ঢাকা, বৃহস্পতিবার 18 May 2017, ০৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৩, ২১ শাবান ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

অর্থ পাচারকারীদের বিচারে বাধা কোথায়?

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন : আমরা বড্ড কঠিন সময়ের মধ্যে দিনাতিপাত করছি। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশও আজ হাজারো সমস্যায় জজরিত। সমস্যার যেন শেষ নেই। একটি সমস্যার রেশ কাটতে না কাটতে আরেকটি সমস্যার সংবাদ পত্রিকার পাতায় মুদ্রিত হচ্ছে। গুম, খুন, অপহরণ, ক্রসফায়ার, জঙ্গি হামলার সাথে নতুন মাত্রায় যোগ হয়েছে অর্থ পাচারের বিষয়টি। স্বাধীনতার পক্ষের আর বিপক্ষের বাহাস শোনা যায়। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৬ বছর পেরিয়ে গেলেও অর্থবহ স্বাধীনতাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। এর চেয়ে লজ্জা একটি জাতির জন্য আর কি হতে পারে? যে জাতি যুদ্ধ করে, সংগ্রাম করে, গণতন্ত্রের কথা বলে স্বাধীনতার লাল সবুজের পতাকাকে ছিনিয়ে এনেছে, সে জাতির একশ্রেণী নীতিহীন ক্ষমতালিপ্সু মানুষ দেশের টাকা অবৈধভাবে বিদেশে পাচার করছে। অর্থ পাচার বিষয়টি এখন অপেন সিক্রেটে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর বিশাল অংকের অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। কোনভাবেই অর্থ পাচারের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গত ১০ বছরে পাচার হয়েছে কমপক্ষে সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা। ওয়াশিংটনভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) গত ১ মে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে ২০০৫ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে এই অর্থ পাচার হয়েছে। শুধু ২০১৪ সালেই বাংলাদেশ থেকে মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের ৯ থেকে ১৩ শতাংশ অর্থ পাচার হয়েছে, যার পরিমাণ ৪৬ হাজার কোটি টাকা থেকে ৭২ হাজার কোটি টাকা। দেশ থেকে মোটা অংকের টাকা বিদেশে পাচার হলেও সংশ্লিষ্ট মহলের নীরব ভূমিকা পালন করাটা সত্যিই বেদনাদায়ক। বাণিজ্যের আড়ালে আন্ডার ওভার ইনভয়েসের মাধ্যমে টাকা পাচারের বিষয়টি হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। সরকারের অধীনে এত নজরদারি প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এত বিশাল অংকের অর্থ পাচার হয়েছে-এ প্রশ্ন যে কেউ করতেই পারে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে বলেই দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়ে গেছে। বিদেশে টাকা পাচার রোধে নীতিমালা ও সুনির্দিষ্ট আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ কার্যকর হচ্ছে না বলেই প্রতি বছর এত টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। এই বিষয়টি রাষ্ট্রের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
দেশ থেকে অবৈধপথে টাকা পাচার হওয়ার ঘটনা নিয়ে দেশব্যাপী তোলপাড় হলেও অর্থ পাচার বন্ধ করা যায়নি। মানি লন্ডারিং বন্ধে সরকারের নানামুখী উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও বাস্তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি এটা আবারও প্রমাণিত হয়েছে গ্লোবাল ফিনান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) রিপোর্টে। তাদের ২০১৪ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ১ হাজার ২৫৭ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। বাংলাদেশী মুদ্রায় তা ১ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। এটি ছিল আগের বছরের তুলনায় ২৬ হাজার কোটি টাকা বেশী। কিন্তু ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোন পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়নি। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ থেকে ৭৭ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছিল। উল্লেখ্য যে, জিএফআই বিশ্বের প্রায় সব দেশের মুদ্রা পাচারের বিষয়ের উপর বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। ক্ষমতাসীন দলের নেতা কর্মীদের ভাষ্য হচ্ছে, দেশ নাকি উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে। উন্নয়নের জোয়ারের ঠেলায় গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৭ হাজার ৫৮৫ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। এই পাচার হওয়া টাকার দায়ভার কে নেবে? রাষ্ট্র এই দায় এড়াতে পারে না। অর্থ পাচার তো এমনি এমনিতে হয়নি, তার পেছনে বিভিন্ন কারণ নিহিত রয়েছে। যেমন- প্রথমত রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে কিছু লোক বিদেশে টাকা পাচার করছে। দ্বিতীয়ত দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত কালো টাকা পাচার করা হচ্ছে। তৃতীয়ত বিনিয়োগের মন্দার কারণে একশ্রেণীর ব্যবসায়ী অর্থ পাচার করছে। তা ছাড়া আরেকটি কারণ হচ্ছে, বিভিন্ন দেশের চেয়ে বাংলাদেশে কর অত্যন্ত বেশি। উন্নত দেশগুলোতে ২০ শতাংশের বেশি কর্পোরেট কর নেই। কিন্তু বাংলাদেশে তা ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত নেয়া হচ্ছে। টাকা পাচারের আরও একটি মাধ্যম রেমিটেন্স। বিদেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় প্রবাসীদের রেমিটেন্স একটি শ্রেণী সংগ্রহ করে তা বিদেশেই রেখে দেয়। আর এ দেশে দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ টাকা গ্রহণ করে তার পরিশোধ দেখায়। এখানে তারা কমিশন বাণিজ্য করে। যাকে সহজে হুন্ডি বলা যায়। তবে অর্থ পাচার যে কারণেই হোক না কেন তা দেশের জন্য সুখবর নয়।
একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পায়নের পেছনে সরকারের ভূমিকা কতটুকু তা ব্যারোমিটার দিয়ে পরিমাপ করার প্রয়োজন নেই। কেননা সুশাসনই হল তার মাপকাঠি। প্রতিটি পরিবারে একজন মাত্র ব্যক্তি থাকেন যিনি সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব পালনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তেমনিভাবে একটি দেশ পরিচালানার জন্যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও জনগণ একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে তাদের অভিভাবক নির্বাচন করে থাকে। এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একটি পরিবারের সমস্যার সমাধান করা যেমন অভিভাবকের দায়িত্ব। তেমনিভাবে রাষ্ট্রের যাবতীয় সমস্যার সমাধান করাও সরকার প্রধানের দায়িত্ব। প্রতিনিয়ত দেশে বেকারের সংখ্যা লাগামহীনভাবে বেড়েই চলেছে। তাদের কর্মসংস্থানের ব্যাপারে কোন কার্যকরী উদ্যোগ সরকার নিতে পারেনি। দেশে যখন কর্মসংস্থান, বৈদেশিক রেমিটেন্স এবং বিনিয়োগের খরা চলছে তখন এক অর্থ বছরেই লক্ষকোটি টাকা অবৈধ পথে বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া মোটেও সুখকর নয়। গত বছর প্রকাশিত সুইস ব্যাংকের রিপোর্টে বলা হয়, দেশটির বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশীদের আমানত বাড়ছে। টাকা পাচারের তথ্য এসেছে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি ইউএনডিপির রিপোর্টে। সূত্র বলছে, দুর্নীতি ও চোরাচালানের মাধ্যমে দেশ থেকে টাকা পাচার হচ্ছে। তবে পাচার হওয়া অর্থ মানেই দুর্নীতির টাকা নয়। তাই এই অর্থ নিয়ে রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি বন্ধ করে তা উদ্ধারে বেশী মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। দেশে বিনিয়োগের অবাধ সুযোগ না থাকায় অনেকে বৈধ টাকাও বিদেশে নিয়ে যাচ্ছেন। এককথায় বলা যায় যে, টাকা পাচারের হিড়িক লেগেছে। অর্থ পাচারের এই ধারা অব্যাহত থাকলে একসময় দেশ অর্থনৈতিক সংকটের সম্মুখীন হবে। সরকার রাষ্ট্র পরিচালানা করতে গিয়ে ভুল করতে পারে। এটা অন্যায় কিছু নয়! তাই বলে আইনের শাসনকে ভূলন্ঠিত করার কোন সুযোগ নেই। লাগামহীন দুর্নীতির টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে। এর সঙ্গে জড়িত এক শ্রেণীর দুর্নীতিপরায়ণ মানুষ। আমরা আশা করব সরকার এই দুর্নীতিবাজদের মুখোশ জাতির সামনে উন্মোচন করে অর্থ পাচার বন্ধে কার্যকারী উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
কিছুদিন আগে একটি জাতীয় দৈনিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ‘বড় প্রকল্প মানে বড় দাঁও মারা। অর্থাৎ বড় বড় প্রকল্প থেকে আগাম কমিশন হিসেবে বিপুল পরিমাণ টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এক শ্রেণীর প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও আমলা সিন্ডিকেট করে দুর্নীতি করছে বলে বাজারে চাউর আছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দুর্নীতিবাজরা দেশের চেয়ে বিদেশে টাকা রাখাকে উপযুক্ত স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছে। যে কারণে কানাডায় বেগমপাড়া গড়ে উঠেছে। টাকা পাচারের ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীরব ভূমিকাও জনমনে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আমরা মনে করি সরকারকে দুটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষা তথা নৈতিক মান বৃদ্ধির ব্যাপারে মনোযোগী হতে হবে। এটি যতক্ষণ করা যাবে না ততক্ষণ রাঘববোয়ালদের অর্থ পাচার বন্ধ করা যাবে না। তাই অর্থ পাচার রোধ করতে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ