করা হয়, তাহলে কোনো স্বর্ণ ব্যবসায়ী বাইরে থাকবে না। সবাইকে জেলে যেতে হবে।’ গতকাল বুধবার শুল্ক গোয়েন্দা কার্যালয় থেকে বের হওয়ার সময় সাংবাদিকদের কাছে এ কথা বলেন তিনি।

বনানীর ধর্ষণে অভিযুক্ত ছেলের পক্ষে বক্তব্য দিয়ে বিতর্কিত দিলদার আহমেদ বলেন, ‘৪০ বছর ধরে সততার সঙ্গে ব্যবসা করে আসছি। কোনো অবৈধ জিনিস (স্বর্ণ-হীরা) আমাদের দোকানে নাই। তবে শুল্ক গোয়েন্দার অধিকার রয়েছে আমাদের দোকান সার্চ করার। তারা আমাদের স্বর্ণ ও ডায়মন্ড জব্দ করেছে। আমরা পেপার্স শো করব।’

সাংবাদিকদের অপর প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি যেভাবে ব্যবসা করছি, সারা বাংলাদেশে সেভাবে ব্যবসা চলছে। এরপরও যদি আমার স্বর্ণের দোকান বন্ধ করা হয় তবে সারাদেশের সকল দোকান বন্ধ করে দিতে হবে।’

অভিযানে বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তাৎক্ষণিকভাবে কেউ কী আর কাগজপত্র দেখাতে পারে? গত পাঁচ বছর ধরে কোনো স্বর্ণ আমদানি নেই। একটা ব্যবসা চললে তার নীতিমালা থাকা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা কোনো নীতিমালা করতে পারিনি।’ ‘আমরাও আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলেছি, কথা হয়েছে জুয়েলারি সমিতির সঙ্গেও। সবার সঙ্গে কথা বলে আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ নেব,’ যোগ করেন দিলদার।

সম্প্রতি বনানীর হোটেলে দুই তরুণী ধর্ষণের অভিযোগে দিলদার আহমেদের ছেলেসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। এরপর ছেলের পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন আপন জুয়েলার্সের এই মালিক।

জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বেরিয়ে এসে আপনের অন্যতম মালিক দিলদার আহমেদ সাংবাদিকদের সামনে দাবি করেন, কোনো দোষ তিনি করেননি। “সারা দেশের লোক যেভাবে ব্যবসা করে আমিও সেভাবে করছি। আমরা কোথাও অন্যায় অবৈধ ব্যবসা করি না। আমাদের কাছে যেসব কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে সেগুলো দেওয়ার জন্য সময় চেয়েছি। আমি যদি কোনো অন্যায় করে থাকি, দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।”

শুল্ক গোয়েন্দারা বিক্রয় কেন্দ্রের ভল্টে গয়না সিল গালা করে রাখায় ব্যবসা করতে পারছেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে আপন মালিকদের।

রেইনট্রির আদনান ‘হঠাৎ অসুস্থ’

শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর আপন মালিকদের সঙ্গে গতকাল বুধবার একই সময়ে বনানীর রেইনট্রি হোটেল কর্তৃপক্ষকে তলব করেছিল। কিন্তু ওই হোটেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এইচ এম আদনান হারুনের পক্ষে আইনজীবী অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির ও রিয়াজ আহমেদ কাকরাইলে শুল্ক গোয়েন্দা দপ্তরে এসে এক মাসের সময়ের আবেদন জমা দেন।পরে বেরিয়ে যাওয়ার সময় জাহাঙ্গীর কবির সাংবাদিকদের বলেন, সকালে হঠাৎ আদনান হারুনের ‘রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ায়’ তিনি আসতে পারেননি। “এ বিষয়টি জানিয়ে আমরা সময়ের আবেদন করেছিলাম। উনারা সময় মঞ্জুর করে ২৩ মে আসতে বলেছেন।”

আগের দিনও রেইনট্রি হোটেলের সংবাদ সম্মেলনে আসা আদনানের অসুস্থতার বিষয়ে কোনো চিকিৎসা সনদ জমা দেওয়া হয়নি বলে জানান এই আইনজীবী। 

শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের মহাপরিচালক মইনুল খান বলেন, “রেইনট্রির ব্যবস্থাপনা পরিচালক অসুস্থতার কথা বলে এখানে আসেননি। কিন্তু তার পক্ষে কোনো কাগজপত্রও আইনজীবীরা দেখাতে পারেননি। আগামী ২৩ মে বেলা ১১টায় তাদের আসতে বলা হয়েছে। সেদিন না এলে শুল্ক গোয়েন্দা দপ্তর একতরফাভাবেই শুনানির নিষ্পত্তি করবে।”

দুই তরুণীকে নিরাপত্তা দেয়ার নির্দেশ

‘দ্য রেইন ট্রি’ হোটেলে ধর্ষণের শিকার দুই বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণীকে নিরাপত্তা দিতে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। দুই তরুণীর আইনজীবীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর হাকিম লস্কর সোহেল রানা গুলশান থানাকে এ নির্দেশ দেন। গতকাল বুধবার আদালত সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এর আগে দুই তরুণীর আইনজীবী ‘রাজধানী মানবাধিকার সংস্থা’র যুগ্ম সম্পাদক সৈয়দ নাজমুল হুদা নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করেন। আবেদনে উল্লেখ করা হয়, মামলা দায়েরের পর থেকে দুই তরুণী ও তাদের পরিবারকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেয়া হচ্ছে। এখন তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তাই তাদের নিরাপত্তা খুবই প্রয়োজন।

তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে গুলশান থানার পরিদর্শক (ভারপ্রাপ্ত) আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ওই দুই তরুণীকে আগে থেকেই পুলিশ নিরাপত্তা দিয়ে আসছে। তাদের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য নারী পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি পুরুষ পুলিশ সদস্যরাও কাজ করছেন। তিনি আরো বলেন, আদালতের নির্দেশনা আমরা এখনও পাইনি। নির্দেশনা পেলে নিরাপত্তা আরও জোরদার করব।

তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্ব বাড়ছে প্লেবয় নাঈমের

ধর্ষণ মামলার অন্যতম আসামি নাঈম আশরাফের গুরুত্ব বাড়ছে তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে। তার ছদ্মনাম, অভিনব প্রতারণা ও ভিআইপিদের সঙ্গে ছবিসহ অনেক তথ্য এখন গোয়েন্দাদের হাতে। 

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বনানী ধর্ষণ মামলার আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হচ্ছে পলাতক আসামি নাঈম আশরাফ ওরফে আব্দুল হালিম। ছদ্মনাম-পরিচয়, ভিআইপিদের সঙ্গে তার সেলফি ও অভিনব প্রতারণার কারণে সে বেশ আলোচিত। নাঈম আশরাফের ঘনিষ্ঠজনদের লম্বা তালিকায় অনেক ভিআইপির নামও রয়েছে। পুলিশের একজন কর্মকর্তা নাম পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নাঈম আশরাফকে গ্রেফতারে বিলম্বের নেপথ্যে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রভাব কাজ করছে। এসব কারণে নাঈম আশরাফ ওরফে আব্দুল হালিম পুলিশের কাছে এখন বেশ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। ইতোমধ্যে তার অবস্থান শনাক্তের পাশাপাশি সব তথ্য সংগ্রহ করেছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। আর সেসব তথ্যের ভিত্তিতে নাঈম আশরাফ ওরফে হালিমকে গ্রেফতারে অভিযান চালানো হচ্ছে। এছাড়া তার সম্পর্কে পাওয়া সব তথ্য ও নথিপত্র যাচাই-বাছাইয়ে মাঠে কাজ করছেন গোয়েন্দাদের একাধিক দল।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সবকিছু এখন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। পাঁচ আসামির মধ্যে চার জনই গ্রেফতার হওয়ায় মামলার তদন্তে তেমন কোনও জটিলতা নেই। তবে তারা যদি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হয়, তাহলে দুজনকেই আদালতে হাজির করা হবে। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি না দিলে ফের তাদের রিমান্ডের আবেদন জানানো হবে।

তদন্ত কর্মকর্তারা আশা করছেন, আসামিরা আদালতের কাছে সত্য কথা বলবে। তবে এজাহারের ফাঁক-ফোকর বের করে সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করছে আসামিরা।

আসামিদের নির্দোষ প্রমাণের জন্য রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার বাইরে তাদের সঙ্গে ওই দুই শিক্ষার্থীর যাতায়াত এবং বসবাসস্থলের নানান তথ্য সংগ্রহে সহযোগীদের মাঠে নামানো হয়েছে। ধর্ষণের শিকার দুই শিক্ষার্থীর সব তথ্য গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। তারপরও রাজধানীর বিভিন্ন আড্ডাস্থল ও ঢাকার বাইরে কোথাও গিয়ে থাকলে সেসব তথ্য, স্থির চিত্র কিংবা ভিডিও চিত্রের নেতিবাচক উপস্থাপনের ভিন্ন কৌশল নিয়ে রেখেছে আসামিপক্ষ। দুই শিক্ষার্থীর সঙ্গে আসামিদের ছবি ব্ল্যাকমেইলের কারণে কিনা সেটাও খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মো. মাসুদুর রহমান বলেন, ‘পলাতক আসামি নাঈম আশরাফকে গ্রেফতারের জন্য বিভিন্ন জায়গায় অভিযান অব্যাহত আছে। এছাড়া মামলার তদন্তের জন্য যেসব তথ্য-উপাত্ত দরকার সবকিছু সংগ্রহ করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।’

ওই ধর্ষণের ঘটনায় পাঁচ আসামির চারজন গ্রেফতার হয়েছেন। কিন্তু এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে মামলার অন্যতম আসামি নাঈম আশরাফ ওরফে আব্দুল হালিম।গ্রেফতার এড়াতে ফেসবুক ডি-অ্যাক্টিভ করে রেখেছিলেন নাঈম আশরাফ। মঙ্গলবার সেটি অ্যাক্টিভ পাওয়া গেছে। এছাড়া ইনস্টাগ্রামেও সক্রিয় দেখা গেছে তাকে। মামলার পর ১০ দিন অতিবাহিত হলেও অধরা নাঈম আশরাফ। ভিকটিমদের অভিযোগ, ধর্ষণের ঘটনার রাতে নাঈম আশরাফের আচরণই ছিল সবচেয়ে জঘন্য।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, গোয়েন্দা পুলিশ, সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশ, বনানী থানা পুলিশ এবং ডিএমপি ও পুলিশ সদর দফতরের একাধিক টিম নাঈমকে গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রেখেছে।

ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের এডিসি আসমা সিদ্দীকা মিলি বলেন, সম্ভাব্য সব স্থানে অভিযান চালিয়ে পাওয়া যায়নি তাকে। যেকোনো মূল্যে নাঈমকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হবে।

ফেরিওয়ালার ছেলে নাঈম আশরাফ

ধর্ষণ মামলার পর নাঈমকে চিহ্নিত করেন সিরাজগঞ্জবাসী। তিনি সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার গান্ধাইল গ্রামের আমজাদ হোসেন ফেরিওয়ালার ছেলে এইচএম হালিম ওরফে নাঈম আশরাফ।২০০৪ সালে এসএসসি পাস করে বগুড়া পলিটেকনিকে ভর্তি হন তিনি। সেখানেও নিজের বাবার নামসহ পুরো পরিচয় গোপন করে প্রতারণা করেন এক মেয়ের সঙ্গে। বিষয়টি জানাজানি হলে সেখানে গণপিটুনির শিকার হন নাঈম। তার বিরুদ্ধে তিনটি বিয়ের অভিযোগ রয়েছে। আগের দুই স্ত্রীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হলেও তৃতীয় স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকার কালশি এলাকায় ভাড়াবাড়িতে বসবাস করতেন।

কাজিপুর উপজেলার গান্ধাইল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আশরাফ আলী জানান, এলাকায় সে একজন প্রতারক হিসেবে পরিচিত। বাবার নাম-পরিচয় বদলে বিয়ে করেছে তিনটি। বগুড়া-ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় নিজের নাম বদলে কুকীর্তি করে বেড়ায় হালিম। সে বছরে দু-একবার এলাকায় আসে। প্রতারণাই তার পেশা। স্কুলজীবন থেকেই সে প্রতারক। তার বিরুদ্ধে ইউনিয়ন পরিষদে নানা অভিযোগ রয়েছে। নাঈম পরবর্তীতে ঢাকায় এসে চাকরি নেন একটি মিডিয়া হাউজে।

সেদিনকার নাঈমের ভূমিকা 

ওই দিনের ঘটনার শিকার দুই তরুণী জানান, ঘটনার দিন সে-ই (নাঈম) প্রথম তাদের একজনকে অস্ত্রের মুখে ধর্ষণ করে। তার দেখাদেখি সাফাতও ধর্ষণ করে। ‘সেদিন সবচেয়ে খারাপ আচরণ করেছিল নাঈম। সবচেয়ে বড় পিশাচ সে। আমার ধারণা তারই বুদ্ধিতে আমাদের জন্য এই ফাঁদ তৈরি হয়েছিল।’ তিনি বলেন, ‘সেদিনের ঘটনার সাক্ষী সাকিফ। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই পুরো ঘটনা জানা যাবে। সেদিন আমাদের সঙ্গে যা যা করেছে ওরা, সাদমান সব দেখেছে, দেখেও চুপ করে থেকেছে। সে ইচ্ছে করলেই আমাদের সাহায্য করতে পারত, পুলিশে খবর দিতে পারত, আমাদের উদ্ধার করতে পারত। কিন্তু সে কিছুই করেনি। বরং ওদের সহায়তা করেছে।’

এই মানুষরূপী পশুদের বিচার চেয়ে তরুণীদের একজন বলেন, এমন বিচার হোক, এমন শাস্তি হোক; আর যেন কেউ কোনো মেয়ের সঙ্গে এমন আচরণ করার সাহস না পায়। তবে বারবার ওই তরুণী প্রশ্ন করেন- আমরা বিচার পাব তো?

তদন্ত শেষ হচ্ছে দ্রুতই

দুই তরুণী ধর্ষণের ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম দ্রুতই শেষ হবে বলে জানিয়েছেন ডিএমপির গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য (ডিবি) বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মো. আব্দুল বাতেন। গতকাল বুধবার দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

ধর্ষণ মামলা দায়ের করার পর প্রথমে তদন্ত করে বনানী থানা পুলিশ। পরে ডিএমপি কমিশনারের নির্দেশে মামলার তদন্তভার পুলিশের উইমেন সাপোর্ট সেন্টার অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগকে দেয়া হয়। এছাড়া আলোচিত এ ধর্ষণ মামলার ঘটনার তদন্ত কার্যক্রমে সহায়তার জন্য ডিএমপি কমিশনার উচ্চপার্যায়ের একটি কমিটি গঠন করেছে।

ওই কমিটির সদস্য গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মো. আব্দুল বাতেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, দুই তরুণী ধর্ষণের ঘটনায় এখন পর্যন্ত চার আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। আসামিদের কাছ থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি। সেগুলো যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। এখনও এক আসামি পলাতক, তাকে গ্রেফতারে চেষ্টা করছি। আসামিরা আদালতে ঘটনার বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ