ঢাকা, বৃহস্পতিবার 18 May 2017, ০৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, ২১ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

জনগণ পাশে আছেন ষড়যন্ত্রকে পরোয়া করি না -প্রধানমন্ত্রী

 

সংগ্রাম ডেস্ক : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনের সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, সৃষ্টিকর্তা এবং জনগণ তার পাশে থাকলে তিনি এই লক্ষ্য অর্জনে কোনকিছুকেই পরোয়া করেন না।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ ছোটবেলা থেকেই আমি এসব ষড়যন্ত্র দেখে আসছি। আমি এগুলোর পরোয়া করি না। আমি বিশ্বাস করি যতদিন মহান আল্লাহ এবং বাংলার জনগণ তাঁর পাশে রয়েছেন, মা-বাবার দোয়া ও আশির্বাদ রয়েছে ততদিন এই লক্ষ্য অর্জনকে কেউ ঠেকাতে পারবে না।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল বুধবার গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর ৩৬তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে একথা বলেন।

উল্লেখ্য, ১৯৮১ সালের এই দিনে পচাত্তরের ১৫ আাগস্টের বিয়োগান্তক অধ্যায়ের পর প্রবাস জীবনে থাকতে বাধ্য হওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে দেশে ফিরে আসেন। এরআগে তিনি ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা শেখ হাসিনার স্বামী দেশের বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়ার কর্মস্থল জার্মানী যান। ১৫ আগস্ট তাঁরা দুজন বেঁচে গেলেও জাতির পিতার পরিবারের ১৮ জন সদস্যকে সেদিন হত্যা করা হয়।

আওয়ামী লীগ এবং তার সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা দিবসটি উপলক্ষে এদিন প্রধানমন্ত্রীকে ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেদিন ৩০ জুলাই আমরা দেশ ছেড়ে যাই, আমি আর রেহানা। সেসময় বিদেশে যাওয়াতো ছিল স্বপ্নের মত ব্যাপার। কিন্তু সেবার বিদেশে যেতে যেন কিছুতেই মন টানছিল না। আমরা খুব কাঁদছিলাম। কিন্তু যেতে হলো। এই তেজগাঁও এয়ারপোর্ট হয়েই আমরা দিল্লী এবং সেখান থেকে জার্মানী। কামাল, জামাল, রাসেল সবাইকে রেখে গিয়েছিলাম। কামাল-জামালের বউ সুলতানা রোজী সবাই এসেছিল এয়ারপোর্টে। আর এই ১৭ মে যেদিন ফিরে আসি, সেদিন লাখো মানুষ। হাজার-হাজার মানুষ সেই মানুষদের ভীড়ে আমি ৩০ জুলাই যাদের রেখে গিয়েছিলাম। তাদের কাউকে পাইনি। আর বনানীতে গিয়ে পেলাম সাঁড়ি সাঁড়ি কবর। জানি না, আল্লাহ আমাকে কত শক্তি দিয়েছেন সহ্য করতে। এই দেশের জন্যইতো আমার আব্বা সারাটা জীবন এতো কষ্ট করেছেন। কারাগারে যেখানে তিনি (বঙ্গবন্ধু) ছিলেন সেটাতো আজ উন্মুক্ত। সবাই গিয়ে দেখে আসতে পারেন। তিনি (বঙ্গবন্ধু) দুঃখকে কোনদিন দুঃখ, কষ্টকে কোনদিন কষ্ট মনে করেননি। বাংলাদেশের মানুষের কথাই ভেবেছেন, আমার আব্বা এবং আম্মা দু’জনেই।

প্রধানমন্ত্রী স্মৃতি রোমন্থনে বলেন, একটাই লক্ষ্য নিয়ে সেদিন ফিরে এসেছিলোম এদেশের দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাব। সেটাই যেন করতে পারি। আর কোন চাওয়া-পাওয়ার নেই।

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, অবেগাপ্লুত কন্ঠে এ সময় বলেন, আমি দুঃখিত এত কথা যে আমাকে বলতে হবে সেটা চিন্তাও করি নাই। তবুও মনে হয় আমাদের আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদেরও জানার দরকার রয়েছে। আমি যখন দেশে ফিরি সে সময় আজকের অনেকের জন্মই হয়নি। আর তখন যারা ছিলেন তাঁদের অনেকেও বেঁচেও নেই।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি একটাই কথাই বলব আমরা যারা রাজনীতি করি তাঁরা যদি জাতির পিতার রাজনীতির দিকে তাকাই এবং তাঁর আদর্শটা ধারণ করে রাজনীতি করি তাহলে আমরা দেশকেও কিছু দিতে পারব, দেশের মানুষকেও দিতে পারবো। মানুষ ধন-সম্পদের জন্য কতকিছু করে, কিন্তু মৃত্যু হলেতো আর কিছুই সাথে নিয়ে যেতে পারে না। সান-শওকত, বিলাসিতায় জীবন কাটালে মুত্যুর পর অনেক কিছুই মিথ্যা হয়ে যায়। কাজেই মানুষের জন্য যদি কিছু করে যাওয়া যায়, সেটাই সব থেকে বড়ো পাওয়া। আমরা আব্বার কাছ থেকে মায়ের কাছ থেকে সেটাই শিখেছি। আর আজকে যতটুকু যাই চেষ্টা করে যাচ্ছি সেই শিক্ষা থেকেই করে যাচ্ছি। তিনি বলেন, এদেশকে এমন একটা জায়গায় পৌঁছানো আমার লক্ষ্য যেন আমার বাবার আত্মাটা শান্তি পায়। তিনি আরো বলেন, ৭৫ এর ১৫ আগস্ট সব হারিয়েছি, সব হারিয়ে নিঃস্ব রিক্ত অবস্থায় বিদেশে ছিলাম।

পচাত্তরের বিয়োগান্তক অধ্যায় সম্পর্কে তিনি বলেন, কখনো ভাবতেও পারিনি এরকম ঘটনা আমাদের জীবনে আসবে। মাত্র ১৫ দিন আগে আমি আর রেহানা দেশে ছেড়ে বিদেশে যাই। অল্প সময়ের জন্য গিয়েছিলাম। চলে আসবো কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য ফিরতে পারলাম না। ’৭৫ এর কালো দিন আমাদের জীবনে সব কিছু কেড়ে নিয়েছিলো।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু আমরা হারিয়েছি তা তো না বাংলাদেশের জনগণ যে স্বপ্ন নিয়ে, যে আকাঙ্খা নিয়ে জাতির পিতার ডাকে অস্ত্র হাতে নিযে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। ক্ষুধা, দারিদ্র মুক্ত সমাজ গঠন, মর্যাদাসম্পন্ন স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেলো।

বিদেশে ১৫ আগস্টের সংবাদ শোনার প্রেক্ষাপট স্মরণ করে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, এ ঘটনাটা যখন আমরা শুনলাম তখন একদিকে যেমন স্বজন হারাবার বেদনা, অপর দিকে একথা বারবার মনে হচ্ছিল যে এ দেশটার জন্য সারা জীবন আমার বাবা কষ্ট করেছেন। আমরা সন্তান হিসেবে একটানা দুই বছর বাবাকে কাছে পাই নি। যে বয়সে ছেলে মেয়ে স্কুলে যায় বাবার হাত ধরে, আমাদের সে সৌভাগ্য কখনো হয়নি।

যখন থেকে জ্ঞান হয়েছে বাবার সঙ্গে দেখা হয়েছে কারাগারে। স্কুল জীবনে কলেজ জীবনে সব সময় ঐ কারাগারে যেয়েই সাক্ষাত করতে হতো। আমার বাবা একটা জাতির জন্য, একটা দেশের জন্য এত ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তিনি নিজের জীবনের দিকে একবারও ফিরে তাকাননি। সব কিছু বিলীন করে দিয়েছিলেন এদেশের মানুষের জন্য। মানুষের স্বার্থে।

প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, গ্রামে গঞ্জে যখন ঘুরেছি তখন দেখেছি সাধারণ মানুষের ভালবাসা। সে ভালবাসাই কিন্তু আমাদের আরো প্রেরণা দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তখন চরক্লার্কের একটি ঘটনার উল্লেখ করে বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়ের রিলিফ দিতে আমরা সেখানে গিয়েছিলাম। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি, রাস্তায় পানি, তখন একজন বুড়ো মতন মহিলা তাঁর ঘরে ডেকে নিয়ে খেজুরপাতার পাটিতে বসতে দিলেন- বাড়ির উঠোনে নারকেল গাছ, সেখান থেকে একপি ডাব পেড়ে এনে বললেন মা খাও। মাথায় হাত বুলিয়ে তিনি বললেন, বাবাতো আমাদের জন্য তাঁর জীবনটাই দিয়ে গেছে, তুমিও মা নামছো এই কাজে! তুমিও এমন চেষ্টা করে যাচ্ছো!’

 শেখ হাসিনা বলেন, পর্ণ কুটিরের একজন মানুষের এই যে অনুভূতি, এটুকুইতো আমার পাওনা। যাদের জন্য আমার বাবা সারাজীবন কষ্ট করেছেন তাদের জন্য কিছু করতে পারলেইতো সবথেকে বড়ো স্বার্থকতা।

দীর্ঘ পথ পরিক্রমার প্রসংগে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সভাপতি হিসেবে আজকে ৩৫ বছর পার হয়ে ৩৬ এ পা দিলাম। এ দীর্ঘ সময় কিন্তুু কেই দায়িত্বে থাকে না। প্রধানমন্ত্রী এ সময় ভবিষ্যতের জন্য নতুন নেতৃত্ব খোঁজার কথা বললে সমবেত সকলে ‘না’ ‘না’ বলে প্রতিবাদ করে ওঠেন।

 শেখ হাসিনা বলেন, জীবন মৃত্যু আমি পরোয়া করি না এটা ঠিক কিন্তুু, মৃত্যুকেতো আমি বারবার সামনে থেকে দেখেছি। কিন্তু কথনও ভয়ও পাইনি, ঘাবড়াইওনি, কারণ আমার একটা বিশ্বাসই ছিলো সৃষ্টিকর্তা আমাকে এই জীবনটা দিয়েছেন, আমাকে দিয়ে কিছু কাজ করাবেন বলে। আর এটা হয়তো আমার আব্বা-আম্মারই আকাঙ্খা এবং আশির্বাদ। নইলে তাঁর পক্ষে এতকিছু সম্ভব ছিলা না বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। বাসস

কোন অঞ্চলের মানুষ উপেক্ষিত থাকবে না 

বাসস : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশের কোন অঞ্চলের মানুষ উপেক্ষিত থাকবে না। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে এনে সকলের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে তার সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর যারা পিছিয়ে আছেন তাদের শিক্ষা-দীক্ষা এবং আর্থ-সামাজিকভাবে যাতে তারা উন্নত হতে পারেন সেই উদ্যোগটা আমরা হাতে নিয়েছি।’

প্রধানমন্ত্রী এ সময় শিক্ষাকে অধিকার হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, ‘দেশের প্রায় ৫৫টি জেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। তাদের জীবনমান কিভাবে উন্নত করা যায় এবং সেই লক্ষ্যে আমরা কিছু বিশেষ এলাকা নিয়ে উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। এজন্য বাজেটেও আলাদা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল বুধবার সকালে তার কার্যালয়ে আয়োজিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের শিক্ষা বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে একথা বলেন।

অনুষ্ঠানে ৩৫০ জন শিক্ষার্থীর প্রত্যেককে বৃত্তি হিসেবে ২৫ হাজার টাকার চেক প্রদান করা হয়।

শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানে ১৬ জন কৃতী শিক্ষার্থীর হাতে এই বৃত্তির চেক তুলে দেন।

নিজ নিজ সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে এদিন চেক গ্রহণে আগত শিক্ষার্থীরা নিজস্ব সংস্কৃতির পোশাক পরিধান করায় সমগ্র অনুষ্ঠানটি একটি ভিন্ন মাত্রা লাভ করে।

দেশের প্রায় ৫৫টি জেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, খুব ক্ষুদ্র আকারে হলেও এসব জেলায় তারা রয়েছেন। কাজেই তাদের জীবনমান কিভাবে উন্নত করা যায় এবং সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা কিছু বিশেষ এলাকা নিয়ে উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করি। এজন্য বাজেটে আলাদা বরাদ্দ রাখার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা সবসময় মনে করি শিক্ষা হচ্ছে একটি জাতির অধিকার।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মুখ্য সচিব ড. কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী।

প্রকল্প পরিচালক এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক কবির বিন আনোয়ার অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা প্রদান করেন।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ওরাং সম্প্রদায়ের লিমা তাত্তো বৃত্তি লাভের পর অনুষ্ঠানে নিজস্ব অনুভূতি ব্যক্ত করে বক্তৃতা করেন।

গত বছর বৃত্তি লাভকারী মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার চা শ্রমিক মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধি এবং বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী রাজু দেশোয়ারার ওপর একটি ভিডিও চিত্র পরিবেশিত হয়। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়া সরকারের মন্ত্রী পরিষদ সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাবৃন্দ, জাতীয় সংসদের সদস্যবৃন্দ, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিদেশী কূটনিতিক, রাষ্ট্রদূত, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাঁওতাল, মুরং, হাজং, গারো, খাসিয়াসহ বহু ক্ষুদ ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী এদেশে রয়েছে। তাদের সংস্কৃতি শিক্ষা এবং মাতৃভাষার সম্মান বজায় রাখা আমাদের লক্ষ্য। যাতে এইসব বৈচিত্রময় নৃগোষ্ঠীর ভাষার এবং তাদের বিভিন্ন সংস্কৃতির চর্চা সঠিকভাবে তারা করতে পারেন।

তিনি বলেন, সেই সাথে তারা শিক্ষার দিক থেকে যেন পিছিয়ে না পড়ে। কারণ, বাংলাদেশকে সকল পর্যায়ের ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া শিখে সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে শিক্ষিত জাতি হিসেবে গড়ে উঠব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ